ভারতে বিজেপির ‘এক দেশ, এক আইন’

আপডেট : ১২ জুন ২০২১, ১১:৫৯ পিএম

ভারতের ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস পত্রিকার ‘ই-আড্ডা’র বার্তালাপে আসামের নবনির্বাচিত মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা বলেছেন, বাংলাদেশের উগ্রপন্থিবিরোধী নীতির জন্যই আসামের জনগণ এখন চরমপন্থি কার্যকলাপমুক্ত পরিবেশে বসবাস করছে। তিনি এ বিষয়ে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর প্রতি বিশেষ কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী উলফা জঙ্গি নেতাদের ভারতের হাতে তুলে দেওয়ায় আসাম আজ বিচ্ছিন্নতাবাদীদের হাত থেকে রেহাই পেয়েছে।’ শুধু তাই নয়, বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে ট্রানজিট সুবিধা দেওয়ার জন্য ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল অর্থনৈতিকভাবে যে লাভবান হবে সে কথাও উল্লেখ করেন। তিনি বাংলাদেশের সঙ্গে উন্নয়নমূলক সহযোগিতা গড়ে তুলতে চান। করোনা পরিস্থিতির উন্নতি হলে বাংলাদেশ সফরের ইচ্ছাও প্রকাশ করেন। বার্তালাপে হিমন্ত বিশ্বশর্মা আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে কথা বলেন, তা হলো, আসামের নাগরিকপঞ্জি (এনআরসি) এবং নাগরিকত্ব আইন (সিএএ)। তিনি রাখঢাক না করেই বলেন, আসামে এনআরসি’র ফলে যে ১৯ লাখ মানুষ বাদ পড়েছে, ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে নিজেদের ভারতের নাগরিক হিসেবে প্রমাণ করতে না পারলে, তারা বিদেশি বা বাংলাদেশি হিসেবে চিহ্নিত হবে এবং তাদের ভারত থেকে বিতাড়িত করা হবে। তিনি আশা প্রকাশ করে বলেন, ‘বিতাড়নের বিষয়ে কেন্দ্রীয় সরকার নিশ্চয়ই বাংলাদেশ সরকারকে বোঝাতে পারবে।’ আসামের মুখ্যমন্ত্রী কোন ভরসায় শেষোক্ত বক্তব্যটি দিয়েছেন তা তিনি নিজেই জানেন। তিনি যদি, বাংলাদেশের বর্তমান সরকার যেভাবে ভারতকে, গত আট-দশ বছর যাবৎ একতরফা ট্রানজিট, নৌপথ ও রেলপথ যোগাযোগ, সমুদ্রবন্দর ব্যবহারসহ অন্যান্য বাণিজ্যিক সুবিধা দিয়ে আসছে; ঠিক একইভাবে আসামের বাঙালি ইস্যুও মেনে নেবে ভেবে থাকেন, তাহলে ভুল করবেন। ভারতের এনআরসি ও সিএএ নিয়ে গত বছরের জানুয়ারিতে গাল্ফ নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর মনোভাবের কথা মনে থাকলে, হিমন্ত বিশ্বশর্মা হয়তো এ কথা এত সহজে বলতেন না। এ কথা ঠিক, বাংলাদেশের সক্রিয় সহযোগিতা ছাড়া ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল, বিশেষ করে আসামের দীর্ঘদিনের সশস্ত্র আন্দোলন দমন করা সম্ভব হতো না। আন্দোলন দমন করা সম্ভব হয়েছে বলেই সেখানে এখন স্থিতিশীলতা ফিরে এসেছে।

যে বাঙালি মুসলমানদের নিয়ে হিমন্ত বিশ্বশর্মা ও তার দল বিজেপি গভীর ষড়যন্ত্রে মত্ত সেই বাঙালি মুসলমানরাই এক সময়ের জঙ্গলাকীর্ণ আসামকে বাসযোগ্য করে গড়ে তুলেছিল। ব্রিটিশ আমলে আসাম ছিল কমিশনারশাসিত বিশেষ এলাকা। এ বিশেষ এলাকায় আয়-উপার্জনের সুযোগ ছিল সীমিত। সেখানে রাজস্ব আয়ও ছিল কম। যে কারণে আসাম কমিশনারশাসিত এলাকা হিসেবেই চিহ্নিত ছিল দীর্ঘদিন। ব্রিটিশ কর্র্তৃপক্ষ যখন আসামকে প্রদেশ হিসেবে গঠনের উদ্যোগ নেয়, তখন প্রদেশ গঠনের জন্য যতটুকু রাজস্ব আয়ের প্রয়োজন হয়, আসামে ততটুকু রাজস্ব আয়ের সুযোগ ছিল না। অতঃপর একটি প্রদেশ বা রাজ্য চালানোর মতো রাজস্ব আদায় সম্ভব হবে সে হিসাব কষে, ১৮৭৪ সালে আসামের সীমান্তবর্তী তৎকালীন পূর্ববঙ্গের সিলেট জেলা এবং রংপুরের গোয়ালপাড়া মহকুমাকে আসামের সঙ্গে অন্তর্ভুক্ত করে আসাম রাজ্য গঠন করা হয়েছিল। আসামকে রাজ্য হিসেবে টিকে থাকতে হলে প্রচুর নিজস্ব অর্থের প্রয়োজন চিন্তা করে তৎকালীন ব্রিটিশ প্রশাসক কৃষি উৎপাদনের মাধ্যমে সে অর্থ জোগানের ওপর জোর দিয়েছিল; কিন্তু জঙ্গলে আবৃত আসামে সে পরিমাণে কৃষিজমি ছিল না। এছাড়া কৃষিকাজে অভিজ্ঞ কৃষকেরও অভাব ছিল সেখানে। এ সমস্যা সমাধানে ব্রিটিশ কর্র্তৃপক্ষ তখন, পূর্ববঙ্গ থেকে ভূমিহীন কৃষকদের আসামে স্থানান্তর এবং এসব কৃষকের জন্য বসতি স্থাপনের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল।

আসাম ছিল জঙ্গলাকীর্ণ এলাকা। পরিকল্পনা মোতাবেক ব্রিটিশরা পূর্ববঙ্গের বৃহত্তর ময়মনসিংহ, রংপুর ও সিলেট জেলা থেকে লাখ লাখ ভূমিহীন কৃষককে আসামে বসতি গড়ে তোলার ব্যবস্থা করে দিয়েছিল। খেটে খাওয়া এই ভূমিহীন বাঙালি মুসলমানরাই সেদিন আসামের জঙ্গল কেটে পরিষ্কার করে বিপুল পরিমাণ জমি চাষাবাদের উপযোগী করে গড়ে তুলেছিল। কথিত আছে আসামের তেজপুর জেলা এমনই জঙ্গলাকীর্ণ ছিল যে, পুরো এলাকা ছিল হিংস্র জীবজন্তুর অভয়ারণ্য। জঙ্গল সাফ করে আবাদযোগ্য জমি তৈরি করতে শত শত বাঙালি মুসলমান তখন হিংস জন্তুর আক্রমণের শিকার হয়েছিলেন। শেষ পর্যন্ত পূর্ববঙ্গের মানুষের কঠোর পরিশ্রমেই আসামের গোয়ালপাড়া, নওগাঁ, দরংগ, কামরূপ ও তেজপুর জেলার জমি চাষাবাদের উপযুক্ত হয়ে ওঠে এবং অল্প সময়ের মধ্যেই আসাম শস্যভাণ্ডারে পরিণত হয়। কৃষিজীবী বাঙালি মুসলমানরা প্রদেশের প্রভূত উন্নয়নে অবদান রাখতে পেরে তখন থেকেই আসামকে নিজের মাতৃভূমি হিসেবেই গ্রহণ করেছিল। আজ যখন রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলের লক্ষ্যে কথায় কথায় বাঙালি মুসলমানদের বিতাড়নের আওয়াজ তোলা হয় তখন তাদের কণ্ঠে অকৃতজ্ঞতাই প্রকাশ পায়। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস পত্রিকার এই বার্তালাপে আসামের মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্যে যেন তারই প্রতিফলন ঘটেছে। বাঙালি মুসলমানদের বিতাড়নের বিষয়ে তার এই বক্তব্য অবশ্য বিজেপির বর্তমান রাজনৈতিক কৌশলেরই অংশ। বিশেষ করে, করোনা মোকাবিলায় অব্যবস্থাপনা ও সাম্প্রতিক অনুষ্ঠিত কয়েকটি রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনের পর তার দল যে ইমেজ সংকটে পড়েছে তা থেকে উত্তরণের নতুন কৌশল হিসেবে এমন বক্তব্য লাগসই বলেই মনে হয়েছে।

পশ্চিমবঙ্গ, তামিলনাড়– ও কেরলের বিধানসভা নির্বাচনে পরাজয়ের ধাক্কা সামলাতে না সামলাতে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ বিজেপির ভাবমূর্তিকে যেন মাটিতে মিশিয়ে দিয়ে গেছে। মোদির ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তাকে পুঁজি করে ও হিন্দুধর্ম উদ্ধারের জিগির তুলে রাজ্য বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল নিজেদের ঘরে তুলবে বলে তাদের যে পরিকল্পনা ছিল সে পরিকল্পনা বাস্তবায়নে এতবড় ধাক্কা খাবে, মোদি-অমিত শাহ জুটি হয়তো কল্পনাও করেননি। পাশাপাশি করোনা নিয়ন্ত্রণে বিজেপি সরকারের চরম ব্যর্থতা নিয়েও দেশ ও বিদেশে প্রচুর সমালোচনা হয়েছে। এসব ঘটনায় মোদির ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তায় যেমন ভাটা পড়েছে, তেমনি ইমেজ সংকটেও পড়েছে তার দল বিজেপি। ইমেজ পুনরুদ্ধারে বিজেপি এখন মরিয়া। বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গে এত বড় ভরাডুবির পর বিজেপিবিরোধী জোট তৈরির যে হাওয়া বইছে তাকে বিজেপি অশনি সংকেত হিসেবেই দেখছে। হিন্দুত্ববাদী বিজেপি নেতারা তাই স্বমহিমায় ফিরে আসতে চাইছেন। আগামী বছর গোয়া, মণিপুর, পাঞ্জাব, উত্তরাখণ্ড ও উত্তর প্রদেশ এই পাঁচটি রাজ্যের বিধানসভার নির্বাচনের আগেই তারা বিভিন্ন ইস্যুকে সামনে এনে রাজনৈতিক ফায়দা নিতে চায়। যার প্রক্রিয়া ইতিমধ্যেই শুরু হয়ে গিয়েছে। ইস্যু তৈরির প্রক্রিয়া হিসেবে বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও আফগানিস্তান থেকে ভারতে যাওয়া অমুসলিম অর্থাৎ হিন্দু, শিখ, জৈন, বৌদ্ধ ধর্মের বাসিন্দাদের নাগরিকত্ব দেওয়ার কার্যক্রম শুরু করেছে। এ নিয়ে দেশ-বিদেশে ব্যাপক সমালোচনা হলেও নিজ অবস্থানে অনড় নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন ভারতের ক্ষমতাসীন বিজেপি সরকার।

দ্বিতীয় ও অন্যতম স্পর্শকাতর ইস্যুটি হলো, ‘অভিন্ন দেওয়ানি বিধি’। বিজেপি চলতি বছরেই এই বিধিটি বিল আকারে সংসদে উত্থাপন করতে চাইছে। অনুমান করা হচ্ছে, আসন্ন বর্ষাকালীন অধিবেশনেই এই বিল পেশ করা হতে পারে। অভিন্ন দেওয়ানি বিধি প্রধানত কোনো কোনো ধর্মের ব্যক্তিগত আইনের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। উল্লেখ্য, ফৌজদারি ও দেওয়ানি আইনের সিংহভাগই ভারতের সব নাগরিকের জন্য এক। তবে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি হলো, সবার জন্য এক আইন, যা সারা দেশের সব ধর্মীয় সম্প্রদায়ের ব্যক্তিগত ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হবে। উল্লেখ্য, বিবাহ, বিবাহবিচ্ছেদ, দত্তক গ্রহণ, সম্প্রত্তির উত্তরাধিকার ইত্যাদি ব্যক্তিগত বিষয় যা মুসলিমদের শরিয়া অনুযায়ী পৃথকভাবে ‘পারিবারিক আইন’ হিসেবে নির্ধারিত রয়েছে। যদিও মুসলিমদের মতো অন্যান্য ধর্মের পারিবারিক আইনও এই অভিন্ন দেওয়ানি বিধির আওতাভুক্ত হবে; তবুও এই বিল যে মুসলিমদের টার্গেট করেই সংসদে পেশ করা হবে সেটি ভারতের অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষকই মনে করছেন। তাদের অনেকেই বলছেন, ভারতের মতো ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রের উচিত হবে না পারিবারিক আইনে হস্তক্ষেপ করা। উল্লেখ্য, কয়েক বছর আগে থেকেই ভারতের কেন্দ্রীয় আইন কমিশন মুসলিমদের পারিবারিক আইনের বদলে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি চালু করা যায় কি না, তা নিয়ে সব পক্ষের মতামত চাওয়ার পর থেকেই এ নিয়ে বিতর্ক চলছে।

প্রশ্ন হচ্ছে, এ সময় বিজেপি এই অভিন্ন দেওয়ানি বিধি বিলকে সংসদে পেশ করতে চাইছে কেন? স্মরণ করা যেতে পারে, লোকসভা নির্বাচনে জয়লাভ করে দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় আসার পর ২০১৯ সালের আগস্ট মাসে সংসদে পাস হয়েছিল কাশ্মীর থেকে ৩৭০ ধারা বিলোপ সংক্রান্ত আইন। ২০২০ সালের আগস্ট মাসে করা হয়েছিল বাবরি মসজিদ প্রাঙ্গণে রামমন্দির নির্মাণের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন অনুষ্ঠান। এরই ধারাবাহিকতায় এ বছরের আগস্টেই অভিন্ন দেওয়ানি বিধি বিল পেশ করার প্রবল সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে বলে অভিজ্ঞমহল মনে করছেন। কাশ্মীরের ৩৭০ ধারা বিলোপ ও রামমন্দিরের বেলায় যেমন বিরোধীরা শক্ত কোনো পদক্ষেপ নিতে পারেনি, অভিন্ন দেওয়ানি বিধি নিয়েও সরাসরি কোনো রাজনৈতিক বিরোধিতা আসবে না বলেই ‘এক দেশ, এক আইন’-এ বিশ্বাসী বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্বরা মনে করছেন। তাদের ধারণা, অভিন্ন দেওয়ানি বিধির পক্ষেই মতপ্রকাশ করবে দেশের সিংহভাগ মানুষ। তাছাড়া, ভারতের সংবিধানের ৪৪ নম্বর ধারায় সরকারকে এ বিল উত্থাপনের অধিকারও দেওয়া আছে। একবার এই বিল যদি পাস হয়ে যায়, তাহলে বিজেপি-সংঘ পরিবারের দীর্ঘকালের এজেন্ডা ‘বাস্তবায়ন কর্মসূচি’ শুধু অক্ষুণ্ন থাকবে না বরং মোদি সরকারের দ্বিতীয় মেয়াদ হয়ে উঠবে হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির মাইলস্টোন।

লেখক অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তা

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত