কলকাতাতেও লড়াইয়ের ঢেউ

আপডেট : ২৬ জানুয়ারি ২০২০, ১২:২১ এএম

অনেক অনেক দিন বাদে ভোরের আলতো রোদে কিংবা কুয়াশাঢাকা সন্ধ্যাবেলায় পথ চলতে বেশ লাগছে। এ যেন এক্কেবারে আমাদের শৈশবের কলকাতা, যেখানে অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে নিয়ত সোচ্চার আমার শহর। যেখানে যাবতীয় কূপম-ূকতাকে দূরে ঠেলে শহর হয়ে ওঠে প্রবল আন্তর্জাতিক। যেখানে কবিতা স্লোগান  হয়। আর স্লোগান হয়ে ওঠে চমৎকার এক-একটা কবিতা। সেই কলকাতা মায়ের স্নেহের মতোই আবার ফিরে এসেছে। হাঁটতে হাঁটতে চলে যাচ্ছি চিৎপুরের কাছে জ্যাকেরিয়া স্ট্রিটে। পেছনে রয়ে গেল নাখোদা মসজিদ। একটু এগোলেই দুশো বছরের পুরনো আতর ও সুগন্ধির দোকান। এই দোকানের খুশবু ভারী পছন্দ ছিল ভারতের শেষ মুঘল বাদশা বাহাদুর শাহর। কে জানে হয়তো এ দোকানের খুশবুর টানে এখানে একদিন নীরবে দাঁড়িয়েছিলেন মীর্জা গালিব। এর কাছাকাছি ছিল কলকাতার আদি বিচারালয়। কাজী বিচার করতেন অপরাধের। চিৎপুর মহানগরীর প্রাচীন সড়ক। শোনা যায়, কাশীপুরের চিত্তেশ্বরী দেবীমন্দির থেকেই চিৎপুর। কত কত ইতিহাস আজও এখানে রয়ে গেছে। এ রাস্তায় যেতে যেতে চোখে পড়বে প্রাচীন স্থাপত্য। ধুলোয়ঢাকা মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথের আদি ব্রাহ্মসমাজের মন্দির, ঠাকুরবাড়ি, শহরের প্রাচীনতম বশরি শা মসজিদ ও রয়েল রেস্তোরাঁ। অজস্র পাঞ্জাবি, কুর্তা আর বোরকার দোকান। কলকাতার পুরনো গুরুদ্বোয়ারারও ঠিকানা এই চিৎপুর। এই কলকাতায় সাম্প্রদায়িকতা নেই। পাশাপাশি সহাবস্থান হিন্দু, মুসলিম, শিখ ও জৈনদের। মুসলিম অধ্যুষিত জ্যাকেরিয়া স্ট্রিট এখন গমগম করছে প্রতিবাদী আঁচে।

ভারত এখন শুধু গৈরিক ফ্যাসিস্ত শক্তির নয়। সে এখন প্রতিদিন পাঠ দিচ্ছে প্রতিবাদের। এই প্রতিবাদের সামনের সারিতে কত নতুন নতুন মুখ। ঠিক আমার সামনে দাঁড়িয়ে রোগা মেয়েটা তার স্বরে চেঁচাচ্ছে ‘হাম ছিনকে লেঙ্গে আজাদি, জান সে মিঠি আজাদি’ অর্থাৎ ‘ছিনিয়ে নেব স্বাধীনতা, প্রাণের চেয়েও প্রিয় স্বাধীনতা।’ কত দিন হয়তো তাকে দেখেছি কাঁধে ব্যাগ ঝুলিয়ে হনহন করে কলেজ যাচ্ছে। কিন্তু চোখে পড়েনি সাধারণ বলে। কোন জাদুমন্ত্রে সেই মেয়েটিই এখন জনতার মুখ, জনগণের নেতা। তার মধ্য দিয়ে আরও কয়েকশত তরুণী স্বপ্ন দেখছে ও দেখাচ্ছে নতুন এক ভারতের। যেখানে হিন্দু-মুসলিম হাত ধরাধরি করে পথ চলবে। এ ধরনের অনেক শাহিন ইউসুফ বড় দ্রুত উঠে এসেছে আন্দোলনের সামনের সারিতে। কিংবা শিলচরের তানিয়া লস্কর, সব ধরনের ভয়-বিদ্রপ গায়ে না মেখে রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ করছে শাসকদের লাল চোখের। এই শাহিন, নাসমিন, তামান্না, হালিমারাই আজ ভারতের রাজনীতির নতুন প্রজন্ম, নতুন নেতৃত্ব। অবাক হয়ে দেখছি কি অসামান্য এক লড়াকু আখ্যান ছড়িয়ে পড়ছে বাতাসের চেয়েও দ্রুত গতিতে। কত আর হুমকি দেবেন আমাদের মাননীয় শাসকরা! কতবার বলবেনÑ তাড়িয়ে দেব দুই কোটি ঘুষপেটিয়াকে! কতবার আর মাননীয় প্রধানমন্ত্রী স্বয়ং একটি সম্প্রদায়ের দিকে পোশাক নিয়ে কু-ইঙ্গিত করবেন! চিঁড়ে খেলেও তাকে অনুপ্রবেশকারী বলা হচ্ছে। খাওয়া দেখেই নাকি বোঝা যায় কে অনুপ্রবেশ করেছে ভারতে!

সব অশ্লীলতাকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে ভারতের কোনায় কোনায় জন্ম নিচ্ছে নতুন নতুন গান, কবিতা, ছবি, নাটক ও সিনেমা। কয়েক বছর আগেও কোথাও না কোথাও ‘সন্ত্রাসী হামলা’ হলেই দেশের সংখ্যালঘু মহল্লায় মিছিল বের হতো ‘শান্তি চাই’ ‘শান্তি চাই’ বলে। আসলে এ এক করুণ আত্মসমর্পণ এবং কিছু ভয়ও। পাছে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ক্রোধের শিকার হতে হয় সেই ভয়। এই ভয় স্বাধীনতার পর থেকে আমরা স্বীকার করি বা না করি, তারা পেয়ে এসেছে। কখনো তাকে প্রকাশ্যে অনুষ্ঠান করতে বাধা দেওয়া হয়েছে। কখনো লুটপাট হয়েছে ওয়াকফের সম্পত্তি। দেশভাগের পর কলকাতার ভূগোল পাল্টে গেছে। আগে যে মহল্লায় হিন্দু-মুসলিম পাশাপাশি দিন কাটিয়েছেন, সেখান থেকে বাধ্য হয়ে পাট গোটাতে হয়েছে এ দেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের অধিকাংশ মানুষজনকে। আমরা কথায় কথায় দেশভাগের কথা বলি, ছিন্নমূল মানুষের যন্ত্রণা নিয়ে মন খারাপ করি এটা স্বাভাবিক। নিজের দেশ, নিজের বাসভূমি থেকে চলে আসা সর্বক্ষেত্রে সব সময় মর্মান্তিক ও বিষাদের। কিন্তু শোক-দুঃখ এসব তো সবার ক্ষেত্রে একই হওয়ার কথা। এ সমস্যা তো মানবিক, কিন্তু সাম্প্রদায়িক নয়। অথচ আমরা কলকাতার বাবু ভদ্দরলোকের অধিকাংশই রাস্তায় রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে ভুলেও তাকাই না নতুন ওঠা আবাসনের এক কোনায় উঁকি মারছে পরিত্যক্ত মসজিদের মাঝ থেকে। কিংবা ভেঙে পড়া দরগা অথবা মলিন কবরস্থানের প্রতি আমাদের চোখই পড়ে না। একবার, একবারও জানতে চাই না কেন একদা আমাদের ঘনিষ্ঠ প্রতিবেশী স্বজনরা আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন! কোথায় গেলেন তারা।

শুধু উপেক্ষা আর ঘৃণা করে বছরের পর বছর একটা সম্প্রদায়ের মানুষকে যে দাবিয়ে রাখা যায় না, তা এবার এই শীতের সময় হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে নরেন্দ্র মোদি অমিত শাহ ও তার দলবল। উত্তর প্রদেশে তথাকথিত এক সন্ন্যাসী যোগী আদিত্যনাথ তো প্রায় যুদ্ধ ঘোষণা করেছে নিজের দেশের নাগরিকদের বিরুদ্ধে। নতুন আইন আসছে গণসংগ্রাম দমনের নামে, যা কুখ্যাত রাওলাট আইনের চেয়েও ভয়ংকর জনবিরোধী। দিল্লিতে শাহিনবাগের লড়াইকে দমন করতে খোলাখুলি সাম্প্রদায়িক তাস খেলছেন সংঘ পরিবারের নেতাকর্মীরা। দিল্লিতেই জারি হয়েছে এনএসএ বা জাতীয় নিরাপত্তা বিধি। যে আইনে সন্দেহ হলেই বিনা অনুমতিতেই যেকোনো লোককে গ্রেপ্তার করার অধিকার দেওয়া হয়েছে পুলিশের হাতে। মনে রাখবেন আমি কিন্তু সামান্য সন্দেহ হলেই শব্দটার ওপর জোর দিয়েছি। ভারতে কেউ আজ আর নিরাপদ নই। জানি না কত দিন এভাবে লিখে যেতে পারব! আদৌ বেঁচে থাকব কি না তাও আজ আর ঠিক নেই। কিন্তু তবু ভালো লাগছে সাধারণ মানুষ পথে নেমে যেভাবে প্রতিরোধ গড়ে তুলছেন। ভয় পেতে পেতে যখন দেয়ালে পিঠ ঠেকে যায় তখনই বাঁচা-মরার তোয়াক্কা না করে পথে নামে জনগণ। যে সংখ্যালঘু জনতা দুদিন আগে সমর্পণের সাদা পতাকা নিয়ে করুণ বদনে শাসকের কাছে ভাবমূর্তি ভালো রাখতে মিছিল করতেন, তারাই এখন গণজাগরণের সামনের কাতারে। এসব প্রান্তিক জনতার হাতেই ভারতের জাতীয় পতাকার সম্মান। এ যেন ১৯৩৬ সালে স্পেনে ফ্যাসিস্ত ফ্রাঙ্কোর বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক ব্রিগেডের মরণপণ লড়াই। প্রহরে প্রহরে জন্ম নিচ্ছে আজাদির স্বপ্ন আর তার সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে গান, কথকতা ও গ্রাফিতি। কালো-সাদার আবছা স্মৃতির বুনুয়েল, আঁরাগ আর লোরকারা ফিরে ফিরে আসছেন অন্য মাটিতে, অন্য পরিপ্রেক্ষিতে। কান্না মুছে মুসলিম সম্প্রদায়ের মহিলারা আজ গণবিক্ষোভের নেতৃত্বে সবার সামনে। আপনারা যারা অনেক দূরে আছেন, তারা কল্পনাও করতে পারবেন না এই দৃপ্ত তেজি মহিলাদের প্রতিদিনের রোজ নামচা নিঃসন্দেহে কীভাবে মহতী উপন্যাস বা ধ্রুপদি সিনেমার বিষয় হতে পারে।

পার্ক সার্কাসে ধীরে ধীরে অন্ধকার নামছে। আওয়াজের তীব্রতা বাড়ছে। পল রবসনের গান আর নেরুদার কবিতার পাশে কানে আসছে কাওয়ালির সুর। মনে পড়ছে একবার ঢাকায় এক বৃদ্ধ আমি কলকাতার লোক শুনে আবেগঘন গলায় জানতে চেয়েছিলেন পার্ক সার্কাসের ঠিক কোনাকুনি সেই বুড়ো অশ্বত্থগাছটা এখনো আছে কি না! আর কখনো বোধহয় দেখা হবে না সেই অপরিচিত বৃদ্ধের সঙ্গে। তিনি বেঁচে আছেন কি না তাও জানি না। থাকলে, দেখা হলে বলতাম সব গাছ বেঁচে আছে। আমাদের শাহিন ইউসুফ ও তার বন্ধু সহকর্মী সহযোদ্ধারাই এক একটা মস্ত গাছ হয়ে পৃথিবীতে শান্তি আনছে। চোখ ধাঁধানো রোদে, ঊষর মরুতে ওরাই আজ মরূদ্যান।

লেখক : ভারতের প্রামাণ্যচিত্র নির্মাতা

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত