স্বাধীনতা অর্জনের দীর্ঘ ৫০ বছরে রাষ্ট্রের অভিভাবক তথা রাষ্ট্রপতির আনুষ্ঠানিক বিদায় জানানো সম্ভব হয়নি। জাতি হিসেবে এটা আমাদের দুর্ভাগ্য ও ব্যর্থতা। রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহল মনে করেন বিগত দিনে দেশে গণতান্ত্রিক সরকার ব্যবস্থার ধারাবাহিকতা না থাকায় অতীতে কোনো রাষ্ট্রপতিকে মেয়াদ পূর্তির পর রেওয়াজ অনুযায়ী সম্মানজনক বিদায় জানানো সম্ভব হয়নি।
দেশে গত ১৪ বছর গণতান্ত্রিক সরকারের ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকায় এই প্রথম দেশের ২১তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে ১০ বছর ৪১ দিন দায়িত্ব পালন শেষে মো. আবদুল হামিদকে রাজসিক, মর্যাদাপূর্ণ এবং সম্মানজনক বিদায় জানাল দেশবাসী। রাষ্ট্রপতিকে এভাবে বিদায় জানানোতে গণতান্ত্রিক দেশ হিসেবে বাংলাদেশের মর্যাদা বৃদ্ধি পেল। বাংলাদেশের ৫২ বছরের ইতিহাসে এমনটি আর কখনোই হয়নি। জাঁকজমকপূর্ণ রাষ্ট্রাচারে এমন বিদায় অনুষ্ঠানও দেখেনি বঙ্গভবন, দেখেনি দেশবাসী।
দক্ষতা ও নিষ্ঠার সঙ্গে সব বিতর্ক এবং দল-মতের ঊর্ধ্বে উঠে দায়িত্ব পালন শেষে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদের বিদায় ও নবাগত রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনকে বরণের ঘটনাটি দেশ-বিদেশের গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে প্রশংসিত হয়েছে। এর আগে রাষ্ট্রপতি মো. জিলুøর রহমান সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ২০১৩ সালের ১৪ মার্চ মৃত্যুবরণ করেন। তার মৃত্যুর পর ওই বছরের ২০ মার্চ তৎকালীন স্পিকার মো. আবদুল হামিদ ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি নিযুক্ত হন। এর ৪১ দিন পর ২২ এপ্রিল বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় তিনি রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন।
গত ২৪ এপ্রিল দেশের ২১তম রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদের বিদায় ও ২২তম রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনকে বরণে বঙ্গভবনকে সাজানো হয় নবরূপে। নতুন রাষ্ট্রপতির শপথ অনুষ্ঠানের পরপরই শুরু হয় মো. আবদুল হামিদের বিদায় অনুষ্ঠান। সর্বোচ্চ সম্মান দিয়ে রাজসিক কায়দায় তাকে বিদায় জানায় বঙ্গভবন, যা দেশে আর কোনো রাষ্ট্রপতির ক্ষেত্রে ঘটেনি। প্রেসিডেন্ট গার্ড রেজিমেন্টের (পিজিআর) একটি সুসজ্জিত অশ্বারোহী দল বিদায়ী রাষ্ট্রপতিকে ‘গার্ড অব অনার’ প্রদান করে।
শপথ অনুষ্ঠান শেষ হয় জাতীয় সংগীত দিয়ে। পরে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন বঙ্গভবন থেকে গুলশানের বাসায় যান। সন্ধ্যার পর তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে বঙ্গভবনে ওঠেন। আর বিদায়ী রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ শপথ অনুষ্ঠানের পর ঢাকার নিকুঞ্জ আবাসিক এলাকায় তার নিজের বাড়িতে ওঠেন।
বিদায়ী রাষ্ট্রপতি আগামীতে কী করবেন জানতে চাইলে সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমি রাজনীতি করব বা অন্য কোনো পদে যাব এটা হবে না। এটা করলে মনে হবে আমি দেশের মানুষকে হেয় করছি, নিশ্চয় আমি তা করব না।’ তার এই বক্তব্য অবশ্যই গণতান্ত্রিক রাজনীতির জন্য ইতিবাচক।
প্রসঙ্গত, দেশে স্বাধীনতা অর্জনের অর্ধশতাব্দীতে দুজন রাষ্ট্রপতি নিহত হয়েছেন; মাঝে স্বৈরাচারী এরশাদ গণআন্দোলনের মুখে পদত্যাগ করেন। মো. সাহাবুদ্দীন আহমদ, আব্দুর রহমান বিশ্বাস অপবাদ নিয়ে নীরবে রাষ্ট্রপতি পদ থেকে প্রস্থান করেন। অধ্যাপক এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরীকে ইম্পিচমেন্টের মাধ্যমে ৬ মাসের মাথায় পদত্যাগে বাধ্য করা হয়। বিতর্কিত ও একগুঁয়েমির ভূমিকার কারণে ‘এক এগারোর’ অস্বাভাবিক সরকার প্রতিষ্ঠা এবং গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থাকে ব্যাহত করে কলঙ্কের তিলক নিয়ে প্রস্থান করেন ইয়াজ উদ্দিন আহম্মেদ। আর এ কারণেই মো. আবদুল হামিদের শান্তিপূর্ণভাবে দুই মেয়াদ পূর্ণ করে বঙ্গভবন থেকে আনুষ্ঠানিক রাজসিক বিদায় নেওয়ার ঘটনা দেশে স্থিতিশীল ও সাংবিধানিক ধারাবাহিকতার অনন্য ও বিরল দৃষ্টান্ত বলে মনে করেন অনেকেই।
রাষ্ট্রের অভিভাবক হিসেবে নতুন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের কাছে দেশ ও গণতন্ত্রের স্বার্থে যে কোনো সংকট সমাধানে যোগ্য নেতৃত্বের প্রত্যাশা আমাদের। আগামী দিনগুলোতে তিনি রাষ্ট্রের অভিভাবক হিসেবে শপথ অনুযায়ী জনগণ ও দেশের পক্ষে দায়িত্ব পালন করবেন বলে প্রত্যাশা করছি। নতুন রাষ্ট্রপতির কাছে প্রত্যাশা সম্পর্কে জানতে চাইলে মো. আবদুল হামিদ বলেন, ‘নতুন রাষ্ট্রপতি যেন সাংবিধানিকভাবে তার দায়িত্ব পালন করতে পারেন এটাই আমার এবং জাতির প্রত্যাশা।’
আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এবং তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে দেশে অব্যাহত গণতন্ত্রের কারণেই একজন সফল রাষ্ট্রপতির সম্মানজনক বিদায় ও নতুন রাষ্ট্রপতির শপথ গ্রহণ সম্ভব হয়েছে। গত ২৪ এপ্রিল সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে ঈদ-পরবর্তী শুভেচ্ছা বিনিময় ও সমসাময়িক বিষয়ে আলোচনাকালে তথ্যমন্ত্রী এসব কথা বলেন। সদ্য সাবেক রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদের মতোই জনবান্ধব রাষ্ট্রপতি হিসেবে মো. সাহাবুদ্দিন দায়িত্ব পালন করবেন বলে আশা ব্যক্ত করেন তথ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, যিনি রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ গ্রহণ করেছেন, তিনি অত্যন্ত যোগ্যতার সঙ্গে, বিচক্ষণতার সঙ্গে তার দায়িত্ব পালন করবেন।’
নতুন রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ ও বিদায়ী রাষ্ট্রপতিকে আনুষ্ঠানিক বিদায়ের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র পরিচালনার সৌন্দর্য সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছে। একই সঙ্গে সদ্য সাবেক রাষ্ট্রপতি পরপর দু’বার তার দায়িত্ব সুচারুরূপে পালন করতে পেরেছেন। মনে রাখা উচিত, রাষ্ট্রপতি পদের গুরুত্ব, সৌন্দর্য ও বৈশিষ্ট্যের আলাদা মর্যাদা রয়েছে। রাষ্ট্রপতি রাষ্ট্রের অভিভাবক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
নতুন রাষ্ট্রপতি অতীত জীবনের নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়েই আজকের পর্যায়ে পৌঁছেছেন। ছাত্রজীবন থেকে যে আদর্শ লালন করে এসেছেন, তা থেকে কখনো বিচ্যুত হননি। এ দীর্ঘ সময়ে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব তিনি সফলতার সঙ্গে পালন করেছেন। তিনি এখন আরও বড় পরিসরে দায়িত্ব পেয়েছেন। ১৭ কোটি মানুষের ভরসাস্থল, প্রজাতন্ত্রের সর্বোচ্চ পদে দায়িত্ব পালন করার জন্য যে যোগ্যতা থাকা দরকার তা নতুন রাষ্ট্রপতির আছে। তিনি তার কর্মকা-, মেধা, বিচক্ষণতা, প্রজ্ঞা দিয়ে জনপ্রত্যাশা পূরণে সফল হবেন এবং বিদায়ী রাষ্ট্রপতির সাফল্যের মর্যাদা ও ধারাবাহিকতা রক্ষা করবেন সেই প্রত্যাশা করছি।
লেখক : সাংবাদিক।
