আমার ছেলে প্রসূনের বন্ধু তাহমিদ। সেন্ট যোসেফ স্কুল থেকেই তারা একসঙ্গে পড়াশোনা করছে। দুজন ভর্তি হয়েছিল বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসে। বন্ধুমহলে প্রসূন বেশ লম্বা, ছয় ফুট ছাড়িয়েছে আগেই। কিন্তু তাহমিদ প্রসূনের চেয়েও লম্বা। স্বাস্থ্যও প্রসূনের চেয়ে ভালো। সব মিলিয়ে দারুণ হ্যান্ডসাম। তাহমিদের বাবা দুবাইয়ে চাকরি করেন। বড় বোন আর মাকে নিয়ে বনশ্রীতে তাদের বাসা। সচ্ছল পরিবারের সন্তান তাহমিদ, দাবড়ে বেড়াত ঢাকা। বাবা দেশের বাইরে ছিল বলে, তাহমিদই ছিল তার পরিবারের কর্তা। নিজে গাড়ি চালিয়ে ইউনিভার্সিটিতে যেত। মধ্যরাতে মা-বোনকে নিয়ে চলে যেত কখনো মাওয়া, কখনো অন্য কোথাও। হঠাৎ এক শুক্রবার সকালে শুনি তাহমিদ মারা গেছে! আমাদের কারও বিশ্বাসই হচ্ছিল না। বুধবারও তাহমিদ গাড়ি চালিয়ে ইউনিভার্সিটিতে গেছে। রাতে এক আত্মীয়ের গায়ে হলুদে অংশ নিয়েছে। পরদিন নিজে ডাক্তারের কাছে গেছে। বৃহস্পতিবার গভীর রাতে খারাপ লাগছিল বলে নিজে থেকেই যেতে চেয়েছে। মা-বোনের সঙ্গে হাসপাতালে যাওয়ার পথে গাড়িতে মায়ের কাঁধে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়ে। হাসপাতালে যাওয়ার পর ডাক্তাররা জানান, গাড়িতেই মারা গেছে তাহমিদ। মায়ের কাঁধে মাথা রেখেই চিরঘুমে চলে গেছে তাহমিদ। মাত্র দুদিনের জ্বরে তাহমিদের মতো প্রাণবন্ত একটি ছেলের চলে যাওয়ার শোক এখনো সামলে উঠতে পারিনি আমরা। সন্তান হারানোর বেদনায় আর্ত আমরাও। তার বন্ধুরা এখনো বিশ্বাসই করতে পারছে না। একবার ভাবুন সেই মায়ের কথা, যার কাঁধে মাথা রেখে ঘুমিয়ে গেল সন্তান। গত একমাসে সেই মাকে একাধিকবার হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়েছে। বনশ্রীতে তাদের বিশাল বাসায় এখন খাঁখা শূন্যতা, বাসাজুড়ে তাহমিদের স্মৃতি। কীভাবে ভুলবে সেই মা, সেই বোন।
শুধু তাহমিদের পরিবার নয়, দেশের শত শত পরিবারে এখন একই ধরনের কান্না, হাহাকার। তছনছ হয়ে গেছে অসংখ্য পরিবার, মুছে গেছে শত স্বপ্ন। এক সপ্তাহে পরিবারের দুই সন্তানকে হারানোর বেদনায় নীল পরিবারের কান্নাও ছুঁয়ে গেছে সবাইকে। হাসপাতালে হাসপাতালে এখন উপচেপড়া ভিড়। কোথাও আসন খালি নেই, আইসিইউ তো সোনার হরিণ। দুঃখটা হলো ডেঙ্গু কিন্তু নতুন অসুখ নয়। অনেক পুরনো রোগ। তবে বাংলাদেশে এই জ্বর শনাক্ত হয়েছে ২০০০ সালে। এমনিতে বলা হয়, ডেঙ্গু মূলত বর্ষার রোগ। জুন থেকে সেপ্টেম্বর হলো ডেঙ্গুর মৌসুম। কিন্তু এবার বর্ষার আগেই ডেঙ্গু তার থাবা বিস্তার করে। লক্ষণ দেখে মৌসুম শুরুর আগে থেকেই স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বলে আসছিল, দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে এ বছর ডেঙ্গুর বিস্তার হবে ভয়াবহ। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের আশঙ্কাই সত্যি হয়েছে। ডেঙ্গু এখন মহামারী আকার ধারণ করেছে। প্রতিদিনই মৃত্যুর মিছিলে যুক্ত হচ্ছে নতুন নতুন নাম। কান্নায় ভারী হচ্ছে বাতাস।
২০০০ সালে শনাক্তের পর থেকে এতদিনে ডেঙ্গুর কারণ, চিকিৎসা সম্পর্কে সবাই জেনে গেছে। তারচেয়ে বড় কথা হলো, ডেঙ্গুর চিকিৎসা তেমন জটিলও নয়, ব্যয়বহুলও নয়। আশা ছিল, ডেঙ্গুর বিস্তার যাই হোক, মৃত্যুর সংখ্যা অনেক কম হবে। কিন্তু আশা ভয়ংকর আশঙ্কায় বদলে গেছে। হু হু করে বাড়ছে কান্না, বাড়ছে মৃত্যুর সংখ্যা।
স্বাভাবিক সময়েই বাংলাদেশের হাসপাতালগুলোতে আসনের চেয়ে অনেক বেশি রোগী থাকে। আর করোনা বা ডেঙ্গুর মতো অস্বাভাবিক পরিস্থিতি তৈরি হলে সবকিছু আয়ত্তের বাইরে চলে যায়। তারপরও কীভাবে যেন গাদাগাদি করে মানুষ হাসপাতালে থাকে। একবার ভাবুন, দেড় কোটি মানুষের এই ঢাকায় যদি এক ভাগ মানুষও ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়, তাহলেও সংখ্যাটা দেড় লাখ! এই দেড় লাখ মানুষ হাসপাতালে ভর্তি হতে চাইলে, কোথায় পাবে আসন?
এতদিন জানতাম, ডেঙ্গু অত ভয়ংকর নয়। খালি সময়মতো রোগটা শনাক্ত হতে হবে এবং সঠিক সময়ে ডাক্তারের কাছে যেতে হবে। তাই জ্বর হলে একদম খামখেয়ালি করা যাবে না। সঙ্গে সঙ্গে ডেঙ্গুর টেস্ট করতে হবে। ডেঙ্গুর টেস্টও ব্যয়বহুল নয়। সরকারি হাসপাতালে ১০০ টাকাতেই ডেঙ্গুর টেস্ট করা যাবে। আর ডেঙ্গু হলেই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের কাছে ছুটতে হবে এমনও নয়। এখন ডেঙ্গুর চিকিৎসা প্রটোকল বাংলাদেশের সব চিকিৎসকেরই মুখস্থ। পরিমাপমতো স্যালাইন দিলেই অনেক সময় সুস্থ হয়ে যাওয়ার সুযোগ থাকে। তবে সময়মতো সেই পরিমাপটা ঠিক করা খুব গুরুত্বপূর্ণ। প্লাটিলেট বেশি কমে গেলে রক্ত দিতে হতে পারে। তবে সতর্ক থাকলে এবং শুরুতেই শনাক্ত হয়ে গেলে অল্পতেই সুস্থ হওয়া সম্ভব। কিন্তু এখন সব এলোমেলো লাগছে। হাসপাতালে ভিড় কমাতে ডাক্তাররা বলছেন, জ্বর হলেই হাসপাতালে ছুটে আসবেন না। তাহলে সাধারণ মানুষ কী করবে? দ্রুত হাসপাতালে গেলেও সমস্যা আবার সময় মতো না গেলেও মৃত্যুর ঝুঁকি। আবার জ্বর আসার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে টেস্ট না করলে নাকি ডেঙ্গু ধরা পড়ে না। কোনটা ডেঙ্গু, কোনটা ম্যালেরিয়া, কোনটা টাইফয়েড, কোনটা ভাইরাল জ্বর সাধারণ মানুষ কীভাবে বুঝবে? এতদিন ডেঙ্গু ছিল শহুরে অসুখ, অভিজাত রোগ। কিন্তু এবার ডেঙ্গু ছড়িয়ে পড়েছে সারা দেশে। সব মিলিয়ে আমার কাছে ডেঙ্গুকে এবার করোনার চেয়েও ভয়ংকর লাগছে।
সবাই মিলে চেষ্টা করলে ডেঙ্গুতে মৃত্যু রোধ করা সম্ভব। তবে সেটার জন্য ডাক্তার, হাসপাতাল, চিকিৎসা ব্যবস্থার ওপর ভরসা করলে হবে না। ডেঙ্গুতে মৃত্যু কমানোর উপায় একটাই, এডিস মশা থেকে দূরে থাকা। আপনার এলাকায় যদি মশার উৎপাত থাকে, দিনরাত মশারি টানিয়ে রাখুন। বিশেষ করে, শিশুদের মশারির ভেতরে রাখুন। যথাসম্ভব হাত-পা ঢেকে রাখুন, যাতে মশা আপনার নাগাল না পায়। তবে অফিস-আদালত, চাকরি-বাকরি, স্কুল-কলেজ ফেলে সারা দিন তো আর মশারির ভেতরে কাটানো সম্ভব নয়। তাই মশা থেকে দূরে থাকার সবচেয়ে সহজ উপায় হলো, মশার বংশবিস্তার ঠেকিয়ে রাখা, আর বংশবিস্তার ঠেকাতে না পারলে মেরে ফেলা।
অনেক বছর ধরে ডেঙ্গুর কারণে মশা মারার বিষয়টা নিয়ে আলোচনা হয়। কিন্তু কখনোই ‘মশক নিধন অভিযান’ পুরোপুরি সফল হয় না। কখনো ওষুধ ফুরিয়ে যায়, কখনো ওষুধ কাজ করে না। মশা মারতে কামান দাগার কথা শুনেছি। কিন্তু এখন দেখছি কামানেও কাজ হবে না। মশা মারতে আামাদের দেশে হাইকোর্টের হস্তক্ষেপ লাগে। এবার আগেভাগেই ডেঙ্গু নিয়ে আলোচনাটা শুরু হয়েছিল। আশা করেছিলাম, নগরপিতারা পরিকল্পনা করে মশা মারতে মাঠে নামবেন। কিন্তু তারা কথায় কামান দাগতে যতটা ওস্তাদ, মশা মারতে ততটা নন। মশার কামড়ে ছড়িয়ে পড়ে অনেক রোগজীবাণু। তবে মশার মধ্যে এখন সবচেয়ে ভয়ংকর হলো এডিস। এই মশাই ডেঙ্গুর বাহক।
সিটি করপোরেশন নির্বাচনের আগে মেয়র প্রার্থীরা সম্ভব-অসম্ভব অনেক প্রতিশ্রুতি দেন। সাদা চোখে সিটি করপোরেশনের প্রধান কাজ দুটি প্রতিদিন ময়লা পরিষ্কার করা আর মশা মারা। এ দুটি কাজ করতেই মেয়রদের নাভিশ্বাস। প্রতিদিন গৃহস্থালি বর্জ্য অপসারণের তবু একটা সিস্টেম দাঁড়িয়েছে, কিন্তু রাস্তাঘাট এখনো অনেক ময়লা, ঢাকার খালগুলো সব আবর্জনায় অচল হয়ে গেছে। আর এই ময়লা হলো, মশার বংশবিস্তারের জন্য সবচেয়ে ভালো। সিটি করপোরেশন কিছু করেনি, সেটা বলব না। তারা চেষ্টা করেছে। অনেক চেষ্টা করলেন, কিন্তু মশা মরল না। উল্টো মানুষ মরছে শত শত, তাহলে লাভটা কী হলো?
এখন জান বাঁচাতে মশার বিরুদ্ধে সম্মিলিত লড়াই চালাতে হবে। সব দায়িত্ব মেয়রদের হাতে দিয়ে, তাদের ব্যর্থ হওয়ার জন্য অপেক্ষা করার চেয়ে, নিজেদের কাজটুকু নিজেরা করা ভালো। এডিস মশা ঠেকানোর কৌশল আমাদের সবার জানা। কোথাও ময়লা রাখা যাবে না, পানি জমতে পারে, এমন কোনো ব্যবস্থা যেন না থাকে। আমাদের চারপাশ পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে; পরিত্যক্ত ডাবের খোসা, টায়ার, নজরের বাইরে থাকা ফুলের টব, নির্মাণকাজের খানাখন্দে পানি জমতে দেওয়া যাবে না। ছাদ বাগানের দিকে যেন সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে। সাধের ছাদ বাগান যেন আপনার মৃত্যুর কারণ না হয়। স্বচ্ছ পানি জমতে না পারলে এডিস বংশবিস্তার করতে পারবে না। তবে সিটি করপোরেশন একা যেমন পারবে না, আবার ব্যক্তি সচেতনতায়ও পুরোপুরি নিরাপদ থাকা যাবে না। সচেতনতার একটা সম্মিলিত প্রয়াস লাগবে। কারণ আপনি আপনার বাসা নিরাপদ রাখলেন কিন্তু পাশের বাসায় যদি এডিসের কারখানা থাকে, আপনি কিন্তু বাঁচতে পারবেন না। তাই মশার বিরুদ্ধে লড়াইটা হতে হবে সর্বাত্মক, বছরজুড়ে এবং দেশজুড়ে।
এডিস মশা আপনাকে কামড়ালে আপনার ডেঙ্গু হতে পারে। ডেঙ্গু হয়ে গেলে ডাক্তার, সরকার, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, হাসপাতালকে গালি দিয়ে পার পাওয়া যাবে না। হাসপাতালে আসন বা আউসিইউ বাড়ানোর চেয়ে, সবাই মিলে এডিসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নামাটাই বুদ্ধিমানের কাজ।