আওয়ামী লীগে কমেছে কর্মী নির্ভরতা

আপডেট : ২৩ জুন ২০২২, ০২:১০ এএম

বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামসহ ইতিহাসের বাঁক-বদলে দেওয়া অনেক অর্জনে নেতৃত্ব দেওয়া আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী আজ বৃহস্পতিবার, ২৩ জুন। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন সরকার স্বপ্নের পদ্মা সেতু করার সাফল্য উদযাপন করার দুদিন আগে দলটি তার প্রতিষ্ঠার দিন উদযাপন করবে।

৭৪-এ পা রাখতে যাওয়া আওয়ামী লীগের একাল-সেকাল নিয়ে দেশ রূপান্তরের সঙ্গে কথা হয় দেশের কয়েকজন ইতিহাসবিদ, রাষ্ট্রবিজ্ঞানীসহ বিশিষ্ট ব্যক্তির সঙ্গে। তারা দলটির নেতৃত্ব ও সাহসী ভূমিকার ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। তবে এটাও বলছেন, টানা ১২ বছর ক্ষমতা থাকা দলটির তৃণমূল অগোছালো। দলে আমলা নির্ভরতা বেড়েছে। আওয়ামী লীগের প্রাণ বলা হয় কর্মীদের। দলটি যতবারই দুঃসময়ে পড়েছে কর্মীরাই হাল ধরেছে। কিন্তু দলটির সেই কর্মী নির্ভরতা কমে গেছে। লম্বা সময় ক্ষমতায় থাকলে একটা বড় রকমের পার্থক্য তৈরি হয়। হয়তো সে কারণেই আওয়ামী লীগে এখন অবস্থা।

১৯৪৯ সালের ২৩ জুন গঠন করা হয় আওয়ামী লীগ। প্রতিষ্ঠাকালীন দলটি ছিল আওয়ামী মুসলিম লীগ। ৫৫ সালে মুসলিম শব্দটি বাদ দিয়ে আওয়ামী লীগ নামকরণ হয়। এর মধ্য দিয়ে সাম্প্রদায়িক খোলস ছেড়ে বের হয় দলটি। আওয়ামী লীগের প্রথম সভাপতি ছিলেন মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী। প্রথম সাধারণ সম্পাদক ছিলেন শামসুল হক। শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক। অবশ্য ৫৩ সালে দলটির সাধারণ সম্পাদক হন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। দীর্ঘ এ পথচলায় দলটির ঝুড়িতে ভূরিভূরি অর্জন জমা হয়েছে। যার বেশিরভাগই এসেছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হাত ধরে। ৫২-এর ভাষা আন্দোলন, ৫৪-এর যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, আইয়ুবের সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলন, ৬৬-এর ছয় দফা আন্দোলন, ৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে বাঙালি জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করে একাত্তরে পরাধীনতার শৃঙ্খল ভেঙে স্বাধীনতার লাল সূর্যও ছিনিয়ে আনে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ।

এরপর দেশ পরিচালনার দায়িত্ব নেন স্বাধীনতার মহানায়ক শেখ মুজিব। মাত্র ১৩১৪ দিনের মাথায় ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বিপথগামী সেনাদের হাতে সপরিবারে নিহত হন তিনি।

১৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের আওয়ামী লীগে কয়েক দফা ভাঙন হয়। পরে ১৯৮১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে অনুষ্ঠিত সম্মেলনে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনাকে সভাপতি নির্বাচিত করা হয়। তার নেতৃত্বে দলটি স্বৈরাচার এরশাদবিরোধী আন্দোলনে সামনে থেকে নেতৃত্ব দেয়। নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে ১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় আসে দলটি। ২০০১ সালে ভোটে হেরে ক্ষমতা হারায় দলটি। পরে ২০০৮ সালে বিপুল বিজয়ের মাধ্যমে এসে টানা ১৪ বছর ক্ষমতায় রয়েছে আওয়ামী লীগ।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, প্রাচীন সংগঠন আওয়ামী লীগের জন্ম ইতিহাসের মাহেন্দ্রক্ষণ। দলটির মাধ্যমে বাঙালির স্বার্থরক্ষার লড়াই শুরু হয়। আওয়ামী লীগকে লড়াই-সংগ্রামের জন্য প্রস্তুত করেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তিনি বাঙালির স্বপ্নকে নিজের মধ্যে আত্মস্থ করে নিয়ে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের জন্ম অনিবার্য করে তুলেছিলেন। তাই দলটির কাছে দেশের মানুষ কৃতজ্ঞ।

বিশ্লেষকরা বলছেন, যে আদর্শ নিয়ে আওয়ামী লীগ গঠন হয়েছিল তা এখন বাচনিকভাবে ধারণ করে দলটি। প্রায়োগিক দিক থেকে সময়, সামাজিক, রাজনৈতিক এবং আন্তর্জাতিক পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে চলছে আওয়ামী লীগ। এক সময় যে দলটিতে আধিপত্য ছিল মধ্য বামপন্থিদের এখন সেখানে রয়েছে মধ্য ডানপন্থিরা। আওয়ামী লীগে কর্মী নির্ভরতা কমে গেছে উল্লেখ করে তারা বলেন, আমলা নেতৃত্ব, অপরাপর নেতৃত্ব কিংবা হাইব্রিড নেতৃত্ব দলকে বেশিদূর এগিয়ে নিতে পারে না।

ইতিহাসবিদ অধ্যাপক সৈয়দ আনোয়ার হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আওয়ামী লীগ বাংলাদেশের ও বাঙালির দল। শুধু বাঙালির বলব না, এ দেশের সব মানুষের দল। বাংলাদেশের অস্তিত্বের সঙ্গে আওয়ামী লীগের সম্পৃক্ততা রয়েছে।’

আওয়ামী লীগের বিষয়ে কিছু পর্যবেক্ষণ তুলে ধরে অধ্যাপক সৈয়দ আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘২০০৯ সাল থেকে এখন পর্যন্ত দলটি ক্ষমতায় আছে। আর শেখ হাসিনা আওয়ামী লীগে নেতৃত্বে রয়েছেন ৪১ বছরের বেশি সময় ধরে। কিন্তু এ সময়ে দ্বিতীয় ও তৃতীয় সারির কোনো নেতা তৈরি হয়নি।’ তিনি বলেন, ‘শেখ হাসিনার অনুপস্থিতিতে দলটির হাল কে ধরবে সেটা ভবিষ্যতের বিষয়। কিন্তু আমি আমার চোখের সামনে কিছু দেখছি না।’

অধ্যাপক সৈয়দ আনোয়ার বলেন, ‘প্রাচীনতম এই দলটি মানুষের সঙ্গে আছে বলেই এতদিন টিকে আছে। কিন্তু দলটির আদর্শিক বিচ্যুতি পীড়াদায়ক। মনে হয় পরিস্থিতি কারণে কিংবা যেকোনো বাস্তবিক বিচারবুদ্ধি থেকে তারা আদর্শের সঙ্গে অনেকটা আপসকামী হয়ে গেছে। এর মধ্যেও কয়েকটি জিনিস আমরা পেয়েছি। মানবতাবিরোধী অপরাধী ও বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার অনেক পাওনা।’

আরেক ইতিহাসবিদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন বলেন, ‘উপমহাদেশের অন্যতম পুরনো রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে এখনো আওয়ামী লীগ টিকে আছে। এটা বিরাট ব্যাপার। গত ৭৩ বছরে দলটি অনেকবার ভেঙেছে, নিষিদ্ধ হয়েছে কিন্তু ফিনিক্সের মতো জেগে উঠেছে দলটি।’ তিনি বলেন, ‘আওয়ামী লীগ ৭৩ বছরের মধ্যে প্রায় ২৫ বছরই ক্ষমতা আছে। এর মধ্যে সামরিক শাসন হটানোর নেতৃত্ব, গণআন্দোলন এবং স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় নেতৃত্ব দিয়েছে এবং কম সময়ে বাংলাদেশকে সংবিধান দিয়েছে। দেশের যত অবকাঠামোগত উন্নয়ন হয়েছে, তার সবই আওয়ামী লীগের আমলেই করা।’

মুনতাসীর মামুন বলেন, ‘শেখ হাসিনার সময়েই যে অগ্রগতি দেখেছি, সেটি গত ২৫ বছরে আর কোনো নেতার আমলে দেখিনি। তার আমলে করা দৃশ্যমান অবকাঠামো উন্নয়ন সবাই দেখছেন। অবকাঠামোগত উন্নয়ন ভবিষ্যতে অনেকেই করবেন, কিন্তু শেখ হাসিনা বাংলাদেশে অর্থনীতিকে এমন একটা পর্যায়ে নিয়ে গেছেন, যে পর্যায়ের নিচে খুব একটা যাবে না। যদি না সামরিক শাসন হয়, বিএনপি বা দক্ষিণপন্থিরা ক্ষমতায় আসে।’ তবে তিনি বলেন, ‘আওয়ামী লীগের আমলে দুর্নীতি হচ্ছে, অনেক কিছুই হচ্ছে, সমঝোতাও হচ্ছে। তারপরও আওয়ামী লীগই সবশ্রেণির মানুষকে কিছু না কিছু দিয়েছে।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক শান্তনু মজুমদার বলেন, ‘আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব গত ১৩ বছরে দারিদ্র বিমোচন হয়েছে ব্যাপক হারে। তবে বৈষম্য সারা পৃথিবীর মতো আমাদের এখানেও বাড়ছে।’ আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে পদ্মা সেতুর মতো সুবিশাল প্রকল্প সফলতার সঙ্গে বাস্তবায়নের মাধ্যমে দেশের মানুষের স্বপ্নের পরিধি ও আত্মবিশ্বাস বৈশ্বিক জায়গায় পৌঁছেছে বলে মনে করেন রাষ্ট্রবিজ্ঞানের এ শিক্ষক।

অবশ্য তিনি বলেন, ‘আওয়ামী লীগের ভেতরে গণতন্ত্রের চর্চাটা এখনো সীমাবদ্ধ আছে। এছাড়াও দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকার কারণে দলটির মধ্যে অন্তর্দ্বন্দ্ব রয়েছে। গণমাধ্যমে প্রায় এ খবর আসে। এটা সামনের দিনে আওয়ামী লীগের চিন্তাভাবনার বিষয়।’

প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর কর্মসূচি : আওয়ামী লীগের এক দিনের কর্মসূচির মাধ্যমে প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপন করবে। আজ সকাল ৮টায় দলের সীমিতসংখ্যক নেতাদের নিয়ে ধানমণ্ডির ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধা নিবেদন করবেন দলীয় সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এরপর সকাল সাড়ে ১০টায় বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে হবে আলোচনা সভা। প্রধানমন্ত্রী গণভবন থেকে ভার্চুয়ালি আলোচনা সভায় যুক্ত হবেন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত