বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতির দেশব্যাপী সমন্বিত কম্প্রিহেনসিভ ডিজিটাল হেলথকেয়ার (ইঈউঐ) কর্মসূচি বাস্তবায়নের মাধ্যমে স্বাস্থ্যসেবা খাতে একটি নবদিগন্তের সূচনা হতে চলেছে। মূলত এবং মুখ্যত আধুনিক ও নির্ভরযোগ্য স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রমকে জনগণের দোরগোড়ায় নিয়ে যাওয়ার এটি একটি সৃজনশীল উদ্যোগ। এই প্রকল্পের আওতায় গৃহীত কর্মসূচি একটি দক্ষ, কার্যকর, সাশ্রয়ী এবং সহজলভ্য চিকিৎসাসেবা প্রক্রিয়া। দেশ-বিদেশে মানুষ এখন স্বাস্থ্যসেবায় আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারে বেশ উৎসাহ দেখাচ্ছে। প্রযুক্তির দ্রুত উন্নয়নে স্বাস্থ্যসেবা প্রদানের পদ্ধতিতেও কার্যকর পরিবর্তন সূচিত হচ্ছে। জনস্বাস্থ্যসেবাকে দেশব্যাপীকরণে কম্প্রিহেনসিভ ডিজিটাল হেলথকেয়ার কর্মসূচির বাস্তবায়ন বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতির এই অভিনব উদ্যোগ সরকারের কমিউনিটি ক্লিনিক কিংবা ইউনিয়ন বা থানা হেলথ কমপ্লেক্সে আধুনিক চিকিৎসাসেবা দানের অবকাঠামো ও প্রক্রিয়াগত অপ্রতুলতা কাটিয়ে ওঠার ক্ষেত্রে সরকারি খাতের ব্যবস্থাপনায় যে অসম্পূর্ণতা রয়েছে তাকে পূর্ণতা প্রদানে সহায়ক ভূমিকায় (স্বশাসিত ও স্বেচ্ছাসেবী) থাকবে। সমিতির এই ভূমিকা দেশের স্বাস্থ্য খাতকে অধিকতর সেবামুখী করবে। সরকারি খাতের পরই বেসরকারি খাতে বৃহত্তর পরিসরে ৬৮ বছর বয়সী বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতির স্বাস্থ্যসেবা নেটওয়ার্ক রয়েছে দেশব্যাপী। জাতীয় অধ্যাপক মোহাম্মদ ইব্রাহিম (১৯১১-১৯৮৯) প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতির প্রতিষ্ঠানগুলো এখন শুধু ডায়াবেটিক চিকিৎসায় সীমিত নয়। যেসব শারীরিক সমস্যা বা রোগের আহ্বায়ক ডায়াবেটিস, সেসব শারীরিক রোগ যথা হাইপারটেনশন, হৃদরোগ, কিডনি, চোখ, কান, গলা, দাঁত, বক্ষব্যাধি, লিভার, নিউরো ও ইউরোলজি, গ্যাস্ট্রিওলজি ইত্যাদি চিকিৎসার ক্ষেত্রে সাধারণ চিকিৎসালয় (জেনারেল হাসপাতাল) বা স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র হিসেবে ভূমিকা পালন করছে। সেই সেবা ব্যবস্থাপনায় ক্লিনিক্যাল ল্যাবরেটরি টেস্টিং, মেডিকেল ইমেজিং, রোগী-চিকিৎসকের পরামর্শ, এমনকি ছোটখাটো অস্ত্রোপচার পদ্ধতিও ডিজিটাল প্রযুক্তির সাহায্যে প্রত্যন্ত অঞ্চলে সাশ্রয়ী মূল্যে সরবরাহ করা হয় এই উদ্যোগের মাধ্যমে। আগামী ৬ সেপ্টেম্বর জাতীয় অধ্যাপক ইব্রাহিমের ৩৪তম মৃত্যুবার্ষিকী। প্রতিষ্ঠাতার মৃত্যদিবসকে বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতি ‘সেবা দিবস’ হিসেবে পালন করে।
প্রসঙ্গত, মোবাইল প্রযুক্তির বিবর্তনের ফলে রোগী-চিকিৎসকের পরামর্শের জন্য হোয়াটসঅ্যাপ, ভাইবার, ইমো ইত্যাদির মতো সামাজিক অ্যাপের ব্যবহার বেড়েছে। রক্ত এবং মূত্র পরীক্ষা এখন সঠিক এবং দ্রুত ফলাফল প্রদানের জন্য কমভোগ্য সামগ্রীসহ ছোট সরঞ্জাম ব্যবহার করে পরিচালিত হচ্ছে। পোর্টেবল হ্যান্ড-হোল্ড ডিভাইসগুলো আলট্রাসাউন্ড, রক্তনালিতে তরল প্রবাহ এবং ইসিজির মতো ইলেকট্রনিক রেকর্ডিংয়ের জন্য ব্যবহৃত হচ্ছে। টেলিমেডিসিনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল রোগী এবং ডাক্তারের মধ্যে মুখোমুখি পরামর্শের অভিজ্ঞতার প্রতিস্থাপন করতে না পারা। এখন, পোর্টেবল হ্যান্ড-হোল্ড ডিভাইসের সংমিশ্রণ, দ্রুত-পরীক্ষা ল্যাবরেটরি সরঞ্জাম এবং সামাজিক অ্যাপগুলোর সঙ্গে অডিও-ভিজ্যুয়াল যোগাযোগের ব্যবহার রোগী এবং ডাক্তার উভয়ের জন্য টেলিমেডিসিন কার্যক্ষমতা ও অভিজ্ঞতাকে ব্যাপকভাবে উন্নত করতে পারে। বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতির অধিভুক্ত অ্যাসোসিয়েশনের মাধ্যমে ৬৪টি জেলা এবং ১৯টি উপজেলায় হাসপাতাল এবং বহির্বিভাগের রোগীদের কেন্দ্রগুলোর বিশাল নেটওয়ার্কে প্রযুক্তিগত বিপ্লব থেকে উপকৃত হতে ডিজিটাল সমন্বিত স্বাস্থ্যসেবা প্রদানের জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত হচ্ছে। কম্প্রিহেনসিভ ডিজিটাল হেলথকেয়ার সেন্টারে যেসব সেবা মিলবে : সরাসরি প্রাথমিক চিকিৎসা ও ভিডিও কনসালটেশনের মাধ্যমে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসাসেবা প্রদান, ল্যাবরেটরি ইনভেস্টিগেশন, ইসিজি, আলট্রাসনোগ্রাম, এক্স-রে, মাইনর ইন্টারভেনশন, ওষুধ বিক্রয় এবং সরকারি ও বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতির (বাডাস) বিশেষায়িত হাসপাতালগুলোতে রেফার করা।
কেন্দ্রগুলো সারাদেশে একটি বৃহৎ রেফারেল নেটওয়ার্ক গঠনের জন্য জেলা এবং শহর পর্যায়ের চিকিৎসা সুবিধাগুলোর সঙ্গে সংযুক্ত স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলোর একটি নেটওয়ার্ক তৈরি করবে। ডায়াবেটিক সমিতির চিকিৎসা সুবিধার দেশব্যাপী নেটওয়ার্ক এবং বিশেষায়িত হাসপাতালে এখন একাধিক চিকিৎসা শাখায় বিশেষজ্ঞ এবং পরামর্শদাতাদের একটি বিশাল পরিসর রয়েছে। এ ছাড়াও যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, কানাডা এবং অস্ট্রেলিয়ার মতো দেশের বেশ কয়েকজন বিশেষজ্ঞ অনলাইনে ভিডিও পরামর্শ প্রদান করবেন। কেন্দ্রের মাধ্যমে রোগীদের অনলাইন ভিডিও পরামর্শ প্রদানের জন্য স্থানীয় এবং আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের একত্রিত করে অনুষদের একটি প্যানেল থাকবে। ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবা প্রত্যন্ত অঞ্চলে উন্নত স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ বা লভ্যতার সুযোগ বৃদ্ধি করবে। বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতি সবসময় স্বাস্থ্যসেবা পরিষেবা সরবরাহের উন্নতির জন্য যে নতুন নতুন পদ্ধতি উদ্ভাবন ও লালন করেছে। সমিতি ডাক্তারদের দক্ষতা বাড়ানোর জন্য সার্টিফিকেট কোর্স চালু করেছে। এমনকি গার্মেন্টস কর্মীদের জন্য স্বাস্থ্যবীমা পাইলট প্রকল্পে টেলিমেডিসিন সেবা, ইব্রাহিম কার্ডিয়াকে ইব্রাহিম হেলথলাইন, বিএনডিআরের রোল আউট ইত্যাদি কর্মসূচি বাস্তবায়িত হচ্ছে। জনস্বাস্থ্যসেবা পরিস্থিতিসংক্রাস্ত সাম্প্রতিক এক সমীক্ষায় দেখানো হয়েছে, গ্রামীণ এলাকায় বসবাসকারী প্রতি ১০,০০০ জন মানুষের জন্য মাত্র ২.৪১ জন চিকিৎসক, ১.৩৬ জন নিবন্ধিত নার্স রয়েছে; এবং প্রতি মিলিয়ন মানুষের জন্য মাত্র ১০টি হাসপাতাল রয়েছে, যেখানে প্রতি ৪০০০ জন মানুষের জন্য হাসপাতালের শয্যা রয়েছে মাত্র ১টি। ইন্টারন্যাশনাল ডায়াবেটিক ফেডারেশনের অনুমান বাংলাদেশে এখনো শতকরা ৪৫ ভাগ মানুষের ডায়াবেটিস আছে কিনা তা পরীক্ষা করা বাকি।
অন্যদিকে এখন এটি উপলব্ধিতে আসছে যে, দেশের প্রত্যন্ত কোণে প্রযুক্তির ব্যবহার করে স্বাস্থ্যসেবা পরিষেবা সাশ্রয়ীভাবে প্রসারিত করতে পারলে অপ্রয়োজনীয় ও অদক্ষ হাসপাতাল বা চিকিৎসকের ওপর নির্ভরশীলতা কমানো সম্ভব। ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবা এমন বাস্তবতা যেখানে প্রযুক্তির সহায়তায় রোগীর যতেœর উন্নতি ও সেবা বৃদ্ধি করা সম্ভব। পোর্টেবল ডিভাইস দিয়ে দ্রুত-পরীক্ষা, ক্লিনিকাল ল্যাবরেটরি বিশ্লেষণের মাধ্যমে প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে হার্টের কিংবা জটিল রোগীকে তাৎক্ষণিক চিকিৎসা দিয়ে টেলিকনফারেন্সের মাধ্যমে প্রাপ্ত বিশেষজ্ঞ পরামর্শক্রমে রোগীকে দ্রুত যথা চিকিৎসালয়ে পৌঁছানো সম্ভব হবে। হার্ট অ্যাটাকের রোগীকে ন্যূনতম সময়ের মধ্যে চিকিৎসার পরিধিতে আনতে পারলে বড় ধরনের ক্ষতি এড়ানো সম্ভব হয়।
পাইলট হিসেবে তিনটি সেন্টার উদ্বোধন করা হয়েছে, সেগুলো হলোÑ ক. উখিয়া, কক্সবাজার খ. খোকসা, কুষ্টিয়া এবং গ. বাবুগঞ্জ, বরিশাল। ওই সেন্টারগুলোর প্রত্যেকটিতে পাঁচজন করে লোকবল নিয়োগ দিয়ে প্রান্তিক এলাকার জনসাধারণকে চিকিৎসাসেবা প্রদান করা হচ্ছে। এই পাঁচজনের মধ্যে রয়েছেন একজন ডাক্তার (এমবিবিএস), একজন নার্স, একজন সেন্টার/মেডিকেল অ্যাসিসটেন্ট, একজন ল্যাব টেকনোলজিস্ট এবং একজন ক্লিনার। সেন্টারগুলোতে প্রাথমিক চিকিৎসাসেবার পাশাপাশি ল্যাবরেটরি ইনভেস্টিগেশন (ডায়াবেটিস, রক্ত, মূত্র, হরমোন ইত্যাদি মোট ৩৬টি পরীক্ষা), ইসিজি, আলট্রাসনোগ্রাম এবং ভিডিও কনসালটেশনের মাধ্যমে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক দ্বারা চিকিৎসাসেবা প্রদানের ব্যবস্থা রয়েছে। খুব শিগগির আরও ২টি সেন্টার চালু করার প্রস্তুতি চলছে, হবিগঞ্জের গ্রাম পঞ্চাশ, শায়েস্তাগঞ্জ এবং অপরটি শ্যামনগর, সাতক্ষীরা। এ পর্যন্ত ৪টি অধিভুক্ত সমিতি যথা : দিনাজপুর ডায়াবেটিক সমিতি (সেতাবগঞ্জ), বগুড়া ডায়াবেটিক সমিতি (তালোড়া), পাবনা ডায়াবেটিক সমিতি (কাশিনাথপুর), ঠাকুরগাঁও ডায়াবেটিক সমিতি (রানীশংকৈল) তাদের সাব-সেন্টারগুলোকে বাডাস কম্প্রিহেনসিভ ডিজিটাল হেলথকেয়ার প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত করার ইচ্ছা ব্যক্ত করেছে।
তিনটি সেন্টার পাইলটিং করে দেখা যায় যে, প্রতিটি সেন্টার প্রতিষ্ঠায় জমির মূল্য বাদে প্রায় ৭০ থেকে ৮০ লাখ টাকা ব্যয়ে এ ধরনের ৩০টি সেন্টার প্রতিষ্ঠা করতে প্রায় ২০ কোটি টাকার প্রয়োজন হবে। সরকারি আর্থিক সহযোগিতা পেতে বাডাস কম্প্রিহেনসিভ ডিজিটাল হেলথকেয়ার প্রজেক্টের (বিসিডিএইচপি) আওতায় ৩০টি সেন্টার স্থাপনের জন্য একটি ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট প্রপোজাল (ডিপিপি) পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে দাখিল করা হচ্ছে। টেলিমেডিসিন যোগাযোগ ব্যবস্থা (অনলাইন ভিডিও পরামর্শের জন্য উচ্চগতির ইন্টারনেট সংযোগ এবং সরঞ্জাম) গড়ে তোলার জন্য সরকারের টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয় থেকে বিশেষ সহায়তা চলমান রয়েছে ।
কম্প্রিহেনসিভ ডিজিটাল হেলথকেয়ার প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতি (বাডাস) এবং সিটি হেলথ লিমিটেডের মধ্যে চুক্তিপত্র সম্পাদন করা হয়েছে। কম্প্রিহেনসিভ ডিজিটাল হেলথকেয়ার প্রকল্প, ইব্রাহিম হেলথলাইনের একটি সম্প্রসারিত প্রকল্প। ইব্রাহিম হেলথলাইন স্বাস্থ্যসেবায় আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
প্রসঙ্গত যে, ভুটানের প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস পাস করা একজন ডাক্তার। ভুটানের স্বাস্থ্যমন্ত্রী, পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং ভুটানের রাজ পরিবারের চিকিৎসক প্রত্যেকেই বাংলাদেশ থেকে এমবিবিএস পাস করা ডাক্তার। ভুটানের প্রধানমন্ত্রী কম্প্রিহেনসিভ ডিজিটাল হেলথকেয়ারসেবা গ্রহণের জন্য বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতির (বাডাস) সভাপতি জাতীয় অধ্যাপক এ কে আজাদ খান-এর কাছে তাদের ইচ্ছা ব্যক্ত করেছেন। ভুটানে যদি বাডাস কম্প্রিহেনসিভ ডিজিটাল হেলথকেয়ার প্রকল্প চালু করা যায়, তবে নেপালেও স্বাস্থ্যসেবাকে উন্নত করার লক্ষ্যে কম্প্রিহেনসিভ ডিজিটাল হেলথকেয়ার প্রকল্প চালু করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
লেখক: সরকারের সাবেক সচিব বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতির ন্যাশনাল কাউন্সিল সদস্য