রাজনীতিতে ভাঁড়ামি উৎসব

আপডেট : ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৩, ১২:১৫ এএম

পরস্পরকে ঘায়েল করতে গিয়ে রাজনীতির মাঠে এখন ননস্টপ সার্কাস আর ভাঁড়ামির শোডাউন। বাকস্বাধীনতার এই আচানক মেগা শোতে, যার মুখ দিয়ে যা আসছে বলছেন। ধিক্কার জানানোর কেউ নেই। বরং মিলছে করতালি। সঙ্গে মিডিয়া কাভারেজ। রুচি-শিষ্টাচার এখানে একদম অপ্রাসঙ্গিক।

দেশে ডেঙ্গুতে প্রতিদিন কত মানুষ মরছে, ডেঙ্গু আক্রান্তদের চিকিৎসা ব্যয় মেটাতে গিয়ে কতজন সর্বহারা হচ্ছেন; তার চেয়ে ‘উন্নয়নের গীত’ আর ‘গণতন্ত্রের ছবক-বয়ান’ই গুরুত্বপূর্ণ খবর। সামনে যে সার সংকটের ভয়ানক শনি ঘুরছে, এটিও সংবাদ নয়। এর চেয়ে দামি সংবাদ যুক্তরাষ্ট্রের সাপোর্ট কোনদিকে বেশি, ভারত এবার কী ভূমিকা নেবে, কার মামলা ঠেকাতে কে চিঠি দিল, সেলফিতে কে বেশি হিট ভাইরাল? মানুষ কেবলই দশর্ক-শ্রোতা। নইলে বিনোদিত। যেমন বিনোদিত বুবলি-শাকিবের ছেলে বীর আজ কী খেয়েছে, সেই সংবাদে।

ভাঁড়ামির সমান্তরালে সম্প্রতি তারা আতঙ্ক ছড়ানো ও রটানোর কাজেও নেমেছেন। বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর আশঙ্কা ব্যক্ত করে বলেছেন, হাজারো নেতাকর্মী প্রতিদিন আদালতের বারান্দায় ঘুরছে। এক-দেড় মাসের মধ্যে হয়তো তাকেও জেলে যেতে হতে পারে। বিএনপি মহাসচিবের জেল আতঙ্কের বার্তা দেওয়ার ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের বিবৃতি। মির্জা ফখরুল কোনো অপরাধ করে না থাকলে কি জেল আতঙ্কে ভোগেন? এমন প্রশ্ন ছুড়েছেন ওবায়দুল কাদের। আওয়ামী লীগবিরোধী মত দমন কিংবা কোনো ধরনের মামলা-হামলা দিয়ে হয়রানি করে না বলে দাবি করেন তিনি। এর সপ্তাহখানেক আগে ওবায়দুল কাদেরের ছড়ানো আতঙ্ক ছিল, বিএনপি ক্ষমতায় এলে প্রথম রাতেই আওয়ামী লীগকে বিনাশ করে দেবে।

রাজনীতির মাঠে বহু কথারই জবাব দিতে হয় না। বলে দিলেই হয়। প্রয়োজনে পরে কথা পাল্টে আরেকটা কথা বাজারে ছেড়ে দিলেই হয়ে যায়। বাস্তবতাটাই এমন। চাইলে মির্জা ফখরুলদের গ্রেপ্তার করতে এক-দেড় মাস অপেক্ষা করতে হবে না সরকারকে। সকাল-সন্ধ্যা, যখন-তখনই তাদের কয়েদ করার মতো বেশুমার মামলা তৈরিই আছে। মহাসচিব মির্জা ফখরুলসহ দলটির বিভিন্ন স্তরের নেতাদের নামে নাশকতা-জ¦ালাও-পোড়াও, সরকারি কাজে বাধা, রাষ্ট্রদ্রোহিতাসহ হরেক কঠিন-কঠিন মামলা রয়েছে। যার কোনো কোনোটি দিয়ে বিএনপি নেতাদের গোটা জিন্দেগি কারাগারে রেখে দেওয়া যাবে। কিন্তু আওয়ামী লীগ বা ওবায়দুল কাদেরের এক রাতেই বিনাশ হয়ে যাওয়ার আতঙ্ক কেন? যেখানে তারা বিএনপিকে মরা গাঙ, মুসলিম লীগের দশাগ্রস্ত ভাবেন, বিএনপির নেতা কে-কই? বিএনপিতে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার মতো লোক কই? এ ধরনের প্রশ্নও আছে তাদের।

এমন একটি দল ক্ষমতায় চলে আসবে এবং ক্ষমতায় এসে পয়লা রাতে আওয়ামী লীগকে নিঃশেষ করে দেবে এ আতঙ্ক কেন? ‘এক রাতে আওয়ামী লীগকে শেষ করে দেওয়া’র ক্ষমতা বিএনপির আছে? এ প্রশ্ন নিষ্পত্তিহীন রেখে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের মরণ আতঙ্ক সাধারণ মানুষকেও ভাবিয়ে তুলেছে। নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়ার আতঙ্ক ভর করবে কেন? আওয়ামী লীগ দেশের বড় ও প্রভাবশালী রাজনৈতিক দল। বিপুল জনগোষ্ঠীর সমর্থন তার পেছনে। উপরন্তু গত তিন মেয়াদে ব্যবসায়ী, আমলা, পুলিশ প্রশাসনসহ রাষ্ট্রের যেসব ক্ষমতাবান গোষ্ঠী নানাভাবে সুযোগ-সুবিধা গ্রহণ করেছে, তাদেরও সমর্থন আওয়ামী লীগের সঙ্গে আছে। তাহলে আওয়ামী লীগের কেন এক রাতেই বিএনপি মতো নিঃস্ব একটি দলের হাতে বিনাশ হয়ে যাওয়ার ভয়? যে দলটি টানা ১৭ বছর ধরে ক্ষমতার বাইরে; দলটির শীর্ষ দুই নেতার একজন বিদেশে, আরেকজন শারীরিকভাবে অসুস্থ; যে দলটির ভেতরে নেতৃত্বের কোন্দলের কথা মোটামুটি সবার জানা সেই দলের হাতে আওয়ামী লীগের মতো একটি দল নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে, এ ধরনের আতঙ্ক অর্থহীন? বিএনপি এই ক্ষমতা পেল কই? এর বিপরীত প্রশ্ন আওয়ামী লীগের মতো শক্তিশালী-ক্ষমতাসীন দল এত ক্ষমতা হারাল কোথায়?

বাংলাদেশের রাজনীতিতে পরস্পরকে বিনাশের চেষ্টা বরাবরই আছে। হালে তা নতুন মাত্রা পেল কিনা, ভাবনার অবকাশ রয়েছে। মির্জা ফখরুলের জেলে পচে মরা এবং ওবায়দুল কাদেরের এক রাতে বিনাশ হয়ে যাওয়ার আতঙ্কমাখা বুলি সেই ভাবনাকে আরও গুরুত্ববহ করে তুলেছে। এর মাঝে অথর্মন্ত্রী বলে দিয়েছেন, যারা বলেন দেশের অবস্থা ভালো নয়, তারা অর্থনীতি জানেন না। নিত্যপণ্যের সঙ্গে কথার চাতুরী ও মুখপাণ্ডিত্যের বাজারও আবার গরম। অভিধানও পাল্টে যাওয়ার দশা। একই বিষয়ে আজ এক কথা, কাল আরেক কথার চাতুরী। এই চাতুরী এখন একটা স্মার্টনেস। মিথ্যাচারীর প্রতিশব্দ ‘সুবক্তা’। এদিকে-সেদিকে ঢু মারলে আগে বলা হতো, ডিগবাজ। হাল আমলে তা চমক-ক্যারিশমা। একেকটি ঘটনায় মানুষের কলিজা ছিঁড়ে যাওয়ার মতো কথার তীর আসছে এই চমক ও স্মার্টনেসধারীদের কাছ থেকে। কোনো ছাড় দেওয়া হচ্ছে না, তেল-চাল-ডালসহ নিত্যপণ্যের কষ্টের সময়টাতেও।

বারবার সিঙ্গাপুর-লন্ডন থেকে মেডিকেল চেকআপ করে ফিরে মাননীয়রা মানুষকে চিকিৎসার জন্য বাইরে না গিয়ে দেশপ্রেমের স্বাক্ষর রাখার পরামর্শ দিচ্ছেন। কোথাও থেকে প্রশ্ন আসছে না এ মশকরার বিষয়ে। মাননীয়দের জন্য কথার মাঠ ফাঁকা। তারা যেন একেকটা কথার মেশিন। বলা মাত্রই প্রচার। গুরুত্বপূর্ণ শিরোনাম হয়ে চলে আসছে গণমাধ্যমে। মানুষের কাটা ঘায়ে কাঁটা বসানোর মতো অবারিত সুযোগ-অধিকার তাদের। গত প্রায় সোয়া এক যুগে এই মান্যবরদের বচনগুলো নিয়ে একটি বই সংকলন করলে পরবর্তী প্রজন্মের জন্য সুখপাঠ্য হতে পারে। তারা জানতে পারবে, এ দেশটিতে একদা কিছু রাজমান্যবর ছিলেন। যাদের ছিল অনেক কদর-আদর। রাজ্যের কেউ কখনো তাদের ভুল ধরার সাহস পায়নি। তাদের সতর্ক করেননি তাদের সিনিয়ররা। সংশোধনের তাগিদ আসেনি হাইকমান্ড থেকেও। বরং ধন্য ধন্য বলে সাহস-প্রণোদনা জোগানো হয়েছে। দেওয়া হয়েছে যোগ্য, দক্ষ, অভিজ্ঞ, স্মার্ট, লয়েল, করিতকর্মা, একের মাল, অরিজিনাল, পিওর, পরীক্ষিত, সাহসী ইত্যাদি কত অভিধা!

আইনের শাসনের বদলে শাসনের আইন কায়েম হলে মহোদয়রা যা ইচ্ছা বলতে পারেন। করতেও পারেন। সেই দৃষ্টেই তারা এই কঠিন দিনেও বলে চলছেন উন্নয়ন হলে দুর্নীতি হবেই। মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বেড়ে গেছে। সকালে ঘুম থেকে উঠেই মানুষ দেখে তার মাথাপিছু আয় বেড়ে গেছে। ঢাকার টয়লেটগুলো ফাইভ স্টার হোটেলের মতো। হাতিরঝিল গেলে মনে হয় প্যারিস শহর, আকাশ থেকে ঢাকা শহরকে মনে হয় লস অ্যাঞ্জেলেস। আগামীতে টেমস নদী দেখতে লন্ডন নয়, বুড়িগঙ্গা গেলেই হবে। বহু দেশের মানুষেরই উড়োজাহাজে চড়ার সামর্থ্য নেই, সেখানে আমরা প্লেনে করে পেঁয়াজ নিয়ে আসি এমন কথা পর্যন্ত বাদ দেননি তারা। বিদেশের মন্ত্রীরা এখন বাংলাদেশের মন্ত্রীদের অ্যাপয়েন্টমেন্টের জন্য বসে থাকে এই গর্ব পর্যন্ত জানান দিয়েছেন একজন মন্ত্রী। রাষ্ট্রীয় বা দলীয় সিনিয়ররাও জুনিয়রদের সঙ্গে পেরে উঠতে নামছেন এ প্রতিযোগিতায়। সুফলও পাচ্ছেন। একেক ঘটনায় হাতেনাতে প্রমাণ হচ্ছে মুখের জোরের বরকত।

মুখের জোরের এই সংস্কৃতি রাজনীতির মাঠ গড়িয়ে এখন অন্যদেরও পেয়ে বসেছে। ফুটপাতের ফেরিওয়ালা-দোকানদার থেকে শুরু করে শিক্ষক, সাংবাদিক, মসজিদের ইমাম-খতিব পর্যন্ত কাজের চেয়ে মুখপাণ্ডিত্য রপ্ত করতে মনোযোগী। মুখের সঙ্গে তাদের শরীরী ভাষাও সেই বার্তাই দিচ্ছে। তারা বিশেষ আদর-সমাদর, আদাব-সালাম, তোয়াজ-কুর্নিশ, যত্ন-আত্তি আদায় করে নিচ্ছেন। ঘুষকে স্পিড মানি, দুর্নীতির সঙ্গে যানজটকে উন্নয়নের প্রমাণ, জনভোগান্তিকে উন্নয়নের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার মতো বচনে জায়েজ করার আর বাকি রাখেননি।

ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণে ভিন্নতা থাকতে পারে। বাজারে জ¦লতে থাকা আগুন বা দুর্নীতি-অনিয়ম পাচারকাণ্ড একেবারে লুকানোর কোনো সুযোগ নেই। সরকার তা নেভানো-দমানো বা থামানোর চেষ্টা করছে না এমনও নয়। সাফল্য যাই আসুক না আসুক, গোলমালটা বেশি বাধছে মন্ত্রীসহ ক্ষমতাসীন কারও কারও মুখপাণ্ডিত্যের জেরে। তাদের ভ্যাংচি-খিঁচুনি, আবৃত্তি কাটা গায়ে নুনের ছিটার মতো বিঁধছে কষ্টভোগী মানুষের বুকে। এ প্রবণতার মাঝে শিক্ষা-শিষ্টাচার বা সুস্থ বুদ্ধিবৃত্তিক কিছুই নেই। পুরোটাই দেউলিয়াত্ব। চিন্তাজগতে চরম খরার প্রকাশ।

লেখক: সাংবাদিক-কলামিস্ট ডেপুটি হেড অব নিউজ, বাংলাভিশন

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত