ভরা মৌসুমে চালের অস্বাভাবিক মূল্য

আপডেট : ০১ জুন ২০২২, ১১:০২ পিএম

মাত্র এক মাস আগে ১৭০০ টাকায় ২৫ কেজি ওজনের সিদ্ধ কাটারি ভোগ চালের যে বস্তা কিনেছিলাম সেটি সম্প্রতি ময়মনসিংহের ত্রিশাল বাজারের বিভিন্ন চালের দোকানে বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার ১০০ টাকায়। নাজিরশাইল চালের ২৫ কেজির বস্তা বর্তমানে বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ৯০০ কাটায়, এক মাস আগেও যা বিক্রি হয়েছে ১ হাজার ৬০০ টাকায়। মোটা চাল স্বর্ণা ও গুটি স্বর্ণা প্রতি কেজি বিক্রি হচ্ছে ৪৬ থেকে ৪৭ টাকা, যা কিছুদিন আগেও বিক্রি হয়েছে ৩৮ থেকে ৪০ টাকা কেজি দরে। ব্রি-২৮ জাতের চাল কদিন আগে ৪৬ থেকে ৪৮ টাকা দরে বিক্রি হলেও তা এখন বিক্রি হচ্ছে ৫৩ থেকে ৫৫ টাকা কেজি দরে। সে হিসেবে মাত্র এক মাসের ব্যবধানে প্রতি কেজি চিকন চালের দাম বেড়েছে ১২ থেকে ১৬ টাকা। মাঝারি মোটা চালের দাম বেড়েছে প্রতি কেজিতে ১৩ টাকা এবং মোটা চালের দাম বেড়েছে ৭ থেকে ৮ টাকা। এটা কী করে সম্ভব? চালের বাজারের এই ঘূর্ণিঝড়ের মতো অস্থিরতার কারণই বা কী? সরকারি সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি) ও কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, গত এক সপ্তাহে সব ধরনের চালের দাম কেজিতে বেড়েছে ৭ থেকে ৮ টাকা। কিন্তু বাস্তবে বেড়েছে আরও বেশি। ৮ থেকে ১০ টাকা। খুচরা ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, অটোমিল মালিকরা চাল মজুদ করায় এ অস্বস্তিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। তবে এ অভিযোগ অস্বীকার করে মিল মালিক ও চাল ব্যবসায়ীরা বলছেন, মিলপর্যায়ে চালের দাম বাড়ানো হয়নি। তবে টানা বৃষ্টি, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ ও ঝড়ো হাওয়ায় ধান নষ্টের কারণে বাড়ছে চালের দাম। কারও কারও মতে, গত বছর এ সময় বোরো ধানের মণপ্রতি দাম ছিল ৮০০ টাকা, বর্তমানে তা বিক্রি হচ্ছে ১২০০ টাকা মণ দরে। চালের মূল্যবৃদ্ধির জন্য এটাও একটি উল্লেখযোগ্য কারণ।

ত্রিশাল নামাপাড়া গ্রামের কৃষক মো. নজরুল ইসলাম এ বছর ১ একর জমিতে ছক্কা জাতের হাইব্রিড ও ব্রি ধান-২৯ জাতের ইনব্রিড ধানের চাষ করেন। এক একর জমি থেকে তিনি ধান পেয়েছেন ৪৮ মণ। ধান উৎপাদনে একরপ্রতি তার খরচ হয়েছে ৪৮ হাজার টাকা। অন্যদিকে ১২০০ টাকা মণ দরে ৪৮ মণ ধান বিক্রি করে তার আয় হয়েছে ৫৭ হাজার ৬০০ টাকা। এতে তার লাভ হয়েছে ৯ হাজা ৬০০ টাকা। যদি অন্যের জমি লিজ নিয়ে তিনি বোরো ধানের চাষ করতেন তাহলে তাকে এক ফসলের জন্য একরপ্রতি লিজ দিতে হতো ১৬ হাজার টাকা। এতে তার লাভ তো দূরের কথা প্রতি একর বোরো ধান চাষে লোকসান দিতে হতো ৮ হাজার টাকা। ধান চাষ বর্তমানে সম্পূর্ণ অলাভজনক ব্যবসা হয়ে দাঁড়িয়েছে। জমি তো আর ফেলে রাখা যায় না। তাই বাধ্য হয়ে কৃষক লোকসান দিয়েও ধানের চাষ করে আমাদের ১৭ কোটি মানুষের খাদ্য সরবরাহ করছেন। একজন কৃষক কান ধরে ওঠবস করে বলেছেন, তিনি আর জীবনে ধানের চাষ করবেন না, কারণ বোরো ধান চাষে বিঘাপ্রতি তার লোকসান হয়েছে ২ হাজার টাকা। ধান চাষ করে কৃষকের লাভ না হলেও গবাদি পশুর খাদ্য হিসেবে খড়টাই কৃষকের লাভ হিসেবে থাকে। এ বছর ঘন ঘন বৃষ্টির কারণে কৃষক বোরো ধানের খড়ও শুকাতে পারেননি। বৃষ্টিতে ভিজে ভিজে সেই খড় পচে বিনষ্ট হয়ে গেছে। সামনের দিনগুলোতে পশুখাদ্যের তীব্র অভাবের আশঙ্কা করা হচ্ছে।

মোট উৎপাদিত চালের শতকরা ৫৫ ভাগ আসে বোরো মৌসুম থেকে। কৃষক ধারদেনা করে বোরো ধান চাষ করেন। তাই ধান কাটার সঙ্গে সঙ্গেই উৎপাদিত ধান পানির দামে বিক্রি করে মহাজন, আত্মীয়স্বজন ও সার-কীটনাশক ব্যবসায়ীদের ঋণ পরিশোধ করেন। এ কারণে বোরো মৌসুমে সাধারণত ধান-চালের সরবরাহ বেশি থাকে। দাম কম থাকে। ভোক্তাও থাকেন স্বস্তিতে। কিন্তু এবার চালের বাজারে দেখা যাচ্ছে সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র।

চালের দামের ওপর বাংলাদেশের রাজনীতি, অর্থনীতি ও সামাজিক শৃঙ্খলা বহুলাংশে নির্ভর করে। নির্ভর করে ক্ষমতাসীন সরকারের জনপ্রিয়তা ও বিরোধী দলের রাজনীতি। তাই চালের মূল্য ভোক্তাসাধারণের সাধ্যসীমার মধ্যে রাখার জন্য সরকারকে সর্বশক্তি নিয়োগ করতে হবে। খাদ্যদ্রব্যের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির কারণে আমাদের প্রতিবেশী দেশ শ্রীলঙ্কায় সরকারবিরোধী বিক্ষোভ ও সরকার পতনের বিষয়টিও আমাদের জানা আছে। যদিও বাংলাদেশে সে রকম অবস্থা সৃষ্টির সম্ভাবনা এখনো দৃশ্যমান নয়। তার পরও জাতির জনকের সেই উক্তিটি আমাদের বিবেচনায় রাখতে হবে। খাদ্যের অভাব হলে মানুষের ধৈর্য ঠিক থাকে না। চালের অস্বাভাবিক মূল্যরোধে নিম্নলিখিত বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা যেতে পারে।

১. চলতি বোরো মৌসুমে কী পরিমাণ জমিতে ধান চাষ হয়েছে? বন্যা, অতিবৃষ্টি ও ব্লাস্টের কারণে কী পরিমাণ ধানের ক্ষতি হয়েছে। ক্ষতি বাদে বোরো মৌসুমে প্রকৃতপক্ষে কী পরিমাণ ধান/চাল উৎপাদিত হয়েছে? আমাদের কী পরিমাণ চালের প্রয়োজন? প্রভৃতি বিষয়গুলোর চুলচেরা বিশ্লেষণ করে দেশের জন্য প্রয়োজনীয় চাল আমদানির এখনই ব্যবস্থা নিতে হবে। কারণ আন্তর্জাতিক বাজারে এখন পর্যন্ত চালের দাম তেমন বাড়েনি।

২. চাল আমদানির ওপর থেকে ট্যাক্স কমিয়ে বিদেশ থেকে চাল আমদানি করে অবিলম্বে দেশে চালের বাজার নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।

৩. ভোজ্য তেলের মতো অভিযান চালিয়ে অবৈধভাবে চাল মজুদদারদের চিহ্নিত করে, তাদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন অনুসারে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

৪. এ বছর শ্রমিকের মজুরি ও ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে ধানের উৎপাদন খরচ বেড়েছে অনেক। বেশ কজন কৃষকের কাছ থেকে সংগৃহীত তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, প্রতি মণ বোরো ধানের উৎপাদন খরচ হয়েছে ১০০০ টাকা। আর সরকার ধানের সংগ্রহ মূল্য নির্ধারণ করেছে প্রতি কেজি ২৭ টাকা অর্থাৎ ৪০ কেজির মণ ১০৮০ টাকা। বর্তমানে বাজারে প্রতি মণ বোরো ধান বিক্রি হচ্ছে ১২০০ টাকা। তাই সরকার নির্ধারিত দামে কৃষক সরকারি গুদামে ধান সরবরাহ করবেন না এটা নিশ্চিত করেই বলা যেতে পারে। তাই ধান সংগ্রহ লক্ষ্যমাত্রা অর্জন ও কৃষকের উৎপাদিত ধানের ন্যায্যমূল্য প্রদানের স্বার্থে ধানের দাম প্রতি কেজিতে ৩ টাকা বাড়িয়ে ৩০ টাকা নির্ধারণ করা উচিত।

৫. প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে বোরো মৌসুমে যে পরিমাণ ধান কম উৎপাদিত হবে, সেই পরিমাণ অতিরিক্ত ধান আমন মৌসুমে উৎপাদনের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা গ্রহণ ও তা বাস্তবায়ন করতে হবে। এজন্য হাইব্রিড ধান চাষের জমির পরিমাণ বৃদ্ধি করতে হবে। সময়মতো কৃষক যাতে সরকার নির্ধারিত দামে সার, বীজ পান, কোনো রকম হয়রানি ছাড়া কৃষিঋণ পান সে বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে।

৬. পল্লী রেশনিংব্যবস্থ চালু করে গ্রামের দরিদ্র মানুষের মধ্যে স্বল্পমূল্যে চাল ও আটা সরবরাহের ব্যবস্থা করতে হবে।

৭. ওএমএসের মাধ্যমে চাল বিক্রির ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে।

৮. নিয়মিত চালের বাজার মনিটরিং করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

৯. যেসব মিল মালিক সম্পাদিত চুক্তি মোতাবেক সরকারি গুদামে নির্দিষ্ট সময়ে চাল সরবরাহ করতে ব্যর্থ হবে, তাদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

১০. কৃষক ও চালকল মালিকরা সরকারি গুদামে ধান, চাল সরবরাহকালে যাতে কোনো হয়রানির শিকার না হন সে ব্যাপারে খাদ্য মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

লেখক : সাবেক মহাব্যবস্থাপক (কৃষি) বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্যশিল্প করপোরেশন

ইমেইল :[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত