মমতাই কি বিজেপিবিরোধী সর্বভারতীয় নেতা

আপডেট : ০২ আগস্ট ২০২১, ১২:০৩ এএম

কী হলে কী হতে পারে এখনই তা নিয়ে ভবিষ্যদ্বাণী করা যাবে না। তবে এটা ঠিক যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের শরীরের ভাষায় এটা স্পষ্ট যে আগামীর লোকসভা নির্বাচনে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেলেও জোট গড়ে কেন্দ্রে বিজেপিবিরোধী একটা সরকার গঠন করতে তিনি বদ্ধপরিকর। কেউ মানুক বা না মানুক ইতিমধ্যেই যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বিজেপিবিরোধী লড়াইয়ের অন্যতম প্রধান মুখ হয়ে উঠেছেন তা পশ্চিমবঙ্গের এই নেত্রী বিপুলসংখ্যক জনগণের মনে নিঃসন্দেহে প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছেন।

নরেন্দ্র মোদির জনপ্রিয়তা দিন দিন কমছে। যে গগনচুম্বী অহমিকা নিয়ে দু’বছর আগেও মোদি ও তার যাবতীয় কুকর্মের দোসর অমিত শাহ সারা দেশে দাপিয়ে বেড়াতেন এখন যে তা নেই তা মোদিজির অন্ধ ভক্ত শিষ্যরাও ঠারেঠোরে মেনে নিতে বাধ্য। বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচন ছিল নরেন্দ্র মোদি, অমিত শাহর কাছে গুরুত্বপূর্ণ এক চ্যালেঞ্জ। এমন কোনো দিন ছিল না যেদিন দিল্লির রাজপাট শিকেয় তুলে দিয়ে কোটি কোটি টাকা খরচ করে দেশের প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী থেকে ছোট বড় মাঝারি সব মন্ত্রী আর বিজেপির নেতারা প্রচারের নামে এ রাজ্যের জেলায় জেলায় ছুটে বেড়াতেন না। আজ কোথাও দলিত আদিবাসীদের বাড়িতে খেয়ে তাদের মন জয়ের চেষ্টা করা বা খোলাখুলি সাম্প্রদায়িক মেরুকরণের চেষ্টা, দাপাদাপির অন্ত ছিল না। তার সঙ্গে ছিল দল ভাঙানোর অশ্লীল খেলা।

কোথাও কোথাও বিজেপি যে ভাষা ব্যবহার করেছিল তা সভ্য সমাজে চলে না। দিলীপ ঘোষ প্রকাশ্যে টিভি চ্যানেলে কাউকে না কাউকে রগড়ে দেওয়ার হুমকি দিতেন। শুভেন্দু অধিকারী অত্যন্ত নির্লজ্জ ভাষায় সাম্প্রদায়িক উসকানি দিতেন। এ ব্যাপারে তার যোগ্য সঙ্গী ছিলেন দেশের মহামান্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। কিছু কিছু সময় স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীও। নরেন্দ্র মোদি যেভাবে ‘দিদি ও দিদি’ বলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে বিদ্রুপ করতেন তা সময় সময় ইভটিজিং-ই মনে হতো। এসব ঔদ্ধত্য আর মিথ্যাচার মানুষ ভালোভাবে না নেওয়ায় পশ্চিমবঙ্গের মসনদে বসার দিবাস্বপ্ন মুখ থুবড়ে পড়ল বঙ্গ-বিজেপির।

তৃণমূল কংগ্রেসের কিছু হেভিওয়েট ও কিছু তথাকথিত হেভিওয়েট নেতাকে বিজেপিতে আনার ঢল নেমেছিল নির্বাচনের আগে। আসলে এও ছিল এক মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি করার রণকৌশল। কিন্তু এখন বোঝা যাচ্ছে তা কোনো কাজে তো লাগেইনি বরং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই হিতে বিপরীত হয়েছিল। সত্যি কথা বলতে কি সাফল্যে উদ্দীপ্ত মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও কালবিলম্ব না করে কোণঠাসা বিজেপিকে আক্রমণ করতে দ্বিধা করলেন না। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনীতি নিয়ে ভিন্ন মত থাকলেও এটা তার প্রবল শত্রুও মানবেন যে, যে কোনো ‘অফ ইস্যুকেও ইস্যু’ করে তুলতে মমতার জুড়ি নেই। কালবিলম্ব না করে মমতা দুটো কাজ করতে সক্রিয় হয়েছেন যথেষ্ট আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে। এক, পাশের রাজ্যে ত্রিপুরার বিজেপি সরকারকে উচ্ছেদ করা ও দুই বিভিন্ন বিজেপিবিরোধী দলকে নিয়ে কেন্দ্রবিরোধী নতুন এক জোট গড়ে তোলা।

এই কাজটি অবশ্য আগেও, এর আগের নির্বাচনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় চেষ্টা করেছিলেন। সফল হতে পারেননি। তবে উনিশ সালের সেই নির্বাচন আর এখনকার সময় সাল তারিখের বিচারে মাত্র দুবছর হলেও রাজনৈতিক দিক দিয়ে সময়টা অনেক। এই অল্প সময়ে নরেন্দ্র মোদির জনপ্রিয়তা তলানিতে না হলেও কমেছে যে তা নিয়ে সন্দেহ নেই। একের পর এক ভুল তাস খেলতে গিয়ে নরেন্দ্র মোদি নিজেই নিজের বিপদ ডেকে এনেছেন। ভারতের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এত খারাপ কখনো হয়নি।

রাজনৈতিক অস্থিরতাও ক্রমেই বাড়ছে। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে কদিন আগে দুই বিজেপি শাসিত রাজ্য আসাম ও মিজোরামের মধ্যে পারস্পরিক বিবাদের জেরে, দুই রাজ্যের সীমান্ত বিবাদের নাম করে পুলিশ নিজেই রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েছিল। যার জেরে আসামের সাত সাতজন পুলিশ প্রাণ হারায়। ইতস্তত পুলিশ বিদ্রোহ খুব একটা প্রকাশ্যে না এলেও নরেন্দ্র মোদির রাজত্বে আগেও ঘটেছে। হাল বেগতিক দেখে খোদ অমিত শাহকে ড্যামেজ কন্ট্রোলে নামতে হয়। তাতেও অবস্থার কোনো উন্নতি হয়েছে মনে হয় না। সত্যি মিথ্যে জানি না, কয়েকটি ভিডিওতে দেখলাম অন্তত হাজার পুলিশ নরেন্দ্র মোদি ও অমিত শাহর নামে হায় হায় ধ্বনি দিতে দিতে চাকরি থেকে ইস্তফা দিয়ে যে যার বাড়ির দিকে রওনা হয়েছেন।

পাশাপাশি পেগাসাস স্পাইওয়ার কেলেঙ্কারিতে জড়িয়ে পড়া বিজেপি সরকার যে যথেষ্ট কোণঠাসা এটা সংসদে তাদের বডি ল্যাংগুয়েজেই স্পষ্ট। দলমত নির্বিশেষে বিভিন্ন ব্যক্তির ফোনে গুপ্তচরবৃত্তি মোদি সরকারের ফ্যাসিস্ট মনোভাবকেই আরও নগ্ন করে দিয়েছে। গোদের উপর বিষফোঁড়া দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা কৃষকদের আন্দোলন যে সরকারকে চাপে রেখেছে ওয়াকিবহাল প্রত্যেকেই তা বোঝেন। গো-বলয়ের বিভিন্ন রাজ্যে, এমনকি সাধের উত্তর প্রদেশেও বিজেপি আগের মতো নিশ্চিন্তে নেই। উত্তর প্রদেশের আইনশৃঙ্খলা মোটের ওপর ভেঙে পড়েছে। দলিত হরিজন হত্যা থেকে ধর্ষণ সেখানে রোজকার ঘটনা। সংখ্যালঘু নিগ্রহ তো সব রাজ্যেই বিজেপির, সংঘ পরিবারের শখ।

দলিত আদিবাসী সংখ্যালঘু মুসলিম কোনোকালেই বিজেপির পক্ষের নয়। ভরসা যেটুকু যা, তা ওই জাঠ, বানিয়া, সচ্ছল মধ্যবিত্ত। কিন্তু সেই চিরাচরিত ভোটব্যাংকেও ইদানীং চিড় ধরেছে বিজেপির। এই অবস্থায় মোদি সরকারের সবচেয়ে বড় ভরসা করপোরেট লবি। আর কে না জানে ভারতের বহু চর্চিত ও ঘোষিত গণতন্ত্রের আসল চাবিকাঠি যত দিন যাচ্ছে ততই স্রেফ করপোরেট পুঁজির হাতেই শোভা পাচ্ছে। করপোরেট নিয়ন্ত্রিত মিডিয়া জনমতকে নিঃসন্দেহে বেশ কিছুটা প্রভাবিত করে।

সেদিক দিয়ে দেখলে আগামী ভোটে বিজেপিকে হারাতে গেলে করপোরেট সাম্রাজ্যে বিজেপির একচেটিয়া প্রভাব বিরোধীদের ভাঙতে হবে। অবশ্য, শোনা যাচ্ছে হালফিলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে রিলায়েন্সের যোগাযোগ বাড়ছে। উত্তর চব্বিশ পরগনার অশোকনগরে বিপুল তেল অনুসন্ধানের পরে কে তার মালিকানা পাবে তা নিয়ে আদানিদের সঙ্গে আম্বানিদের মন কষাকষির কারণে কিছুটা হলেও আম্বানিরা মমতাঘনিষ্ঠ হলে তার ফলভোগ করবে মোদিবিরোধীরাই।

সাধারণ ক্ষেত্রে মাটির নিচের তেলের মালিকানা থাকে কেন্দ্রীয় সংস্থা ‘ওএনজিসি’র হাতে। এখন বদলে যাওয়া ভারতে বেসরকারিকরণের ঝোড়ো হাওয়া। কয়লা খনি, ডিফেন্স, বীমা, ব্যাংক, বিমান সবই চলে যাচ্ছে আদানি-আম্বানিদের হাতে। ফলে পশ্চিমবঙ্গের নতুন তেলখনির মালিকানা নিয়েও ‘ওএনজিসি’-কে সরিয়ে দুই বৃহৎ পুঁজির টানাপড়েন চলবে এটা অনুমান করা যায়। এসব ক্ষেত্রে রাজ্যের কোনো ভূমিকা কেন্দ্র স্বীকার করে না। কিন্তু মমতা বন্দ্যোপ্যাধ্যায় অত সহজে নিজের প্রাপ্তি চট করে কেন্দ্রকে দিয়ে দেবেন মনে হয় না। হয়তো সেই কারণেই শোনা যায় যে, এবার বিধানসভার ভোটের আগে রিলায়েন্সের কর্তারা গোপনে এক বৈঠকে বসেছিলেন মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে।

বললাম যে কেন্দ্রের ক্ষমতা দখল করতে গেলে কোনো না কোনো বড় শিল্পগোষ্ঠীর আশীর্বাদের হাত বিরোধীদের মাথায় থাকতেই হবে। পড়ে পাওয়া চোদ্দ আনা তেলের দৌলতে তা যদি হয় রিলায়েন্সের মতো শক্তিশালী শিল্প সংস্থা তা হলে নিঃসন্দেহে অ্যাডভান্টেজ মমতার।

অনেকে মানতে চাইবেন না মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তীব্র বিজেপিবিরোধিতায় আদর্শগত বিরোধের চেয়ে আছে যে কোনো কারণেই হোক নরেন্দ্র মোদি ও অমিত শাহর সঙ্গে ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব। এ বিষয়টি কখনো অস্বীকারও করেননি তৃণমূল সুপ্রিমো। একাধিকবার জানিয়েছেন অটল বিহারি বাজপেয়ি ও লাল কৃষ্ণ আদভানি তাকে কতটা স্নেহ করতেন। জানিয়েছেন প্রয়াত বিদেশমন্ত্রী সুষমা স্বরাজের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতার কথা।

এখন কথা হচ্ছে শুধু মোদি সরকারের ব্যর্থতার জন্য কি করপোরেট পুঁজি বিজেপি সরকারের মাথা থেকে আশীর্বাদের হাত উঠিয়ে নেবে! এবারের দিল্লি সফরে বিরোধী ঐক্য গড়ে তুলতে সোনিয়া গান্ধী থেকে শারদ পাওয়ারসহ প্রভাবশালী সব নেতার সঙ্গে হয় দেখা অথবা ফোন করে কথা বলেছেন মমতা। বিরোধী দলের মহাতারকাদের সঙ্গে দেখা হওয়ার হইচইয়ে একটা ছোট্ট খবর হয়তো অনেকেরই চোখ এড়িয়ে গেছে। গত সপ্তাহে দিল্লি গিয়েই কিন্তু মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দেখা করেছেন বিজেপি নেতা নীতিন গড়গড়ির সঙ্গে।

লেখক ভারতীয় প্রামাণ্যচিত্র নির্মাতা ও লেখক

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত