পরের জায়গা পরের জমি

আপডেট : ০২ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ১০:২৫ পিএম

আবদুল আলীমের কণ্ঠে আবদুল লতিফের সুরের এই লোকগানটি  শোনেননি এমন কেউ আমার প্রজন্মে অন্তত নেই। গানের অন্তর্নিহিত দর্শনটি বৈশ্বিক, এই স্বর সুর বহন করে আফ্রিকার তুরকানা মাসাই জনগোষ্ঠী।

পরের জায়গা পরের জমিন

ঘর বানাইয়া আমি রই

আমি তো সেই ঘরের মালিক নই।।

সেই ঘরখানা যার জমিদারি

আমি পাই না তাহার হুকুমদারি

আমি পাই না জমিদারের দেখা

মনের দুঃখ কারে কই।।

যে ভার গাধা বইতে পারে না

যে সম্পদের ভার কারও গাধা বইতে পারে না, সে সম্পদে তার বৈধ অধিকার নেই। এমনকি রাজার বেলায়ও একই নিয়ম। কোনো ব্যক্তি কিংবা তার গাধা যে পরিমাণ সম্পদের বোঝা বহন করে জঙ্গলাকীর্ণ দুর্গম পথে অবলীলায় এগিয়ে যেতে পারবে, সেটুকুই কেবল বৈধ অধিকার। এর বেশি যার দখলে সে- লোভী, সে ব্যক্তিই ঈশ্বরের অপছন্দের এবং মানুষের ঘৃণার। বলাই বাহুল্য, ব্যক্তি কিংবা গাধা বহন করে নিয়ে যেতে পারে কেবল সামান্য পরিমাণ অস্থায়ী সম্পদ। জমি বহন করতে পারে না। জমির নিরঙ্কুশ মালিকানা একান্তই ঈশ্বরের। এতে মানুষের ব্যক্তিগত অধিকার প্রতিষ্ঠিত হওয়ার প্রশ্নই আসে না। সম্পদের অধিকার কার প্রশ্নের এত সহজ-সরল এবং সর্বজনীন ব্যাখ্যা দ্বিতীয়টি মিলবে না। এর চেয়ে বেশি সম্পদ যখন ব্যক্তির দখলে চলে আসবে, তখনই সংকট দেখা দেবে, তখনই দ্বন্দ্ব তখনই যুদ্ধ। তুরকানাদের এই বিশ্বাস হাজার বছরের। কিন্তু নতুন প্রজন্ম হতবুদ্ধ। বিশ্বাস যে আর কাজে লাগছে না।

কেনিয়ার উত্তরাঞ্চলে তুরকানা আদিবাসীদের বাস। তুরকানা লেক ঘিরে বসবাস করা এই জনগোষ্ঠী সম্ভবত সুদানের দক্ষিণাঞ্চল থেকে এখানে এসে জমায়েত হয়েছে। তারা মনে করে জমিতে স্থিতিশীল হওয়া কখনো ঈশ্বরের ইচ্ছে হতে পারে না। সুতরাং তারা যাযাবর। তাদের গোটা জীবনযাপনই প্রার্থনা এবং উপাসনা। কাজেই তাদের চাওয়া তাদের কাজে ঈশ্বরের ইচ্ছা প্রতিফলিত হোক। ঈশ্বর এবং আকাশ তাদের কাছে সমার্থক। আকাশের বিচিত্র রূপে, আলোতে-আঁধারে, কালিমায়-লালিমায়, গর্জনে-বিদ্যুতে, বর্ষণে-খরায় ঈশ্বররে ভাষাই কেবল মূর্ত। সে ভাষা তুরকানারা জানে। সে নির্দেশনা তারা মানে। আকাশই বলে দেয়- এখনই সময়, যাত্রা শুরু করো। তখনই স্বল্পকালীন স্থিতির জড়তা কাটিয়ে তারা চলতে শুরু করে নতুন নিবাসের সন্ধানে। তাদের প্রার্থনা, পরিশ্রম এবং উদ্যোগের ফসল বণ্টিত হয় সম্প্রদায়ের ভেতরে বাইরে, কিছু ফসল সঞ্চিত রাখা হয় অজ্ঞাত পথচারীর জন্য নৈবেদ্য হিসেবে দেওয়ার জন্য। আকাশ, ঈশ্বর এবং অদৃশ্য অনেক ঐশী শক্তির যেন তারা কল্যাণের প্রতিশ্রুতি দেয়, বিরত থাকে অকল্যাণ সৃষ্টি থেকে। আধুনিক অর্থে তাদের কোনো কেন্দ্রীয় প্রশাসন নেই, ঐশী শাসনে তার চালিত।

তুরকানারা জানে সবচেয়ে বড় বন্ধন সম্পদের। শৃঙ্খলে বাঁধা পড়লে মুক্তি নেই, স্বাধীনতা নেই, তাতে ঈশ্বরের নৈকট্যও নেই। সম্পদের অধিকার ঐশ্বর্যের নয়, দীনতার নামান্তর। অধিকারের যন্ত্রণা দীনতা থেকে বেরিয়ে আসা তুরকানারা ঈশ্বরের প্রিয়। সেজন্য আকাশ, তুরকানা এবং ঈশ্বর সবার পরিচিতি একআকুজ তারা আকুজের কাছে প্রার্থনা করে। তারা পূর্বপুরুষের আত্মার কাছে প্রার্থনা জানায় যেন খরা থেকে তাদের রক্ষা করে। একাত্মতার ঐশ্বর্য স্থিতিশীল সম্পদলোভী মানুষের মধ্যে থাকে না।

 আদমের সন্তান আবেল ঈশ্বরের প্রিয়জন। আবেল ছিল মেষপালক। অপর সন্তান কেইন ভূমির কর্ষক, সম্পদলোভী এবং অবিশ্বাসী। আবেল কেইনের বিরোধই যাযাবর এবং স্থায়ী বসতি স্থাপনকারী মানুষের বিরোধের পূর্ব রূপ। অবিশ্বাসীরাই পার্থিব যাত্রায় এগিয়ে। কেইনের হাতে খুন হয় আবেল। স্থিতিশীল কথিত সভ্য মানুষের হাতে খুন হচ্ছে যাযাবর পশুপালক সম্প্রদায়।

কেবল আফ্রিকাতেই নয়, ইউরোপ, এশিয়া, উত্তর দক্ষিণ আমেরিকা এবং অস্ট্রেলিয়ায় যুদ্ধে জিতেছে কেইন। আবেল আহত ক্ষতবিক্ষত এবং সবশেষে নিহত।

 অধিকার প্রত্যাশী কেইনের উত্তরসূরিরা কেবল জমি সম্পদে সন্তুষ্ট নয়, নারীতেও চাই নিরঙ্কুশ অধিকার। তারা ভেঙে ফেলেছে মাতৃতান্ত্রিকতার মঙ্গল কাঠামো। নারীকেও পরিণত করেছে একান্তই নিজের অধিকারে রাখার মতো একটি সামগ্রীতে। মায়ের ঐশ্বর্য ভূলুণ্ঠিত। এর ফলাফল ভালো হয়নি। তারা কল্যাণ আনতে পারেনি, এনেছে ক্রন্দন, এনেছে গ্লানি।

 যাযাবর তুরকানাদের গান আছে, কবিতা আছে, গল্প আছে, দর্শন আছে। উত্তরাধিকার হস্তান্তরের সঙ্গে সঙ্গে এসব গল্প গানের অধিকারও চলে আসে এক প্রজন্ম থেকে অন্য প্রজন্মে। বিশ্বাস সংস্কৃতির মিলনে তাদের ধর্মাচার। একসময় এসে হাজির হয় খ্রিস্টান মিশনারিরা। ঈশ্বর বিশ্বাসে এরা এমনিতেই অর্ধেক পথ এগিয়ে, কাজেই দলে দলে যোগ দেয় খ্রিস্টধর্মে। একেশ্বরবাদী অন্য ধর্মের মিশনারি আগে হাজির হলে হয়তো সে ধর্মেই তারা দীক্ষিত হতো। একেশ্বরবাদ বেশি ঠাঁই পেয়েছে যাযাবর সম্প্রদায়ের মধ্যেই। কারণ বিশ্বাস নিয়েই তাদের যাত্রা। মিশনারিদের দেখানো পথে এসেছে ঔপনিবেশিক শাসন। তাদের হাতে বাইবেল তুলে দিয়ে ছিনিয়ে নিয়েছে সার্বভৌমত্ব।

কেইনের প্রজন্ম সৃষ্টি করেছে জমির মালিকানা, সৃষ্টি করেছে বিরোধ। জমির মালিকানা ঈশ্বরের। জমি বেচাকেনা করার কোনো সুযোগ নেই। স্রষ্টা বলছেন, জমি কেবল আমারই। তোমরা সামান্য পরিব্রাজক (লেভিক্টিকাস) কিন্তু সভ্যতার মানে দাঁড়িয়েছে জমিনে মালিকানা সৃষ্টি এই মালিকানায় যারা যত বেশি মূল্য সংযোজন করতে পেরেছে তারা তত সভ্য।

এই যাযাবররা শিল্পবিপ্লবের বিকৃত নৈতিকতায় তেমন প্রভাবান্বিত নয়, কিন্তু স্থিতিশীল মানুষ আধুনিকতা উন্নয়নের দোহাই দিয়ে ক্যালরিভিত্তিক খাবারের হিসাব দেখিয়ে, মাথাপিছু আয়ের অঙ্ক কষে এবং এমনকি তাদের একান্ত নিজস্ব যৌনাচার নিয়ে প্রশ্ন তুলে তাদের বিব্রত করছে, দূরপ্রসারী পরিকল্পনা নিয়ে ভেঙে ফেলছে তাদের ঘর-সংসার, আমূল উপড়ে ফেলছে তাদের সাংস্কৃতিক ভিত্তি। তারপর এগিয়ে এসেছে শীর্ষঘাতক, তার নাম  বিশ্বায়ন। কেনিয়ার মাসাইদের জোর করে সম্পৃক্ত করা হয়েছে এই ভুবনীকরণের সঙ্গে। ঔপনিবেশিক শাসকরাঅন্ধকার আফ্রিকারযাযাবরদের সংস্কৃতায়নের গুরুদায়িত্ব নিল। তাদের ঘাড়েই যেন কালো মানুষের  বোঝা। কেনিয়ার প্রথম গভর্নর স্যার চার্লস এলিয়ট তত্ত্ব দাঁড় করালেন মাসাইদের সর্বনাশ করেছে তাদের সংস্কৃতি সমাজ কাঠামো। এই কাঠামো তাদের পশ্চাৎপদ করে রাখছে। কাজেই ভাঙো তাদের কাঠামো, বদলে দাও সংস্কৃতি। জন্য সবার আগে দরকার স্থিতি। ঈশ্বর আবেলকে ভালোবাসেন। কিন্তু ধনবাদী অর্থনীতির পথকে নিশ্চয়ই নয়। তাদের পথে আনতে হবে, কেইনের পথে। মিশনারিরা এলো ধর্ম নিয়ে, কথিত সংস্কারকরা এলো আধুনিক শিক্ষা নিয়ে এবং বেনিয়ারা বাজার অর্থনীতি নিয়ে। পরিবর্তন এসেছে। অশিক্ষা, কুসংস্কার এবং বিনিময়ের অর্থনীতি কমেছে, সেই সঙ্গে হাতছাড়া হয়েছে ঈশ্বরের মালিকানাধীন মাসাইদের দখলাধীন বিশাল ভূখণ্ড, বিশাল পৃথিবী। কিন্তু আমরা অশিক্ষা কাকে বলি? কুসংস্কার কাকে বলি? এই রায় দেওয়ার মানদ- কে তাদের হাতে তুলে দিয়েছে?

 তুরকানাদের মতো মাসাইদেরও বিশ্বাস জমির স্থায়ী মালিকানা হতে পারে না, জমির ভাগাভাগি হতে পারে না, কেনাবেচা চলতে পারে না। ঔপনিবেশিক শাসন শেষ হলেও, দর্শনটি বিদায় নেয়নি। স্বশাসনের ভেতর বেশ পাকাপোক্ত আসন করে নিয়েছে একই দর্শন। জমি যাবে ব্যক্তি খাতে, সম্পদের হবে অর্থায়ন। ভোগের অর্থনীতিতে তাদেরও সম্পৃক্ত করতে হবে।

মাসাইদের এই ক্রমপরিবর্তন অসন্তুষ্ট করে মাসাই ঈশ্বরএনকাইকে। তার প্রিয় তরুণ মাসাইরা পিতৃপুরুষের পেশা ছেড়ে সামান্য মজুরির সন্ধানে ঘুরে বেড়াচ্ছে কেনিয়ার পথে-প্রান্তরে. স্থিত-মানুষের আচরণ অনুসরণ করছে। সাফারি স্যুট পরে ব্রিফকেস হাতে, চোখে সানগ্লাস, চকচকে চামড়ার জুতো পায়ে বহুজাতিক কোম্পানির সিগারেট ফুঁকতে থাকা মাসাই যুবকের চিত্র ঈশ্বরএনকাইকল্পনা করেননি। সরকারের মন্ত্রী সাংসদ তাদের কমিশন দিয়ে লাঠিয়াল হিসেবে ভাড়া করছে, তাদের হীনস্বার্থ চরিতার্থ করতে।

 এনগঙ্গ পাহাড়ের কাছে প্রায় হাজার হাজার মাসাইকে উচ্ছেদ করা হলো। মাত্র কয়েকজন বহিরাগত ৩০ হাজার একর মাসাই জমি দখল করে নিল। জমি উদ্ধারের মামলায় নামল মাসাইরা। ভূমিমন্ত্রী প্রেসিডেন্ট আশ্বাস দিলেন, তাদের জমিন ফিরিয়ে দেবেন। কিন্তু দেখা গেল, দখলদারদের একজন প্রভাবশালী প্রতিনিধির মাধ্যমে ভূমিমন্ত্রীও দখল করেছে হাজার একর। মাসাইদের এখন আর মর্ত্যরে কোনো ত্রাণকর্তা নেই। অমর্ত্যরেও নেই। মাসাই মারার দুই নদীর মাঝখানে লাখ লাখ একর মাসাই জমি ভাগ-বাটোয়ারা হয়ে গেছে রাজনৈতিক নেতারা তাদের সন্তান-সন্ততিদের মধ্যে। সবচেয়ে মূল্যবান জমির দখলদার স্বয়ং দখলদার ভাইস প্রেসিডেন্ট ড্যানিয়েল আরাপ মই (তিনিই পরে প্রেসিডেন্ট হলেন) ১৯৬৭ থেকে ১৯৭৮ তিনি ছিলেন কেনিয়ার ভাইস প্রেসিডেন্ট আর ১৯৭৮ থেকে ২০০২ সে দেশের প্রেসিডেন্ট।  দ্বিতীয় বৃহৎ দখলদার ভাইস প্রেসিডেন্ট জর্জ স্যাইতোতি। এমনকি সেখানকার ধর্মমন্ত্রীও বাদ যাননি। দখলদারের তালিকায় ক্ষমতাসীন প্রায় সবাই। মাসাইরা বিচার চাইবে কার কাছে?

এনগঙ্গ পাহাড়ের পাদদেশের জমির মামলায় প্রধান বিচারক দখলদারদের কাছ থেকে ঘুষ নিয়েছেন . মিলিয়ন শিলিং। প্রায় ৩০ হাজার পাউন্ড স্টার্লিং। প্রেসিডেন্ট দখলদার, বিচারক ঘুষখোর মাসাইদের জীবন বাঁচানোই বড় সমস্যা। উন্নয়নের নামে, ব্যক্তি খাতের সমৃদ্ধির নামে, প্রবৃদ্ধির নামে যাযাবর আদিবাসীদের সমূলে উচ্ছেদ চলছে এশিয়া, ইউরোপ, অস্ট্রেলিয়া, ল্যাটিন  আমেরিকা আফ্রিকায়। এমনকি এস্কিমোদের বরফের দেশও দখল করে নিচ্ছে আধুনিক উন্নয়নের সংস্কৃতি।

 সম্পদের পরিমাপ নেওয়ার মতো গাধাও নেই। প্রায় ক্রমবিলুপ্তির পথে এই নিরীহ প্রাণীটিও। কেনিয়ার তুরকানা এবং মাসাই সম্প্রদায়ও হারিয়ে যাচ্ছে উন্নয়নের জোয়ারে। কতটুকু সম্পদের অধিকার বৈধ সেই অঙ্কও ভুলে গেছে পৃথিবী। কৃষিকাজ, শিকার মাছ ধরতে জানা তুরকানারা বদলে যাচ্ছে দ্রুত। তাদের পল এরেঙ্গ ৮০০ মিটার দৌড়ে অলিম্পিক স্বর্ণপদক পেয়েছেন। তাদের মেয়ে আজুমা নেসেনিয়ানা আফ্রিকার সুপার মডেল। মাসাইরাও বসে নেই- জোসেফ এনকাইসেরি কেনিয়ার কেবিনেট সেক্রেটারি হয়েছেন, এডওয়ার্ড সোকিনি এবং এডওয়ার্ড লাওয়াসা হয়েছেন তাঞ্জানিয়ার প্রধানমন্ত্রী, ডেভিড রুডিসা দৌড়ে বিশ্বরেকর্ডের অধিকারী।

আবদুল আলীমের গাওয়া গানটার বাকি অংশ:

জমিদারের ইচ্ছামতো দেই না জমি চাষ

তাইতো ফসল ফলে না রে

দুঃখ বারো মাস।।

আমি খাজনাপাতি সবই দিলাম

তবু জমিন আমার হয় যে নিলাম

আমি চলি যে তার মন জোগাইয়া

দাখিলায় মেলে না সই।

একালের তুরকানা মাসাইরাও ব্যক্তিমালিকানার জমির অধিকারী হচ্ছে, লোভ বাড়ছে, মূলধন কুক্ষিগত করছে, নিজেদের মানুষকেও ঠকাচ্ছে। কথিত সভ্যতা আসার আগে মানুষকে সহজে মানুষ হিসেবে চেনা যেত, এখন চিনতে কষ্ট হয়।

লেখক

কথাসাহিত্যিক অনুবাদক

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত