খাদ্য নিরাপত্তায় বোরো মৌসুমের নতুন ধান

আপডেট : ১৯ জুন ২০২১, ১১:১৮ পিএম

দেশের সাড়ে ষোল কোটি মানুষের খাদ্য নিরাপত্তায় বোরো ধানের একটি বড় ভূমিকা রয়েছে। মোট উৎপাদিত চালের শতকরা প্রায় ৫৫ ভাগই আসে বোরো মৌসুম থেকে। যে বছর বোরো ধানের বাম্পার ফলন হয়, সে বছর খাদ্য সংকট থাকে না দেশে। বিদেশ থেকে চাল আমদানি করতে হয় না। চালের দাম শ্রমজীবী মানুষের সাধ্যের মধ্যে থাকে। আবার যে বছর কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা পোকামাকড় ও রোগবালাইয়ের প্রাদুর্ভাবের কারণে বোরো ধানের ফলন কম হয়, সে বছর বিদেশ থেকে চাল আমদানি করে খাদ্য ঘাটতি পূরণ করতে হয়। এই সুযোগে মধ্যস্বত্বভোগী ব্যবসায়ী ও মিল মালিকরা সিন্ডিকেট করে চালের দাম বাড়িয়ে দেয়। তখন স্বল্প আয়ের মানুষের কষ্টের সীমা থাকে না।

স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে দেশে চাল উৎপাদিত হয় মাত্র ১ কোটি ১০ লাখ টন। ওই সামান্য পরিমাণ চাল দিয়ে সাড়ে সাত কোটি মানুষের খাদ্য চাহিদা মেটানো সম্ভব ছিল না। ফলে জরুরি ভিত্তিতে বিদেশ থেকে চাল আমদানি করতে হয় সরকারকে। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ইজজও) বা ‘ব্রি’ ১৯৯৪ সালে ব্রি-ধান ২৮ ও ব্রি-ধান ২৯ এর অবমুক্তির পর চাল উৎপাদনে বাংলাদেশে এক অভাবনীয় বিপ্লব ঘটে। চালের উৎপাদন বহুগুণ বেড়ে যায়। ফলে তলাবিহীন ঝুড়ির বদনাম ঘুচিয়ে দেশ প্রথমবারের মতো খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করে।

খাদ্যের ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটাতে আমাদের কৃষিবিজ্ঞানীরা নিরলসভাবে কাজ করছেন। সম্প্রতি ব্রি-ধান ৮১, ব্রি-ধান ৮৯ , ব্রি-ধান ৯২ সহ অনেকগুলো উন্নত জাতের ধান উদ্ভাবিত হয়েছে। ব্রি-ধান ৮১, ব্রি-ধান ৮৯ ও ব্রি-ধান ৯২ জাতের ধানের ফলন অনেক বেশি। প্রতি বিঘায় ২৫ থেকে ৩০ মণ, প্রতি শতকে প্রায় ১ মণ। এ জাতগুলো চাষের মাধ্যমে দেশে নতুন করে সবুজ বিপ্লব ঘটবে। দেশে খাদ্য উৎপাদন অনেকগুণ বেড়ে যাবে ও ভবিষ্যতে আর খাদ্য সংকট হবে না। গত ৮ মে টাঙ্গাইলের ধনবাড়ীতে উপজেলার মুশুদ্দি কামারপাড়ায় ব্রি-ধান ৮৯ ও ব্রি-ধান ৯২ জাতের ধান কর্তন ও কৃষক সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন কৃষিমন্ত্রী ড. মো. আব্দুর রাজ্জাক। ব্রি’র তথ্য মতে ফেব্রুয়ারি মাসে রোপণ করা ব্রি-ধান ৮৯ ও ব্রি-ধান ৯২ ধান কাটা হয় মে মাসের ৮ তারিখে। আগে ওই এলাকায় ব্রি-ধান ২৮ ও ব্রি-ধান ২৯ আবাদ করা হতো। যেখানে ব্রি-ধান ২৮ ও ব্রি-ধান ২৯ এর ফলন পাওয়া যায় বিঘাপ্রতি ১৮ থেকে ২০ মণ, সেখানে ব্রি-ধান ৮৯ ও ব্রি-ধান ৯২ ধানের ফলন পাওয়া যায় ২৫ থেকে ৩০ মণ। এছাড়া ব্রি-ধান ২৯ এর চেয়ে ৫ থেকে ৭ দিন আগেই কর্তন করা যায় এ দুটি জাত।

অন্যদিকে ২০১৯ সালে গাজীপুর জেলার শ্রীপুর উপজেলার রাজাবাড়ী ইউনিয়নের চিনাশুকানিয়া গ্রামের মোজাম্মেল কাজী ২ বিঘা জমিতে বি-ধ্রান ৮১ জাতের চাষ করে বিঘাপ্রতি ফলন পান ২৭ মণ। এ জাতের ধানের চাল খুব সরু। খেতে সুস্বাদু। ঝড়ে অন্য জাতের ধান নুয়ে পড়লেও ব্রি-ধান ৮১ সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। ফলে ধান কাটার কাজটা খুব সহজ হয়। এটি বাসমতির মতো রান্না করার পর দেড়গুণ লম্বা হয়। এই জাতের ধানের চালে অ্যামাইলেজের পরিমাণ ২৬.৫ শতাংশ। ধান থেকে তৈরি আতপ চাল বিদেশে রপ্তানিযোগ্য। এ ধানের বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো ধান পাকার পর পাতাগুলো সবুজ থাকে। এতে প্রোটিন থাকে শতকরা ১০ দশমিক ৩ ভাগ। আর ব্রি-ধান ২৮ এ থাকে মাত্র ৮ শতাংশ। মাঝারি উঁচু বা উঁচু জমিতে এ ধানের ফলন ভালো হয়।  নাটোর, নওগাঁ, রাজশাহী, সাতক্ষীরা, চুয়াডাঙ্গা, খুলনা ও ঝিনাইদহে এই জাতের ভালো ফলন পাওয়া যায়।

এ বছর সবচেয়ে আশা জাগানো নতুন জাত হিসেবে কৃষকদের মধ্যে বেশি আলোচিত হচ্ছে  ব্রি-ধান ৮১। এছাড়াও ব্রি-ধান ৮৮, ব্রি-ধান ৮৯ ব্রি-ধান, ৯২ ও ব্রি-ধান ৯৬ জাতে পুরনো জাতগুলোর তুলনায় পরীক্ষামূলক প্রদর্শনী প্লটগুলোতে অনেক বেশি ফলন পাওয়া গেছে চলতি বোরো মৌসুমে। সদ্যসমাপ্ত বোরো মৌসুমে দেশে রেকর্ড পরিমাণ ফলন দিয়েছে ব্রি-ধান ৮১।  চাষিরা বিঘাপ্রতি ৩১ মণ ফলন পেয়েছেন উচ্চ ফলনশীল এ জাতটিতে। যেখানে আগের জনপ্রিয় জাত ব্রি-ধান ২৮-এর হেক্টর প্রতি ফলন ছিল ৬ টন, সেখানে একই জমিতে ব্রি-ধান ৮১ চাষে ফলন পাওয়া গেছে সাড়ে ৭ টন। বাংলাদেশের মানুষের ক্যালরি ও আমিষের চাহিদার অর্ধেকেরও বেশি পূরণ হয় ভাত থেকে। ফলে আমিষের ঘাটতি পূরণেও সহায়ক হবে নতুন জাতের এই ধান। সে কারণেই এই নতুন জাতটি দ্রুত কৃষক পর্যায়ে সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।

চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুরের রহনপুরের কৃষক সিরাজ মিয়া এ বছর প্রথম চার বিঘা জমিতে ব্রি-ধান ৮১ জাতের চাষ করেন। তিনি বিঘাপ্রতি ফলন পান ৩০ মণ। এর আগে তিনি একই জমিতে ব্রি-ধান ২৮ ও ব্রি-ধান ২৯ চাষ করে বিঘাপ্রতি ফলন পেয়েছেন ২০ থেকে ২২ মণ। তাই একথা নির্দ্বিধায় বলা যায় দেশের মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে নতুন উদ্ভাবিত জাতগুলোর কৃষকের মাঠে দ্রুত সম্প্রসারণের কোনো বিকল্প নেই।

২০১৭ সালের অক্টোবরে জাতীয় বীজ বোর্ড ব্রি-ধান ৮১ জাতটির অনুমোদন দিয়েছে। এরপর থেকেই বিজ্ঞানীরা আশা করছেন ব্রি-ধান ৮১ জনপ্রিয়তায় ব্রি-ধান ২৮ এর জায়গা দখল করবে এবং দেশের ধান উৎপাদন উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বাড়বে। জানা গেছে অনুমোদনের ১৫ বছর আগে কৃষি মন্ত্রণালয় ইরান থেকে আমোর-৩ জাতের ধান বাংলাদেশে নিয়ে আসে। তখন থেকেই বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিজ্ঞানীরা এই ধান থেকে বাংলাদেশের আবহাওয়া উপযোগী উচ্চ ফলনশীল জাত উদ্ভাবনের কাজ করছিলেন। অবশেষে ইরানের সেই আমোল-৩ ও আমাদের মেগা ভ্যারাইটি ব্রি-ধান ২৮ সংকরায়ণ করে ব্রি-ধান ৮১ উদ্ভাবন করা হয়।

