সুবিধা রূপালীর বঞ্চিত জনতা

আপডেট : ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ১২:৫৪ এএম

প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মহাব্যবস্থাপক (জিএম) পদে পদোন্নতি ও পদায়নের ক্ষমতা অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ হাতে নেওয়ার পর থেকে প্রতিষ্ঠানগুলোর অভ্যন্তরে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। জানুয়ারিতে জারি করা প্রজ্ঞাপনটি বাস্তবায়ন হলে সরকারি ব্যাংক কর্মকর্তাদের মধ্যে বৈষম্য দেখা দেবে বলে মনে করেন ব্যাংক কর্মকর্তারা। এক ব্যাংকের কর্মকর্তারা সুবিধা পাবেন, আর অন্য ব্যাংকের কর্মকর্তারা বঞ্চিত হবেন। এমন পরিস্থিতিতে প্রজ্ঞাপনটি বাতিলের দাবি জানিয়েছেন রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংকের কর্মকর্তারা।

সম্প্রতি প্রজ্ঞাপনটি বাতিলের জন্য আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও বাজার বিভাগের সচিবের কাছে আবেদন জানিয়েছে জনতা ব্যাংকের কর্মকর্তারা। তাদের পাঠানো চিঠিতে দাবি করা হয়, এই নীতি বাস্তবায়ন হলে জনতা ব্যাংকের কর্মকর্তাদের চেয়ে বেশি সুবিধা পাবেন রূপালী ব্যাংকের কর্মকর্তারা। এছাড়া জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘিত হওয়ার পাশাপাশি রূপালী ব্যাংকের অপেক্ষাকৃত কনিষ্ঠ কর্মকর্তারা পদোন্নতি পেয়ে জনতা ব্যাংকের অভিজ্ঞ সিনিয়র ব্যাংকারদের ওপরের কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পাবেন। এতে রূপালী ব্যাংকের নির্বাহীরা আরও এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ পাবেন। বিপরীতে জনতা ব্যাংকের অভিজ্ঞ ও দক্ষ অফিসাররা পদোন্নতি বঞ্চিত হবেন।

জনতা ব্যাংক থেকে পাঠানো চিঠিতে বলা হয়েছে, প্রজ্ঞাপনটি বাস্তবায়িত হলে ব্যাংক কর্মকর্তাদের মেধা, অভিজ্ঞতা ও জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘিত হবে। এছাড়া প্রজ্ঞাপনের কারণে রাষ্ট্রমালিকানাধীন ব্যাংকের অভিজ্ঞ ব্যাংকারদের পদোন্নতির স্বপ্নকে পদদলিত করে শ্রেণি বিশেষকে পুনঃ পুনঃপদোন্নতির সুযোগ করে দেবে। এতে অভিজ্ঞ ব্যাংকাররা ব্যক্তিগত ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি সার্বিকভাবে হতাশায় পতিত হয়ে কর্মোদ্দীপনা হারাবেন, যা ব্যাংকিং সেক্টরে ব্যাপক ক্ষোভ ও অস্থিরতা তৈরি করতে পারে।

চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, এই প্রজ্ঞাপন বাস্তবায়ন করা হলে জনতা ব্যাংকের অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের বিপরীতে রূপালী ব্যাংকের অপেক্ষাকৃত কম অভিজ্ঞ কর্মকর্তারা সুবিধা পাবেন। ১৯৯৮ সালে বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংকার্স রিক্রুটমেন্ট কমিটি’র আওতায় একটি বৃহৎ ব্যাচ মেধা তালিকা অনুযায়ী রাষ্ট্র-মালিকানাধীন বাণিজ্যিক ও বিশেষায়িত ব্যাংকে যোগদান করে। ওই সময়ে যেসব কর্মকর্তা রূপালী ব্যাংকে যোগদান করেছে তাদের মধ্যে একজন এমডি, ১২ জন ডিএমডি (সোনালী ব্যাংকে তিনজন, জনতা ব্যাংকে একজনসহ) এবং অবশিষ্ট অধিকাংশ জিএম পদে পদোন্নতি পেয়েছেন।

অথচ, সোনালী, জনতা ও অগ্রণী ব্যাংকে একই সময়ে যোগদান করা কর্মকর্তারা ডিজিএম হিসেবে তিন বছর সময়কাল অতিক্রম করতে পারেননি। চলতি বছরে জনতা ব্যাংকের ১৯৮৮,৮৯ ও ৯৩ সালে যোগদান করা নবম গ্রেডের কর্মকর্তাদের অনেকেই প্রথমবার জিএম পদে পদোন্নতিযোগ্য হিসেবে বিবেচিত হবেন, যাদের মধ্যে অধিকাংশই ২০২৫ সালে অবসরে যাওয়ার কথা রয়েছে। নতুন নীতিমাল অনুযায়ী, ডিজিএম থেকে জিএম পদে পদোন্নতি কার্যকর হলে জনতা ব্যাংকসহ অন্য ব্যাংকের কর্মকর্তাদের পদোন্নতি বঞ্চিত হওয়ার পাশাপাশি নিম্নস্তরের পদসমূহেও পদোন্নতির ক্ষেত্রেও স্থবিরতা তৈরি হবে। এ থেকে সৃষ্ট হতাশা ও কর্ম বিমুখতা ব্যাংকিং সেক্টরকে দুর্বল করে দেবে বলেও উল্লেখ করা হয় চিঠিতে।

প্রজ্ঞাপনটি বাস্তবায়িত হলে জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘিত হওয়ার পাশাপাশি রূপালী ব্যাংকের অপেক্ষাকৃত কনিষ্ঠ কর্মকর্তারা পদোন্নতি পেয়ে জনতা ব্যাংকের অভিজ্ঞ সিনিয়র ব্যাংকারদের ওপরের কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পাবেন। এতে রূপালী ব্যাংকের নির্বাহীরা আরও এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ পাবেন। এছাড়া রূপালী ব্যাংকের নির্বাহীদের চাকরির মেয়াদকাল বেশি থাকায় তারা দীর্ঘ সময় পর্যন্ত জনতা ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট পদসমূহ দখল করে থাকবেন। ফলে জনতা ব্যাংকের অভিজ্ঞ ও দক্ষ অফিসাররা পদোন্নতি বঞ্চিত হবেন। এছাড়া ১৯৮৮,৮৯, ৯৩ ও ৯৮ সালের দীর্ঘ পদোন্নতি বঞ্চিত নির্বাহীরাও পুনরায় স্থায়ীভাবে পদোন্নতিতে বঞ্চিত থাকবেন।

 ২০১৯ সালের এক প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, রাষ্ট্র মালিকানাধীন বাণিজ্যিক ব্যাংক, বিশেষায়িত ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে উপ মহাব্যবস্থাপক হিসেবে ন্যূনতম ০৩ বছর এবং ৯ম গ্রেড হতে ন্যূনতম ১৮ বছরের কর্ম অভিজ্ঞতা সম্পন্নদের পদোন্নতির জন্য বিবেচনা করা হবে। এর ফলে ডিজিএম হিসেবে তিন বছর পূর্ণ না হওয়ায় সোনালী, জনতা, অগ্রণীসহ অন্যান্য ব্যাংকে নবম গ্রেডে ২৫ বছর বা ততধিক সময়ে কর্মে অভিজ্ঞতা সম্পন্ন প্রার্থীরা জিএম পদে পদোন্নতির বিবেচনায় আসতে পারছেন না। অথচ রূপালী ব্যাংকে ১৯৯৮ সালে দশম গ্রেডে যোগদানকারী কর্মকর্তারা ২০০৪ সালে নবম গ্রেডে উন্নীত হয়েছেন। এতে রূপালী ব্যাংকের কর্মকর্তারা ১৮ বছরে জিএম হবেন এবং বিপরীতে সরাসরি নবম গ্রেডে অন্যান্য ব্যাংকে (সোনালী, জনতা, অগ্রণী ব্যাংক লিমিটেড) যোগদান করে ২৫ থেকে ৩০ বছরেও জিএম পদে পদোন্নতির জন্য বিবেচিত হবেন না। তাই গত ৩ জানুয়ারি জারি করা প্রজ্ঞাপনের বাতিল চেয়েছে জনতা ব্যাংকের কর্মকর্তারা।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে জনতা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবদুছ ছালাম আজাদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘জিএম পদে পদোন্নতির বিষয়টি আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও বাজার বিভাগের হাতে নেওয়ায় ব্যাংক কর্মকর্তাদের মধ্যে ক্ষোভ রয়েছে। এ ক্ষমতা ব্যাংকের হাতে থাকলে আমরা এরই মধ্যে একটি পদোন্নতি দিতাম। কিন্তু এখন দেওয়া যাচ্ছে না। এ ছাড়া এক ব্যাংকের লোক অন্য ব্যাংকে গেলে সেখানে গিয়ে সমস্যা তৈরি হতে পারে। ডিএমডিদের ক্ষেত্রে হলে অন্য বিষয়।’

অন্য কোনো ব্যাংক এতে সুবিধা পাবে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘রূপালী ব্যাংকে যারা অল্প সময়ে পদোন্নতি পেয়েছে তারা অন্য ব্যাংকে গেলে সিনিয়রিটি-জুনিয়রিটি নিয়ে সমস্যা তৈরি হবে। আমি যতদূর জানি, রূপালী ব্যাংকের কর্মকর্তাদের স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় পদোন্নতি হয়নি। তারা আমাদের এখানে এলে সিনিয়রিটি নিয়ে দ্বন্দ্ব তৈরি হতে পারে।’

এ বিষয়ে জানতে রূপালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. জাহাঙ্গীরের সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করে সাড়া পাওয়া যায়নি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত