পরাহ্ণে পদোন্নতি

আপডেট : ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১০:২০ পিএম

পদোন্নতি বড়ই কাক্সিক্ষত সবার। পদ বাড়লে মান বাড়ে, ক্ষমতা বাড়ে, অর্থ বৃদ্ধিযোগও থাকে। তাই, চাকরি-বাকরিতে শুধু নয় পদধারী সবারই সরল বাসনা পদোন্নতি। পাতি নেতার প্রত্যাশা হাফ-নেতা, হাফ-নেতার খায়েশ ফুল-নেতা। তবে, পদোন্নতি রাতারাতি পাওয়ার নয়। হাল জমানার বাংলায়ও কিছু দপ্তরে পদোন্নতি যেমন ঘটছে তাও ঠিক রাতারাতি নয়, পূর্বাহ্ণ, মধ্যাহ্ন, অপরাহ্ণ গড়িয়ে শেষে রাত-দুপুরে। যোগদানও তাই রাত পোহাবার আগে। সেলিব্রেট, উদযাপন শুরু হয় মধ্যরাতে। পদোন্নতি তো উদযাপনেরই ব্যাপার বটে। আমার জজিয়তি চাকরি জীবনের প্রথম পদোন্নতির চিঠি পেয়েছিলাম ১৫ দিন পরে। সেই পদোন্নতিতে মানও বাড়েনি, ক্ষমতাও বাড়েনি। আসলে কিন্তু পদটাও বাড়েনি, বেতন বেড়েছিল ১৫০ টাকা মাত্র। উদযাপন, সেলিব্রেট দূরে থাক প্রকাশই করা যায়নি কারও কাছে।

১৯৮৮-এর ১৫ ফেব্রুয়ারি যখন সহকারী জজ হিসেবে চাকরিতে ঢুকি তখন পদোন্নতি কবে হবে সে হিসাব কষার ধৃষ্টতা ছিল না মোটে। কোনো ঘাটে তরী না পেয়ে নিজের অগতি বোঝা সারা ততদিনে। যমরাজের দপ্তরে (হিন্দু শাস্ত্রমতে বিচারেরও দেবতা যম, যার আরেক নাম ধর্মও বটে, মনুষ্য দেহধারী যারা তার সেই কর্ম ইহলোকে করেন সেই বিচারককে তাই ধর্মাবতার বলা হতো এককালে) এই চাকরিপ্রাপ্তিটাই তখন ছিল একই সঙ্গে তরী আর কূল পাওয়া। ছিলাম বিসিএস (বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস) ব্যাচের হিসেবে ১৯৮৫, চাকরির ব্যাচে হয়ে গেলাম ১৯৮৮। চাকরিতে ঢোকার আগেই তিনটা বছর খোয়া গেছে পরীক্ষাতে। সে আরেক কাহিনী, বলা যাবে সময় করে। যমরাজকে ধর্মরাজ মেনে ঢুকে পড়ি জজিয়তিতে। ঢোকার পরে একটু সয়ে এলে পদোন্নতির হিসাব কষতে গিয়ে সামনে ভাসে শুধুই অকূলপাথার। আমাদের ’৮৫ ব্যাচের আগে ’৮৩, ’৮৪ ব্যাচের প্রায় চারশ-জনের বিশাল বহর। সাব-জজের ওপরের ধাপে ওঠা অবসরের বয়সে কুলায় না কোনোমতেই। পদোন্নতিপ্রত্যাশী থাকলেই পদোন্নতি ঘটে না প্রত্যাশিত পদ শূন্য না থাকলে। হালে ব্যতিক্রম শুরু হয়েছে বাংলার একটিমাত্র সোনার চাকরিতে, সেখানে প্রত্যাশী পেলেই পদোন্নতি ঘটে পদ পূর্ণ থাকলেও। ঠাঁই নাই ভাব নাই সেই সোনার তরীতে, সোনার ছেলেতে যতই যাক না ভরে।

বিচার বিভাগে পদোন্নতির বেহাল দশা ছিল আগেও। জেলা জজ হওয়া বরাতে জুটত না অনেকেরই, পিরামিডের চূড়ায় পৌঁছাতেন ভাগ্যবান উনিশ-বিশজনে। ১৯৮৩-তে মহকুমাগুলো সব জেলায় উন্নীত হলে জেলার সংখ্যা উনিশটা থেকে উঠে গেল চৌষট্টিতে। জেলা জজের পদও হলো ৬৪টিতে। সুবর্ণ সুযোগ এসে যায় জজিয়তিতে যারা আগে থেকে ছিলেন তাদের। সেই সুযোগের সুবিধা ’৮১, ’৮২ ব্যাচ গড়িয়ে ’৮৩ ব্যাচের প্রথমে এসে ঠেকে, জেলা জজ মানের আরও কিছু পদ বাড়ায়। তাদের বিধিলিপি আইনের বিধিকে টেনে মিলায় অনুকূলে। আইনের বিধিতে লেখা একেবারে দিনক্ষণ মিলিয়ে পরবর্তী প্রত্যেকটা ধাপের পদোন্নতি মিলে যায় একে একে। ৭ বছরের মাথায় সাব-জজ, ১০ বছরের মাথায় অতিরিক্ত জেলা জজ, আর ১৫ বছরের মাথায় জেলা জজ। ১৫ বছর ধরে জেলা জজগিরি করে হাঁপিয়েও ওঠেন অনেকে ওঠার আর কোনো ধাপ না পেয়ে।

জজিয়তির চাকরির প্রথম পদোন্নতিটা পাই নড়াইলে সদর সিনিয়র সহকারী জজ থাকাকালে; তবে কি না সেই একই সিনিয়র সহকারী জজ পদে একই আদালতে। ক্ষমতার ভেদে সিভিল কোর্টস অ্যাক্টে (১৮৮৭) পদ ছিল জেলা জজ, অতিরিক্ত জজ (মধ্যখানে জেলা শব্দটা লাগানো হয় ২০০১-এর সংশোধনীতে), সাব-জজ আর মুন্সেফ। তার সঙ্গে মিল রেখে বিচার বিভাগের পদগুলো সাজানো ছিল বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস (জুডিশিয়াল) কম্পোজিশন অ্যান্ড ক্যাডার রুলসেও (১৯৮০)। ‘মুন্সেফ’ বদলিয়ে ‘সহকারী জজ’ করা হয় ১৯৮৭-তে সংশোধনীযোগে। সিনিয়র মুন্সেফ বা সিনিয়র সহকারী জজ নামে পদ আসলে ছিল না কোনো আইনবিধিতে। সিভিল কোর্টস অ্যাক্টের ১৯ ধারার (১) উপধারায় ছিল কোন জজের কত টাকার আদি আর্থিক এখতিয়ার দেওয়ানিতে; অর্থাৎ, কোন জজ কত টাকা মূল্যমানের মূল মামলা (আপিল/রিভিশন নয়) বিচার করতে পারে। ১৯৮৮-তে সহকারী জজ হিসেবে ঢুকেছিলাম ২০ হাজার টাকার ‘পাওয়ার’ নিয়ে। দু-বছর পরে ১৯৯০-তে সংশোধনীযোগে সেটা বেড়ে হয় ৫০ হাজার টাকা (২০২১-এর সংশোধনীতে এখন সেটা হয়েছে ১৫ লাখ; হয়েছিল আরও আগে ২০১৬-তে, আটকে আছে হাইকোর্টের স্থগিতাদেশে, সরকার সেটা বাতিল করে ২০২১-এ আবার করেছে, তার আগে পর্যন্ত ২০০১-এর সংশোধনীযোগে বেড়ে দাঁড়িয়েছিল ২ লাখ টাকায়)।

সিভিল কোর্টস অ্যাক্টের ১৯ ধারার (২) উপধারায় ছিল সরকার কোনো সহকারী জজকে ১ লাখ টাকা পর্যন্ত (১৯৯০-এর সংশোধনীর আগে সেটা ছিল ৫০ হাজার, ২০০১-এর সংশোধনীযোগে প্রতিস্থাপিত ১৯ ধারায় কোনো উপধারাই রাখা হয়নি, এখন ২০২১-এর সংশোধনীযোগে প্রতিস্থাপিত ১৯ ধারায় এই উপধারার বিধান ভিন্নতর) মূল্যমানের মূল মামলা বিচার করার ক্ষমতা বাড়াতে পারবে। ৪টা বছর সহকারী জজের সন্তোষজনক চাকরি দেখলে সরকার ক্ষমতা বাড়াত, সঙ্গে একটা সিলেকশন গ্রেডের সিনিয়র স্কেলও (বেতন) দিত। সেই সিনিয়র ‘পাওয়ার’ পাওয়া সিনিয়র স্কেলধারী সহকারী জজদের সিনিয়র সহকারী জজ (আগেকার দিনে সিনিয়র মুন্সেফ) বলা হতো আদালতের সর্বত্র। চাকরির ধাপের পদ না হলেও আদালতের মাপে এই পদবিটা দরকারি হিসেবে চলত, না হলে ৫০ হাজারের ওপরে ১ লাখ টাকা পর্যন্ত মূল্যমানের মামলা বিচার করে সারলেন যিনি তিনি কি শুধুই সহকারী জজ নাকি সিনিয়র পাওয়ারওয়ালা সহকারী জজ, তাই নিয়ে উচ্চতর আদালতে তর্কযুদ্ধের আরেকটা ফাঁক বাড়ত।

