সবকিছু দেখে মনে হচ্ছে, বাংলাদেশসহ সারা পৃথিবীতে জাতিসংঘ ঘোষিত টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট (এসডিজি) বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া স্তিমিত হয়ে পড়ছে। আমরা সবাই জানি, সহস্রাব্দের উন্নয়ন লক্ষ্য বাস্তবায়ন শেষে জাতিসংঘ টেকসই উন্নয়ন অভীষ্টসমূহ ঘোষণা করে। এতে মোট ১৭টি অভীষ্ট, ১৬৯টি লক্ষ্য ও ২৩২টি সূচক নির্ধারণ করা হয়। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণের পেছনে বড় উদ্দেশ্য ছিল বিশ্বব্যাপী দারিদ্র্যকে পরাজিত করা এবং একইসঙ্গে পৃথিবীর প্রাকৃতিক পরিবেশকে সুরক্ষা দেওয়া।
এসব অভীষ্ট অনুযায়ী দারিদ্র্য বিমোচন, ক্ষুধা নিবারণসহ, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, জেন্ডার সমতা, নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশন, সবুজ জ্বালানি, অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও শোভন কর্মসংস্থান ইত্যাদি নিশ্চিত করাসহ বৈষম্য দূরা করা, টেকসই শহর ও জনপদ, জলবায়ু পরিবর্তনে ভূমিকা, টেকসই উৎপাদন ও ভোগ, সমুদ্র সম্পদের দায়িত্বশীল ব্যবহার, বাস্তুসংস্থানের সুরক্ষা, শান্তি সুরক্ষা ও অংশীদারত্ব তৈরি ইত্যাদি বিষয়গুলোকে উন্নয়নের অগ্রাধিকার হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
এই সময়ে, জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক ফলাফল আলোচনার আলোকে এসডিজির বাস্তবায়ন বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। পরিবেশকে ধ্বংস না করে উন্নয়ন ও সমৃদ্ধি অর্জন এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে মাথায় রেখে প্রাকৃতিক সম্পদের দায়িত্বশীল ব্যবস্থাপনা। এটা এমন নয় যে, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ভোগের জন্য এই সম্পদ সংরক্ষণ করা, বরঞ্চ ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য বর্তমান প্রাকৃতিক পরিবেশের সংরক্ষণ করা। কারণ প্রাকৃতিক পরিবেশের সংরক্ষণ ছাড়া, বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও দুর্বিপাকে মানুষের বেঁচে থাকাই দায় হয়ে যাবে, যার ভুক্তভোগী এখনই আমরা সবাই।
করোনা মহামারী নিঃসন্দেহে এসডিজি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে ছেদ ঘটিয়েছে। এসডিজি অনুযায়ী শুধুমাত্র লক্ষ্যমাত্রা অর্জনই সব না, টেকসই পরিবর্তন নিয়ে আসার জন্য কর্ম প্রক্রিয়াটাও খুবই গুরুত্বপূর্ণ, এসডিজিতে যাকে ‘হোল আব সোসাইটি’ বা সরকার, ব্যক্তি খাত, মিডিয়া ও জনগণ সবাই মিলে কর্মসম্পাদন হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। বাংলাদেশে এসডিজি অর্জনে বিনিয়োগের যে পরিকল্পনা করা হয়েছে তাতে ৮০ শতাংশ ব্যক্তি খাতের ভূমিকার কথা বলা হয়েছে। যদিও ব্যক্তি খাতের মুনাফা অর্জন সর্বস্ব নীতি এক্ষেত্রে কতটুকু কার্যকর হবে তা প্রশ্নের দাবি রাখে।
শুধু তাই নয়, এসডিজি অভীষ্টসমূহ অর্জনে দরিদ্র ও উন্নয়নশীল দেশের প্রতি ধনী দেশগুলোর দায়িত্বের কথা বারবার স্মরণ করিয়ে দেয়। বিশেষ করে দক্ষতা উন্নয়ন, আর্থিক সহযোগিতা ও প্রযুক্তি হস্তান্তরের ক্ষেত্রে। সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে, করোনা মহামারী শেষ না হতেই, ইউরোপে যুদ্ধ এবং তাতে পশ্চিমা দেশগুলোর জড়িয়ে পড়ায় আপৎকালীন পরিস্থিতি সামাল দিতেই যেখানে সবাই ব্যস্ত সেখানে এসডিজি অর্জনের জন্য যে মনোযোগ বিশেষ করে পরিকল্পনা, অর্থব্যয় ও সহযোগিতার প্রয়োজন তার বড়ই ঘাটতি দেখা যাচ্ছে। সার্বিক বিবেচনায় দেখা যাচ্ছে, ২০১৫ সালে যে বিবেচনায় জাতিসংঘের সব সদস্য রাষ্ট্র উন্নয়নের টেকসই এজেন্ডা বাস্তবায়নে যেভাবে ঐকমত্যে আসতে পেরেছিল অন্যান্য পরিস্থিতির চাপে তা গুরুত্ব হারাতে বসেছে।
এসডিজি বাস্তবায়নকে সামনে রেখে বাংলাদেশ সরকার অষ্টম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা করেছে। তবে এসডিজি বাস্তবায়নে স্থানীয় পরিপ্রেক্ষিতে উন্নয়ন এজেন্ডাগুলোকে বিবেচনায় নেওয়া এবং সে অনুযায়ী পরিকল্পনা করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আর এজন্য অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে শাসনকাঠামোর সংস্কার। এসডিজির বিভিন্ন অভীষ্টের সূচকেও এই শাসন কাঠামোর সংস্কারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, যেখানে ন্যায্যতা ও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক।
এসডিজিকে কীভাবে স্থানীয়করণ করা যায়, সেজন্য সরকার নাটোর জেলাকে মডেল ধরে কিছু প্রশাসনিক কর্মপদ্ধতি উদ্ভাবনের চেষ্টা করেছিল। এই মডেল অনুযায়ী জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে সরকার ও জনপ্রতিনিধিদের অংশগ্রহণে পরিকল্পনা প্রণয়ন ও উদ্যোগ গ্রহণ করার কথা। বলা হয়েছে, বাংলাদেশে এসডিজি বাস্তবায়নে প্রাথমিকভাবে ৪০টি লক্ষ্য (৩৯+১) নির্ধারণ করা হয়েছে। শেষের একটি লক্ষ্য হচ্ছে প্রত্যেকটি জেলা ও উপজেলা নিজস্ব পরিপ্রেক্ষিত বিবেচনায় একটি লক্ষ্য বাছাই করে নেবে এবং সে অনুযায়ী উদ্যোগ গ্রহণ করবে।
কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে এসডিজি স্থানীয়করণে সরকারের উদ্যোগ গতি হারিয়েছে, যেটুকু আছে তাও আবার প্রথাগত প্রশাসনিক উদ্যোগ নির্ভর। সেখানে জনঅংশগ্রহণ বিশেষ করে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণের সুযোগ নেই বললেই চলে। এ সম্পর্কিত সরকারের ঘোষিত ব্যবস্থাপনা জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে আর কাজ করছে না। ‘নাটোর মডেল’ মডেল হিসেবে তৈরি হয়েছে সত্য, কিন্তু এই মডেল আর কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি। আর এই কারণেই বাধাগ্রস্ত হচ্ছে এসডিজি বাস্তবায়নের ‘কাউকে পেছনে ফেলে না রাখার নীতি’।
সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় যদি প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত না হয়, শাসন কাঠামো যদি জনবান্ধব না হয় তাহলে তা জনগণের প্রয়োজন বুঝতে কতটুকুই বা সক্ষম হবে? যেটা কিনা এসডিজি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে একটি বড় সীমাবদ্ধতা। সম্প্রতি সরকার কর্র্তৃক আয়োজিত দ্বিতীয় এসডিজির বাস্তবায়ন পর্যালোচনা সম্মেলনে এই কথাগুলো কমই আলোচনা হয়েছে এবং তার চেয়ে আরও কম আলোচনা হয়েছে এই সীমাবদ্ধতা কীভাবে দূর করা যাবে তা নিয়ে। অন্যদিকে, এসডিজি কতটুকু বাস্তবায়ন হলো তার পরিবীক্ষণ ব্যবস্থা একদম নেই বলা না গেলেও অস্বীকার করার জো নেই যে তা অত্যন্ত সেকেলে। সরকারের এসডিজি ট্র্যাকারের সমস্ত তথ্য ন্যূনতম দুই তিন বছরের পুরনো বা আরও বেশি। এই তথ্য দিয়ে কোনোভাবেই অগ্রগতি বোঝা সম্ভব না। পাশাপাশি আরেকটি বিষয় বিবেচনায় নিতে হবে, টেকসই অভীষ্ট অর্জন শুধুমাত্র বড় বড় কিছু লক্ষ্য যেমন জিডিপির হার বৃদ্ধি, দারিদ্র্য হার হ্রাস, মাতৃ ও শিশুমৃত্যুর হার কমানো ইত্যাদি অর্জনের মাধ্যমে সফল বলা যাবে না, যদিও এর প্রত্যেকটি লক্ষ্যই অসম্ভব গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এসডিজি হচ্ছে অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, প্রাকৃতিক পরিবেশ ও বাস্তুসংস্থানের উন্নয়ন ও সংরক্ষণ। এজন্যই একে ‘টেকসই বা স্থায়িত্বশীল’ অভিধায় অভিহিত করা হয়।
এসডিজি পরিকল্পনায় একটি বড় সীমাবদ্ধতা বোধহয় পরিকল্পনা করার সময় করোনা অতিমারীর মতো একটি বড় অভিঘাতকে কল্পনা করা যায়নি। অন্যভাবে বলা যায় পুরো পরিকল্পনা যেভাবে ধনী, উন্নয়নশীল ও দরিদ্র দেশগুলোর মধ্যে যে অংশীদারত্বের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল আদতে তা কখনোই বাস্তবায়ন হয়নি। ফলে অর্থনৈতিক সহযোগিতা, প্রযুক্তি হস্তান্তর, মেধাস্বত্ব আইনের প্রতিবন্ধকতা ইত্যাদি খুবই স্পর্শকাতর অথচ টেকসই উন্নয়নের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো এখনো অধরাই রয়ে গেছে। এই সঙ্গে অধরা রয়ে গেছে এসডিজি বাস্তবায়নে সম্পদ সংগ্রহ ও ব্যবস্থাপনায় পাবলিক ও প্রাইভেট অংশীদারত্ব এবং একই সঙ্গে দায়িত্বশীল আচরণের বিষয়টি।
আমাদের বিবেচনায় নিতে হবে, এসডিজি বাস্তবায়নে একটি উন্নয়ন অভীষ্ট অরেকটি উন্নয়ন অভীষ্টের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত, যেমনটি প্রযোজ্য মানবাধিকারের সর্বজনীন ঘোষণার বেলায়, এর একটি অভীষ্টের বাস্তবায়নে ব্যর্থতা অন্যগুলোর ওপর প্রভাব ফেলতে বাধ্য। এসডিজির প্রথম দুটি লক্ষ্যমাত্রার একটি হচ্ছে ‘নো প্রভার্টি’ অন্যটি ‘জিরো হাঙ্গার’, করোনা ও সাম্প্রতিক রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পরিপ্রেক্ষিতে দুটোই বেড়েছে বৈ কমেছে এমন তথ্যপ্রমাণ হাজির করা খুবই কষ্টকর হবে।
লেখক উন্নয়নকর্মী