বাংলাদেশে বর্তমানে বোরো মৌসুমে ৪৮ লাখ হেক্টর জমি থেকে প্রায় কোটি মেট্রিক টন চাল উৎপাদিত হচ্ছে। বোরো মৌসুমে শতকরা ৪১ ভাগ জমিতে ব্রি-ধান ২৮ এবং ২৪ ভাগ জমিতে ব্রি-ধান ২৯ এর চাষ হয়। অর্থাৎ বোরো ধানের প্রায় ৬৫ ভাগ জমি দখল করে আছে এই দু’টি ম্যাগা ভ্যারাইটি। আজ থেকে ২৪ বছর আগে উদ্ভাবিত জাত দুইটিতে নানা রকম রোগ আক্রমণের  আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এ ছাড়া প্রতিকূল পরিবেশ মোকাবিলার সক্ষমতাও জাত দু’টির  হ্রাস পাচ্ছে। ইতিমধ্যে দেশের কোনো কোনো স্থানে জাত দু’টিতে ব্যাপক ‘ব্লাস্ট’ রোগের আক্রমণ  পরিলক্ষিত হচ্ছে। ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া উপজেলার পলাশতলী গ্রামের কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ২০১৮ সালে ওই গ্রামের প্রায় ২০ একর ব্রি-ধান ২৮ জাতে ‘ব্লাস্ট’ রোগের আক্রমণের কারণে ধানের ফলন হ্রাস পায় এবং কৃষক আর্থিকভাবে চরম ক্ষতির সম্মুখীন হন। কোনো কোনো কৃষক ক্ষেত থেকে এক মুঠো ধানও বাড়িতে আনতে পারেননি এবং উৎপাদিত খড়ও গরুকে খাওয়াতে পারেননি।

তাই বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট এ জাত দু’টির বিকল্প হিসেবে ব্রি-ধান ৮৮ ও ব্রি-ধান ৮৯ উদ্ভাবন করছে। ব্রি-ধান ৮৮ ব্রি-ধান ২৮-এর মতো স্বল্পমেয়াদি। এ জাতের জীবনকাল ১৪০ থেকে ১৪৫ দিন। ব্রি-ধান ২৮-এর হেক্টরপ্রতি স্বাভাবিক ফলন যেখানে ৫ থেকে ৬ টন, সেখানে ব্রি-ধান ৮৮ এর ফলন সাড়ে ৬ টন। অন্যদিকে ব্রি-ধান ৮৯ এর জীবনকাল ১৫৪ থেকে ১৫৮ দিন। ব্রিধান ২৯ এর স্বাভাবিক ফলন যেখানে সাড়ে সাত টন, সেখানে ব্রি-ধান ৮৯ এর ফলন হেক্টরপ্রতি ৮ টন। তাই ধান বিজ্ঞানীরা মনে করেন, নতুন জাত; ব্রি-ধান ৮৮ ও ব্রি-ধান ৮৯ কৃষক পর্যায়ে জনপ্রিয় করা গেলে দেশে ধানের উৎপাদন আগের চেয়ে বেশি হবে।

বোরো মৌসুমে উচ্চ ফলনশীল নতুন জাতগুলোর দ্রুত বিস্তারের জন্য নিম্নলিখিত পদক্ষেপ গ্রহণ করা যেতে পারে :

১.         আগামী ২ থেকে ৩ বছরের মধ্যে নতুন উচ্চফলনশীল জাত ব্রি-ধান ৮১, ৮৮, ৮৯, ৯২ ও ৯৬ দ্বারা পুরাতন জাত ব্রি-ধান ২৮ ও ব্রি-ধান ২৯ প্রতিস্থাপনের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট কর্মসূচি গ্রহণপূর্বক তা শতভাগ বাস্তবায়ন করতে হবে।

২.         জাত প্রতিস্থাপনের কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট, বিএডিসি, এবং বেসরকারি বীজ উৎপাদন কোম্পানিগুলোকে বিশেষ ভূমিকা পালন করতে হবে।

৩.         জাত প্রতিস্থাপন কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনে দেশের ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকের মধ্যে বিনামূল্যে নতুন জাতের উচ্চফলনশীল ধান বীজ বিতরণ করতে হবে।

৪.         নতুন জাতের উচ্চফলনশীল ধান বীজ কৃষকের কাছে সহজলভ্য হতে হবে এবং দামও হতে হবে কৃষকের সাধ্যের মধ্যে।

৫.         নতুন জাতের ধানবীজের ব্যবহার বাড়ানোর জন্য কৃষক পর্যায়ে বীজ উৎপাদন, সংরক্ষণ ও বিতরণের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরকে।

৬.         নতুন জাতের ধানবীজের ওপর এলাকা ও জাতভিত্তিক প্রচুর সংখ্যক প্রদর্শনী প্লট স্থাপন, শস্য কর্তন, মাঠদিবস ও চাষি সমাবেশের ব্যবস্থা করতে হবে এবং তা জাতীয় পত্রপত্রিকা ও রেডিও টিভিতে ব্যাপক প্রচার করতে হবে।

৭.         নতুন উচ্চফলনশীল জাতের বোরো ধানের ভালো দিকগুলো তুলে ধরে পোস্টার ও লিফলেট ছাপানো এবং সেগুলো ব্যাপকভাবে কৃষকদের মধ্যে বিতরণের ব্যবস্থা করতে  হবে।

লেখক সাবেক মহাব্যবস্থাপক (কৃষি), বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশন

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত