শনিবার রাত ১০টায় বিস্ফোরণ ঘটেছে, ৬০ ঘণ্টা পরেও আগুন জ্বলছে। দফায় দফায় বিস্ফোরণ ঘটছে। বিস্ফোরণস্থলে এবং হাসপাতালে ৪৯ জন বা ৪১ জনের মৃতদেহ পাওয়া গেছে, আশঙ্কা করা হচ্ছে মৃতের সংখ্যা আরও বাড়বে। আহত চার শতাধিক, আহতদের ভিড়ে উপচে পড়ছে হাসপাতাল। এটুকু পড়লে অনেকেই মনে করবেন এটা ইউক্রেন যুদ্ধের রিপোর্টের অংশ। কিন্তু না, বন্দর নগরী চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের সোনাইছড়িতে বিএম কনটেইনার ডিপোতে রাসায়নিক বিস্ফোরণের খবর এটি। বিস্ফোরণের তীব্রতা এত বেশি ছিল যে কেঁপে উঠেছে বিস্তীর্ণ এলাকা, আগুনে লাল হয়ে উঠেছে আকাশ তা দেখা গেছে বহুদূর থেকেও, শত শত বাড়িঘর ও স্থাপনা ধ্বংস হয়েছে, আতঙ্কিত মানুষ ভয়ে এলাকা ছাড়ছেন, বাতাসে-পানিতে মিশে গেছে রাসায়নিক বিষ, কী করবে এলাকার নিম্নবিত্ত ও গরিব শ্রমজীবী মানুষ? ডিপোর আশপাশের বাড়িঘর বেশির ভাগই নিম্নবিত্ত মানুষের এবং টিনের ছাউনির বাড়ি। এরা বাড়ি ছেড়ে যাবে কোথায় আর বাড়িতে থাকলে বিষাক্ত বাতাস আর পানিতে কেমন করে বসবাস করবে?
চাকরি, ব্যবসা করবে কীভাবে, কত দিনে মুক্তি পাবে এই দুর্বিষহ যন্ত্রণা থেকে?
সীতাকুণ্ডের সোনাইছড়িতে ২৬ একর জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত এই বিএম ডিপো। নেদারল্যান্ডস ও বাংলাদেশের যৌথ মালিকানায় প্রতিষ্ঠিত কনটেইনার ডিপোটির ওয়েবসাইটে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বিএম কনটেইনার ডিপোর চেয়ারম্যান বার্ট প্রঙ্ক। ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোস্তাফিজুর রহমান। পরিচালক হলেন স্মার্ট জিনসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মুজিবুর রহমান। তারা পরস্পর ভাই এবং মুজিবুর রহমান চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের কোষাধ্যক্ষ। অন্যসব ঘটনার মতো এখানেও ক্ষমতা আর অর্থ হাত ধরাধরি করে অমান্য করেছে সব নিয়ম এবং সতর্কতা। তিনি যদি নিয়ম না মেনে কনটেইনার ডিপো পরিচালনা করে থাকেন সে ক্ষেত্রে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে? নাকি কাউকে ছাড়া হবে না এই আপ্তবাক্য আবার শুনবে দেশের মানুষ?
চট্টগ্রাম বাংলাদেশের প্রধান শুধু নয় বলা যেতে পারে প্রায় একমাত্র সমুদ্রবন্দর। আমদানি-রপ্তানিতে কনটেইনার ব্যবহার শুরু হওয়ার পর দ্রুত বিকশিত হতে থাকে কনটেইনার ডিপো ব্যবসা। চট্টগ্রামে ১৬টি শিল্পগোষ্ঠী ও প্রতিষ্ঠানের ১৯টি বেসরকারি কনটেইনার ডিপো রয়েছে। সব কটি ডিপো গত বছর ১০ লাখ টোয়েন্টি ইকুইভ্যালেন্ট ফিট বা টিইইউস কনটেইনার ব্যবস্থাপনা করেছে। এর মধ্যে সাত লাখ রপ্তানি পণ্যের ও ৩ লাখ আমদানি পণ্যের কনটেইনার ছিল। চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে মোট যে পরিমাণ পণ্য রপ্তানি হয়, তার প্রায় ৯০ শতাংশই পরিবহন করা হয় এই ১৯টি বেসরকারি কনটেইনার ডিপো থেকে। আর বন্দর দিয়ে আমদানি পণ্যবাহী কনটেইনারের মধ্যে গড়ে ২৩ শতাংশ খালাস হয় এসব ডিপো থেকে। শুধু আমদানি-রপ্তানি পণ্যবাহী কনটেইনার নয় খালি কনটেইনারও সংরক্ষণ করে বেসরকারি ডিপোগুলো। দেশের বিভিন্ন কারখানা থেকে কাভার্ডভ্যানে রপ্তানি পণ্য এনে এই ডিপোর কনটেইনারে বোঝাই করা হয়। শুল্কায়ন কার্যক্রম শেষে কনটেইনার বন্দরে নিয়ে জাহাজে তুলে দেওয়া হয়। একইভাবে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে আমদানি হওয়া ৩৭ ধরনের পণ্য ডিপোতে এনে কনটেইনার খুলে খালাস করা হয়ে থাকে। মূলত বন্দরের কনটেইনার টার্মিনালের ধারণক্ষমতা না বাড়িয়ে এ ব্যবসাকে বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়ার অংশ হিসেবে ২৪ বছর আগে বেসরকারি কনটেইনার ডিপো নির্মাণের কাজ শুরু হয়।
শিপিং লাইনে ‘ডেঞ্জারাস গুডস’ বা বিপজ্জনক পণ্যের ক্ষেত্রে আলাদাভাবে সংরক্ষণ এবং ব্যবস্থাপনার নিয়ম আছে। এটি পরিবহনের ক্ষেত্রে বিশেষ কিছু নিয়মকানুনও রয়েছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে কিছু নিয়ম প্রণীত এবং পালিত হয়ে আসছে। ডেঞ্জারাস কার্গো অ্যাক্ট ১৯৫৩ অনুযায়ী এ ধরনের পণ্য সমুদ্রপথে পরিবহনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ নেভির অনুমোদন নেওয়া বাধ্যতামূলক। আমদানি এবং রপ্তানির ক্ষেত্রেও একই নিয়ম প্রযোজ্য। আইন খুবই কড়া, নিয়ম না মানলে এ ধরনের অপরাধের জন্য পুলিশ বিনা ওয়ারেন্টে যে কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারবে। ১৯৫৩ সালের ওই আইনকে ভিত্তি করে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড একটি নীতিমালাও তৈরি করেছে। সেখানেও এ ধারাগুলো সংযোজন করা হয়েছে। বৈধ বা অবৈধ যে পথেই কেমিক্যাল আসুক না কেন, কোথায় মজুদ করা হচ্ছে, কোন প্রতিষ্ঠান আনছে, কীভাবে পরিবহন করা হচ্ছে, কী কাজে ব্যবহার করছে, সেটা সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরকে অবগত করতে হবে এবং তা পর্যবেক্ষণ করা সংশ্লিষ্ট দপ্তরের দায়িত্ব। চট্টগ্রাম বন্দর থেকে কেমিক্যাল খালাসের পর এর পরিবহন ব্যবস্থা নিয়ে সরকার বা সংশ্লিষ্ট শিল্প মন্ত্রণালয়কে সতর্ক হওয়া এবং সবাইকে নির্দেশনা দেওয়াটাও জরুরি। কারণ কেমিক্যালগুলো যদি অনিরাপদ অবস্থায় পরিবহন করা হয় তাহলে যেকোনো সময় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। রাসায়নিক দ্রব্য পরিবহনের একটি নীতিমালা থাকা এবং কেমিক্যালগুলো কীভাবে মজুদ করা ও রাখা হচ্ছে, সে বিষয়েও নজরদারি থাকা জরুরি। এ কথা তো সব মহল একবাক্যে স্বীকার করবে যে কেমিক্যাল পরিবহন করা গাড়িগুলোতে বিশেষ চিহ্ন বা সতর্কতামূলক বার্তা লেখা থাকা উচিত। কিন্তু আমাদের দেশে শুধু জ্বালানি তেল পরিবহনকারী ট্যাংক লরিগুলো লাল রঙের হয় এবং এর গায়ে সতর্কতামূলক বার্তা লেখা থাকে। কেমিক্যাল বহন করা কনটেইনার বা গাড়ির চালকদের বিশেষ প্রশিক্ষণ দরকার। কিন্তু এ ব্যাপারে পদক্ষেপ এবং নীতিমালা কি আছে? সোজা উত্তর, নেই। কেমিক্যাল বহন করা কনটেইনার বা গাড়িগুলো একটি নির্দিষ্ট রঙের হতে হবে এবং এটাতে সতর্কতামূলক বার্তা লেখা থাকতে হবে, যা দেখলে যে কেউ বুঝতে পারবে যে চলন্ত কনটেইনার বা গাড়িতে বিপজ্জনক কেমিক্যাল রয়েছে। বাংলাদেশের জন্য এসব নিয়ম বা প্রটোকল যেন কাজীর গরু যা শুধু কেতাবেই থাকে।
ফায়ার সার্ভিসের তথ্য মতে, গত ১০ বছরে দেশে প্রায় ১ লাখ ৬৮ হাজারের বেশি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এর প্রায় সবগুলোই সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব পালনে অবহেলাজনিত কারণে হয়েছে। এর ফলে জীবনহানি, পঙ্গুত্ব, সম্পদের আর্থিক ক্ষতি কত, তা হিসাব করলে অগ্নিদুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণের গুরুত্ব বুঝতে অসুবিধা হবে না কারও। এসব অর্থনৈতিক তথ্য তো পাওয়া গেল কিন্তু রাষ্ট্রের নৈতিক দায়িত্ব পালনের দৃষ্টান্ত কোথায়? রানা প্লাজা, তাজরীন, নিমতলী, চুড়িহাট্টা এমনকি সীতাকুণ্ডে সাধারণ মানুষকে অজ্ঞতা সত্ত্বেও আন্তরিকতা নিয়ে এগিয়ে আসতে হয়েছে। তাহলে এত রিপোর্টের পর প্রতিকার কোথায়? ফায়ার সার্ভিসের দক্ষতা, সক্ষমতা ও আধুনিক যন্ত্রপাতির ব্যবস্থা করা কেন যাচ্ছে না?
বেশির ভাগ ব্যবসায়ী শুধু ট্রেড লাইসেন্স নিয়েই কেমিক্যাল ব্যবসা করছেন। তারা কেমিক্যাল মজুদ, পরিবহন ও বিক্রির ক্ষেত্রে আইনের বাধ্যবাধকতা মানছেন না। আমদানি করা কেমিক্যাল মজুদের জন্য বিস্ফোরক অধিদপ্তরের অনুমোদিত গোডাউন থাকার কথা। তা যে ছিল না এটা পত্রিকার রিপোর্ট থেকে জানা যায় কিন্তু দপ্তরের কাজটা তাহলে কী? বিস্ফোরক অধিদপ্তর কর্র্তৃক ৩১ ধরনের কেমিক্যালকে ‘অতি দাহ্য’ বিপজ্জনক হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এই ৩১ ধরনের কেমিক্যাল আমদানি ও মজুদের অনুমতি বিস্ফোরক অধিদপ্তর দিয়ে থাকে। কিন্তু তালিকাভুক্ত ৩১ ধরনের অতি দাহ্য কেমিক্যালের বাইরে আরও বহু ধরনের কেমিক্যাল আমদানি করা হয়। পত্রিকায় প্রকাশিত তথ্যে জানা যায়, এসব কেমিক্যাল সিটি করপোরেশনের ট্রেড লাইসেন্সের বিপরীতে আমদানি ও মজুদ করা হয়। কেমিক্যাল পণ্য হিসেবে অরগানো কেমিক্যাল, ফার্মাসিউটিক্যালস, ফার্টিলাইজার, ডায়িং প্রভৃতি আমদানি হয়। চামড়া ও চামড়াজাত শিল্প, টেক্সাইল, রং, কসমেটিকস, ওষুধ, সার-কারখানা প্রভৃতিতে এসব কেমিক্যাল ব্যবহৃত হয়। কে দেখে বা কে দেখবে এসব?
বিএম কনটেইনার ডিপোর বিস্ফোরণে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ডিপোতে শুধু হাইড্রোজেন পার অক্সাইড থাকলে এ বিস্ফোরণ ঘটত না। নিশ্চিতভাবেই বলা যায় সেখানে আরও অন্য রাসায়নিক ছিল এবং যার যথাযথ ব্যবস্থাপনাও ছিল না। ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা জানতেন না যে এখানে রাসায়নিক দ্রব্যের কনটেইনার আছে। সে কারণেই সাহসের ওপর ভর করে কাজে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন আর প্রাণ হারালেন ৯ জন ফায়ার ফাইটার। এ মৃত্যুর দায় তাহলে কে নেবে? প্রাথমিক ধ্বংসযজ্ঞের পর বড় বিপদের আশঙ্কা হলো যে, রাসায়নিক দূষণ এমন এক বিষয় এটা এক জায়গায় থেমে থাকে না। সাধারণ মানুষের চোখে দেখা না গেলেও এসব রাসায়নিক দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে পরিবেশে এবং আমাদের ক্ষতি করে। আশঙ্কা করা হচ্ছে যে, সীতাকুণ্ডের এই দূষণ ঢাকা পর্যন্ত পৌঁছে যেতে পারে। জীবন ও সম্পদের ক্ষতি যে হলো, যাদের কারণে হলো তারা কি নিমতলী বা চুড়িহাট্টার মতো নিরাপদেই থেকে যাবে। মুনাফা ওদের আর ক্ষতি জনগণের এই নীতি আর কত দিন চলবে?
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই কিছু একটা ঘটেছে, এটা আমার বিশ্বাস। না হলে এতগুলো প্রাণ যায় না।’ কিন্তু জানতে ইচ্ছা হয়, পুরান ঢাকার নিমতলীর রাসায়নিক গুদাম, লালবাগের প্লাস্টিক কারখানা, বনানীর বহুতল অফিস ভবন, রূপগঞ্জের হাসেম ফুডসের কারখানা এগুলোতেও তো কিছু একটা ঘটেছিল। তার কারণ বা হোতারা কি চিহ্নিত হয়েছে? হাজার কোটি টাকার পণ্যের ক্ষতি হয়েছে তাই হিসাব যত দ্রুত পাওয়া গেল, জীবনের হিসাব কি সেভাবে পাওয়া যাবে? বীমা করা আছে পণ্যের, গুদামের, কারখানার, সবাই তাদের প্রাপ্য বুঝে পাবেন। জনগণের ট্যাক্সের টাকায় রাষ্ট্র তাদের ক্ষতি পুষিয়ে দেবে কিন্তু মৃত্যুবরণ করলেন যারা তাদের পরিবারের কী হবে? ২, ৪ ও ১০ লাখ টাকার বিনিময়ে হারিয়ে যাওয়া জীবন, আর পঙ্গু হয়ে বেঁচে থাকাদের কান্না সবাই ভুলে যাবে এবং পরবর্তী ভয়াবহ দুর্ঘটনার আড়ালে চাপা পড়ে যাবে সব? ঘরবাড়ি, ব্যবসা-বাণিজ্য ধ্বংস হলো যাদের তারাই বা কী করবেন? একদল দুর্বিনীত মুনাফা শিকারির অসহায় শিকার হিসেবে জনগণ আর কত দিন এসব মেনে নেবে?
লেখক রাজনৈতিক সংগঠক ও কলামনিস্ট