হাবড়া, অশোকনগর, গুমা, বনগাঁ বেনাপোল বর্ডারের কাছে। সীমান্ত কাছে হওয়ার কারণে সেটাকে কেন্দ্র করে নানা ধরনের আর্থিক লেনদেন হয়এ কোনো নতুন খবর নয়। নতুন যেটা কয়েক বছর ধরে চোখে পড়ছে, তা হচ্ছেএকদা গ্রামীণ এলাকাগুলোতেও ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। আমাদের ছোটবেলায় হাবড়া-টাবড়া যেতাম শুধু পিকনিক করতে। ফাঁকা জায়গা।
১৯৪৭ পরবর্তী, দেশভাগের পরে ওপার থেকে অনেক মানুষ চলে আসায় প্রচুর কলোনি গড়ে উঠলেও তখনো গা থেকে গাঁয়ের গন্ধ যায়নি। আমরা কলকাতার লোকজন নিতান্ত বাধ্য না হলে কেউ যেতাম না। ওসব এলাকা উদ্বাস্তু অধ্যুষিত হলেও মিশ্র জনজাতির বাস। দাঙ্গাটাঙ্গা কখনো হয়নি। শান্ত এলাকা। কবি বিজয় সরকার ও বিনয় মজুমদারের বাসা ছিল বনগাঁ ও কাছের ঠাকুরনগরে। কয়েক বছরের মধ্যে দ্রুত বদলে যেতে লাগল রাত নামতেই ঝিঁঝিডাকা জনপদগুলো। স্কুল-কলেজের সংখ্যা বাড়তে লাগল। বড় বড় বাড়ি, অটোরিকশার দাপাদাপি, হু হু করে জনসংখ্যার বৃদ্ধি, রাস্তার উন্নয়নসব মিলিয়ে একসময় যা ছিল নিঝুম কলোনি, তাই হয়ে পড়ল ছোট ছোট সব ঝাঁ-চকচকে নগর।
কলকাতা যেন হাঁ করে গিলে নিল গ্রাম হাবড়া, অশোকনগর, বনগাঁ ও আশপাশের এলাকা। এখন তো চিনতেই পারি না পুরনো বনগাঁ, অশোকনগরকে। এই বিপুল বদল ঘটে গেছে নব্বই দশকের পর। যখন থেকে ভারতের অর্থনীতিতে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে তখন থেকে। ওই সময় থেকেই এ দেশে কনজিউমারিজমের রমরমায় চোখ ঝলসে গেল ছাপোষা নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের মানুষজনেরও। বিউটি পার্লার, শপিং মল, ঠান্ডা কোকাকোলার বিজ্ঞাপন আছড়ে পড়ল দরিদ্র পরিবারগুলোতে। এই স্বপ্নের হাতছানি জন্ম দিল কালো টাকার অর্থনীতির।
সীমান্ত লাগোয়া এলাকাতে বেশ কয়েক বছর ধরে যেভাবে বহুতল ভবন বেড়েছে, নতুন নতুন প্রাসাদোপম বাড়ি তৈরি হচ্ছে, তাতে একটা বিষয় সাদা চোখেই স্পষ্টঅন্তত কিছু লোকের হাতে পয়সা এসেছে। এই জমি বাড়ি সিন্ডিকেট কিন্তু সারা ভারতেই শক্তিশালী। মুম্বাই, নয়ডা, গুড়গাঁও, দিল্লি, হরিয়ানা, রাজস্থান, পশ্চিমবঙ্গের সর্বত্রই এই হাউজিং ব্যবসার রমরমা। কালো অর্থনীতিতেও হাউজিং ইন্ডাস্ট্রির ভূমিকা কম নয়। কলকাতার কাছে যেভাবে ‘নিউটাউন’ উপনগরী গড়ে উঠেছে তা নিয়েই লেখা যেতে পারে চমৎকার এক রহস্য রোমাঞ্চ সিরিজ।
আসলে এই দীর্ঘ প্রেক্ষিত বাদ দিয়ে আপনি পি কে হালদার বা আগামী দিনে অন্য কোনো লোকের স্ক্যাম বা মহান কীর্তি বুঝতে পারবেন না। আমার ধারণা, পি কে হালদারের দশ হাজার কোটি টাকার স্ক্যাম হিমশৈলর চূড়ামাত্র। গভীরভাবে খোঁজ করলে আরও বড় কোনো কেলেঙ্কারি বেরিয়ে আসতে পারে। এর সঙ্গে হিন্দু-মুসলমান, তৃণমূল, সিপিএম, জামায়াত, বিএনপি, কংগ্রেস, বিজেপি, আওয়ামী লীগ আলাদা আলাদা করে দোষ দিয়ে লাভ নেই।
পি কে হালদার কেলেঙ্কারি সামনে আসার পর অনেকেই বলছেন, এর পেছনে রাজনৈতিক যোগাযোগ না থাকলে অসাধু দুষ্টচক্রের এমন রমরমা হয় না। কোনো রাজনৈতিক দল, সাধারণ মানুষ, মিডিয়া, প্রশাসন, পুলিশ কোনো মহলের মনে ঘুণাক্ষরেও প্রশ্ন আসেনিলোকটা করে কী! ঠিক কথা। প্রত্যেকটি দুর্নীতির পেছনে রাজনৈতিক মাথা আছে। পি কে হালদার নিয়ে খোঁজখবর নিতে গিয়ে দেখলাম তিনি প্রথম অশোকনগর আসেন ২০০৫ সালে। তখন এ রাজ্যে বামপন্থি সরকার। ব্লক, পঞ্চায়েত, মিউনিসিপ্যালিটি, বিধানসভা, লোকসভা, স্কুল কমিটি, কলেজের গভর্নিং বডি সব বামেদের হাতে। তখন শ্রীযুক্ত হালদার এপারে পা রাখলেন। জমির দালালদের হাত করলেন, ছোট্ট একটা বাড়ি কিনলেন। ধীরে ধীরে বিপুল সম্পদের মালিক হলেন।
এই সময়ের মধ্যে কিন্তু এ রাজ্যের ক্ষমতার পালাবদল হয়েছে। সিপিএমের জায়গায় তৃণমূল এসেছে। কিন্তু হালদারের সাম্রাজ্য বিস্তার নিশ্চিন্তে, মসৃণ গতিতে এগিয়ে চলছিল। আসলে পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে, কেউ আজকাল আর আয়ের উৎস নিয়ে মাথা ঘামায় না। মূল্যবোধ পাল্টে গেছে। দুর্নীতি এখন মধ্যবিত্ত মননেও খারাপ শব্দ নয়। একদিকে অর্থনৈতিক সংকট, অন্যদিকে লোভের হাতছানি। এরকম পরিস্থিতিতেই জন্ম নেয় পি কে হালদারেরা।
পুলিশের রিপোর্ট বলছে যে, বাংলাদেশের অনেক মুসলমান লোকজনও ব্যাংক লোন নিয়ে শোধ না করে এপারে এসে নাম পাল্টে বাড়ি ভাড়া করে সংসার করছে। তবে শুনতে খারাপ লাগলেও এটা ঠিক হিন্দু জনগোষ্ঠীর মধ্যে দুই দেশেই বাড়ি জমি করার প্রবণতা বেশি। এটা বেড়েছে আমাদের শাসকদের প্রতিনিয়ত নির্দিষ্ট এক জনগোষ্ঠীকে গালমন্দ করা ও সংখ্যাগরিষ্ঠ লোকজনকে বাবা-বাছা করে তোল্লাই দিয়ে এপারে এলেই নাগরিকত্ব প্রদান নিশ্চিত বলে ঘোষণা করার পর থেকে। বাস্তবে এই নাগরিক অধিকার নিছক মরীচিকা এটা কে আর কাকে বোঝায়। কিন্তু মজা হচ্ছে, ওপারের লোকজন এলে আধার কার্ড বা ভোটার তালিকায় নাম তোলা কিংবা বাড়ি জমি দেখে দেওয়ার কাজটি সব দলের, সব সম্প্রদায়ের লোকজনই নিষ্ঠার সঙ্গে করেন। দুর্নীতির সত্যিই কোনো হিন্দু-মুসলমান হয় না।
পুলিশের অনেক কর্তাদের এই পি কে হালদার স্ক্যাম নিয়ে জিজ্ঞেস করলেই জবাব পেয়েছি, স্থানীয় কেউ অভিযোগ না করলে আমরা মাথা ঘামাই না। এবারও প্রথম এক বেসরকারি ব্যাংকের উচ্চ পদস্থ আধিকারিক পি কে হালদারের দুর্নীতির হালহকিকত নিয়ে তত্ত্ব তালাশ বাংলাদেশের পুলিশ না করলে এরকম কেঁচো খুঁড়তে সাপ বেরিয়ে আসত না। হালদার ভুয়া কাগজপত্র দেখিয়ে নিজের আত্মীয়স্বজনের নামে বিপুল টাকা সরিয়ে ফেলেছে এটা জানাজানি হতেই বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের অনুরোধে এখানকার ইডি বা এনফোর্সমেন্ট বিভাগ তদন্ত করতে নেমে এখনো অবধি দশ হাজার কোটি টাকার দুর্নীতির হদিস পেয়েছে। তার মধ্যে অশোকনগর এলাকাতেই লগ্নি হয়েছে তিনশ কোটি টাকা। ভালোই ছিলেন সুকুমার মৃধা, পি কে হালদার ও তার জ্ঞাতি গুষ্টি। ভাই, জামাই, ভাগ্নে সব মিলিয়ে জমজমাট কারবার।
ওপারের কোটি কোটি টাকা এপারে এনে জমি বাড়ি কিনে স্থাবর সম্পত্তি বাড়িয়ে যাওয়া। কিন্তু কথায় আছে না, চুরি বিদ্যা মহাবিদ্যা যদি না পড়ো ধরা। সতেরো বছর ধরে চলা রমরমার এবার শেষ প্রহর। পি কে হালদারের ভাই প্রাণেশ প্রথম অশোকনগর তল্লাটের বাইগাছিতে জমি কেনেন। পরে আদর্শ পল্লী, মানিকনগর, নতুন পল্লী, বিল্ডিং মোড়, বাইগাছি ও মানিকনগর মৌজার সর্বত্রই হালদার সাম্রাজ্য বিস্তৃত হয়। পি কে হালদারকে কেউ সেভাবে চিনতে পারলেন না। ভাই প্রাণেশ, জামাই সঞ্জীব হালদার সবার পরিচিত। নানা সামাজিক কাজে থাকলেও প্রাণেশ এলাকায় অনেকের কাছে টাকা ধার করে বর্ধমানের কাটোয়ায় কোনো এক অজ্ঞাত কারণে পালিয়ে যায়। কয়েক দিন আগে সেখান থেকেই পুলিশ অটোচালকের ছদ্মবেশে প্রাণেশকে অ্যারেস্ট করে। তার আগে বাংলাদেশের গোয়েন্দাদের জালে ধরা পড়েছে দুর্নীতির কিংপিন, মূল মস্তিষ্ক পি কে হালদার।
এলাকায় এখন প্রবল উত্তেজনা, ফিসফিসানি। এত বড় ঘটনার সাক্ষী থাকলেও তারা কেউ কিছুই টের পাননি ভেবে ঠোঁট কামড়াচ্ছেন সবাই। এইরকম নাটকীয়তার রুদ্ধশ্বাস নাটক রোজ তো আর ঘটবে না। আমার বন্ধু, বিশিষ্ট সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব তাপস ব্যানার্জী কথায় কথায় বলছিলেন যে, হালদার বা মৃধা যাই হোক, ওদের মা কিন্তু খুব ভালো। শুনেছি বাংলাদেশের কোনো এক স্কুলে পড়াতেন। ওইরকম মায়ের ছেলেরা কীভাবে অন্ধকার জগতে পা রাখল, ভাবলে অবাক লাগে। আপাততভাবে বলা যায়, হালদার নাটকের পর্দা আজ না হোক কাল নামবে। কে জানে এরপরে অন্য কোনো দুর্নীতি নাট্য আবার আমাদের দেখতে হবে কিনা!
লেখক ভারতীয় প্রামাণ্যচিত্র নির্মাতা ও লেখক