২৪ এপ্রিল রানা প্লাজা ট্র্যাজেডির ৯ বছর পার হয়ে গেল। বছরের হিসাবে সময়ের দৈর্ঘ্য এক সমান থাকলেও অনুভূতি এক রকম হয় না। কখনো মনে হয় সময় বোধ হয় শেষ হবেই না আবার কখনো সময় চলে যায় চোখের পলকে। দুঃখের সময় শেষ হতে চায় না আর সুখের অনুভূতি ক্ষণস্থায়ী। তবে সময় চলে যায় সময়ের গতিতে। স্মৃতিও ঝাপসা হয়ে আসে। যেমন চলে গেল রানা প্লাজা ট্র্যাজেডির ৯ বছর। বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম কারখানা দুর্ঘটনা হিসেবে রানা প্লাজা ভবনধসকে বিবেচনা করা হলেও তা থেকে শিক্ষা নেওয়া হয়েছে কতটুকু তা এখনো প্রশ্নসাপেক্ষ।
২৪ এপ্রিল ২০১৩ সালের এই ভবনধসের ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ১১৩৮ জন, যাদের মধ্যে ২৯১ জনের কোনো পরিচয় পাওয়া যায়নি। তাদের সমাধিস্থ করা হয়েছে জুরাইনে অচিহ্নিত শ্রমিকদের কবরস্থানে। রানা প্লাজাধসের ঘটনায় আহত হয়েছিলেন ২৫০০ জন। এই ভয়াবহ কাঠামোগত হত্যার মাত্র ৫ মাস আগেই ২০১২ সালে তাজরীন অগ্নিকাণ্ডে জীবন হারিয়েছিলেন ১১২ জন। তাজরীনের দগদগে স্মৃতি মন থেকে মুছে যেতে না যেতেই রানা প্লাজা ভবনধস শুধু বাংলাদেশে নয়, সারা পৃথিবীকেই নাড়া দিয়েছিল।
কিন্তু ৯ বছর পর হিসাব করে দেখা গেল এ ঘটনা যতটা আবেগকে নাড়া দিয়েছিল, ততটা দায়িত্ব পালনে উদ্বুদ্ধ করেনি সংশ্লিষ্ট কাউকে। ফলে ২০১৬ সালে টাম্পাকো এবং ২০১৭ সালে মাল্টি ফ্যাবস কারখানা অগ্নিকা-ের ঘটনা ঘটে। ছোট-বড় নানা ধরনের দুর্ঘটনা ঘটেই চলেছে যেমন, তেমনি বড় দুর্ঘটনারও বিরাম নেই। ২০২১ সালের জুলাই মাসের ৮ তারিখে হাসেম ফুডস অ্যান্ড বেভারেজ কারখানায় আগুন লেগে ৫২ জনের মৃত্যু মনে করিয়ে দেয় সস্তা শ্রমিকের জীবনটাও কত অবহেলার।
সেফটি অ্যান্ড রাইটস নামের একটি বেসরকারি সংস্থার পক্ষ থেকে সংবাদপত্রে প্রকাশিত দুর্ঘটনা এবং মৃত্যুর খবর জরিপ করে দেখানো হয়েছে ২০০৯ থেকে ২০২১ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনায় মৃত্যুবরণ করেছেন ৬৬৮১ জন। অগ্নিসচেতনতা, অগ্নিসতর্কতা আর অগ্নিনিরাপত্তার ব্যবস্থা এতই নাজুক যে বলা হয় প্রতি দুদিনে একটি অগ্নিদুর্ঘটনা ঘটে থাকে। বড় আকারের প্রতিষ্ঠান এবং বেশি পরিমাণ প্রাণহানি না ঘটলে তা সাড়া ফেলে না, শোরগোল তোলে না। আড়ালেই থেকে যায় দুর্ঘটনা আর মৃত্যুর খবর। কর্মক্ষম মানুষকে হারিয়ে শ্রমজীবী পরিবারগুলো যে কি অসহায় হয়ে পড়ে তা নজরে আসে না অনেক ক্ষেত্রেই।
রানা প্লাজা ভবনধসের পর কিছু প্রশ্ন উঠেছিল। বাংলাদেশে চাইলেই কি কোনো কারখানা বা প্রতিষ্ঠান নির্মাণ করা যায়? প্রায় ১৭টি প্রতিষ্ঠানের অনুমতি ছাড়া কোনো শিল্প-কারখানা স্থাপন করা যায় না। ফ্যাক্টরি প্ল্যান পাস করাতেই তো জমির কাগজপত্র লাগে, সাইট প্ল্যান, মাস্টার প্ল্যান লাগে, কনস্ট্রাকসন প্ল্যান লাগে, মেশিন লে-আউট ও ম্যানুফ্যাকচারিং ফ্লো চার্ট লাগে। তাহলে ভবনধসের পর সংগত কারণেই প্রশ্ন ওঠে, ভবন নির্মাণের অনুমতি দেন যারা তারা কী দায়িত্ব পালন করেছিলেন? এখানে দুর্নীতি না দায়িত্বহীনতা কোনটা প্রধান? নাকি দুর্নীতির কারণেই নিয়ম থাকা সত্ত্বেও দায়িত্বে অবহেলা করা হয়েছিল?
আইন নাগরিককে সুরক্ষা দেয়। প্রশ্ন উঠে সেখানেও। কোন ধরনের নাগরিককে সুরক্ষা দেয়? ক্ষমতাবানের ক্ষমতার সুরক্ষা নাকি দুর্বলের ন্যূনতম অধিকারের সুরক্ষা? একটি অপরাধ বা অন্যায়ের শাস্তি হলে যেমন অপরাধপ্রবণতা কমতে থাকে, তেমনি অপরাধ করে পার পেয়ে গেলে অপরাধপ্রবণতা বাড়ে। ২০০৫ সালের ১১ এপ্রিল স্পেকট্রাম কারখানার ভবনধসে ৮০ জন শ্রমিকের মৃত্যুর পর যদি কর্র্তৃপক্ষ যথাযথ পদক্ষেপ নিত, তাহলে ২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল রানা প্লাজার দুঃখজনক ঘটনা হয়তো ঘটত না। ২১টি অধ্যায়ে বিভক্ত শ্রম আইনের ৫, ৬, ৭, ৮, ১১ অধ্যায়ে নিরাপদ কর্মস্থল, কল্যাণমূলক ব্যবস্থা, দুর্ঘটনাজনিত ক্ষতিপূরণ সংশ্লিষ্ট আইনের ধারাসমূহ সন্নিবেশিত আছে। অগ্নি প্রতিরোধ ও নির্বাপণ আইন ২০০৩, বাংলাদেশ ইমারত নির্মাণ বিধিমালা ২০০৬ আছে। আরও আছে পেশাগত স্বাস্থ্য ও সেফটি ব্যবস্থাপনা সম্পর্কিত আইএলও গাইড লাইন। আইন তো আছে, কিন্তু মানা হয় কতখানি আর না মানলে মালিকের শাস্তির কোনো দৃষ্টান্ত কি আছে?
রানা প্লাজা ভবনধসের পর ২০১৩ সালে একটা রিট পিটিশন করা হয়েছিল ব্লাস্ট এবং আসকের পক্ষ থেকে। এখনো তার নিষ্পত্তি হয়নি। শ্রম আদালতে ১১টি ফৌজদারি মামলা ২০২২ সাল পর্যন্ত চলমান আছে। মামলার দীর্ঘসূত্রতা যে বিচার প্রক্রিয়ার প্রতি অনাস্থা তৈরি করে তা কি বলার অপেক্ষা রাখে? শুধু রানা প্লাজা নয় এ পর্যন্ত নিষ্পত্তিকৃত ৮০টি মামলা বিশ্লেষণ করে দেখা যায় যে রায় প্রদান করা হয়েছে ৩৫টি মামলার, বাদীর অনুপস্থিতির কারণে খারিজ হয়ে গেছে ৩৬টি মামলা, আপস-মীমাংসা হয়েছে ৯টি মামলার। আইন অনুযায়ী ৬০ কর্মদিবসের মধ্যে মামলা নিষ্পত্তির বিধান থাকলেও মামলা নিষ্পত্তিতে গড়ে সময় লেগেছে ৬৩০ দিন। অর্থাৎ নির্ধারিত সময়ের ১০ গুণ বেশি। আবার যে ৩৫টি মামলার রায় ঘোষিত হয়েছে তার মধ্যে ১৯টি মামলার ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়েছে। বাকি ১৬টির ক্ষেত্রে মালিকপক্ষ আদালতের রায় উপেক্ষা করেছে বলে ফৌজদারি মামলা করা হয়েছে। আইন এবং আদালতকে উপেক্ষা করার এই নজিরকে উপেক্ষা করলে আইনের শাসনের কথা যতই বলা হোক না কেন, তা অরণ্যে রোদনের মতোই নিষ্ফল হবে।
রানা প্লাজাধসের পর শ্রম আইন সংশোধন হয়েছে দুবার। একবার ২০১৩ সালেই, আর একবার ২০১৮ সালে। কর্মক্ষেত্রে শ্রমিকের মৃত্যুজনিত ক্ষতিপূরণের এবং পূর্ণ কর্মক্ষমতা হারানো আহতদের ক্ষতিপূরণের পরিমাণ বাড়ানো হয়েছে। মৃত্যুবরণ করলে পরিবার পাবে ২ লাখ টাকা এবং চিরস্থায়ী পঙ্গু হলে আড়াই লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ পাবেন। এই ক্ষতিপূরণের পরিমাণ কি হাস্যকর নাকি উপহাসের শামিল তা নিয়ে বিতর্ক করা যাবে। কিন্তু একজন মানুষের জীবনকে এবং জীবিকাকে যে তাচ্ছিল্য করা হয়েছে তা নিয়ে বিতর্ক করার প্রবৃত্তি নিশ্চয়ই কারও হবে না। দেশের জিডিপি বাড়ছে, মাথাপিছু আয় বাড়ছে। এ আয় বৃদ্ধিতে শ্রমজীবীদের ভূমিকা অস্বীকার করার উপায় নেই কিন্তু তাদের প্রতি দায়িত্ব প্রতি পদে পদে অস্বীকার করা হচ্ছে এমনকি কর্মক্ষেত্রে নিহত বা আহত হওয়ার পরও। মাথাপিছু আয় হিসেবে একজন শিশু থেকে বৃদ্ধ পর্যন্ত যেকোনো বয়সী নাগরিকের আয় বার্ষিক ২ লাখ ৩০ হাজার টাকা। আর উৎপাদনের চাকা ঘোরান যারা তাদের জীবনের চাকা থেমে গেলে ক্ষতিপূরণ ২ লাখ টাকা। শ্রমিকের জীবন নিয়ে একি তামাশা নয়? এই তামাশা শেষে বিয়োগান্ত বেদনা ও অপমানে পর্যবসিত হয় যখন সেই ক্ষতিপূরণ পাওয়ার জন্যও বছরের পর বছর ঘুরতে হয়।
রানা প্লাজা ভবন নির্মাণ হয়েছিল অবৈধভাবে, ফাটল দেখা যাওয়ার পর শ্রমিকরা কাজে যেতে চায়নি, তাদের জোর করে কাজে পাঠানো হয়েছে, শ্রমিকরা চাকরি হারানোর ভয়ে কাজে যোগ দিয়েছে, ভবনে জেনারেটর নিয়মানুযায়ী স্থাপন করা হয়নি, ভবনধসের পর বিরোধী দলের কর্মীরা পিলার ধরে ঝাঁকি দিয়েছে বলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বক্তব্য দিয়েছেন। ৫টি কারখানায় প্রায় ৫ হাজার শ্রমিক কাজ করতেন কিন্তু কোনো ট্রেড ইউনিয়ন ছিল না সেখানে এসব তথ্য কী প্রমাণ করে? শ্রম দপ্তর, পরিদর্শন দপ্তর এবং রাষ্ট্রের দায়িত্বপূর্ণ ব্যক্তি কেউ কি দায়িত্ব পালন করেছেন, দায় এড়াতে পারবেন কি কেউ?
দেখা গেছে ২৯টি ব্র্যান্ড রানা প্লাজায় অবস্থিত ৫টি ফ্যাক্টরিতে তৈরি পোশাকের অর্ডার দিত। তাদের কি কোনো দায় ছিল না কর্ম পরিবেশ দেখার ব্যাপারে? একটা হিসাব দাঁড় করিয়েছিল ক্লিন ক্লথ ক্যাম্পেইন নামক একটি সংস্থা। তারা দেখিয়েছে একটি টি-শার্টের বিক্রয় মূল্যের মাত্র দশমিক ৬ শতাংশ পান শ্রমিক। অর্থাৎ ১০০ টাকার টি-শার্টে শ্রমিকের প্রাপ্তি মাত্র ৬০ পয়সা। কারখানা মালিক ৪ শতাংশ পান লাভ হিসেবে, ইউরোপ-আমেরিকার নামকরা ব্র্যান্ড পায় ১২ শতাংশ, আর ইউরোপ-আমেরিকার বিক্রেতা পায় ৫৯ শতাংশ। শ্রমিক ভবনের নিচে চাপা পড়ার আগেই চাপা পড়ে থাকে লাভ বা মুনাফার পাহাড়ের নিচে।
গার্মেন্টস বা তৈরি পোশাকের ব্যবসা বিশাল। সারা পৃথিবীতে প্রায় আড়াই ট্রিলিয়ন ডলারের শিল্প এই পোশাকশিল্প আর ৪ কোটি শ্রমিক খাটছে এখানে। বাংলাদেশের মালিকরা ৫০ বিলিয়ন ডলার রপ্তানির লক্ষ্যে কাজ করছেন। তৈরি পোশাক রপ্তানিতে বাংলাদেশ তুরস্ক, ভারত, পাকিস্তান, ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়াকে পেছনে ফেলে দ্বিতীয় বৃহত্তম তৈরি পোশাক রপ্তানির দেশ। কিন্তু শ্রমিকের মজুরি দেওয়ার দিক থেকে পৃথিবীতে সর্বনিম্ন দেশের নাম বাংলাদেশ। ৪০ লাখ শ্রমিক কাজ করে এই শিল্পে। তাদের মজুরি বাড়ে ধীর গতিতে, মামলাগুলো প্রায় গতিহীন, কাজ করতে এসে প্রাণ হারালে ক্ষতিপূরণ নগণ্য, আইনে তাদের অধিকার সুরক্ষিত নয় বরং উপেক্ষিত, তাদের ন্যায্য প্রাপ্য থেকে বঞ্চিত করতে বিদেশি বায়ার আর দেশি মালিক একজোট কিন্তু শ্রমিকদের সংগঠিত হওয়া এবং ট্রেড ইউনিয়ন করার ব্যাপারে পদে পদে বাধা। যে কারণে ৪ হাজারের বেশি কারখানায় ইউনিয়নের সংখ্যা ১১০০-এর কাছাকাছি। এদের মধ্যে কতটা ইউনিয়ন কাজ করতে পারে তাদের খুঁজে পাওয়া মুশকিল।
রানা প্লাজা ভবনধস দেখিয়েছে অনেক কিন্তু শিখিয়েছে কি কিছু? শ্রমজীবী মানুষের জীবন-জীবিকা রক্ষা, ন্যায্য মজুরি, ট্রেড ইউনিয়ন অধিকার আর মৃত্যুজনিত ক্ষতিপূরণের হার নির্ধারণ, আহতদের চিকিৎসা পুনর্বাসনের কাজে যে অনেক পিছিয়ে আছি আমরা প্রতি বছর ২৪ এপ্রিল রানা প্লাজা দিবস সে কথাই মনে করিয়ে দেয়।
লেখক রাজনৈতিক সংগঠক ও কলামনিস্ট