আমাদের ব্যাচের সহকারী জজরা সেই সিনিয়র ‘পাওয়ার’ পেয়েছিলাম ২৬ নভেম্বর ১৯৯২ তারিখের সরকারি আদেশে, চার বছর চাকরি পূর্ণ হওয়ায় এবং এই সিনিয়র ‘পাওয়ার’ দেওয়ায় ৪১০০-৬৫০০ টাকার সিলেকশন গ্রেডের (১৯৯১ সালের) সিনিয়র স্কেলটা প্রাপ্য করা হয় চাকরি চার বছর পূর্ণ হওয়ার দিন অর্থাৎ, ১৪ ফেব্রুয়ারি ১৯৯২ থেকে। সরকারি আদেশে স্পষ্ট লেখা থাকার পরও ২৬ নভেম্বর ১৯৯২-এর আগের সময়টুকুর স্কেল আমার প্রাপ্য নয় বলে ঝামেলা লাগিয়েছিল কুড়িগ্রামের হিসাবরক্ষণ অফিসার; হুজুরের হাত একটু দেখাতে হয়েছিল তাকে, সে আরেক কাহিনী বলা যাবে সময় করে। সেই থেকে আমরা সিনিয়র সহকারী জজ পদবি নিয়ে আদালত চালিয়ে আসছিলাম। আদালতি এই সিনিয়র সহকারী জজ পদটাকে আইন মন্ত্রণালয় চাকরির ধাপে ৪১০০-৬৫০০ টাকার ৭ম গ্রেড থেকে ৪৮০০-৭২৫০ টাকার ৬ষ্ঠ গ্রেডের (১৯৯১-এর) পদোন্নতির পদ বানায় ১৯৯৫-এর অক্টোবরে। সিভিল কোর্টস অ্যাক্টে সেটা ঢোকে ২০০১-এর সংশোধনীযোগে।

আগের ব্যাচের ১২ জন, পরের ব্যাচের ২০ জন, আর আমাদের ব্যাচের ৩৪ জন (ব্যারিস্টার একজন এসেছিলেন আমাদের সঙ্গে জজিয়তিতে, জজিয়তি ছেড়ে তিনি ফিরে যান এই সিনিয়র হওয়ার আগে) মিলিয়ে মোট ৬৬ জনের সিনিয়র সহকারী জজ হিসেবে পদোন্নতির সেই আদেশটা হয় ৯ অক্টোবর ১৯৯৫। অবিলম্বে নিজ নিজ কর্মস্থলেই যোগদান করতে বলা হয় সবাইকে। কেননা, নতুন পদ তো হয়নি একটাও। এই ৬৬ জনই আগে থেকেই আদালতি সিনিয়র সহকারী জজ ছিলাম যার যার আদালতে। পদোন্নতি পেয়ে যিনি যে-আদালতে ছিলেন তাকে সেই আদালতেরই নাম দিয়ে আবার যোগদানপত্র পাঠাতে হয় মন্ত্রণালয়, সুপ্রিম কোর্ট, জেলা জজ, হিসাবরক্ষণ অফিসে। ঢাকা আর তার কাছের জেলাগুলোর সাহেবরা ৯ অক্টোবরের আদেশের কপি নিয়ে সেদিনই যোগদান সেরে ফেলেন। দূরের জেলাগুলোর সাহেবরা দু-এক দিনের মধ্যে কপি জোগাড় করে ৯ অক্টোবর যোগদান দেখিয়ে পদোন্নতির আনুষ্ঠানিকতাটুকু সারেন। কপি একটা আমিও জোগাড় করেছিলাম, কাজ হয়নি। নড়াইলে আমার জেলা জজ কট্টর আইনবাদী! অন্যের নামে ইস্যু করা আদেশপত্রে আমার নাম থাকলেই চলবে না, আমার নিজের নামে ইস্যু করা আদেশপত্রটা লাগবে! সেই আদেশপত্রটা ঢাকা থেকে নড়াইল আসে ১৫ দিন পরে ২৪ অক্টোবর ১৯৯৫। সদর আদালতের নাম দিয়ে যোগদানপত্র দিলাম ২৪ অক্টোবর। পাওয়ার বাড়েনি এক তিলও, বেতন বাড়ে ১৫০ টাকা মাত্র। বার্ষিক বেতন বৃদ্ধিযোগে আমার বেতন আগেই গিয়ে ঠেকেছিল প্রায় ৫ হাজারে। পদোন্নতির যোগদানে বেতন বৃদ্ধির তারিখ ১৫ ফেব্রুয়ারি থেকে পিছিয়ে এসে দাঁড়াল ২৪ অক্টোবরে। তিন বছর ধরে সিনিয়র সহকারী জজগিরি চালিয়ে এসে চাকরির ৭ বছর পার করে পদোন্নতিযোগেও রইলাম সিনিয়র সহকারী জজ। লোকের কাছে বলি কি করে!

দ্বিতীয় পদোন্নতি পাই সাব-জজ পদে। পদ বাড়ল, অসীম আর্থিক ক্ষমতা হলো আদি দেওয়ানিতে, দেওয়ানি আপিল শুনানির, ফৌজদারি পাওয়ার পাই একেবারে নতুনভাবে। জজিয়তি চাকরির সাড়ে বারোটা বছর পেরিয়ে পদোন্নতিটা পাই ১৮ জুলাই ২০০০-এ। বেতন কিন্তু বাড়ল না একটি পয়সাও। সাব-জজের বেতন স্কেল তখন ৯৫০০-১২১০০ টাকা (১৯৯৭ সালের)। তার আগেই চাকরিতে ১০ বছর পূর্ণ হওয়ায় পদোন্নতির ক্ষতিপূরণ বাবদ সাব-জজের সেই স্কেলটা পাওয়া ছিল সিলেকশন গ্রেড নামে। পদোন্নতি হলেও স্কেল অপরিবর্তিত, বেতন নির্ধারণ করা লাগল না, তাই বেতন বৃদ্ধির তারিখও থাকল অপরিবর্তিত সেই ২৪ অক্টোবর।

তৃতীয় পদোন্নতি হয় অতিরিক্ত জেলা জজ পদে, জজিয়তি চাকরিতে বিশ বছর যায় যায় করে ১৫ নভেম্বর ২০০৭-এ। ফৌজদারি পাওয়ার ঠেকল ফাঁসিতে। আর বেতন বাড়ল ৪০০ টাকা মাত্র। বার্ষিক বেতন বৃদ্ধিযোগে অতিরিক্ত জেলা জজের বেতন স্কেলের শুরুর ধাপ ছাড়িয়ে অনেকখানিই এগিয়ে ছিলাম তাই। শেষ পদোন্নতিটা হয় জেলা জজ পদে। জজিয়তির চাকরিতে সাড়ে চব্বিশ বছরেরও পরে ১৮ অক্টোবর ২০১২-তে। আর কিছু তো নেই ফাঁসির ওপরে, পাওয়ার বাড়েনি খুব একটা। বেতন বাড়ে ৬৫০ টাকা মাত্র। কারণ, বার্ষিক বেতন বৃদ্ধিযোগে জেলা জজের বেতন স্কেলের শুরুর ধাপ ছাড়িয়ে অনেকখানিই এগিয়ে ছিলাম আগেই। জেলা জজের পদে পাঁচটা বছর পার করলে সিনিয়র স্কেল হিসেবে ৭৮০০০ টাকার নির্ধারিত সর্বশেষ স্কেলটা পাই। সিনিয়র জেলা জজ নামে চাকরির ধাপে পদ নাই, স্কেলের মাপ বোঝাতে সিনিয়র জেলা জজ চলে। তাতে কারও কি গা জ্বলে!

লেখক প্রবন্ধকার ও আইন গ্রন্থকার; অবসরপ্রাপ্ত সিনিয়র জেলা জজ ও দুদকের সাবেক মহাপরিচালক

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত