একটি ছোট্ট প্রবন্ধ পড়েছিলাম যার শিরোনাম প্রাবৃট। লেখাটির বিষয়ে কিছু মনে নেই প্রায়, শুধু ওই শিরোনামাটা মনে আছে। যখন পড়েছিলাম প্রাবৃট শব্দের অর্থ জানতাম না সেদিন, কিন্তু কোনো অজ্ঞাত কারণে শব্দটা মনে থেকে গিয়েছে। পরে যখন শব্দটির অর্থ জেনেছি, তখনো অভিধানের পাতা উলটাতে গিয়ে আমার মনে পড়েছে সংবাদ সাময়িকীর পাতায় শিল্পী যে ছাঁচে ওই শব্দটি লিখেছিলেন সেটি। সংবাদ তখন লেটার টাইপে ছাপা হয়। সাহিত্য সাময়িকী একরঙা। লেখাটি ছাপা হয়েছিল সাময়িকীর শুরুর লেখা হিসেবে। লেখকের নাম, স্মৃতিতে আজও ওই ছোট্ট শিরোনামার নিচে যেভাবে ছাপা হয়েছিল সেই কারণে মনে ভাসে, আবুল মোমেন।
কোনো কোনো শব্দ অর্থ না জানার পরও শুধু ইমেজ হয়ে চোখে বহুদিন লেগে থাকে। তা কি শব্দটির শ্রুতিমধুরতার কারণে অথবা শ্রুতিকটু হলেও, নাকি এর কোনোটাই নয়। স্রেফ এটি একটি শব্দ যার অর্থ আমার জানা নেই। এ কথাগুলোও পরে ভেবেছি, অনেক পরে। কিন্তু সেই উত্তীর্ণ কৈশোরক চোখে শব্দটি গেঁথে থাকার কারণে, পরে নিজের কাছে এর অর্থ পরিষ্কার করে নিতে অভিধানে খুঁজেছি। সংসদ বাংলা অভিধান খুলে দেখি, প্রাবৃট অর্থ বর্ষাকাল। কেন এমন অর্থ জানি না। অন্তত অভিধান দেখার আগে অনেক দিন মনে হতো এই শব্দের অর্থ নিশ্চয় কোনো বড় গাছগাছালি অথবা বয়েসি বট ইত্যাদি। একটু আগে কবুল করেছি, ওই লেখাটির প্রায় কিছুই মনে নেই আমার। তাই অনেকগুলো দিন প্রাবৃট শব্দের অমন কল্পিত একটি অর্থ নিজের ভেতরে পুষে রেখেছিলাম। অথচ অভিধান দেখামাত্রই সেই সব জমানো কথা নিমেষেই হাওয়া হয়ে গেল। অর্থান্তর ঘটল। ওই শব্দটি তখন একেবারেই ভিন্ন একটি অর্থে আমার কাছে ধরা দিয়েছিল। কিন্তু সংবাদ সাময়িকীর পৃষ্ঠায় সেই প্রাবৃট লেখাটির ইমেজ আজও চোখে লেগে আছে। ওদিকে শব্দটির অর্থ জানার পর থেকে দেখেছি, প্রতি বছর, বর্ষাকালে অন্তত এক-দুবার কোনো বর্ষণমুখর সন্ধ্যায় আমার মনে হয়, এখন প্রাবৃট। এরপর এক সময়ে, আমার নিজের কাছে ওই শব্দের অলাদা একটি অর্থও দাঁড়াল, বর্ষণমুখর সন্ধ্যা। তখন ভেতরে ভেতরে একটা গোলমালও পাকলো। শব্দটার অর্থ ভিন্ন, কিন্তু বর্ষাকালের সন্ধ্যায় ঘনঘোর বরিষণের ভেতরে যখন শব্দটা আমার মনে পড়ে তখন ভাবি, আচ্ছা এটা তাহলে আমার নিজস্ব অর্থ। নিশ্চয় অনেক শব্দ আছে যার এক-একটি নিজস্ব অর্থ আমাদের কাছে থাকতে পারে, থাকেও। প্রাবৃট শব্দটি আমার ক্ষেত্রে তাই। যদিও আভিধানিক অর্থ যে বর্ষাকাল, সেই বর্ষাকালও শব্দটা মনে পড়ার অন্তত একটা কারণ।
বাংলা সাহিত্যে বর্ষাকাল নিয়ে পঙ্ক্তির তো অভাব নেই। বাঙালির প্রধান ঋতু। রবীন্দ্রসাহিত্যের ঋতুও তো প্রায় এই একটিই, কেউ কেউ তা বলেন। একেবারে ভুল কিছু বলেন না। বৃষ্টির বর্ণনা, বর্ষাকালের প্রকৃতির বর্ণনা, গীতিকবিতায় বর্ষাকালের প্রসঙ্গ রবীন্দ্রনাথ এমনভাবে ব্যবহার করেছেন, এমন উপমায় এনেছেন যে কখনো কখনো ঘোরতর বর্ষাকালে অমন দৃশ্যের মুখোমুখি হলে রবীন্দ্রনাথের সে সব পঙ্ক্তি অনায়াসে মনে পড়ে। অন্তত যার রবীন্দ্রনাথ পড়া আছে কিংবা শোনা আছে। আরও একটু এগিয়ে গল্পগুচ্ছের কোনো লেখার একটি-দুটি লাইনও ভেবে নেওয়া যায়। বাঙালির বর্ষাযাপন রবীন্দ্রনাথ সবচেয়ে ভালো বুঝতেন। সাহিত্যিকমাত্রই জনজীবন ও ভৌগোলিকতার সমস্ত উপাদানের ভেতর দিয়েই তো যেতে হয়, তাকে শিল্প করে তোলার কৌশল, রবীন্দ্রনাথ প্রসঙ্গে সে কথা এখানে বাহুল্য।
বরং, বাঙালির জনজীবনে বর্ষাকাল কী, এ নিয়ে আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের রেইনকোট গল্পের একটি লাইন এখানে ভাবা যাক। এক ছন্দবেশী মুক্তিযোদ্ধা আওড়েছিলেন, ‘রাশিয়ায় ছিলেন জেনারেল উইন্টার, আমাদের জেনারেল মনসুন।’ মোটেও কৌতুক করে বলা নয়, কিন্তু বলার ছন্দে কৌতুক আছে। তলানিতে আছে প্রাকৃতিক সত্য। রাশিয়ার হিটলার বাহিনী শীতে কাবু হয়েছিল, বাংলাদেশে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী বর্ষাকালে বহু জায়গায় মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে ভীষণ পর্যুদস্ত হয়েছে। কারণ বাঙালি চিরটাকাল বছরের প্রায় ছয় মাস টানা বৃষ্টিতে কাটানোয় জানে এ সময়ে কীভাবে সহজে শত্রুকে মোকাবিলা করা যাবে। পাকিস্তানিরা এদিক দিয়ে বাঙালিদের ঠিক বিপরীত। অনেকদিন আগে খবরের কাগজে পড়েছিলাম, পাকিস্তানের কোনো একটি প্রদেশের কোনো অঞ্চলে প্রায় বারো বছর বাদে বৃষ্টি হলে বালক-কিশোররা খুব অবাক হয়ে বাইরে বেরিয়ে এসেছিল। সেদিনের স্কুল-কলেজ সব ছুটি দেওয়া হয়েছিল। ফলে বাংলার বর্ষাকালে বৃষ্টি যে মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে শত্রুবাহিনীর বিরুদ্ধে সমান লড়াকু, তা লেখা বাহুল্য।
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় তার বিখ্যাত ‘প্রাগৌতিহাসিক’ গল্প শুরুই করেছেন ভিখুর সে সময়ে ভয়ানক কষ্টের কথা বলে। ভিখুর মতন মানুষের জীবনে বর্ষাকাল স্বাভাবিকভাবেই খুব কষ্টকর। শুধু ভিখু কেন, মাথার ওপরে আচ্ছাদনহীন যে কোনো মানুষের জন্য বৃষ্টি কষ্টকর। উলটো দিকে বাংলার কৃষক আর জেলের জন্য এই বৃষ্টিই আহার জোগায়। পদ্মা নদীর মাঝিতে বর্ষায় সে নদীর মাঝির মাছ ধরবার কোনো কামাই নেই যেমন জানা যায়, সেই একই মাঝির চালহীন ঘরের মেঝেও স্যাঁতসেঁতে। আলাউদ্দিন আল আজাদের ‘বৃষ্টি’ নামের যে বিখ্যাত গল্প, সেখানে গ্রামবাসী আর দুটো মানুষের জীবনে বৃষ্টি একেবারে আলাদা বারতা নিয়ে আসে।
এই সবই বাংলা বর্ষাকালের ভিন্ন ভিন্ন রূপ। চাইলে যে কেউ পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা এমন বিষয় ভাবতে পারে। সাহিত্যের পৃষ্ঠার দিকে তার তাকানোর প্রয়োজন নেই। নিজের জীবনে বর্ষাকালের আলাদা আলাদা অভিজ্ঞতা এদেশের প্রতিটি মানুষের। কেউ তাকে গ্রীষ্মের মাটিফাটা রোদের পরে বৃষ্টির আগমনে স্বস্তি, কেউ এই যে বৃষ্টি পড়ল এখন হাল দেওয়ার কিংবা ট্রাক্টর নামানোর সময়ও ভাবতে পারেন। কিন্তু এই দেশের মানুষ হিসেবে বর্ষা তাকে কোনোভাবেই প্রভাবিত করে না, তা হওয়ার নয়। বরং অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে বাংলাদেশের অথবা বাংলার দুটো রাজধানী বর্ষাকাল তাদের জন্য কী উপদ্রবের কাল তা ঢাকা ও কলকাতার নাগরিক, বাংলার বাকি অংশের মানুষের চেয়ে আরও ভালোভাবে বুঝতে পারেন। একইভাবে বোঝেন অন্যান্য নগরের মানুষরা। বৃষ্টি তাদের নাগরিক জীবনে হয়তো প্রায় অপ্রয়োজনীয়, বরং উৎপাতেরই অন্য নাম। বর্ষাকাল এলে নাকাল হওয়ার ভয়ে তারা ভাবেন বৃষ্টি না হলেই ভালো। অথচ দেশের অন্য অংশের মানুষ, কৃষি যাদের জীবনের চালিকা এখনো, তারা ভাবেন, শুধু অতি বৃষ্টি না হলেই হয়। বাকিটা আশীর্বাদ। বৃষ্টি-বর্ষণকে তারা আজও খনার বচনের সঙ্গে মিলিয়ে গণনা করেন। কোন দিনে শুরু হলে কয়দিন হবে এই বৃষ্টি। বর্ষণটা কেমন হবে। কতটা হবে। এমনকি একেবারে শুকনার সময়ে অর্থাৎ অগ্রহায়ণে বৃষ্টি হলে কী হবে, পৌষে কিংবা মাঘে হলে দেশের খাদ্য অবস্থা কোন দশায় পৌঁছবে তাও খনার বচন থেকে লোকায়ত জ্ঞানে পরিণত হয়েছে।
অগ্রহায়ণে ধান ওঠার সময়, তখন বৃষ্টি রাজাকে মাগনে পাঠাবে। মাগন অর্থাৎ মাগা, মানে ভিক্ষে। পৌষে হলে তুষে আগুন লাগবে। মাঘের শুরুতে বৃষ্টি নিয়ে কিছু নেই। কিন্তু, ‘যদি হয় মাঘের শেষ, ধন্য রাজার পুণ্য দেশ।’ এটা অবশ্য বর্ষাকালকে সামনে রেখে ধানচাষের হিসেবে খনার এই বৃষ্টি গণনা। এখন শুকনোর সময়ে বোরো ধানের যে চাষ হয় কিংবা হাওর অঞ্চল যেখানে বর্ষাকালে সারাটা চরাচর তলানোই থাকে, সেখানে এ হিসেব কোনোভাবেই খাটবে না। খনা নিশ্চয়ই সে অঞ্চলের কথা জানতেন না, জানলে সেখানকার ধান চাষ নিয়েও তার বচন থাকতে পারত।
প্রাবৃট শব্দটাকে স্মরণ করে এই লেখা, এখন প্রায় গন্তব্যই হারিয়ে ফেলছে। বৃষ্টির দিনে তাই স্বাভাবিক, বর্ষাকালে তাই ঘটে, প্রাবৃট দৃষ্টিকে ঝাপসা করে ফেলতেই পারে। বৃষ্টির দিকে তাকিয়ে দৃষ্টি ঝাপসা হলে সেখানে খুব স্বাভাবিকভাবে অতীত এসে ভর করে। এমনকি বৃষ্টির ভেতরে দাঁড়িয়ে, চোখের পাতায় সেই বৃষ্টির ঝাঁট নিয়ে দিগন্তে তাকিয়ে, অমন তুমুল কোলাহলময় বৃষ্টির ভেতরে চাইলে অতীতচারীও হওয়া যায়। হয়তো, প্রাবৃট শব্দটাকে মনে করে সেই প্রায় দিশাহীনতার গন্তব্যেই আমাদের যাত্রা এখন। এমন বর্ষকালে, কখনো রোদ কখনো বৃষ্টির ভেতরে দৃষ্টির সেই যাত্রাও একেবারে গন্তব্যহীন। আবার উলটোও।
এই যে কথাগুলো এতক্ষণ লেখা হলো, তা ওপর থেকে পড়ে এসে আবার আমার মনে পড়ল, প্রাবৃট মানে বর্ষণমুখর। যদিও জানি তা বর্ষাকাল। এবারের বর্ষায় কোনো-একটি বৃষ্টির সন্ধ্যায় আবারও ওই ভুলটা ভাবব!
৩১ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৮/১৪ জুন ২০২১। সিলেট।
লেখক কথাসাহিত্যিক