করোনা মোকাবিলায় পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ এ পর্যন্ত যে কটি পদ্ধতি ব্যবহার করেছে তার মধ্যে অন্যতম হলো লকডাউন, স্বাস্থ্যবিধি পালন এবং গণটিকা। বাংলাদেশে নানা বিশেষণে বিশেষায়িত হয়ে লকডাউন/বিধিনিষেধ তার মর্যাদা হারিয়েছে বহু আগে। গত দেড় বছর অল্প কিছু সময় বাদ দিলে প্রায় পুরোটা সময় জুড়েই ছিল বিধিনিষেধ, কঠোর বিধিনিষেধ কিংবা লকডাউন। অথচ এর মধ্যেই খোলা রাখা হয়েছে কল-কারখানা, অফিস-আদালত, হোটেল-রেস্তোরাঁ থেকে শুরু করে সবকিছু।
এই পুরোটা সময় যদি নিষ্ঠার সঙ্গে কোনো কিছু লকডাউন পালন করে তবে তা হলো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। বিধিনিষেধ বা লকডাউন শিথিল হয়েছে, এমনকি তুলেও নেওয়া হয়েছে, কিন্তু এক দিনের জন্যও খোলা হয়নি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। এর মাশুল দিয়েছে এবং এখনো দিয়ে যাচ্ছে শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে শিক্ষা ক্ষেত্রের সঙ্গে যুক্ত লাখ লাখ মানুষ।
ক্ষমতাসীন দলের বয়ান মতে বাংলাদেশের উন্নয়ন অগ্রগতি বিশ্বদরবারে কেবল প্রশংসিতই হয়নি, বরং বহু দেশের ঈর্ষার কারণও হয়েছে। এমনকি পৃথিবীর বহু দেশ নাকি আমাদের কাছে ‘চুপি চুপি কানে কানে’ উন্নয়নের গোপন রহস্য জানতে চায়। তাদেরই বয়ান মতে বাংলাদেশ কখনো ইউরোপ বা আমেরিকা আবার কখনো মালিয়েশিয়া বা সিঙ্গাপুর। অথচ করোনা আসা মাত্রই যখন স্বাস্থ্য, সামাজিক সুরক্ষাসহ নানা বিষয়ে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর প্রশ্ন উঠল, তখনই সরকার উচ্চকণ্ঠে জানান দিল উন্নত দেশের পক্ষে যা সম্ভব তা নাকি বাংলাদেশের পক্ষে সম্ভব না। বাংলাদেশের সম্পদ সীমিত, সীমাবদ্ধতা অনেক। সরকারের এ ধরনের দ্বিচারিতা অবশ্য নতুন কিছু না।
বাংলাদেশের মানুষের লকডাউন না মানার প্রবণতাকে সরকারের দিক থেকে এক বৈশ্বিক প্রবণতার অংশ হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করা হয়েছে সব সময়। কিন্তু এটা একেবারেই ভুল ব্যাখ্যা। উন্নত দেশের মানুষরা করোনার সময়ে সরকার থেকে মোটা অঙ্কের আর্থিক অনুদান পেয়েছে, যা দিয়ে তাদের জীবনযাপনের খরচ জোগাতে কোনো সমস্যাই হয়নি। কিছু কিছু ক্ষেত্রে বিচ্ছিন্নভাবে লকডাউন না মানার যে প্রবণতা দেখা গেছে, সেটা তাদের সান্ধ্যকালীন বিনোদনের স্বার্থে। কিন্তু বাংলাদেশের মানুষ বেরিয়ে আসতে চেয়েছে তার খাবার সংস্থানের তাগিদে।
শুরু থেকে সরকারের সমন্বয়হীনতা, অসচেতনতা, সার্বিক নৈরাজ্য মানুষকে নিরুৎসাহিত করেছে স্বাস্থ্যবিধি মানতে। তা ছাড়া পেটে ভাত না থাকলে মুখে মাস্ক, হাতে সাবান, আর অতি ঘনবসতিপূর্ণ দেশে সামাজিক দূরত্ব মানা বিলাসিতার বেশি কিছু না। সুতরাং মানুষকে করোনা থেকে বাঁচাতে চাইলে সরকারের হাতে গণহারে টিকাকরণ ছাড়া আর কোনো উপায় ছিল না।
টিকার সূচনাটা হয়েছিল খুব জাঁকজমকপূর্ণভাবে, উৎসাহ নিয়ে। ঢাকঢোল পিটিয়ে বলা হয়েছিল বাংলাদেশ বিশ্বে প্রথম দিকে টিকা শুরু করা দেশগুলোর একটি। এরপর টিকা নিয়ে এতই যাচ্ছে-তাই অবস্থা হলো যে বাংলাদেশের অবস্থান দক্ষিণ এশিয়ায় একেবারে তলানিতে চলে যায়; একমাত্র আফগানিস্তান আছে বাংলাদেশের নিচে। বোধ করি এই লজ্জাজনক পরিস্থিতি কিছুটা ভালো করার আশায় তড়িঘড়ি করে বহু মানুষকে টিকা দেওয়ার পরিকল্পনা নিয়েছিল সরকার। সেটায় কেমন করল তারা?
জুলাইয়ের শেষ থেকেই সরকার খুব ঢাকঢোল পিটিয়ে বলতে শুরু করে ৭ আগস্ট থেকে শুরু করে পরবর্তী এক সপ্তাহে দেশে ১ কোটি টিকা দেওয়া হবে, যাকে তারা নাম দিয়েছেন গণটিকাদান কর্মসূচি।
এই ঘোষণার দুদিন যেতে না যেতেই ৪ আগস্ট রাতে এক অদ্ভুত কাণ্ড ঘটে। সরকারের পক্ষ থেকে ঘোষণা দেওয়া হয়, এখন আর এক সপ্তাহে এক কোটি টিকা দেওয়ার কর্মসূচি থাকছে না, কারণ হাতে পর্যাপ্ত সংখ্যক টিকাই নেই। সরকারের কাছে তখন টিকার মজুত ছিল ৮৯ লাখ ডোজ। তাই এ কর্মসূচি হবে মাত্র এক দিন, ৭ আগস্ট। সেদিন প্রথম ডোজ হিসেবে প্রায় অর্ধকোটি টিকা (৪৬ লাখ) দেওয়া হবে। ৪ তারিখেই যদি হাতে ৮৯ লাখ টিকা থাকে, তাহলে স্বাভাবিক টিকাকরণ কর্মসূচির পর ৭ তারিখে কত টিকা থাকার কথা? তাহলে এক কোটি টিকা দেওয়ার পরিকল্পনাটি করা হলো কীসের ভিত্তিতে?
এরপর সরকার এই সিদ্ধান্তেও অটল থাকতে পারেনি। জানানো হয় সপ্তাহে এক কোটি টিকা দেওয়া হবে ১৪ আগস্ট থেকে। তার আগে ৭ তারিখে টিকার একটি মহড়া হবে। না সরকার এমনকি স্থির থাকতে পারেনি এই সিদ্ধান্তেও। সর্বশেষ জানানো হয় সপ্তাহে কোটি টাকা দেওয়ার পরিকল্পনা আপাতত বাদ। এখন আবার ৭ তারিখ থেকে ৩ দিন বেশ কিছু টিকা দেওয়া হবে। টিকার সংখ্যা স্পষ্টভাবে বলা না হলেও ধারণা দেওয়া হয় এটা হবে ৩০ লাখের আশপাশে।
এই টিকা দেওয়ার প্রদর্শনী হলো ৭ এবং ৮ আগস্ট। ৭ তারিখে প্রায় ত্রিশ লাখ আর ৮ তারিখে সাত লাখ টিকা দেওয়ার কথা আমাদের জানানো হয়েছে।
মিডিয়ায় আসা ছবিতে আমরা দেখতে পাই টিকাদান কেন্দ্রে হাজার হাজার মানুষের ভিড়। ন্যূনতম কোনো শৃঙ্খলা ছিল না কেন্দ্রগুলোতে। কিন্তু ছিল আওয়ামী লীগের তদবিরের টোকেন নেওয়াদের টিকা পাওয়ার গল্প। ছিল এক ঘণ্টা যেতে না যেতে কেন্দ্রে সরবরাহকৃত টিকা শেষ হয়ে যাওয়া, ভোরবেলা লাইনে দাঁড়িয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টার অপেক্ষা করে টিকা না পাওয়া, প্রথম দিন না পেয়ে পরদিন গিয়েও টিকা না পাওয়া, এমন নানা গল্প। মানুষের অসন্তোষের মুখে কিছু জায়গায় টিকাদান কর্মীদের বুথ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার ঘটনা পর্যন্ত ঘটেছে। এই লেখা যখন লিখছি তখন ঢাকায় নানা কেন্দ্রে একই রকম পরিস্থিতির কথা মিডিয়ায় দেখছি।
এ ঘটনাগুলো যখন ঘটছে তখন দেশের খুব বড় একটা অঞ্চলে মাঝারি থেকে ভারী বৃষ্টি হচ্ছিল। মানুষ এই অকল্পনীয় হয়রানির শিকার হয়েছে বৃষ্টি মাথায় নিয়ে। আরও আশ্চর্যের ব্যাপার হলো কোনো কোনো ক্ষেত্রে একই ব্যক্তিকে একবারেই দুই ডোজ টিকা দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে। এমন ঘটনা বিশ্বে আর কোথাও ঘটেছে বলে আমার জানা নেই।
কোন কেন্দ্রে কটি টিকা বরাদ্দ করা হয়েছে সেই তথ্য তো সরকারের হাতে ছিলই। তাহলে সেই সামান্য সংখ্যক টিকা দেওয়ার জন্য মানুষকে আগেই তালিকাভুক্ত করে রাখাই যেত। এবার বিভিন্ন এলাকার ‘জনপ্রতিনিধি’ এবং রাজনৈতিক কর্মীদের যেহেতু কাজে লাগানো হয়েছে তাই টিকার জন্য বয়স্ক মানুষদের একটা তালিকা আগে করে ফেলা কঠিন কোনো কাজ ছিল না। কিন্তু এই সামান্য পরিকল্পনাটুকুও করা হয়নি।
করোনার সময় সরকারের সুবিধাবাদী বয়ানের কথা বলেছিলাম কলামের শুরুর দিকে। নিশ্চয়ই বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নতি সরকার যা দাবি করে তার আশপাশেও না। কিন্তু করোনার সময়ে দেখা গেছে আমাদের আর্থিক সামর্থ্যরে মধ্যেও হতে পারত এমন অনেক কিছুই হয়নি। আমাদের কাছে আরও হতাশার ব্যাপার হচ্ছে এমন অনেক পদক্ষেপ ছিল যেগুলোতে আদৌ কোনো আর্থিক সামর্থ্যরে দরকার ছিল না, সেগুলোতেও আমরা একেবারে লেজে গোবরে করেছি। যেমন টিকার এই কর্মসূচি সফল করার জন্য শুধু সঠিক কৌশল নির্ধারণ, সমন্বয় এবং বাস্তবায়ন অর্থাৎ ব্যবস্থাপনাগত দক্ষতাই যথেষ্ট ছিল।
করোনা মোকাবিলায় সরকার শুরু থেকে এখন পর্যন্ত অনেক বেশি আমলানির্ভর হয়ে আছে বলে সমালোচনা আছে নানা দিক থেকে। এমনকি ক্ষমতাসীন দলের প্রবীণ সদস্য তোফায়েল আহমেদও জাতীয় সংসদে এই প্রবণতার বিরুদ্ধে সমালোচনা করেছেন। বাইরে থেকে যখন অনেকেই আমলাদের দায়িত্ব দেওয়া নিয়ে সমালোচনা করেন, তাতে কি তারা এটা বোঝাতে চান যে আওয়ামী লীগ দলটির সদস্যরা অসাধারণ দক্ষ এবং সৎ?
পুরো প্রশাসন, স্থানীয় সরকারের ‘নির্বাচিত প্রতিনিধি’ এবং দলের নেতাকর্মীরা সবাই জড়িত ছিলেন এবার এই কর্মযজ্ঞে। বলাবাহুল্য, ক্ষমতাসীন সরকার আর দলের সবার মিলিত ব্যর্থতায় এই কর্মযজ্ঞ পরিণত হয়েছে স্রেফ একটা দক্ষযজ্ঞে।
লেখক আইনজীবী, সংসদ সদস্য ও বিএনপিদলীয় হুইপ