বিশ্ববাজারে খাদ্যপণ্যের অস্থিরতায় করণীয়

আপডেট : ২৮ নভেম্বর ২০২১, ১০:০৮ পিএম

করোনাভাইরাস মহামারীর সঙ্গে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে সৃষ্ট প্রাকৃতিক দুর্যোগের ফলে উৎপাদন, বণ্টন, সরবরাহ শৃঙ্খলে এক ধরনের সংকট সৃষ্টি হয়েছে। ফলে বিশ্ববাজারে খাদ্যপণ্যের মূল্যে বিরাজ করছে অস্থিরতা। এজন্য খাদ্যপণ্যের দাম বাড়ছে অস্বাভাবিক হারে। বাংলাদেশ এর ব্যতিক্রম নয়। এরই মধ্যে সব ধরনের খাদ্যপণ্যের দাম বেড়েছে দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে। যে ব্রি-২৯ জাতের চাল বর্তমানে ময়মনসিংহের বিভিন্ন খুচরা বাজারে বিক্রি হচ্ছে ৫০ টাকা কেজি দরে, সেই চাল এক বছর আগে বিক্রি হয়েছে ৩৫ টাকা কেজি দরে। বর্তমানে যে মসুর ডাল ৯০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে, তা দেড় থেকে দুই মাস আগেও বিক্রি হয়েছে ৬০ টাকা কেজি দরে। খাদ্যপণ্যের দাম বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বেড়েছে পোলট্রি ফিড, মাছ ও গবাদিপশুর খাবারের দাম। যার প্রভাব পড়েছে মাছ, মাংস ও ডিমের দামের ওপর। জ¦ালানি তেলের সাম্প্রতিক মূল্যবৃদ্ধিতে সামনের দিনগুলোতে খাদ্যপণ্যের মূল্য আরও বৃদ্ধির আশঙ্কা করা হচ্ছে। এ অবস্থায় খাদ্য পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে উৎপাদন বাড়ানো, বণ্টন ও সরবরাহ চেইন স্বাভাবিক রাখার পরামর্শ দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।

সার্বিকভাবে খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির পেছনে বড় ভূমিকা রয়েছে গমের। বাংলাদেশকে প্রতি বছর ৫৫ থেকে ৬০ লাখ টন গম আমদানি করতে হয়। গত এক বছরে খাদ্যপণ্যের দাম বেড়েছে প্রায় ৪০ শতাংশ। কানাডা, রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের মতো বৃহৎ রপ্তানিকারক দেশে গমের ফলন হ্রাস পেয়েছে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে। কারণ হিসেবে করোনার পাশাপাশি সর্ববৃহৎ খাদ্য উৎপাদনকারী দেশ কানাডাসহ বিশ্বের বিভিন্ন রাষ্ট্রে সৃষ্ট প্রাকৃতিক দুর্যোগকে দায়ী করেছেন বিশেষজ্ঞরা। সম্প্রতি কানাডায় সৃষ্ট বন্যা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে দেশটির সর্ববৃহৎ টার্মিনাল ভ্যাঙ্কুভারের অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফলে ভ্যাঙ্ককুভার টার্মিনালে তৈরি হয়েছে চালান সংকট। এ টার্মিনালের অদূরে সৃষ্টি হয়েছে পণ্যবোঝাই জাহাজের জট। কানাডা বিশ্বের বৃহত্তম শস্য রপ্তানিকারক দেশগুলোর একটি। ফলে বিশে^র বিভিন্ন দেশেও খাদ্য সরবরাহ চেইনে গভীর সংকটের আশঙ্কা করা হচ্ছে।

এদিকে চলতি বছরের জুনে জাতিসংঘ হুঁশিয়ারি দিয়ে বিশ্ববাসীকে সতর্ক করে বলেছিল যে, করোনার কারণে ৫০ বছরের মধ্যে সবচেয়ে বড় ধরনের খাদ্য সংকটের মুখে পড়তে যাচ্ছে বিশ্ব। জাতিসংঘের মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস এ আভাস দেন সে সময়। আসন্ন এ বিপর্যয় ঠেকাতে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছিলেন তিনি। গত ৯ জুন ২০২০ ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়। আর গত সপ্তাহে বিশ^বাজারে পণ্যমূল্যবৃদ্ধির রেকর্ডের বিষয়ে গুরুত্ব দিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে বিবিসি, সিএনএন, রয়টার্সসহ বিশে^র প্রভাবশালী গণমাধ্যমগুলো।

জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা বলছে, গত অক্টোবর পর্যন্ত টানা তৃতীয় মাসের মতো খাদ্যপণ্যের দাম বেড়েছে। এতে খাদ্যপণ্যের দাম গত ১০ বছরে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। গত বছর একই সময়ের চেয়ে খাদ্যপণ্যের দাম বেড়েছে ৩১ দশমিক ৩ শতাংশ। বিশ্ব সংস্থাটি গত ১৮ নভেম্বর এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানায়। এফএওর প্রতিবেদন অনুযায়ী, সরবরাহ ঘাটতি, নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের উচ্চমূল্যে কল-কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়া ও রাজনৈতিক অস্থিরতা বিশ্ববাজারে খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধিতে যথেষ্ট ভূমিকা রেখেছে। বিশেষজ্ঞদের কেউ কেউ এজন্য জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবকেও দায়ী করছেন। তারা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে খাদ্যশস্যের উৎপাদন কমেছে। অধিকাংশ খাদ্যপণ্যের বাজারদর পর্যবেক্ষণ করে এফএও। এ ভিত্তিতে করা তাদের ‘খাদ্যসূচক’ অক্টোবরে ছিল ১৩৩ দশমিক ২ পয়েন্ট, যা আগের মাস সেপ্টেম্বরে ছিল ১২৯ দশমিক ২ পয়েন্ট। সংস্থাটি বলছে, ২০১১ সালের জুলাইয়ের পর এসব পণ্যের দাম আর কখনোই এতটা বাড়েনি। সংস্থাটির মতে, বিশ্বব্যাপী সব ধরনের খাদ্যশস্য ও ভোজ্য তেলের দাম বেড়েছে। অক্টোবরে ভোজ্য তেলের দাম বেড়েছে ১০ শতাংশ, যা নতুন রেকর্ড সৃষ্টি করেছে। এমনকি সামগ্রিকভাবে খাদ্যশস্যের দাম গত বছরের তুলনায় বেড়েছে ২২ শতাংশে বেশি। টিসিবির তথ্যানুসারে বাংলাদেশে ভোজ্য তেলের দাম এখন প্রতি লিটার ১৫০ থেকে ১৫৫ টাকা, যা এক মাস আগেও ছিল ১৩০ থেকে ১৩৫ টাকা। আর এক বছর আগে ছিল ৯০ থেকে ৯২ টাকা। অর্থাৎ মাত্র এক বছরের ব্যবধানে ভোজ্য তেলের দাম প্রায় দ্বিগুণ হয়ে গেছে।

কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, করোনাভাইরাসের কারণে সারা বিশ্বেই কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে প্রাকৃতিক দুর্যোগে অনেক দেশেই খাদ্য উৎপাদন হ্রাস পেয়েছে। এতে আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের দাম বেড়েছে। জরুরি নিত্যপণ্য হিসেবে পরিচিত চাল, ডাল, তেল, চিনি, আটা-ময়দা, পেঁয়াজ ও আলুর দাম বেড়েছে হু-হু করে। মাছ-মাংসের পরিবর্তে ডিম ও ব্রয়লার মুরগির মাংস খেত গরিব মানুষ। মাছ, মাংস ও ডিম নিয়মিত খেতে না পারলে ডাল, আলুভর্তা দিয়ে ভাত খেয়ে জীবনধারণ করত খেটে খাওয়া মানুষ। এখন সেই আলুর দামই শুধু বাড়েনি, আলুভর্তা বানাতে যে তেল, পেঁয়াজ ও মরিচের দরকার সেই তিনটি পণ্যের দামও এখন আকাশচুম্বী। ফলে স্বচ্ছন্দে আলুভর্তাও খেতে পারছে না গরিব মানুষ। তাই নিত্যদিনের খরচ মেটাতে একেবারে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন নিম্ন-মধ্যবিত্তরা। আয়-ব্যয়ের সমন্বয় করতে পারছেন না কোনো ক্রমেই। জীবন বাঁচাতে ধার-কর্জ করছেন প্রতিনিয়ত।

আমাদের দেশে এমনিতে খাদ্য মজুদ পরিস্থিতি বেশ সন্তোষজনক। সরকার সারা বছরই মৌসুমভেদে খাদ্যশস্য সংগ্রহ করে। তবে করোনা-পরবর্তী সময়ে দাম কিছুটা বেড়েছে। বিষয়টি আন্তর্জাতিক বাজারের ওপর নির্ভর করে। এ ছাড়া যেকোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ কিংবা মহামারী-পরবর্তী সময়ে জিনিসপত্রের দাম বেড়ে যায়, এটাই স্বাভাবিক। তবে এটাকে যতটা সম্ভব সহনীয় পর্যায়ে রাখা যায় সে চেষ্টাই করতে হবে সরকারকে।

এখন সারা দেশে আমন ধান কাটা চলছে পুরোদমে। ধান কাটা, মাড়াই, সিদ্ধ ও শুকানোর কাজে ব্যস্ত সময় অতিবাহিত করছেন কৃষাণ-কৃষাণীরা। আবার ধান কাটার সঙ্গে সঙ্গে জমি চাষ করে ওই জমিতে রোপণ করা হচ্ছে আলু, সরিষা, গম, ভুট্টা, মরিচ, পেঁয়াজসহ মসলাজাতীয় ফসল। শীতের সুস্বাদু সবজিও রোপণ করছেন অনেক কৃষক। অনেকে বোরো ধানের চারা রোপণের কাজও শেষ করে ফেলেছেন এরই মধ্যে। কিছুদিনের মধ্যে আবার হাইব্রিড বোরো ধানের চারা রোপণ করবেন কৃষক। চাল উৎপাদনে বাংলাদেশে বোরো ধানের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উৎপাদিত চালের শতকরা ৫০ ভাগের বেশি আসে বোরো মৌসুম থেকে। ২০১৯-২০ অর্থবছরে দেশে উৎপাদিত ৩ কোটি ৮৬ লাখ ৯৫ হাজার টন চালের মধ্যে বোরো থেকে আসে ২ কোটি ১ লাখ ৮১ হাজার টন। অর্থাৎ দেশে উৎপাদিত চালের ৫২ দশমিক ১৫ ভাগ আসে বোরো ধান থেকে। বোরো ধান সম্পূর্ণ সেচনির্ভর ফসল। এই সেচকাজে ব্যবহৃত ডিজেলের দাম এরই মধ্যে প্রতি লিটারে ১৫ টাকা বৃদ্ধি করে নির্ধারণ করা হয়েছে ৮০ টাকা। এতে ধান উৎপাদন খরচ বাড়বে কেজিপ্রতি ২ থেকে ৩ টাকা। ফলে কৃষকদের মধ্যে সৃষ্টি হয়েছে এক অজানা আতঙ্ক। যদিও এরই মধ্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ডিজেলের দাম বাড়লেও সেচকাজে ব্যবহৃত ডিজেলের দাম আগের মতোই বহাল থাকবে। আন্তর্জাতিক বাজারে যখন খাদ্যপণ্যের দাম বাড়ছে হু-হু করে, ঠিক সে মুহূর্তে প্রধানমন্ত্রীর এই ঘোষণা যাতে শতভাগ বাস্তবায়িত হয়, কৃষক যাতে নির্বিঘ্নে বোরো ধান উৎপাদন করতে পারেন, সময়মতো সেচ দিতে পারেন, ফলন বৃদ্ধি করতে পারেন সে বিষয়ে প্রখর দৃষ্টি রাখতে হবে সরকারকেই। সেই সঙ্গে কৃষক যাতে উৎপাদিত ধানের ন্যায্যমূল্য পান তাও নিশ্চিত করতে হবে।

লক্ষ করা দরকার দেশের কিছু কিছু স্থানে সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে সার বিক্রি করে কৃষকদের প্রতারিত করছে কিছু স্বার্থান্বেষী ডিলার ও সার ব্যবসায়ী। এ ব্যাপারে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের সার ও বীজ মনিটরিং কমিটিকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। অন্যদিকে সরকার প্রণোদনা হিসেবে কৃষকদের মধ্যে যে সার, বীজ ও কীটনাশক প্রদান করছে, তা যেন কৃষকরা সঠিক সময়ে পান এবং সঠিকভাবে ব্যবহার করে ফলন বাড়াতে পারেন সে বিষয়ে কৃষি বিভাগকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিতে হবে। শস্য উৎপাদনে আধুনিক কলাকৌশল ব্যবহারে কৃষকদের উদ্বুদ্ধকরণের জন্য কৃষক প্রশিক্ষণ, মাঠ পরিদর্শন, পদ্ধতি প্রদর্শনী, ফলাফল প্রদর্শনী ও মাঠ দিবসসহ সম্প্রসারণ কর্মকা-কে করতে হবে আরও ত্বরান্বিত ও গতিশীল।

একই সঙ্গে কৃষকরা যাতে সময়মতো কৃষি ঋণ পান সে বিষয়ে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে হতে হবে আরও তৎপর। প্রয়োজনে গ্রামে গ্রামে ‘কৃষি ঋণ বিতরণ ক্যাম্প’ খুলে কৃষকদের মধ্যে সময়মতো কৃষি ঋণ প্রদান নিশ্চিত করতে হবে। ক্ষুদ্র, প্রান্তিক কৃষক ও বর্গাচাষিরাও যাতে কৃষি ঋণ পান সে বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। মনে রাখতে হবে প্রকৃত কৃষকের ঋণ কোনো দিন অনাদায়ি থাকে না। তারা সবার আগে ঋণ পরিশোধ করেন।

লেখক সাবেক মহাব্যবস্থাপক (কৃষি), বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্যশিল্প করপোরেশন

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত