দুর্গাপূজা এখন পণ্য

আপডেট : ১৬ অক্টোবর ২০২২, ১০:২২ পিএম

দুর্গাপূজা হয়ে যাওয়ার পরে, অন্তত এক মাস উৎসবের রেশ থেকে যায়। এমনিতেই দুর্গাপূজার পরপরই লক্ষ্মীপূজা, তারপর কালী আরাধনা, সব মিলিয়ে এক মাস ধরে হিন্দু বাঙালির উৎসবের মেজাজ দেখার মতো। শুধু ঢাকঢোল বাজিয়ে পূজা উদযাপন নয়, নতুন জামা, জুতো কেনা থেকে এখানে সেখানে বেড়াতে যাওয়া, বাড়িতে স্পেশাল রান্নাবান্না, রেস্তোরাঁয় খাওয়া, চুটিয়ে আড্ডা এসবের মধ্য দিয়েই এক-দেড় মাস উৎসবের আবহাওয়া এক্কেবারে জমজমাট।

চারপাশের পরিবেশটাও এ সময় কেমন বদলে যায়। বর্ষা গিয়ে মেঘমুক্ত ঝলমলে নীল আকাশ, কলকাতা ছাড়িয়ে একটু এদিক-সেদিক গেলেই কাশফুল, জলের মধ্যে অজস্র শাপলা, পদ্ম ফুটে থাকা দেখতে দেখতে বুঝতে পারি পূজা আসছে। ফলে পূজা মানেই কিন্তু নিছক আধ্যাত্মিকতা বা ধর্মীয় আখ্যান নয়। পুরো বিষয়টির সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে অনেক কিছু। এই আরও অনেক কিছু নিয়ে খোঁজখবর নিলে দেখতে পারবেন, কীভাবে বাজার অর্থনীতি থেকে আর্য-অনার্য দ্বন্দ্ব জড়িয়ে আছে দুর্গাপূজার সঙ্গে। আর এখন তো দুর্গা পুরোপুরি ব্র্যান্ড। তাকে ঘিরে রাজনৈতিক মহল থেকে, করপোরেট পুঁজি, বিজ্ঞাপন, মিডিয়ার মাতামাতিতে স্পষ্ট, তিনি আজ আর কোনো নিছক ভক্তদের মা নন। নন সনাতনী দেবীও। তিনি হয়ে পড়েছেন বিরাট গুরুত্বপূর্ণ এক পণ্য।

মা দুর্গাকে নিয়ে আলোচনা অবশ্য নতুন কিছু নয়। এখন যে দুর্গাকে আমরা পূজা করি, তার বৃত্তান্ত রয়েছে রামচন্দ্রের রাবনবধের মধ্যে। সনাতনী দুর্গাপূজা আদতেই ছিল বসন্তকালে বাসন্তী আরাধনা। রাবনবধের জন্য রামচন্দ্র অকালে মায়ের স্মরণ নেন। তখন থেকেই শরৎকালে এই দুর্গাপূজা। দুর্গাকে বলা হয় গৌরী। গিরিরাজ কন্যা উমা। শিবের মতো ‘উড়নচণ্ডী’কে বিয়ে করার অপরাধে তাকে নিন্দেমন্দ শুনতে হয়। এর আর এক গাথা হচ্ছে, দক্ষ মহারাজের যজ্ঞে অপমানিত উমা শিব নিন্দা সহ্য করতে না পেরে প্রাণত্যাগ করলে শিব রুদ্র মূর্তি ধরে স্ত্রীর মৃতদেহ কাঁধে তুলে দুনিয়া লন্ডভন্ড করতে শুরু করেন। তাকে থামাতে আতঙ্কিত দেবতাদের প্রতিনিধি কৃষ্ণ, সুদর্শন চক্রে দেবীর দেহ টুকরো টুকরো করে ছড়িয়ে দেন পৃথিবীর নানা জায়গায়। ৫২টি জায়গায় এই দেহাবশেষ পড়েছিল। সনাতনী বিশ্বাসীদের কাছে ওই বাহান্ন স্থান বড় পবিত্র। সতীপীঠ।

দক্ষ কন্যার নাম ছিল সতী। আসলে উমা, সতী, দুর্গা নানা আখ্যানের আলাদা আলাদা চরিত্র হলেও বস্তুত এক। লোককাহিনীতে, বিশ্বাসে বহু বছর ধরে তিনি হিন্দু আরাধ্যা। যদিও এ ধরনের লোক বিশ্বাস জনপ্রিয় হতে থাকে যে শাক্তপাঠের মধ্য দিয়ে, তা কিন্তু সে অর্থে খুব পুরনো নয়। আঠারো শতকের আগে-পরে এই শাক্ত সাহিত্য বিস্তৃত হয়। তবে এটাও ঠিক যে, সাহিত্যে জায়গা পাওয়ার অনেক আগেই সতী মাহাত্ম্য বা দক্ষযজ্ঞের কাহিনী মুখে মুখে জনপ্রিয় ছিল।

দুর্গাপূজা জনপ্রিয় হতে থাকার পেছনে বঙ্গে জমিদারি ব্যবস্থার সম্পর্ক গভীর। বোধহয় ১৬৪০ সাল বা তার একটু আগেই অবিভক্ত বঙ্গে প্রথম সর্বজনীন দুর্গাপূজা হয় নাটোরের কাছে তাহেরপুরে। জমিদার কংস নারায়ণ সেকালে পূজার আয়জনে লাখ লাখ টাকা খরচ করেছিলেন। জমিদারি না থাকলেও সে পূজা এখনো হয়। ঘটনাচক্রে তা দেখার সুযোগ হয়েছিল আমার। মজা হচ্ছে জমিদার কংস নারায়ণ বছরে দুবার মোটে গ্রামে যেতেন। দোলে ও দুর্গাপূজার সময়ে। গিয়েই বসতবাড়ি ঢোকার আগে কাছারিবাড়ি গিয়ে খাজাঞ্চি বাবুর সঙ্গে বসে খাজনার হালহকিকত জানতেন। রাজস্বের প্রাচুর্য জেনে তিনি উৎসবে মাততেন। মাঝেমধ্যে মনে একটা প্রশ্ন উঠছে। এই যে দুই বঙ্গে, গ্রামে, কলকাতায় এত সব বনেদি বাড়ির পূজা নিয়ে এত আদিখ্যেতা আজও বিপুল সমাদরে মিডিয়ার দৌলতে জনমনে জায়গা পায়, তাদের অধিকাংশই পলাশী যুদ্ধে সিরাজদ্দৌলাকে হারানোর ষড়যন্ত্রের ঘুষ হিসেবে টাকা কামানোর কারণে ও অন্যান্য ক্ষেত্রে জমিদারি ঠাটবাটের দেখনদারি। বিরাট প্রাসাদ, দালান, নহবতখানা, চাকর মহল, কাছারি ইত্যাদি নীল রক্তের গল্পগাথা শুনতে ভালো লাগে। দেখতেও। কিন্তু এই বিপুল টাকার উৎস যে খুব একটা সহজ স্বাভাবিক পথে নয়, এ নিয়ে খোঁজখবর করলেই অনেক মহামান্য অভিজাতের তথাকথিত প্রগতিশীল মুখোশ খুলে যেতে পারে। তাই কখনো আমরা কেউই ভুলেও মৌচাকে ঢিল মারি না।

পূজা নানাভাবে বিবর্তিত হয়েছে। চল্লিশ-পঞ্চাশ দশকেও কলকাতার পূজায় মোটামুটিভাবে স্বীকৃত ছিল এক চালার মূর্তি। সম্ভবত রাখাল পাল নতুন আঙ্গিকে দুর্গামূর্তির প্রচলন করেন। পরে তা আরও জনপ্রিয় করেন সুনীল পাল। ষাট-সত্তর দশকে আরেক শিল্পী কলকাতায় খ্যাতি পেয়েছিলেন অসাধারণ মুখচ্ছবি নির্মাণের জন্য। তিনি গোরাচাঁদ পাল। সত্তর দশকে জোয়ার এসেছিল টালিউড, বলিউডের নায়িকাদের আদলে দুর্গা বানানো। নব্বই দশকে মুক্ত অর্থনীতি ভারতে সমাজ অর্থনীতিতে বিপুল পরিবর্তন আনে। তা ধীরে ধীরে পূজার মধ্যেও ছড়িয়ে পড়তে থাকে। পূজা হয়ে ওঠে পণ্য। এক একটা বড় পূজায় কোটি কোটি টাকা লগ্নি করতে থাকেন উদ্যোক্তারা। টাকা লগ্নি সূত্রে পূজার স্পনসর করতে এগিয়ে আসেন শিল্পপতিদের বড় অংশ। ফলে পিছিয়ে থাকেন না রাজনৈতিক নেতারাও। পূজা হয়ে ওঠে বিনোদন ও রাজনৈতিক জনসংযোগের কেন্দ্র।

আর দুবছর ধরে তো পশ্চিমবঙ্গে শাসক তৃণমূল সরাসরি পূজার সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েছেন। তার পেছনে বাজার অর্থনীতিতে মুনাফা করা যেমন লক্ষ্যে, ঠিক তেমনি উদ্দেশ্য রাজনৈতিক ফায়দা তোলা। সর্বভারতীয় স্তরে নিজেদের হিন্দুত্ববাদী প্রমাণ করে বিজেপির পালের হাওয়া কেড়ে, এ রাজ্যে হিন্দু ভোটের বড় অংশ জোড়া ফুলে ফিরিয়ে আনা। পশ্চিমবঙ্গে কট্টর হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির শিকড় কতটা গভীরে পৌঁছেছে, তার সবচেয়ে বড় উদাহরণএবার দক্ষিণ কলকাতার একটি পূজামণ্ডপে, মহাত্মা গান্ধীকে অসুর করা হয়েছিল। কিছু হইচই হওয়ার পরে পুলিশ গিয়ে গান্ধীর চশমা সরিয়ে গোঁফটোফ লাগিয়ে আদল পাল্টে অসুর করা হয়। কিন্তু প্রশাসন সংগঠকদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। উদ্যোক্তা, বিশ্ব হিন্দু পরিষদ ক্ষমাও চাননি গান্ধী হেনস্তার জন্য। ফলে পূজা আর কোনো উৎসব নয়। সে হয়ে পড়েছে নানা গোষ্ঠীর যাবতীয় মতলব হাসিলের হাতিয়ার।

লেখক : ভারতীয় প্রামাণ্যচিত্র নির্মাতা ও লেখক

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত