সিইসি সিরিয়াস কি না সেটাই প্রশ্ন

আপডেট : ১৭ জুন ২০২৩, ১০:৫৬ পিএম

আলী ইমাম মজুমদার স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ ও সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব। কর্মজীবনে সংস্থাপন মন্ত্রণালয়ের সচিবসহ সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেছেন। সম্প্রতি গাজীপুর, বরিশাল ও খুলনা সিটি করপোরেশনের নির্বাচনসহ নানা বিষয়ে দেশ রূপান্তরের সঙ্গে কথা বলেছেন এই জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সম্পাদকীয় বিভাগের সাঈদ জুবেরী

দেশ রূপান্তর : সম্প্রতি গাজীপুর, বরিশাল ও খুলনা সিটির নির্বাচন হয়ে গেল। এই তিন সিটির নির্বাচন নিয়ে আপনার পর্যবেক্ষণ কী?

আলী ইমাম মজুমদার : বেসিক পয়েন্ট যেটা ছিল দেশের প্রধান বিরোধী দল মানে আমাদের দেশের প্রধান বড় দুটি রাজনৈতিক দলের একটা বিএনপি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেনি। যে কারণে ভোটারদের মাঝে উৎসাহ-উদ্দীপনা যে রকম হওয়ার কথা ছিল সেটা ছিল না। নির্বাচন ঘিরে দেশবাসীরও যেমন আকর্ষণ বোধ করার কথা ছিল, তাদেরও সেই পরিমাণ আকর্ষণ ছিল না। এটা গেল একটা দিক।

দেশ রূপান্তর : কিন্তু ভোটার উপস্থিতি তো খারাপ ছিল না, ভোটদানে উৎসাহেরও কমতি ছিল না। বিশেষ করে গাজীপুর ও বরিশালে...

আলী ইমাম মজুমদার : এটাকে ভালো বলা যাবে না। আপনি যেটা বললেন যে গড়ে শতকরা ৫০ জনের মতো ভোটে অংশ নিয়েছেন। অবশ্য গাজীপুরের নির্বাচনটা বেশ প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ছিল। সেখানেও ভোটার ছিল শতকরা ৫০ জনের মতোই। কিন্তু স্থানীয় সরকার নির্বাচনে কাউন্সিলর লেভেলের প্রার্থীদের জন্যই একদম তৃণমূল পর্যায় থেকেই ভোট দিতে মানুষ আসে। এ ক্ষেত্রে প্রার্থী ও ভোটারদের রাজনৈতিক দলের প্রতি আনুগত্যের চেয়েও বেশি কাজ করে ব্যক্তিগত সম্পর্ক। পাড়া, মহল্লাকেন্দ্রিক সামাজিক সম্পর্ক, সামাজিকতা ইত্যাদি অনেক বেশি ক্রিয়াশীল থাকে। এ জন্য স্থানীয় সরকার নির্বাচনে আমাদের দেশে ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ ভোটারের প্রতিনিধিত্ব থাকে। যদিও সার্বিক বিবেচনায় বললে বলতে হবে গাজীপুরে ভোটটা শান্তিপূর্ণই হয়েছে। কিন্তু ৫০ শতাংশের মতো ভোটার উপস্থিতিকে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত ভোটার উপস্থিতি হিসেবে গণ্য করা যায় না।

দেশ রূপান্তর : প্রধান বিরোধী দল যে নির্বাচনে অংশ নিল না, একটা হচ্ছে যে, তারা এই সরকারের অধীনে ভোট করবে না বলে ঘোষণা দিয়েছে। কিন্তু সেটা জাতীয় নির্বাচনের ক্ষেত্রেই বেশি বলা হয়ে থাকে। সে ক্ষেত্রে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে না আসার পেছনে ইসির দায় কতটুকু?

আলী ইমাম মজুমদার : আমার ব্যক্তিগত মত হচ্ছে, যারা নির্বাচন বর্জন করেছেন তারা আসতেও পারতেন। আসাটাই সঙ্গত ছিল বলে আমি মনে করি। কারণ, তারা চাচ্ছেন যে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে জাতীয় নির্বাচন। যদি হয়ও এটা, মানে তাদের দাবি অনুযায়ী সেটা তো জাতীয় নির্বাচনের সময় হবে। এটা প্রাসঙ্গিকও। কিন্তু স্থানীয় সরকারের নির্বাচন তো বিভিন্ন সময়ে বিভিন্নভাবে হবে। এ ক্ষেত্রে তো তত্ত্বাবধায়ক সরকার থাকবে না, দলীয় সরকারই থাকবে। আমি মনে করি যে, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে তাদের অংশগ্রহণ করা উচিত। অথবা তাদের দলের নেতাকর্মীদের দলীয়ভাবে ছাড়াও স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে দেওয়া উচিত, অথবা বাধা না দেওয়া উচিত। আগে তো করেছে। নাগরিক সমাজ বা বিভিন্ন নামে অংশ নিয়েছে। কিন্তু এখন বিরোধী রাজনৈতিক দলের নির্বাচনে অংশ না নিতে দলীয় কর্মীদের প্রতি কঠোর যে অবস্থান তাদের দলের কেউ এই নির্বাচনে অংশ নিতে পারবে না, অংশ নিলে তাকে বহিষ্কার করা হবে; আমার মনে হয় এটা তারা না করলেও পারত। তাতে স্থানীয় এসব নির্বাচন অধিকতর জমজমাট হতো। পাশাপাশি, আমার বিবেচনায় এতে তাদের সংগঠনও অধিকতর শক্তিশালী হতো।  

দেশ রূপান্তর : তিন সিটির নির্বাচনের চরিত্র তো তিন রকম দেখলাম। মানে গাজীপুরে একরকম, বরিশালে আরেক রকম উত্তেজনা, আবার খুলনায় একরকম টেনশন ফ্রি... সবশেষে নির্বাচনে যারাই অংশ নিলেন তাদের মধ্যে কি লেভেল প্লেইং ফিল্ড ছিল বলে মনে করেন?

আলী ইমাম মজুমদার : এখানে মনে করেন গাজীপুর এবং বরিশালে যে সিনড্রমটা ছিল, সেটা হলো ক্ষমতাসীন দলের যে প্রার্থী, তারা নিজ দলের মধ্যেই একটা প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখে ছিল। গাজীপুরে তো তাদের অফিশিয়াল যে প্রার্থী তিনি পরাজিতই হয়েছেন। আর বরিশালেও ক্ষমতাসীন দলের মনোনীত প্রার্থী যিনি তিনিও পুরো দলের সমর্থন পাননি বা তার সঙ্গে নিতে পারেননি, তার বিরুদ্ধে দলের একটা অংশ ক্রিয়াশীল ছিল। ফলে প্রশাসন তাদের কারোর বিরুদ্ধে কাজ করেছে এমনটা ছিল না। কিন্তু খুলনার ব্যাপারটা আবার আলাদা। কারণ, এখানে প্রকৃত অর্থে সিগনিফিকেন্ট কোনো বিরোধী প্রার্থী ছিল না। আমি সেখানে যাইনি বা সেখানকার খবরও পত্রপত্রিকায় যেমন এসেছে, সেখানে যে বিরোধী প্রার্থী ছিলেন তিনি তেমন পরিচিতও না। দলটিও তেমন ইয়ে না। তো সেখানে যে তিনি ৬০ হাজার ভোট পেয়েছেন তাতে আমি বিস্মিত হয়েছি।

তো লেভেল প্লেইং ফিল্ড বলতে আমরা যেটা বুঝি সেটা যদি একটা আইডিয়াল দৃষ্টিতে বিবেচনা না করে একটি কমন বা সাধারণ দৃষ্টিতে দেখলে আমার মনে হয় একটা লেভেল প্লেইং ফিল্ড ছিল। 

দেশ রূপান্তর : বরিশালে নির্বাচনে বিরোধী হাতপাখার প্রার্থীর ওপর যে হামলার ঘটনাটি ঘটেছে এবং তারপর ইসি ‘ইন্তেকাল তো করেন নাই’ বলে যে মন্তব্যটি করেছেন, বিষয়টি নিয়ে আপনি কী বলবেন?

আলী ইমাম মজুমদার : বরিশালের নির্বাচনের শেষ দিকে হামলার যে ঘটনা ঘটেছে, হতে পারে হামলাটির আকৃতি এবং প্রকৃতি খুব বড় আকারের না। হতে পারে আর কী। কিন্তু এখানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর যে মোবিলাইজেশন, তার ভেতরে হামলার সাহস দেখানোটা আমি মনে করি বড় ধরনের দুর্বলতা। এক হলো, আইনশৃঙ্খলা রক্ষার কাজে যারা জড়িত ছিলেন, তাদের দুর্বলতা প্রকাশ পেয়েছে। আর হামলার ঘটনার পর প্রধান নির্বাচন কমিশনের যে বক্তব্য সেটা তো অদ্ভুত। তিনি সিরিয়াস কিনা সেটা নিয়েই তো প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে। মানে সিইসি কোনো কিছুকে সিরিয়াসলি নিচ্ছেন কিনা, আমি সেটা ঠিক বুঝে উঠতে পারছি না। এ ধরনের মন্তব্য, তা সে ছোটখাটো হলেও তিনি কিন্তু শুরু থেকেই করে যাচ্ছেন। প্রথমে তিনি বলেছিলেন যে, জেলেনস্কির মতো প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। মানে হচ্ছে যে, আপনাকে মারতে আসলে আপনিও মারেন। এই জাতীয় কথাবার্তা তিনি শুরু থেকেই বলছেন। এবার হামলায় আহত হওয়ার বিষয়ে তিনি পাল্টা জানতে চাইলেন যে, সে কি ইন্তেকাল করেছেন কিনা! মানে কেউ ইন্তেকাল করলে তিনি রিয়েক্ট করবেন বা করবেন না। আসলে এগুলো হলো অযাচিত আচরণ ও বক্তব্য। এ ধরনের বক্তব্য দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠানের লোক থেকে শুনতে হলো বলে আমি অত্যন্ত দুঃখিত। তা সত্ত্বেও আমি আশা করি হামলাকারীকে বোধহয় গ্রেপ্তার করা হয়েছে, যতটুকু জানি যে শেষ পর্যন্ত একটা মামলাও বোধহয় হয়েছে, ফলে আশা করি এ বিষয়ে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। 

দেশ রূপান্তর : ইসি যে রকম বলে আসছেন, মানে আপনি বললেন যে জেলেনস্কির মতো প্রতিরোধ বা সর্বশেষ তিনি কি ইন্তেকাল করেছেন এ ধরনের মন্তব্য কি হামলা, সন্ত্রাসী কর্মকা- বা সহিংসতাকে উৎসাহ দিচ্ছে না?

আলী ইমাম মজুমদার : হ্যাঁ, ওনার এসব মন্তব্যকে বিশ্লেষণ করলে তো মনে হয় যে হামলা-পাল্টা হামলার মতো ঘটনাকে উৎসাহ দেওয়ারই কাছাকাছি। এখানে প্রধান নির্বাচন কমিশনার হিসেবে ওনার পজিশনের মান রক্ষা করে তিনি কথা বলেননি। নিজের পজিশনকে খাটো করেছেন, নির্বাচন কমিশনকেও খাটো করেছেন।

দেশ রূপান্তর : জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে আস্থা সংকটে থাকা ইসি এই স্থানীয় নির্বাচনগুলোর মধ্য দিয়ে আস্থা অর্জনের একটা সুযোগ পেয়েছে। আস্থা অর্জনের পরীক্ষায় ইসি কি পাস করেছে না ফেল করেছে?

আলী ইমাম মজুমদার : দেখেন, এসবকে যদি কেউ জাতীয় নির্বাচনের মহড়া বলে কেউ মনে করেন, সেটা ঠিক না। এটা জাতীয় নির্বাচনের মহড়া না। প্রথম থেকেই এটা নির্দিষ্ট হয়ে গিয়েছে যে, দেশের অন্যতম প্রধান বিরোধী দল এটা বর্জন করেছে। আরেকটা বিষয় হচ্ছে, জাতীয় নির্বাচনের ভোট হবে ৩০০ আসনে। এখানে ভোটকেন্দ্র থাকবে- সামান্য কমবেশি হতে পারে ৫০ হাজারের মতো। ভোট কক্ষ থাকবে প্রায় তিন লাখ। এই বিশালত্বেও তুলনায় এসব স্থানীয় নির্বাচন কিছুই না। এটাকে জাতীয় নির্বাচনের মহড়া হিসেবে চিন্তা করাই ঠিক হবে না। ওনারাও এটাকে দিয়েই যে ওই পথে হাঁটছেন সেটাও আমার মনে হয়নি। প্রথমত, সব রাজনৈতিক দলকে নির্বাচনে আনতে পারাও কৃতিত্বেও ব্যাপার। তো সেটা হতে হলে অ্যাম্পায়ারের প্রতি পরিপূর্ণ আস্থা আসতে হবে। এই আস্থা এলেই খেলোয়াড় মাঠে নামে। এখানে শুধু তাদের দোষ দিলেও হবে না। আগেও বিরোধীরা নির্বাচনে এসেছিল। ধরেন ২০১৮-এর নির্বাচন কিন্তু অংশগ্রহণমূলক ছিল। কমিশনে কে কখন কারা ছিল সেটা কোনো কথা না। কমিশনের একটা চিরন্তন উত্তরাধিকার বা ধারাবাহিকতা আছে। তখনকার কমিশনও কিন্তু আমাদের হতাশ করেছে। সামান্যতম নিরপেক্ষতার, দৃঢ়তার পরিচয় তারা দিতে পারেনি।

দেশ রূপান্তর : গাইবান্ধার নির্বাচনে দেখেছি যে নির্বাচনী দায়িত্ব যাদের ওপর, পুলিশ বা প্রসাশন বা প্রিসাইডিং অফিসার তারা কমিশনের কথা শুনছে না। পরে সিসিটিভিতে অনিয়ম চাক্ষুস করে ইসি ঢাকা থেকে ভোট বাতিল করল। তো এই সিটিগুলোর নির্বাচনে কি পরিস্থিতির কোনো উন্নতি দেখতে পান?

আলী ইমাম মজুমদার : না সে রকম পরিস্থিতি দেখা যায়নি। তবে গাইবান্ধার ঘটনাটি ব্যতিক্রম। প্রশংসা করার মতো। সেখানে তারা সিসিটিভিতে অনিয়ম দেখে এটাকে নিয়ন্ত্রণবহির্ভূত মনে করে নির্বাচনটা স্থগিত করে দিলেন। তখন মনে হয়েছিল ঘটনাটি একটা সাড়া ফেলবে। একটা তদন্ত কমিশনও হয়েছিল। কমিশন বিস্তারিত তদন্ত করে একটা রিপোর্টও দেয়। সেখানে ভোটকেন্দ্র থেকে শুরু করে জেলা পর্যায় পর্যন্ত কমিশনের বেশ কিছু কর্মকর্তাকে দায়ী সাব্যস্ত করা হয়। এই দায়ী কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দুধরনের ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ আছে। প্রথমত, তাদের কর্তৃপক্ষের কাছে লেখা যে তারা ওই ঘটনায় দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছে বা অনিয়মে জড়িত, তাদের বিরুদ্ধে এই ব্যবস্থা নাও। দুই নম্বর কথা হলো, জনপ্রতিনিধিত্ব আদেশের মধ্যেই সম্ভবত এখনো আছে যে, এ ধরনের আচরণের জন্য দায়ী কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে মামলার সুযোগ আছে। এখানে কমিশন শুধু কর্তৃপক্ষের কাছে দায়ী কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার চিঠি দিয়েই চুপ করে গেছে। এই চিঠি দেওয়ার পরও কেউ মানে কোনো সংস্থা যেকোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না, এটা নিয়ে তারা কোনো কথাই বলছে না। প্রেস কনফারেন্স করবেন বা বিভিন্নভাবে নজরে আনবেন, সেসব কিছুই করছেন না। কাজেই গাইবান্ধায় কমিশন যেটা দেখাতে চেয়েছিলেন, আল্টিমেটলি তার কিছুই হয়নি। শাস্তি দিয়ে যে অন্যকে শেখানো, মানে তুমি যদি এমন করো তাহলে তোমাকেও শাস্তি পেতে হবে, গাইবান্ধায় সেটা হয়নি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত