ট্রেন লেট, ট্রেন লেট অ্যাবসেন্ট

আপডেট : ০৬ জুলাই ২০২২, ১০:৪৪ পিএম

আমাদের একজন শিক্ষক ছিলেন, তিনি খুব মজা করে রোল কল করতেন। ছাত্রদের নাম উচ্চারণের সময় একটা বিশেষ ভঙ্গি প্রয়োগ করতেন। রোল কল শুরু হওয়ার দু-তিন মিনিট পর যে ছাত্ররা ক্লাসে ঢুকত তাদের দিকে তাকিয়ে একটু বিশেষ ভঙ্গিমায় বলতেন, তুমি লেট প্রেজেন্ট। আর যারা দশ মিনিট পরে ঢুকত তাদের দিকে তাকিয়ে বলতেন তুমি প্রেজেন্ট নও, লেট প্রেজেন্টও নও, তুমি লেট অ্যাবসেন্ট। দু-একজন ছাত্র প্রতিবাদ করার চেষ্টা করে বলত, স্যার আমি তো প্রেজেন্ট। স্যার আবারও দৃঢ়ভঙ্গিতে বলতেন, তুমি লেট অ্যাবসেন্ট। দশ মিনিট বিলম্বে যদি ট্রেনকে লেট বলা হয় তাহলে স্যারের ভাষায় ট্রেনটি লেট অ্যাবসেন্ট। এমনি লেট অ্যাবসেন্টের হাজারো আবর্তে পড়ে আছে শতবর্ষের ট্রেন। ব্রিটিশ আমলে এই ট্রেন লেটের জন্য সবাইকে জবাবদিহি করতে হতো। এবং কারণ দর্শানোর জন্য রেল কর্মকর্তাদের হিমশিম খেতে হতো। আমার ওই শিক্ষক হয়তো বেঁচে নেই। তাহলে তার হিসাবে দশ মিনিট পর থেকেই ট্রেনকে আর লেট বলতেন না। বলতেন ট্রেন আসেইনি।

পাকিস্তান আমলে যখন থেকে রেলকে সংকুচিত করার চেষ্টা চলছিল, তখন থেকেই ট্রেনের বিলম্বে আসাকে খুব একটা ধর্তব্যের মধ্যে আনা হয়নি। আর বাংলাদেশ আমলে প্রথমত, ট্রেনকে গুরুত্ব দেওয়া শুরু হয়েছিল। ভারতীয় কিছু ট্রেনবিশেষজ্ঞ এ দেশে এসে নানান রকম পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু করেছিলেন। ট্রেনের জন্য একটা সুদিন আসবে বলে আমরা আশাও করেছিলাম। ভারতের ট্রেনব্যবস্থা সাতচল্লিশের পর থেকে দুর্বার হয়ে উঠতে থাকে। সেই ধারাবাহিকতা এখনো অক্ষুণœ আছে। এশিয়ার অন্য দেশগুলোতে বিশেষ করে জাপান ও চীনে ট্রেন একটি প্রধান পরিবহন। সপরিবারে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর যে সামরিক সরকারগুলো আসে তারা ট্রেনব্যবস্থাকে দুর্বল থেকে দুর্বলতর করে বাস, মিনিবাস, মালামাল পরিবহনের জন্য ট্রাক এবং রাস্তাঘাটের উন্নয়নের দিকে মনোনিবেশ করে। নব্বই দশক পর্যন্ত হাইওয়ের প্রতিষ্ঠা হতে থাকে। এরই মধ্যে কতগুলো ট্রেন দ্রুতগামী করা হয়েছে, যার ফলে মাঝারি পাল্লার ও লোকাল ট্রেনগুলো ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। মানুষ ট্রেনে চলাচলের অভ্যাস ত্যাগ করে বাসকেই ব্যবহার করতে থাকে। ওই সময় ট্রেন লেট বা ট্রেন দুর্ঘটনা, ট্রেনের রক্ষণাবেক্ষণ স্বাভাবিক কারণেই ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

এরপর শুরু হয় ট্রেনের স্থাপনার ওপর নানান ধরনের জবর-দখল। রেলের জায়গাগুলো অবলীলায় বেদখল হতে থাকে এবং রেলের প্রধান কার্যালয়গুলো সরিয়ে ঢাকায় নিয়ে আসা হয়। রেলকে আঞ্চলিকভাবে বিভক্ত করে আরও দুর্বল ব্যবস্থাপনার দিকে ঠেলে দেওয়া হয়। এর মধ্যে পৃথিবীতে রেলের প্রযুক্তিগত অনেক উন্নতি হয়ে গেছে। বিশেষ করে ট্রেন এখন ডিজেলের ওপর মুখাপেক্ষী নয়। ট্রেন চলে বিদ্যুতের সাহায্যে। রেলকে কম্পিউটার সিস্টেমের আওতায় আনা হয়। কিন্তু বাংলাদেশের রেল সেই সবুজ আর লালবাতি এবং পয়েন্টসম্যানের হাতে হাতে চলতে থাকে। রেল আর তখন লেট নয় একেবারে লেট অ্যাবসেন্টের জায়গায় পৌঁছায়। ঘণ্টার পর ঘণ্টা যাত্রীদের হয় অপেক্ষায় বসে থাকতে হয় স্টেশনে কিংবা ট্রেনের ভেতর বসে থাকতে হয় প্রচন্ড গরমে।

রেলের মালামাল পরিবহনের ব্যবস্থাটিও চলে যায় ট্রাকের হাতে। ঐতিহ্যগতভাবে মালামাল পরিবহনের ক্ষেত্রে নদীপথ একদা প্রধান পথ হিসেবেই চিহ্নিত ছিল। সেই নদীপথও ক্রমে সংকুচিত হয়ে আসে। ফেরিঘাটগুলোতে ট্রাকের দীর্ঘ যানজট দৃশ্যমান হতে থাকে আর মাঝখান থেকে ট্রেনে মালামাল পরিবহনের ব্যাপারটি গৌণ হয়ে ওঠে। নদীর দুপাশ যেমন অবৈধ দখলদারদের হাতে চলে যায়, তেমনি রেলের জায়গাও চলে যায় সেসব রাজনৈতিকভাবে শক্তিশালী ব্যক্তি ও ভূমিদস্যুদের হাতে। নদীকে মুক্ত করার জন্য মাঝেমধ্যে উচ্ছেদ অভিযান চালানো হলেও রেলের জায়গাকে দখলমুক্ত করার কোনো উদ্যোগ দেখা যায় না।

বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর রেলকে পুনরুজ্জীবিত করার জন্য একটা ব্যবস্থায় হাত দিয়েছে। গঠন করা হয়েছে রেলপথ মন্ত্রণালয়। এ কথা সত্য যে, দেশের জনসংখ্যা বিবেচনায় রেলের কোনো বিকল্প নেই। ঈদে অগ্রিম টিকিট দেওয়া হয় এবং তাতে যে পরিমাণ মানুষ একটি টিকিটের জন্য হাহাকার করে, তাতে আর সন্দেহ থাকে না যে, দূরপাল্লায় গমনের জন্য ট্রেনই একমাত্র উপায়। রেলযাত্রা যানজটমুক্ত, ভ্রমণ আরামদায়ক আর রেল পরিবহনের সংস্কৃতিও প্রাচীন। এই সংস্কৃতির কারণেই রেলকে কেন্দ্র করে অনেক ভ্রমণকাহিনী, গল্প, কবিতা ও উপন্যাস লেখা হয়েছে।

রেলপথের কাছাকাছি আছে নৌপরিবহনের অভিজ্ঞতা। কিন্তু সেই নৌপরিবহন ব্যবসায়ীদের হাতে পড়ে নানা ধরনের ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে। দুর্ঘটনায় বাস, মোটরসাইকেল এবং আরও ছোট ছোট যান দুর্ঘটনার শীর্ষে। দ্বিতীয় স্থানে আছে নৌ-দুর্ঘটনা। সেদিক থেকে রেল একেবারে পিছিয়ে। রেলে যেসব দুর্ঘটনা ঘটে তা নিতান্তই অবহেলার কারণে। যেহেতু রেলের সংস্কারকাজ চলে ধীরগতিতে। তাই অবকাঠামো ত্রুটিও তার মধ্য থেকে যায়। আমাদের দেশে রেলের ব্যবস্থাপনাও শতাব্দী প্রাচীন। তেমন কোনো জনবলবিষয়ক সংস্কার রেলে হয়নি। কখনো কখনো দেখা যায় দূরপাল্লার ট্রেনে কিছু ব্যক্তিমালিকানাধীন কোম্পানিকে যাত্রী ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব দেওয়া হয়। সে ব্যবস্থাটাও খুব দীর্ঘস্থায়ী হয় না। দূরপাল্লার ট্রেনগুলোতে যে একটা বিশেষ ব্যবস্থাপনা থাকা দরকার তারও কোনো উদ্যোগ রেল কর্তৃপক্ষ নেয় না।

রেলে একটা মজার বিষয় হচ্ছে ডিজেল ব্যবস্থাপনা। এর মধ্যে রেল কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের একটা বড় ধরনের স্বার্থ লুকায়িত আছে। একবার এক লোকাল ট্রেনে আমি লালমনিরহাট থেকে পাটগ্রাম যাচ্ছিলাম। হঠাৎ পথিমধ্যে ট্রেনটি থামল, দেখি আর ট্রেন চলে না। হঠাৎ আওয়াজ উঠল যে, ড্রাইভার ডিজেল বিক্রি করছে। যাত্রীদের চিৎকার-চেঁচামেচি ও যাত্রীদের এক ধরনের ধাওয়ার পর ডিজেল চোররা সটকে পড়ল, ট্রেন আবার চলতে শুরু করল। ওই এলাকাতেই ট্রেনকে চালু রেখে ড্রাইভার কী কারণে নেমে গিয়েছিল। এরপর ট্রেন চালকবিহীন হয়ে চলতে শুরু করে। এটা বুঝতে পেরে অন্য স্টেশনগুলো ক্লিয়ারেন্সের ব্যবস্থা করে এবং একজন সাহসী ড্রাইভার ট্রেনের ছাদের ওপর উঠে ড্রাইভারের কক্ষে প্রবেশ করে ট্রেনটি রক্ষা করে। এ রকম হাজারো ঘটনা ট্রেনকে ঘিরে পাওয়া যায়। আন্দোলনের সময় ট্রেন লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়, ফিশপ্লেট খুলে দেয়, ট্রেন দুর্ঘটনায় পড়ে যায়। এবারে কোনো একটি এলাকায় একটা ভালো ট্রেন সার্ভিস হয়েছিল কিন্তু বাস পরিবহন মালিকরা ট্রেন চালুর পর ট্রেনের ওপর ইট, পাথর নিক্ষেপ করে গতি রুদ্ধ করে দেয়। যাত্রীরা শেষ পর্যন্ত ওই দুষ্কৃতকারী বাস মালিক-শ্রমিকদের সঙ্গে আর পেরে উঠে না।

ট্রেনের যাত্রীদেরও একটা সংস্কৃতির সংকট আছে। যেহেতু ট্রেনের একটা টয়লেটের ব্যবস্থা আছে, যদিও তা অপ্রতুল, সেই টয়লেট প্রায় সব সময়ই ব্যবহারের অযোগ্য থাকে। অথচ রেল তার জন্মলগ্ন থেকেই পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের নিয়োগ করেছে, তাদের বাসস্থানের ব্যবস্থা করেছে। কিন্তু তাদের যথার্থ তদারকির ব্যবস্থা নেই। বর্তমানে এ ব্যবস্থাটি একটা নাজেহাল অবস্থার মধ্যে রয়েছে। ট্রেনের দুর্নীতি সর্বজনবিদিত। ট্রেনে টিকিট না কেটে ওঠা, মালামাল পরিবহনে ওজনে ফাঁকি দেওয়া এবং টিকিটের বিনিময়ে কিছু উৎকোচের ব্যবস্থা বহু দিন আগে থেকেই চালু আছে। দেশ স্বাধীনের পর একটা সময় গেছে টিকিট করাটাকে কেউ কেউ অবমাননা মনে করত। প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতা এবং আত্মীয়স্বজন-চেলাচামু-ারা ট্রেনকে ব্যক্তিগত সম্পদ মনে করত। বর্তমানে তার কিছুটা পরিবর্তন  হলেও সম্পূর্ণভাবে এই অনিয়ম বন্ধ করা যায়নি। পৃথিবীর অন্যান্য দেশে স্বয়ংক্রিয় মেশিনের দ্বারা এটি নিয়ন্ত্রণ করা হয়। টিকিট করাটাকে যাত্রীদের একটা সংস্কৃতির মধ্যে নিয়ে আসা জরুরি, বর্তমানে সেই অবস্থার সৃষ্টি হতে যাচ্ছে।

অত্যন্ত আশার কথা, যেখানেই বড় সেতু হচ্ছে সেখানেই যুক্ত হচ্ছে রেললাইন। এতে প্রতীয়মান হয় সরকার রেলের ওপর গুরুত্বারোপ করেছে। মেট্রোরেলও তারই একটা বহিঃপ্রকাশ। সেই সঙ্গে পাতাল রেললাইনটা চালু হলে মানুষ এই অসহ্য যানজটের হাত থেকে রক্ষা পাবে। সেই সঙ্গে ডিজেলচালিত ট্রেন আর নয় এ বিষয়টিরও একটা সিদ্ধান্ত নিতে হবে। রেলের জন্য আলাদা পাওয়ার স্টেশন নির্মাণ খুবই জরুরি বিষয় হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। কারণ সেখানে বিরতিহীন বিদ্যুৎ সরবরাহ থাকতে হবে।

ট্রেন লেট দিয়ে শুরু করেছিলাম, লেটটা লেট লতিফ থেকে শুরু। এ যেন বাঙালির জীবনে এক অনতিক্রান্ত বৃত্ত। তাই ঈদযাত্রা শুরুর দিনই তিনটি ট্রেন লেট হয়ে গেল। আর লেটের কারণ ব্যাখ্যা করতে বাঙালির মতো এত পারদর্শী লোক পৃথিবীর কোথাও পাওয়া যাবে না। তাই লেটকে আর প্রশ্রয় নয়, দেরি হলে তাকে অনুপস্থিত বিবেচনা করা হবে।

লেখক নাট্যকার, অভিনেতা ও কলামিস্ট

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত