মশার সাজে যম

আপডেট : ১৭ জুলাই ২০২৩, ০৯:৪৬ পিএম

ডেঙ্গু নয়, সব প্রায়োরিটি নির্বাচনে! যত আকর্ষণ জেয়া, লু, ইউরোপীয় ইউনিয়নে। অথচ, বাংলাদেশে এখন পাবলিক হেলথ ইমার্জেন্সি। ‘জনস্বাস্থ্য জরুরি পরিস্থিতি’ জাতীয় উদ্বেগের বিষয় হলেও পজিশন-অপজিশন কারও কাছেই এটির অগ্রাধিকার আলোচনা নেই। ডেঙ্গু আর ঢাকা বা নগরীর অসুখ নয়। ডেঙ্গুর দম বেড়েছে, আরও আগ্রাসী চরিত্রে ছড়িয়ে পড়েছে দেশের ৬৩ জেলায়। সংক্রমণ ও মৃত্যু দুই-ই বাড়ছে।

২০২২ ও ২০২৩ সালের মধ্যে ডেঙ্গু সংক্রমণের মধ্যে কোনো বিরতি ছিল না। জনঘনত্ব, গ্রাম ও শহরের অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ ডেঙ্গুর জন্য হ্যাচারি তৈরি করে দিয়েছে। তরতাজায় সে তার চরিত্রও পাল্টে নিয়েছে। মোটা দাগে ডেঙ্গু এখন দাবড়ে বেড়াচ্ছে চার কিসিমে। চার ধরনসহ এর ভয়াবহতাদৃষ্টে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের শঙ্কা, আগস্ট-সেপ্টেম্বরে এর সংক্রমণ আরও বাড়বে। হাসপাতালগুলোর গত ক’দিনের চিত্র সেই শঙ্কাকে আরও বাতাস দিচ্ছে। ঢাকায় ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী সবচেয়ে বেশি মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। সিট না থাকায় হাসপাতালটির ফ্লোর-বারান্দায়ও রোগীর গড়াগড়ি-ছড়াছড়ি। ঢাকার বেসরকারি হাসপাতালগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ রোগী হলি ফ্যামিলিতে। পরিস্থিতি বিবেচনায় ঢাকা উত্তর সিটি মহাখালীর ডিএনসিসি কভিড হাসপাতালকে শুধু ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসার জন্য নির্ধারণ করা হলেও জনবল এবং সরঞ্জামের ব্যবস্থা মামুলি পর্যায়ে। একসময় ধারণা ছিল, ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব মূলত ঢাকা মহানগরকেন্দ্রিক। কিন্তু ২০১৯ সালে দেশব্যাপী ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাবের পর রোগটি নতুন করে চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। সেইসঙ্গে ডেঙ্গু বিষয়ে প্রচলিত কিছু মিথ রোগটি সম্পর্কে মানুষকে বিভ্রান্তিতে ফেলে। ডেঙ্গু জ্বরের উৎপত্তি হয় ডেঙ্গু ভাইরাসের মাধ্যমে। মানুষের মধ্যে তা ছড়ায় মূলত এডিস মশার কামড়ে। একই প্রজাতি জিকা, চিকনগুনিয়া এবং সমজাতীয় ভাইরাসগুলো ছড়ানোর জন্যও দায়ী। বাংলাদেশে ডেঙ্গুর প্রকোপ বহু বছর ধরে থাকলেও ২০১৯ সালে এই রোগে আক্রান্তের হার এবং মৃতের সংখ্যা বৃদ্ধি আশঙ্কাজনক হারে বাড়তে শুরু করে।

ডেঙ্গু বিষয়ে বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্রচলিত মিথের মধ্যে রয়েছেÑ এডিস মশা শুধু সকালে এবং পায়ে কামড়ায়, কারও দুবার ডেঙ্গু হয় না, দুবার হলে নিশ্চিত মৃত্যু ইত্যাদি। এসব মিথ নিয়ে ভাবা বা বিশ্লেষণের সময় এখন আর নেই। কাউকে দোষারোপ বা দায়ী করাও এখন সময় নষ্টের পর্যায়ে। এ পরিস্থিতির জন্য রেড অ্যালার্ট জরুরি না কাউকে কাউকে রেড কার্ড দেখানো জরুরি সেই প্রশ্নও আছে। কিন্তু, জবাব খোঁজার সময় নেই। পরিস্থিতির অবনতি হওয়ায় ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন মশা মারায় নেমেছে।

করোনা চিকিৎসার নামে দেশে অতিবাণিজ্য চলেছে। তা ডেঙ্গু নিয়েও শুরু হয়েছে। কোনো কোনো বেসরকারি হাসপাতাল ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসার ক্ষেত্রে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করছে বলে অভিযোগ উঠছে। ডেঙ্গু মোটেই প্রতিরোধ অযোগ্য নয়। কিন্তু, একে প্রাণঘাতী করে ফেলা হচ্ছে অব্যবস্থাপনা ও গলাকাটার মানসিকতায়। এ সুযোগে ডেঙ্গুও তার রূপ লুকাচ্ছে। আদতে এখনকার ডেঙ্গুর সঙ্গে ২০০০ সালের এমনকি ২০১২ সালের ডেঙ্গুর আলামত আচরণ এবং সংক্রমণ শক্তির মধ্যে বিস্তর ফারাক। ফলে আগের অভিজ্ঞতার আয়নায় ডেঙ্গুকে চেনা যাচ্ছে না। দ্বিতীয়, তৃতীয় বা চতুর্থবার আক্রান্তরা ডেঙ্গু শক সিনড্রোমে পড়ছে। এখন আগের মতো জ্বরের পারদ চড়ে যাচ্ছে না। বিরতি দিচ্ছে। শরীরে ব্যথা তেমন থাকছে না। প্লাটিলেট কমে গেলেও টের পাওয়া যাচ্ছে না। প্রথমে মনে হবে সাধারণ জ্বর, সর্দি, কাশি, মাথা বা গলাব্যথা। তবে চট করেই শারীরিক অবস্থার অবনতি হচ্ছে। কমে যাচ্ছে রক্তচাপ, কিডনি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, রোগী অজ্ঞান হয়ে যাচ্ছে, যা ডেঙ্গু শক সিনড্রোম নামে পরিচিত। এবার ডেঙ্গুতে মৃত্যু বেশি হওয়ার অন্যতম কারণও শক সিনড্রোম।

মশা কম থাকা অবস্থায় তা মারার উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। এখন মশা বেড়ে গেছে। মশা মারার সঙ্গে রোগ দমনও জরুরি হয়ে গেছে। তা চটজলদি বা ক্রাশ প্রোগ্রামে সম্ভব নয়। সিটি করপোরেশনগুলোর ‘সব অসুখের একই ওষুধ’ মার্কা নীতি ব্যর্থ হয়েছে। বারবার প্রয়োগ করা একই বিষ মশার দেহে সহনীয় হয়ে গেছে। প্রতিটি প্রাণী দেহেই প্রকৃতিগতভাবে এ সহনক্ষমতা তৈরি হয়। এডিস মশারাও এখন সেই সক্ষমতায় বলীয়ান। এছাড়া, উষ্ণ আর্দ্র আবহাওয়ার কারণে বাংলাদেশ মশা ও মশাবাহিত রোগ বিস্তারের জন্য উত্তম জায়গা। উপযুক্ত তাপমাত্রা ও আর্দ্রতার সঙ্গে যোগ হয়েছে অপরিকল্পিত নগরায়ণ। সব মিলিয়ে ঢাকা যেন মশার স্বর্গরাজ্যে রূপান্তরিত হচ্ছে।

বাংলাদেশে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব মূলত ১৯৬৪ সালের দিকে। তখন এটির নামকরণ হয়েছিল ‘ঢাকা ফিভার’। ২০০০ সালে এসে নাম পড়ে ডেঙ্গু। ওই বছর সরকারি হিসাব মতে, ৫ হাজার ৫০০ জন মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হন এবং ৯৩ জন মারা যান। দেশে ডেঙ্গরু সবচেয়ে বড় আঘাত আসে ২০১৯ সালে। সরকারি হিসাবে আক্রান্ত হয় ১ লাখ ১ হাজার ৩৫৪ জন। আর গেল বছর আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা যথাক্রমে ৬২ হাজার ৩২১ ও ২৮১। অপরিকল্পিত নগরায়ণ, বিভিন্ন সামাজিক ও পরিবেশগত কারণ ডেঙ্গু সংক্রমণের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। জনসংখ্যার ঘনত্ব, মানুষের যাতায়াত, ব্যবহারযোগ্য পানির স্বল্পতা ও বিভিন্ন পাত্রে পানি সংরক্ষণ এডিস মশার ঘনত্ব ও ডেঙ্গু বাড়িয়ে দিচ্ছে বহুগুণে। বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন ধরনের প্যাকেটজাত খাবার ও বোতলজাত পানীয়ের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধির ফলে প্রচুর বর্জ্য তৈরি হচ্ছে। এসব বর্জ্য সঠিকভাবে ব্যবহার করতে না পারার কারণে বৃষ্টির পানি জমে এডিস মশার প্রজননক্ষেত্র তৈরি হচ্ছে। বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে গ্রীষ্মমণ্ডলীয় ও উপক্রান্তীয় অঞ্চলে ডেঙ্গুর ঝুঁকি বৃদ্ধি পাচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ডেঙ্গুর বাহক এডিস মশা পরিবর্তিত পরিবেশে নিজেকে খাপ খাইয়ে নিতে সক্ষম হচ্ছে।

ঘাড়ের ওপর না পড়লে কোনো কিছুকে ঘটনা মনে না করার একটি বৈশিষ্ট্য অনেকটা আমাদের মজ্জাগত। ব্যবস্থা গ্রহণ তো আরও পরের বিষয়। তার ওপর বিদেশি রাজঅতিথিদের খবরাখবরে গণমাধ্যমের যত আগ্রহ ডেঙ্গুর ভয়াবহতা বা বন্যার শঙ্কা নিয়ে তা নেই। টেলিভিশন-পত্রিকাসহ গণমাধ্যমগুলো নিশ্চয়ই না বুঝে তা করছে না। অডিয়েন্সের মেজাজ-মর্জি তথা চাহিদা মতোই নিউজ ভ্যালু ঠিক করে তারা। নির্বাচন সামনে রেখে বিদেশিদের যাতায়াতের খবরের এখন বাজার বেশি। রাজধানীর পর চট্টগ্রাম, রাজশাহী, ময়মনসিংহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় প্রাণঘাতী ডেঙ্গু ছড়িয়ে পড়ার খবরাখবর সেই তুলনায় গুরুত্বহীন। তিস্তাপাড়ের রংপুরসহ উত্তরাঞ্চল এবং সুরমা-কুশিয়ারা প্রভাবিত সিলেট-হবিগঞ্জ এলাকায় বন্যার মহড়াও খবরের বাজারে বড় ঘটনা নয়। যদিও ডেঙ্গু এবার বেশি চোখ রাঙাবে, কেড়ে নেবে অনেক প্রাণÑ বার্তাটি গোপন ছিল না। ঈদের পর পরিস্থিতি গুরুতর হবে দেওয়া হয়েছিল সেই আভাসও।

করোনা নামের মহামারীটি কার্যত এখনো গুডবাই দেয়নি। তার ওপর ডেঙ্গুর আক্রমণের যাবতীয় কারণ বিদ্যমান রেখে এখন কীভাবে রক্ষা মিলবে? প্লাস্টিক ড্রাম, এসির পানি, ফুলের টব ও ছাদে জমা পানিতে এডিস মশার লার্ভা বেশি জন্মেÑ এ সতর্কতা সেই কবে থেকেই দেওয়া হচ্ছে। কোনো রাখঢাক না রেখে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়ে দিয়েছে, গোটা রাজধানীসহ আশপাশ ডেঙ্গুর জীবাণুবাহী এডিস মশার উপস্থিতির কথা। তার মানে,  রাজধানীর প্রায় সবাই ডেঙ্গু আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে। অথচ স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রাক-বর্ষা জরিপের এই চিত্র আমল না দিয়ে যেনতেন ভাবার একটি মানসিকতা স্পষ্ট। নইলে গত পাঁচ বছরের মধ্যে এবার ঢাকায় এডিস মশার সর্বোচ্চ লার্ভা ও এবং সম্ভাব্য প্রজননস্থল গড়ে ওঠে কীভাবে? স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগনিয়ন্ত্রণ শাখার আওতাধীন জাতীয় ম্যালেরিয়া নির্মূল ও এডিসবাহিত রোগ নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির কীটতাত্ত্বিক দলের প্রাক-বর্ষা এডিস জরিপটি চলে গত ১৭ জুন থেকে ২৭ জুন পর্যন্ত। তা চলে ঢাকার দুই সিটির মোট ৯৮টি ওয়ার্ডের ৩ হাজার ১৪৯টি বাড়িতে। বেশি দেরি বা কিছু গোপন না রেখে তারা জরিপের তথ্য অবহিত করেছে।

মশার লার্ভার ঘনত্ব পরিমাপের সূচক ‘ব্রুটো ইনডেক্স’ নামে পরিচিত। জরিপ বলছে, ৯৮টি ওয়ার্ডের মধ্যে ৫৫টিতেই ‘ব্রুটো ইনডেক্স’ ২০-এর বেশি। অর্থাৎ, এসব এলাকার ১০০টির মধ্যে ২০টি পাত্রে মশা বা লার্ভা মিলেছে। গত বছর ৯৮টি ওয়ার্ডের মধ্যে মাত্র ৩টিতে ব্রুটো ইনডেক্স ২০-এর বেশি ছিল। ভাবা যায় কত হটস্পটে আছে এই ঢাকা? এ বছর বর্ষা এসেছে দেরিতে, হয়তো যাবেও দেরিতে। এতে ডেঙ্গুর মৌসুম দীর্ঘ হওয়ার একটি শঙ্কা ঘুরছে। এরইমধ্যে প্রতিদিন আক্রান্ত এবং মৃত্যু ভয় জাগানিয়া সংখ্যা শঙ্কার তীব্রতায় মাত্রা যোগ করে চলছে। চট্টগ্রামসহ ঢাকার বাইরের বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তির তথ্যও অ্যালার্মিং। বাংলাদেশ আরেকটি দুর্যোগে পড়তে যাচ্ছে কিনা এ আতঙ্ক ভর করেছে অনেকের মধ্যে।

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট

mostofa 71 @gmail. com

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত