এক্সপ্রেসেন স্টকহোম
সত্য গোপন করার জন্য সামরিক সরকারের সব প্রচেষ্টা সত্ত্বেও আমরা এখন জানি পূর্ব পাকিস্তানে কী ঘটছে। শরণার্থীরা ব্যাপক গোলাবর্ষণ, বেপরোয়া ধ্বংসযজ্ঞ এবং গণহত্যার সাক্ষ্য দিয়েছে।
শত সহস্র মানুষ তাদের ঘর ছেড়ে পালাচ্ছে। ক্ষুধা ও দুর্ভিক্ষ হানা দিয়েছে। পাকিস্তানের ঐক্য অটুট রাখতেই হবে এই প্রণোদনার নামে দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের প্রতি শক্রতার অস্ত্র প্রয়োগ করা হচ্ছে। দেশের প্রথম সংসদীয় নির্বাচনের ফলাফল ভন্ডুল করে দেওয়ার পর জন্য সামরিক জান্তা সহিংস শক্তি প্রয়োগ করে চলেছে। সাধারণ নির্বাচনের ফলাফল হজম করার প্রস্তুতি পাকিস্তানি শাসকদের ছিল না উলটো সামরিক বাহিনী লেলিয়ে দিয়েছে। এটা স্পষ্ট, এই পদ্ধতিতে কখনোই পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের পুনর্মিলন ঘটানো সম্ভব হবে না। নির্মমভাবে অধিকার প্রতিষ্ঠা অথবা যুদ্ধ এ ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই। শেখ মুজিবুর রহমানকে যে বন্দি করা হয়েছে তা প্রমাণ করতে পাকিস্তানের সামরিক কর্তৃপক্ষ একটি আলোকচিত্র অবমুক্ত করেছে। তার বন্দিদশার ছবিটি দেখিয়ে সামরিক সরকার পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের মনোবল ভেঙে দিতে চায়। প্রশ্ন, ছবিটি আগে ছাড়া হলো না কেন? কোন তারিখের ছবি তা-ই বা উল্লেখ করা হয়নি কেন? তারা শেখ মুজিবুর রহমানকে কেন দেখাচ্ছে না? এটা স্পষ্ট, ইয়াহিয়া খানের শাসন যে কোনো মূল্যে তার (শেখ মুজিব) শহীদ হওয়ার সুযোগ প্রতিহত করতে চাইবে। প্রশ্ন হচ্ছে কারাবন্দি শেখ মুজিবকে দেখার যে অনুভূতি পূর্ব পাকিস্তানে জন্মাবে, তা কি পরিস্থিতি পাল্টে দেবে? তাকে নিয়ে কিংবা তাকে ছাড়া (বন্দিদশায় রেখে) যে অবস্থায়ই হোক না কেন, পূর্ব পাকিস্তানের আর পিছু হটার পথ নেই। এই নীতি অনুসরণের জন্য অবশ্যই নিন্দা জ্ঞাপন করতে হবে। (১ এপ্রিল ১৯৭১)
দ্য ইভনিং স্টার হংকং
পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চল নির্বাচনের ফলাফলের ভিত্তিতে তাদের মতো করে সংবিধান প্রণয়নের যে অধিকার অর্জন করেছে, শুরু থেকেই ভুট্টো তা অস্বীকার করে আসছেন। সামন্ত ভূস্বামী, সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী, মেধাবী কিন্তু সুযোগসন্ধানী জুলফিকার আলি ভুট্টো সমাজতান্ত্রিক ধাঁচের রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রতিশ্রুতি দিয়ে পশ্চিম পাকিস্তানে নির্বাচনে জেতেন। কিন্তু তিনি যেভাবে রহমানের (শেখ মুজিবুর রহমান) কার্যক্রমে বাধা সৃষ্টি করে যাচ্ছেন, তাতে গরিবের নয় বরং পশ্চিমের অভিজাত শ্রেণির স্বার্থই রক্ষা করা হচ্ছে।
ভুট্টোর বর্জনের হুমকির কারণে জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত করা হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে হতাশ রহমান ধর্মঘটের ডাক দিয়েছেন, যা শেষ পর্যন্ত বিস্তৃত হতে হতে পূর্ব পাকিস্তানের প্রায় সব বেসামরিক প্রশাসনের দায়িত্ব গ্রহণে এসে ঠেকেছে। তার দল আওয়ামী লীগ কর্তৃক পূর্ব পাকিস্তানে ধর্মঘট শুরু করার পর পশ্চিম পাকিস্তান থেকে পূর্ব পাকিস্তানে সেনা প্রেরণের খবর আসা অব্যাহত রয়েছে। জাতীয় বিমান সংস্থা ও ঢাকা এয়ারপোর্টের কর্তৃত্ব সরকারের হাতে আছে। জাহাজযোগেও পূর্ব পাকিস্তানে সেনা প্রেরণের অসমর্থিত সংবাদ পাওয়া গেছে।
‘ঘূর্ণিঝড় এখনো হয়তো তার পুরো পাওনা বুঝে নেয়নি।’ জুলফিকার আলি ভুট্টো ৪ মার্চ এক সাক্ষাৎকারে ভেতরের তথ্যটি এভাবেই ফাঁস করেছেন। এর মানে, পশ্চিম পাকিস্তানের সেনাবাহিনী, আমলা, ভূস্বামী ও অভিজাত শ্রেণি পূর্ব পাকিস্তানের ওপর নিয়ন্ত্রণ অব্যাহত রাখতে আরও রক্ত ঝরাতে চায়। তিন সপ্তাহ পর গত বৃহস্পতিবার সেই রক্তপাত শুরু হয়ে গেছে। যদিও পাকিস্তান সরকার দাবি করছে, লড়াই কার্যত শেষ হয়ে এসেছে। বাস্তবে দুই অসম অংশের মধ্যে গণযুদ্ধ হবে অনেক দীর্ঘমেয়াদি ও রক্তাক্ত। পূর্ব পাকিস্তানে ঘূর্ণিঝড়ে চার থেকে পাঁচ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়েছে। কিন্তু প্রকৃত সংখ্যা কত তা হয়তো কখনো জানা হবে না। তেমনি কারও জানা হবে না, এই গণযুদ্ধে নিহতের প্রকৃত সংখ্যা কত। কারণ, পাকিস্তান সরকার তথ্য গোপনের চেষ্টা করে যাচ্ছে। পূর্ব পাকিস্তানের বন্দরে সরকারের নিয়ন্ত্রণ নেই; এখানে আওয়ামী লীগের সমর্থকরা সেনাবাহিনীর জন্য সরবরাহ করা রসদ বন্দরে নামাতে দিচ্ছেন না। রহমান সেনাবাহিনীকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছেন। সীমিত রেশনের ওপর তাদের নির্ভর করতে হচ্ছে।
দ্য লিবিয়ান টাইমস
মস্কো (এপি-ইউপিআই) : ভারত-পাকিস্তান সম্পর্কের অবনতি ঘটছে প্রতি ঘণ্টায়। পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের বিশেষ দূত এম আরশাদ হুসেইন গতকাল সোভিয়েত প্রধানমন্ত্রী আলেক্সি কোসিগিনের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। সরকারি ঘোষণায় বলা হয়েছে, মস্কোতে কর্মরত পাকিস্তানি রাষ্ট্রদূতও ওই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন। পাঁচ দিন আগে আরশাদ হুসেইন মস্কোতে পৌঁছেছেন। পূর্ব পাকিস্তানের সমস্যা এবং ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে বিস্ফোরণোন্মুখ পরিস্থিতি নিয়ে সোভিয়েত কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনার জন্য ইয়াহিয়া খানের দূত হিসেবে তার এ সফর।
তাসখন্দ আলোচনায় (১৯৬৫) মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কোসিগিন ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যকার সর্বশেষ প্রধান দ্বন্দ্বের অবসান ঘটান। শুক্রবার রাওয়ালপিন্ডিতে পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, পূর্ব পাকিস্তানের গণযুদ্ধ সম্পর্কে সোভিয়েত নেতার দ্বিতীয় চিঠিটি ইয়াহিয়া খানের হাতে পৌঁছেছে। উপমহাদেশের প্রতিবেশী দুই দেশের মধ্যে ঘণ্টায় ঘণ্টায় সম্পর্কের অবনতি ঘটছে এবং দুই সরকার একের পর এক প্রতিবাদলিপি পাঠিয়ে চলেছে। পাকিস্তানের অনুরোধে একটি দ্বিপক্ষীয় ব্যবস্থার মাধ্যমে দুটি কূটনৈতিক মিশনের কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়া হয়। পাকিস্তানের ডেপুটি হাইকমিশনার কলকাতায় স্বাভাবিক দায়িত্ব পালন করতে পারছিলেন না বলে ভারতকে জানানো হয়। ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো এক চিঠিতে পাকিস্তান সরকার কলকাতায় সে দেশের ডেপুটি হাইকমিশনের সব কর্মকর্তা-কর্মচারীকে পাকিস্তানে ফেরত পাঠানোর অনুরোধ জানায়।
প্রকৃতপক্ষে সেখানে কর্মরত ১০০ জনের মধ্যে ৭০ জনই পূর্ব পাকিস্তানের বিদ্রোহী কূটনীতিক। ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র জানান, কলকাতায় পাকিস্তানি মিশনে কর্মরত সবাইকে ফেরত পাঠানোর যুক্তি ভারত অবশ্যই মেনে নেবে না। তিনি বলেন, যারা যেতে চায় যাবে, কিন্তু ভারত ছাড়ার জন্য অন্যদের ওপর বলপ্রয়োগ করা হবে না।
মুখপাত্র বলেন, একইভাবে ভারত সরকারও ঢাকা থেকে ভারতীয় কূটনীতিক ও তাদের কর্মচারীদের মধ্যে যারা ভারতে আসতে চান, কেবল তাদের ফেরত পাঠানোর ওপরই জোর দিচ্ছে। এ মিশনের দলিল-দস্তাবেজ কেমন করে নিজ নিজ দেশে ফেরত পাঠাতে হবে, তা-ও দুই দেশকেই ঠিক করতে হবে। পাকিস্তান জোর দিয়ে বলেছে, পারস্পরিকতার নীতি (প্রিন্সিপাল অব রেসিপ্রসিটি) কঠোরভাবে মানতে হবে।
ডেইলি মেইল জাম্বিয়া
কান্ডজ্ঞানহীন জীবননাশ
ট্যাংক, গোলা, দুর্ভিক্ষ মানুষের কান্ডজ্ঞানহীন জীবননাশের এই বাস্তবতায় বিশ্বকে অবশ্যই সজাগ হতে হবে। প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের সরকার পূর্ব পাকিস্তানে বলপ্রয়োগের মাধ্যমে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে। কয় মাস আগে শুরু হওয়া এই দ্বন্দ্বে গুলিবিদ্ধ হয়ে, অনাহারে ও রোগে ভুগে হাজার হাজার মানুষ মৃত্যুবরণ করেছে। প্রতিটি সরকারেরই বিদ্রোহীদের পরাস্ত করার অধিকার রয়েছে। কিন্তু আমরা মনে করি, পাকিস্তানের বেলায় নিহতের সংখ্যা আতঙ্কজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। এখন মনে হচ্ছে, পূর্ব পাকিস্তানের জনগণকে নিশ্চিহ্ন করার পরিকল্পিত প্রচেষ্টা চালানো হচ্ছে। (১৪ জুন, ১৯৭১)
দ্য পালাভার উইকলি ঘানা
শেখ মুজিব ও তার দলের একমাত্র অপরাধ তারা স্বাভাবিক গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে দেশের যে অংশে তাদের অবস্থান, সে অংশে ঔপনিবেশিক মর্যাদা বদলে সংযুক্ত পাকিস্তান ফেডারেশনে একটি সম্মানজনক অবস্থানের দাবি জানিয়েছে। পশ্চিম পাকিস্তানি সামরিকজান্তা সংখ্যাগরিষ্ঠের ওপর ত্রাস ও বর্বরতার রাজত্ব কায়েম করেছে। পাকিস্তানের কাছে এক নম্বর শত্রু বিবেচিত ভারত নিজ দেশে জন-বিস্ফোরণ সত্ত্বেও মানবিক কারণে পূর্ব পাকিস্তান থেকে আসা অসংখ্য শরণার্থীকে ঠাঁই দিতে যতটা সম্ভব সবই করেছে, আশ্রয় দিয়েছে, খাবার দিয়েছে।
২৫ মার্চ রাতের অন্ধকারে পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ সাড়ে সাত কোটি মানুষের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে রক্তপিপাসু সামরিকজান্তা মানব-ইতিহাসের একটি জঘন্যতম অপরাধ সংঘটিত করেছে। বস্তুনিষ্ঠতার জন্য খ্যাত অনেক সংবাদপত্র ছবি ও প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণের মাধ্যমে ইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ এই গণহত্যার চিত্র তুলে ধরেছে। যেসব সাক্ষ্য ও প্রতিবেদন পাওয়া গেছে, তাতে নিশ্চিত হওয়া গেছে যে ইচ্ছাকৃতভাবে এই ভয়াবহ গণহত্যা ঘটানো হয়েছে। পশ্চিম পাকিস্তানের সেনাবাহিনী নির্মমভাবে এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করেছে। পূর্ব পাকিস্তানের খ্যাতিমান অধ্যাপক, আইনজীবী, সাংবাদিক, চিকিৎসক, ছাত্র-নির্বিশেষে বুদ্ধিজীবী ও পেশাজীবীদের নিঃশেষ করে দেওয়ার লক্ষ্যে পরিচালিত এই হত্যাযজ্ঞ বীভৎস গণহত্যাগুলোর একটিতে পরিণত হয়েছে। এই গণহত্যা এখনো চলছে। পূর্ব পাকিস্তান থেকে পালিয়ে ভারতে যাওয়া শরণার্থীর সংখ্যা বেড়েই চলেছে এখন প্রতিদিন গড়ে ৫০ হাজার শরণার্থী ভারত যাচ্ছে। যে সরকার তার লাখ লাখ নাগরিককে অন্য একটি দেশে চলে যেতে বাধ্য করে, সেই সরকারের আর ক্ষমতায় থাকার কোনো অধিকার রয়েছে কি না, সেটাই প্রশ্ন।
ভেচের্নিয়ে নোভোস্তি যুগোশ্লাভিয়া
বেয়নেটের সাহায্যে স্বাভাবিক অবস্থা বজায় রাখার দাবি জানানো হচ্ছে। বাঙালিদের স্বায়ত্তশাসনের জন্য আন্দোলনের জবাবে সামরিক আক্রমণের তিন মাস পর এই প্রথম বিদেশি সাংবাদিকদের পূর্ব পাকিস্তানে ঢুকতে দেওয়া হয়। চাপিয়ে দেওয়া সফরসঙ্গী ছাড়াই তারা ঘুরে দেখার অনুমতি পেয়েছেন। যদিও এতদিন ধ্বংসের আলামত সরিয়ে ফেলা হয়েছে, তারপরও যেটুকু রয়ে গেছে, তা আগের নৃশংসতার সাক্ষ্য দিতে যথেষ্ট।
রাজধানী শহর ঢাকা এখনো আতঙ্ক, সহিংসতা ও সন্ত্রাসের ছায়ায় ঢাকা। রাস্তায় লোকজন ফিসফিস করে কথা বলে। অসমান রাস্তায় গাড়ি তেমন বেরই হয় না। এটাকেই সরকার বলছে ‘স্বাভাবিক অবস্থা’। স্বাভাবিক অবস্থা নিশ্চিত করতে ভয়াবহ শাস্তি প্রয়োগ করা হচ্ছে। গোপনে কেউ যদি স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র শোনে, কঠোর শাস্তি তার প্রাপ্য। অধিকাংশ দোকানপাট এখনো বন্ধ। গাড়ির নম্বরপ্লেটে বাংলা মুছে ইংরেজি লেখা হয়েছে। খালি রাস্তায় ও দোকানে মানুষ ফিসফিস করে কথা বলে। সেনাবাহিনী এখনো বাঙালিদের তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে, গ্রেপ্তার করছে এবং কখনো কখনো হত্যাও করছে। যদিও ট্যাংক ও রকেটের আলামত সরিয়ে ফেলা হয়েছে, ধ্বংসের ও আতঙ্কের ছাপ রয়ে গেছে পুরান ঢাকায়। শহরের সবচেয়ে গরিব শ্রেণির মানুষ এখানে বসবাস করে এবং তারা আওয়ামী লীগের একান্ত সমর্থক। অবিশ্বাস্য শ্লথগতিতে হাটবাজার ও নোংরা সরু রাস্তায় জীবন ফিরে আসছে। এখানকার অধিকাংশ মানুষ হিন্দু, তারা নির্মমভাবে খুন হয়েছে, না-হয় ঘরবাড়ি ছেড়ে চলে গেছে। (৮ জুলাই ১৯৭১)
লেখক: কথাসাহিত্যিক ও অনুবাদক
