পৃথিবীটাই অশান্ত হয়ে উঠেছে। শহরের অলিগলিতে, ঘরে-বাইরে এমনকি গ্রামবাংলার চায়ের দোকানে নানা ধরনের গুজব একটু একটু করে জায়গা করে নিয়েছে। টানা দুই বছরের করোনা সংক্রমণ জীবনযাপনের স্থবিরতা, মৃত্যুভয় সব মিলিয়ে যখন মানুষ একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলবে, তখনই শুরু হয়ে গেল যুদ্ধ। দূরত্বের দিক থেকে যুদ্ধরত দুটি দেশ খুব কাছে নয় কিন্তু আজকের দিনে সারা পৃথিবীটাই একটা বড় গ্রাম। সেই গ্রামের কোনো একটি পাড়া-মহল্লায় যদি কিছু ঘটে তার প্রতিক্রিয়া ছড়িয়ে পড়ে সর্বত্র। এর কারণ হলো পৃথিবীতে কেউই স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়। সবাই নিজের দেশের জন্য স্বার্থপরের মতো সম্পদ সঞ্চয় করে রাখে। যাদের নিজস্ব সম্পদ আছে তারা তো বটেই যাদের নেই তারাও অন্য দেশ থেকে খাদ্য, জ¦ালানি এসব কিনে কিনে দুর্দিনের জন্য ব্যবস্থা করে রাখছে। আমাদের অবস্থাটা পৃথিবীর অন্যান্য দেশের চেয়ে ভিন্ন। আমাদের মানুষ বেশ সঞ্চয়মুখী এবং একসময় প্রতিবেশীর প্রতিও ছিল উদার। মানুষ মানুষের খোঁজ করত। অভাবে, দুর্দিনে কাছে গিয়ে দাঁড়াত।
মুক্তিযুদ্ধের পর একটা নতুন অর্থনীতিকালে এক ধরনের লোভী মজুদদারের জন্ম হয়। এরা মজুদদারি শিখে যায়। অতি মুনাফাখোর এক ব্যবসায়ী চক্র বাজারকে কুক্ষিগত করে ফেলে। সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের প্রতি তাদের কোনোই অঙ্গীকার ছিল না। এরা শিক্ষা গ্রহণ করেছে তেতাল্লিøশের (বাংলা ১৩৫০) দুর্ভিক্ষ থেকে। সে সময় স্মরণকালের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ফসল উৎপাদিত হয়েছিল। তখন যুদ্ধাবস্থা, ব্যবসায়ীদের মজুদের কারসাজিতে একটা কৃত্রিম দুর্ভিক্ষ শুরু হয় এবং খাদ্যদ্রব্যের দাম হঠাৎ করে কয়েক গুণ বেড়ে যায়। এতে অনাহারে ব্যাপক মানুষের মৃত্যু ঘটে। সেই সঙ্গে আঙুল ফুলে কলাগাছের আশীর্বাদধন্য হন কিছু মুষ্টিমেয় ব্যবসায়ী। মুক্তিযুদ্ধের পরপর তা-ই হয়েছিল। নতুন সরকার এই পরিস্থিতি সামাল দিতে গিয়ে হিমশিম খেয়েছিল। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র। সেই ব্যবসায়ীরা এবং তাদের বুদ্ধিদাতারা দিনে দিনে আরও বেশি সক্রিয়তা এবং দক্ষতা লাভ করেন। সুযোগ পেলেই নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম হঠাৎ হঠাৎ বাড়িয়ে দেন। ১৯৭২ সাল থেকেই একটি সরকারি প্রতিষ্ঠানের নাম চারদিক থেকে শোনা যায় টিসিবি (ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ)। টিসিবি খাদ্যদ্রব্য আমদানি করে খোলাবাজারে বিক্রি করতে শুরু করে কিন্তু চাহিদা অনুযায়ী তার জোগান এত সীমিত ছিল যে প্রয়োজনের তুলনায় তা একেবারেই অপ্রতুল।
এবারও টিসিবি মাঠে নেমেছে। করোনার সময় থেকেই তারা ট্রাকে করে মালামাল নিয়ে বিভিন্ন জায়গায় দাঁড়াত আর ক্রেতারা লাইন ধরে দাঁড়িয়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস সুলভমূল্যে কিনতেন। এ মাসের ১ তারিখ থেকে নতুন নিয়ম চালু হয়েছে। কার্ড দিয়ে তাদের তালিকাভুক্ত বিভিন্ন দোকান ও স্থান থেকে এই পণ্য কিনতে হবে। বলা হয়েছে, সারা দেশের নিম্ন আয়ের এক কোটি পরিবারকে এই কার্ড দেওয়া হচ্ছে। এটাকে বলা হচ্ছে ‘ফ্যামিলি কার্ড’। মুশকিল হলো এই এক কোটি পরিবার আসলেই কীভাবে বাছাই করা হয়েছে কিংবা আদৌ এক কোটি পরিবারকে কার্ড দেওয়া হয়েছে কি না সেটা নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না। আশঙ্কার বিষয় হলো, এর মধ্যেই কিছু অশুভ চক্র এবং দোকানদাররা মিলে এসব কার্ড নিয়ে একটা গোপন কোনো ব্যবস্থা করে ফেলছে কি না? সে রকম হলে সাধারণ মানুষ বঞ্চিত হতেই থাকবে। বাংলাদেশে মুনাফালোভী মজুদদাররা যে বিশাল চক্র তৈরি করে ফেলেছে, সেখানে সরকারি একটি প্রতিষ্ঠান এ বিষয়ে কতটুকু কী করতে পারে তা আমাদের অজানা নয়। গত পঞ্চাশ বছরের ইতিহাসে বহুবার তার প্রমাণ পাওয়া যায়।
সেই ব্রিটিশ আমলে একটি সরকারি প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছিল, যার নাম ছিল প্রাইস কন্ট্রোল ডিপার্টমেন্ট। বাংলাদেশে স্বাধীনতার পরও টিমটিম করে তার বাতি জ¦লছিল। সরকারিভাবে আরও একটি প্রতিষ্ঠানের জন্ম হয়েছে, সেটা হচ্ছে ভোক্তা অধিকার অধিদপ্তর। মাঝেমধ্যেই টেলিভিশনের পর্দায় কিছু ম্যাজিস্ট্রেটকে ব্যবসায়ীদের জরিমানা করতে দেখা যায়। কোনো কোনো ম্যাজিস্ট্রেট তাদের দ্রুত কার্যক্রমের জন্য রাতারাতি বিখ্যাত হয়ে যান কিন্তু পরিস্থিতির কোনো পরিবর্তন হয় না। ব্যবসায়ীদের নিষ্ঠুরতা দিন দিন বাড়তেই থাকে। এর প্রভাব পড়ে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের মধ্যেও। হঠাৎ কোনো খাদ্যদ্রব্যের দাম বেড়ে গেল, যার পেছনে কোনো যুক্তি নেই। একবার ক্রেতারা কিনতে শুরু করলেই আর কোনো কথা নেই। সেই মূল্যটিই প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়। এমনি করে করে দেশে একটা কৃত্রিম বাজার গড়ে উঠেছে এবং নিম্ন আয়ের মানুষের জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলেছে। এই মুনাফাখোরদের ঐক্য এবং মুনাফা ধান্দা এত প্রবল যে তার জ¦লন্ত প্রমাণ ইলিশ মাছ। এত ইলিশ মাছ ধরা পড়ছে, এত ইলিশের ছড়াছড়ি অথচ দাম কমছে না। সরবরাহ যদি বেশি হয় আর সেই তুলনায় যদি চাহিদা কম হয় তাহলে মূল্য কম থাকাই স্বাভাবিক। এই স্বাভাবিক অর্থনীতির সূত্রটি বাংলাদেশে অচল।
বাংলাদেশের ব্যবসায়ীদের একটি অত্যন্ত শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান আছে যার নাম ‘এফবিসিসিআই’। সব ব্যবসা কেন্দ্র এবং শহরগুলোতে তার শাখা রয়েছে। নির্বাচনের মাধ্যমে তাদের নির্বাহী কমিটি গঠিত হয়। এই প্রতিষ্ঠানরে নেতারা কখনো কখনো সংবাদপত্রে হতাশার সুরে কথা বলেন! কিন্তু এরাই দেশের পরোক্ষ নিয়ন্ত্রক। দেশের সংসদ এদের হাতে। আইনপ্রণেতাদের অধিকাংশই এদের সদস্য। আমাদের দেশে সংসদ সদস্যদের ‘আইনপ্রণেতা’ বলা হয় বটে কিন্তু সে কাজটিতে কখনোই তাদের মনোযোগ নেই, মনোযোগ রয়েছে রাজনৈতিক প্রভাব বলয়ের সৃষ্টি করায়। এই প্রভাব বলয়ের সৃষ্টি করতে তারা হেন কাজ নেই করতে পারেন না। রাজনৈতিক দলগুলোতে বাংলাদেশে গণচাঁদার ব্যবস্থা নেই। এক-একটি মোটা দাগের চাঁদা আসে ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে। সরকার চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে আইন করলেও কিছু যায় আসে না কারণ রাজনীতিবিদরা এই চাঁদার মাধ্যমেই তাদের বিত্ত গড়ে তোলে।
অন্যদিকে বরং খাদ্য সরবরাহের যে চ্যানেলগুলো আছে সেখানেও নানা রকমের চাঁদা বসিয়ে দেওয়া হয়। দ্রব্যমূল্যের ওপর এই চাঁদা সরাসরি প্রভাব ফেলে। পরিবহন ব্যবস্থাতেও একই অবস্থা। বাস, ট্রাক আইন রক্ষাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে সরাসরি চাঁদা দিয়ে থাকে আর তার সঙ্গে সরকারি দলের লোকরাও জড়িত হয়। প্রতিদিনের চাঁদার অপসংস্কৃতির ফলে দেশের একটি শ্রেণি বিপুল সম্পদের মালিক হয়ে পড়ে। এমনি করে দেশের শতকরা নব্বই ভাগ লোককে একটা কৃত্রিম অর্থনীতির জালে আটকে ফেলা হয়। লঙ্কাকা-ের পর পত্র-পত্রিকায়, টেলিভিশনের টকশোগুলোতে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে এক অশনিসংকেতের বার্তা লক্ষ করা যায়। সেই সঙ্গে গুজব ডালপালা ছড়িয়ে মানুষকে আতঙ্কগ্রস্ত করে তুলছে। এই আতঙ্ক ব্যবসায়ীদের নতুন একটা সুযোগের দিগন্ত খুলে দিচ্ছে। আজকাল রাজনৈতিক দলগুলো সামনে নির্বাচন ছাড়া আর কোনো ইস্যু খুঁজে পাচ্ছে না। মাঝেমধ্যে বাম দলগুলো দ্রব্যমূল্যের অসহনীয় পরিস্থিতি নিয়ে দু-একটা মিছিল-মিটিং করে বটে তবে তাতে বাজারের এই মাস্তানদের কোনো ভীতির উদ্রেক হয় না।
কোনো সৃজনশীল আন্দোলনও কোনো রাজনৈতিক দল গড়ে তুলতে পারে না। আজ পর্যন্ত কোনো বাজারভিত্তিক প্রতিবাদ বা পাইকারি ব্যবসায়ীদের কেন্দ্রে কোনো ধরনের আন্দোলন কোনো রাজনৈতিক শক্তিই রচনা করতে পারেনি। ব্যবসায়ীদের একটা অংশও যে দেশদ্রোহী, জাতির জন্য ভয়ংকর তা কোথাও প্রমাণ করতে পারেনি। সরকারি দলের রাজনৈতিক নেটওয়ার্ক সবচেয়ে বড় কিন্তু তারা মাঠে নামে না। কারণ এই কৃত্রিম বাজার সৃষ্টির তারাও অংশীদার। সমস্যা হচ্ছে সেসব অগণিত মানুষের যারা কেউ কেউ দিন আনে দিন খায়, কেউ মাস-মাহিনার নির্ধারিত আয়ের মানুষ এবং বিপুলসংখ্যক বেকার জনগোষ্ঠী। ধার-দেনায় যাদের জীবন চলে। তারাই সংখ্যাগরিষ্ঠ।
সম্পদ লুণ্ঠন আজ এই দেশে শিক্ষিত, অশিক্ষিত নির্বিশেষে একটা প্রবণতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কখনো সাম্প্রদায়িকতা পুঁজি করে, কখনো প্রকৃতিকে লুণ্ঠন করে দেশকে দেউলিয়াপনার দিকে নিয়ে যাওয়া এদের উদ্দেশ্য। পাহাড় কেটে, নদী থেকে বালু উত্তোলন করে প্রকৃতিকে ধ্বংস করার ব্যাপারেও এই লোকরা সিদ্ধহস্ত।
আবার এই লুটেরা গোষ্ঠী সব সময়ই ঢাল হিসেবে ধর্মকে ব্যবহার করে। এই লুণ্ঠনের অর্থ দিয়ে তারা মসজিদ, মাদ্রাসা বানায়, ওয়াজ-মাহফিলের আয়োজন করে, নিজেরা হজে যায়। তাদের এই বড় বড় পাপ ধামাচাপা পড়ে যায়। সঙ্গে আছে সরকারের অভ্যন্তরে বড় বড় দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা-কর্মচারী। টাকা আসলে গিলে খাচ্ছে সব মূল্যবোধ, বিবেক। এই পরিস্থিতির বিরুদ্ধে বার্ধক্যজনিত রাজনীতি দিয়ে কিছু হবে না। এ দেশকে পাল্টাতে চাই তারুণ্যের অগ্নিঝরা প্রতিবাদের রাজনীতি।
লেখক নাট্যকার ও অভিনেতা
