পুলিশ কখন বিব্রত হয়, মামলার ক্ষেত্রে? গভীরভাবে চিন্তা করলে দেখা যাবে এ ক্ষেত্রে মূলত দুটো বিষয় কাজ করে। প্রথমত, ইচ্ছার বিরুদ্ধে যখন কারও নির্দেশ অনুযায়ী তারা কাজ করেন এবং দ্বিতীয়ত, নিজেকে অতি তৎপর হিসেবে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে প্রমাণের জন্য। কিন্তু তারা একবারের জন্যও ভাবেন না বিষয়টি প্রকাশিত বা প্রচারিত হওয়ার পর, কোনো ব্যক্তির মধ্যে আর সীমাবদ্ধ থাকবে না। এর দায় নিতে হবে পুরো বাহিনীকেই।
সরকারের সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষের কাছে, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদেরই জবাবদিহি করতে হয়। সেক্ষেত্রে মামলার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তার যতটুকু জবাবদিহি করতে হয়, তা কেবলমাত্র নিজস্ব বলয়ের মধ্যেই। তবে এমনটি ভাবার কোনো কারণ নেই, সেই পুলিশ কর্মকর্তা সংশ্লিষ্ট থানার অফিসার ইনচার্জের (ওসি) অনুমতি ছাড়াই এমনটি করেছেন। অবশ্য যারা এসব করেন, তারা থাকেন আলোচনার বাইরে।
এ পর্যন্ত অসংখ্য ভুতুড়ে মামলা হয়েছে। দেশব্যাপী সমস্ত থানা কার্যালয়ে খোঁজ নিলে দেখা যাবে সেই মামলার সংখ্যা হবে কয়েক হাজার। আর আসামি হয়েছেন কত সংখ্যক নিরপরাধ মানুষ, তা সহজেই অনুমান করা যায়। তবে সমস্ত ঘটনাকে ছাপিয়ে এবারের ঘটনাটি বেশ কৌতূহলের সৃষ্টি করেছে। জানা গেছে, কিছু গায়েবি মামলার ক্ষেত্রে যাদের আসামি করা হয়েছে, তারা ঘটনাস্থলে ছিলেনই না। এমনকি দেশের বাইরের মানুষও আসামি হয়েছেন। অবাক করার বিষয় হচ্ছে, মৃত ব্যক্তিকেও আসামির অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে! এসব আসলে কার ভুল? অবশ্য এই ভুল যদি ইচ্ছাকৃতভাবে করা হয়ে থাকে, তাহলে সেটি আইনের দৃষ্টিতে অপরাধ। আর যদি বিষয়টি অনিচ্ছাকৃত হয়, তাহলে সেটি ভুল। প্রশ্ন হচ্ছে, এই বিষয়টি তদন্ত করবে কে? তিনিও যে অন্যায় করবেন না তার গ্যারান্টি কী! এমন একটি অবস্থার মধ্যে, পুরো পুলিশ প্রশাসনকেই প্রশ্নের মুখোমুখি করা হয়েছে। আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ও নিরীহ মানুষ, স্বাভাবিকভাবেই বিষয়টিতে আতঙ্কিত বোধ করছেন। যার কারণও রয়েছে। এ বিষয়ে দেশ রূপান্তরে বৃহস্পতিবার ‘গায়েবি মামলায় পুলিশও বিব্রত’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। সেখানে বিষয়টি বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে নাম প্রকাশ না করার শর্তে পুলিশ সদর দপ্তরের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বলেন, ‘গায়েবি মামলা ও আসামিদের নিয়ে সমালোচনা ওঠায় আমরা বিব্রত। পুলিশ তাড়াহুড়া করে কেন মামলা নিল, সে বিষয়ে তদন্ত করছি। সম্প্রতি পুলিশের ইউনিটপ্রধান, রেঞ্জ ডিআইজি ও জেলার এসপিদের কাছে এর ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে। ভবিষ্যতে যেন এ ধরনের কোনো ঘটনা না ঘটে সেদিকে বিশেষ নজর দিতে বলা হয়েছে। তাড়াহুড়া বা অতি উৎসাহী মামলা নেওয়া যাবে না। যারা গায়েবি আসামি ও মামলা করেছে, তাদের বিষয়েও খোঁজ নেওয়া হবে। তবে আন্দোলনের নামে সরকারবিরোধীরা কোনো বিশৃঙ্খলা করলে অবশ্যই কঠোরভাবে মোকাবিলা করা হবে। সামনের দিনগুলোতে রাজনৈতিক অস্থিরতা দেখা দেবে তা আমরা নিশ্চিত।’
আইজিপি বৈঠকে বলেছেন, দেশের শান্ত পরিবেশ যাতে কেউ অশান্ত করতে না পারে, সেজন্য সবাইকে সতর্ক থাকতে; বিশেষ করে রাজনৈতিক দুর্বৃত্তদের এলাকাভিত্তিক তালিকা করে তাদের শক্তভাবে মোকাবিলা করতে হবে। হুটহাট করে পুলিশকে গুলি করতে বারণ করা হয়েছে। যেখানে লাঠিচার্জ করলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে, সেখানে গুলি করা যাবে না। তবে গুলি বা টিয়ার শেল নিক্ষেপ করলে অবশ্যই ঊর্ধ্বতনদের অনুমতি নিয়ে তা ব্যবহার করতে হবে।
এর মানে কী, আগে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার অনুমতি ছাড়াই কোনো কোনো ক্ষেত্রে গুলি বা টিয়ার শেল নিক্ষেপ করা হয়েছে! যদি তাই হয়ে থাকে, তাহলে এসব কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা দরকার। তবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানের একটি কথা বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি বলেছেন, আসলে গায়েবি মামলা হচ্ছে কি না, সেই বিষয়ে তদন্ত করা হচ্ছে। আর তদন্তে এ ধরনের ঘটনার সম্পৃক্ততা পাওয়া গেলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে যারা নাশকতা ও বিশৃঙ্খলার সঙ্গে জড়িত থাকবে তাদের আইনের আওতায় আনা হবে।
আমরা জানি, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ‘চেইন অব কমান্ড’ যথেষ্ট শক্তিশালী। এরপরও যদি অনাকাক্সিক্ষত এই ধরনের ঘটনা ঘটতেই থাকে, তাহলে পুরো বাহিনীকেই এই দায়ভার নিতে হবে যা কোনোভাবেই আমরা চাই না।
