যে শিক্ষা ভুলে যেতে হবে

আপডেট : ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৩, ১০:১৮ পিএম

‘ঘর পোড়া গরু সিঁদুরে মেঘ দেখলে ভয়’ এই প্রবাদই সাধারণ বাঙালির ঐতিহাসিক বঞ্চনার কথা বলে দেয়, একই সঙ্গে ছাপোষা বাঙালির বাড়তি নিরাপত্তা খোঁজার যৌক্তিকতা তৈরি করে। হয়তো একটু বেশিই করে এবং কখনো কখনো বাড়াবাড়ি রকমের হয় বলেই কোনো ধরনের কার্যকারণ সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা ছাড়াই এই ছাপোষা বাঙালির উচ্চাকাক্সক্ষা আকাশসম। যার বেশির ভাগই ব্যক্তিগত ধন-সম্পদ, ভোগবিলাস ও ক্ষমতার চর্চা সম্পর্কিত। সেটাও আবার তথাকথিত ‘শর্ট-কার্ট’বা সংক্ষিপ্ত পদ্ধতিতে। সাম্প্রতিক সময়ে এই প্রবণতাটা এত বেশি দৃষ্টিকটুভাবে ধরা দেয় যে, এড়িয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। ২০২২-এর জানুয়ারিতে শিক্ষাবিদ সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের একটি সাক্ষাৎকার সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক মাধ্যমে বেশ ঘোরাফেরা করে। যেখানে তিনি বলেছিলেন, ‘দেশে কোনো বিজ্ঞানী নেই, গবেষক নেই, দার্শনিক নেই। যেদিকে তাকাবেন শুধুই প্রশাসক।’ মূলত ভারতের চন্দ্র বিষয়ের পর যেন এই আলোচনাই নতুন করে হালে পানি পেয়েছে। মূলত সেই আলোচনা থেকেই যে ভারত পারলেও আমরা কেন পারছি না?

সমাজবিজ্ঞানী বলেন, ঔপনিবেশিক ব্যবস্থা আমাদের মানসিক দাসত্ব শিখিয়েছে এবং পাশাপাশি আমাদের মনে সামন্ত হওয়ার যে প্রবল আকাক্সক্ষা তৈরি করেছে সেই ভূত আমাদের ঘাড় থেকে আজও নামেনি বরং বিস্তৃত হয়েছে। আর এই কায়দাকানুনের একটি প্রকাশ সেই প্রচলিত প্রবাদ, ‘লেখাপড়া করে যে, গাড়ি-ঘোড়া চড়ে সে’।  কে দার্শনিক হবে, কে বা বিজ্ঞানী হবে যেখানে দার্শনিক, বিজ্ঞানী, শিল্পী, কবি হয়ে গাড়ি ও ঘোড়ায় চড়া যায় না। শিক্ষার উদ্দেশ্য নিয়ে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি এখনো এই সংকীর্ণ চিন্তার মধ্যে সীমাবদ্ধ রয়ে গেছে। তাও আগে সমাজে ডাক্তার ও ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার মতো পেশাগত শিক্ষা ও দক্ষতা অর্জনের প্রতি এক ধরনের পক্ষপাতিত্ব ছিল তবে এখন আর ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়াররাও নিজ পেশায় থাকতে চান না, পেশা বিসর্জন দিয়ে তারাও প্রশাসক হতে চান। আর এসব বিষয়ের খবর আমরা গণমাধ্যমে দেখতে পাই কিছু দিন পর পর, কোন এক দরিদ্র পরিবারের এক বা একাধিক সদস্য বিসিএস ক্যাডার হতে পেরেছে। একইভাবে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করতে দেখি না যখন কেউ কেউ কবি, শিল্পী, দার্শনিক, সাংবাদিক, শিক্ষাবিদ, সমাজকর্মী, পরিবেশকর্মী বা এ রকম সৃষ্টিশীল পেশায় যুক্ত হন। প্রচলিত দৃষ্টিভঙ্গিতে প্রশাসক হওয়া মানেই প্রভূত ক্ষমতা, বাড়তি অনেক কিছুর প্রলোভন । অনেকের কাছে এটাই মর্ত্য থেকে স্বর্গ আরোহণের সিঁড়ি, দেবতা হিসেবে না হলেও অন্তত রাক্ষস-খোক্ষস হিসেবে। একবার প্রশাসক হয়ে যাওয়ার পর জনগণের সঙ্গে সম্পর্কটা হয়ে যায় রাজা ও প্রজার। তাই শিক্ষার লক্ষ্য গিয়ে ঠেকেছে প্রশাসক হওয়ায় ও তা না পারলেও নিদেনপক্ষে যেকোনো একটি সরকারি চাকরি।

আর এসবের ফলাফল হচ্ছে জ্ঞান ও বিজ্ঞানে, চিন্তাচেতনায় ও উদ্ভাবনে ধারাবাহিক পিছিয়ে পড়া। যার প্রতিফলন হিসেবে দেখা যায় সবক্ষেত্রে পশ্চাৎপদতাকে আঁকড়ে ধরে শিল্প, সাহিত্য ও বিজ্ঞান চর্চাকে নিরুৎসাহিত করা। আসলে শিক্ষার উদ্দেশ্য শুধু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নির্ধারণ করে না, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিক্ষার উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের একটি অনুষঙ্গ মাত্র। শিক্ষার মূলধারার উদ্দেশ্য নির্ধারণ করে সমাজ ও রাষ্ট্র। আর এই সমাজ ও রাষ্ট্রকে সঠিক দিকনির্দেশনা প্রদান করে দার্শনিক ও সৃষ্টিশীল রাজনীতিকরা। সমাজে যদি সৃষ্টিশীল দার্শনিকদের গুরুত্ব কমে যায়, তারা যদি মুক্তচিন্তার চর্চা করতে না পারে তখন শিক্ষার উদ্দেশ্য হয়ে যায় যেন শুধু একটি চাকরি করা, জীবন চালানো আর প্রশাসক হলে তো কথাই নেই, এ যেন মর্ত্য থেকে স্বর্গে আরোহণ।

আসলে হঠাৎ প্রশাসক হয়ে যাওয়া যতটা সম্ভব সৃষ্টিশীল দার্শনিক হওয়া ততটা না। দার্শনিকরা যেমন ভবিষ্যৎ দেখতে পায় তেমনি নিজ গুণে প্রভাবশালী ও ক্ষমতাবান হয়। আমাদের জাতীয় নীতিনির্ধারণের সঙ্গে যারা যুক্ত তারা প্রশাসনিক ক্ষমতাবান কিন্তু অনেক সময় প্রচলিত দৃষ্টিভঙ্গি ও ধ্যানধারণার ঊর্ধ্বে উঠতে পারে না।  চাঁদে যাওয়া তো দূরের কথা, কোনো মর্ত্যরে মানুষ যে চাঁদে যেতে পারে সেই ধারণাকে সন্দেহের দৃষ্টিতে দেখার লোকের অভাব নেই আমাদের সমাজে। ফলে ধারাবাহিক উন্নতির লক্ষ্যে শিক্ষা ব্যবস্থার যে নীতি ও আদর্শ নির্ধারণ করা দরকার তা করতে যেমন ব্যর্থ হচ্ছে, আবার নীতিনির্ধারণে কতকটা প্রতিফলিত হলেও তার বাস্তবায়নে কোনো উদ্যোগ দেখা যায় না। জ্ঞান ও বিজ্ঞানের উন্নতি শুধু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে অর্জন করা সম্ভব না, তার জন্য সমাজের প্রচলিত ক্ষমতা কাঠামোতে পরিবর্তন আনা দরকার। অন্তত প্রশাসককেন্দ্রিক সমাজ পরিচালনার ধারণায় পরিবর্তন আনতে হবে, সামাজিক প্রথাগত ধ্যানধারণায় প্রতিনিয়ত চ্যালেঞ্জ অব্যাহত রাখতে ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গির ধারণকারীদের সহায়ক পরিবেশ তৈরি করে দিতে হবে। যার হয়তো কিছুটা প্রতিফলন থাকবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে, কিন্তু সমাজই হবে শিক্ষার আসল পরিসর।

আকাশ ও পাতাল নিয়ে আমাদের ভাবার সময় কই? আকাশ-পাতাল নিয়ে বেশির ভাগ চিন্তাচেতনাই যেন ভূত-প্রেত, রাক্ষস-খোক্ষসদের নিয়ে গল্প-গাথা, কখনোবা দেবতাদের নিয়ে কেন্দ্রীভূত থাকে। তাই আকাশ-পাতালে নিজেদের ভূমিকা নিয়ে ভাবতে পারি না, এ যেন নিজেদের মর্ত্যরে মানুষ মনে করে আকাশ-পাতালের ভাবনাকে দেবতাদের কাছে সমর্পণ করে নিশ্চিন্ত হওয়ার চেষ্টা করা। যদিও সময় বদলেছে, মর্ত্যরে অনেকেই এখন আকাশ ভ্রমণ করছে, আকাশে রকেট ও রোবট পাঠাচ্ছে এবং পাতালেও যাচ্ছে। মানুষ হলেও তারা কতটুকু দেবতাসম বা দেবতাদের গুণসম্পন্ন এই প্রশ্নের কোনো সহজ উত্তর নেই। সম্ভবত এই বিষয়গুলো নিয়ে অনেক বিতর্ক আছে, বলা বাহুল্য, এসব বিতর্কে যতটানা যুক্তিতর্ক নির্ভর তার থেকে অনেক অনেক গুণ প্রচলিত বিশ্বাসকেন্দ্রিক। কখনো কখনো এই দুটোর মিশেলও থাকে, তবে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই নিজের গণ্ডিবন্ধ বিশ্বাসকে অতিক্রম করতে পারে না। তাই আমাদের দৃষ্টি না আকাশে, না পাতালে; বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই বড্ড বেশি সমান্তরাল, কিছুটা প্রচলিত কথায় ‘ছাপোষা বাঙালি’র মতো। আর আমাদের মধ্যে কে ছাপোষা, কে নতুন সৃষ্টির নেশায় মত্ত সেই বিতর্কের মধ্যে যাওয়াটাই হয়তো অসম্ভব, এমনও হতে পারে, ‘লোম বাছতে কম্বল উজাড়’। তাই অন্য অনেক কিছুর মতো ভাবনাচিন্তার ক্ষেত্রেও এক ধরনের নিরাপদ অবস্থান অবলম্বন করাটাই যেন শ্রেয়। আবার এটাই হয়তো ছাপোষা বাঙালির প্রধান বৈশিষ্ট্য। সেখানে টিকে থাকতে পারাটাই মুখ্য এবং যার অনেকগুলোই আবার একেবারে জীবনধারণের মৌলিক চাহিদাগুলোর সঙ্গে যুক্ত।

শিক্ষার উদ্দেশ্য শুধু গাড়ি ও ঘোড়ায় চরার জন্য, ঔপনিবেশিক সেই দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করে এখন সময় এসেছে শিক্ষার আসল উদ্দেশ্য নিয়ে কথা বলার।  জ্ঞান ও বিজ্ঞানকে আহ্বান করা, প্রাচীনপন্থিতাকে মোকাবিলা করে প্রতিনিয়ত নিত্যনতুন সৃষ্টির জয়গান গাওয়া। তাহলেই আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা বিশ্বের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে পারবে এবং দেশকে বিশ্বের সামনে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে সহযোগিতা করবে। ইতিহাস বলে পুরনোকে আঁকড়ে ধরে নতুন বিশে^ নেতৃত্বের আসনে আসা সম্ভব না। তবে পুরনোকে ছুড়ে ফেলে দিয়েও হয়তো না, পুরনোর সঙ্গেই ধারাবাহিক নতুন ধারণা ও ব্যবস্থাপনার সমন্বয়ে একটি সৃষ্টিশীল পরিবেশ তৈরি সম্ভব। এই সৃষ্টিশীল বাংলাদেশ থেকে আমরা এখনো অনেক পিছিয়ে অধিকন্তু অনেকেই আছেন, যারা পুরনোকে খড়-কুটোর মতো আঁকড়ে ধরে জাতিকে পেছনের দিকে ঠেলে দিতে চায়। বাংলাদেশের গত কয়েক দশকের অভিজ্ঞতায় এদের প্রভাব যে ধীরে ধীরে বেড়েই চলছে তা বলাই বাহুল্য। আর এর মাধ্যমে ওই গোষ্ঠী শুধু কীভাবে নিজেদের গোষ্ঠীগত প্রভাব প্রতিপত্তিকে বাড়ানো যায়, সেই চেষ্টাতেই ব্যস্ত। এই অবস্থায় অন্যের চাঁদে যাওয়া চেয়ে চেয়ে দেখা ছাড়া কিছুই করার নেই। আর যদি কিছু করতেই হয় তাহলে এই পশ্চাৎপদতার কারণগুলো নির্মোহভাবে অনুধাবন করতে হবে এবং সেই কারণগুলো দূর কারোর জন্য সমাজের প্রত্যেকটা গোষ্ঠীর ভূমিকা পালন করতে হবে, তবে এর সহায়ক পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে সরকারকে।

লেখক : উন্নয়নকর্মী ও কলামিস্ট

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত