মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিকল্প কি চীন?

আপডেট : ১৬ জুন ২০২৩, ১০:৪৮ পিএম

সম্প্রতি বাংলাদেশের ওপর মার্কিন যে ভিসানীতি ও তার আগে র‌্যাবের ওপর যে রেস্ট্রিকশন এসেছে সেটা বিবেচনায় নিয়ে খুব সংক্ষেপে বললে, সব মিলিয়ে যে জিনিসটা বোঝা যাচ্ছে, সেটা হলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র চাচ্ছে যে, আগামী নির্বাচন যেন প্রকৃত অর্থেই প্রপার এবং স্বচ্ছ একটা নির্বাচন হয়। আরও সহজভাবে বলতে গেলে ২০১৪ বা ২০১৮-এর মতো নির্বাচন যেন না হয়, এটাই তারা চায়। কেন চাচ্ছে সেটা আরও অনেক বড় আলাপ-আলোচনার বিষয়। এখানে সেই আলাপ বাদ দিলাম। কিন্তু মোটা দাগে বলতে গেলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এটা চাচ্ছে। এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নও একই লাইনে এগোচ্ছে। যদিও ইউরোপীয় ইউনিয়নের পক্ষ থেকে তেমন কিছু এখনো বলা না হলেও তাদের কয়েকজন এমইপি চিঠিপত্র লিখেছে।

মোট কথা, তাদের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে যে এখানে যেন একটা যথাযথ মানসম্পন্ন নির্বাচন হয়। এখন এর মধ্যে যে জিওপলিটিক্যাল ইস্যুজ নেই এ কথা কিন্তু বলা যাবে না। বিশেষ করে চীনের যে অবস্থান সেটা তো জিও পলিটিক্যাল কারণেই। চীন প্রধানমন্ত্রীকে সমর্থন করে যে বক্তব্য দিয়েছে এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধেও কথা বলেছে যে তারা এখানে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছে। এখন নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা তো সবাই করে, চীনও করে। কিন্তু চীন এখানে বলার চেষ্টা করছে যে, তারা এই আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে।

এখন এগুলো সবই আসলে কথার কথা। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিকল্প কি চীন? আমার ঠিক তা মনে হয় না। কারণ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে আমাদের যে স্বার্থগুলো আছে সেটা চীনের কাছ থেকে অথবা অন্য কোনো বিকল্প উৎস থেকে পাওয়া কঠিন। কারণ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র হলো আমাদের রপ্তানির লক্ষ্যস্থল বা ঠিকানা। রপ্তানির সবচেয়ে বড় ক্ষেত্র হচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাজার। এখন চীন কি আমাদের সেটা দিতে পারবে? আমার মনে হয় না। ১০০ বছর পরে কী হবে সেটা দিয়ে চিন্তা করলে তো বর্তমানের সমস্যা বা প্রয়োজনের সমাধান হবে না। আমাকে চিন্তা করতে হবে এখন, আজকে, আগামীকাল বা আগামী পাঁচ বছর কী হবে ইত্যাদি ইত্যাদি।

চীন হলো আমাদের অর্থনৈতিক সুবিধাভোগী। সুবিধাভোগী এ জন্য যে, এখানে প্রায় সব প্রজেক্টে বেশির ভাগ কাজই করছে চীনা কন্ট্রাক্টররা। চীনের স্বার্থ রয়েছে এখানে। আর চীন এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এখন আঞ্চলিক নিয়ন্ত্রণ এবং ভারত ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় এলাকা ইত্যাদি নিয়ে পারস্পরিক বৈরী একটা অবস্থানে আছে। কাজেই চীনের যে প্রতিক্রিয়া সেটা খুব একটা অপ্রত্যাশিত কিছু না। কারণ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যেহেতু স্পষ্টতই বর্তমান সরকারের সঙ্গে কিছু রেস্ট্রিকটিভ আচরণ করছে যেটা খোলা চোখেই দেখা যাচ্ছে। কাজেই বাংলাদেশেকে আরও কাছে টানতে চীন সেই সুযোগ নেবে, এটাই স্বাভাবিক।

বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে টানাপড়েন বা বিভিন্ন পর্যায়ে ভারতের একটা অংশগ্রহণ থাকে। এটা ঐতিহাসিক এবং ভৌগোলিক কারণেই দেখে এসেছি। এবারও ভারত পুরোপুরি যে চুপচাপ আছে সেটা বলা যাবে না। কারণ ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী চলতি সপ্তাহে বা গত সপ্তাহেই বলেছেন যে, বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে বিদেশি হস্তক্ষেপের কোনো প্রয়োজন নেই। তা ছাড়া ভারত স্বাভাবিকভাবেই চাইবে যে, বর্তমান সরকারই বাংলাদেশের ক্ষমতায় থাকুক। কারণ, এটা তাদের জন্য সুবিধাজনক। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সঙ্গেও তাদের সম্পর্ক ভালো। যদি আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় না থাকে বা অন্য কোনো সরকার এলে তারা কী ধরনের আচরণ করবে সেটা তো তারা জানে না। যদিও আমি মনে করি যে, বাংলাদেশের সব সরকারকেই ভারতের সঙ্গে মোটামুটি ভালো সম্পর্ক রেখেই চলতে হবে।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রে দেখছি পশ্চিমারা ব্যবহার করছে গণতন্ত্র, নির্বাচন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতার মতো শব্দ। অপরদিকে চীন ব্যবহার করল আধিপত্য, নিয়ন্ত্রণের মতো শব্দ। প্রশ্ন থাকতে পারে যে, এসব শব্দের আড়ালে তাদের স্বার্থ রয়েছে, নাকি এসব শব্দ যা মিন করে সেটাই তারা চায়। এখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অবশ্যই চাইবে যে, তাদের সঙ্গে চীনের যে সংঘাত অথবা চীন-ভারতের যে দ্বন্দ্ব সেখানে চীনের পক্ষে যেন বাংলাদেশ না যায়। কিন্তু বাংলাদেশ নিজের মতো করে এক ধরনের মধ্যপন্থা অবলম্বন করে যাচ্ছে।

জানি না যে আগামীতে এটা কী হবে। কারণ, সংঘাত যদি আরও তীব্র আকার ধারণ করে তখন এমন হতে পারে যে, হয়তো বাংলাদেশকে তখন কোনো একটা পক্ষ নিতে হবে। যতদিন পর্যন্ত তেমন পরিস্থিতির দিকে না যায় ততদিন বাংলাদেশ কারও পক্ষ না নিয়ে এক ধরনের নিরপেক্ষতা বজায় রাখবে, এটাই স্বাভাবিক। সেটাই উচিত।

যেটা বলতে চাচ্ছি, বাংলাদেশের ক্ষেত্রে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক ভিসানীতি ও বিভিন্ন ব্যক্তির ওপর রেস্ট্রিকশন চীনের কাছে একটা সুযোগ এনে দিয়েছে। গতকালের বিবৃতিটি হচ্ছে সেই সুযোগকে কাজে লাগানো। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যেহেতু তাদের একটা কনফ্লিক্টিং রিলেশন আছে, কাজেই মার্কিন অবস্থানের বিরোধিতার সুযোগ চীন পেয়েছে এবং সেটা তারা করেছে। এটা অপ্রত্যাশিত না।

লেখক: সাবেক পররাষ্ট্র সচিব ও কূটনীতিক

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত