জ্বালানি সংকট ও গ্যাসের দাম বৃদ্ধির কথা উল্লেখ করে বেশ ঘটা করেই বিদ্যুতের লোডশেডিংয়ের আগাম বার্তা দেয় সরকার। গত জুলাইয়ের মাঝামাঝি আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়ে রাজধানী ঢাকাসহ দেশজুড়ে শুরু হয় লোডশেডিং। কথা ছিল, দিনে সর্বোচ্চ দুই ঘণ্টা থাকবে না বিদ্যুৎ। সরকারের বিদ্যুৎ বিভাগ সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারকরা বলেছিলেন, চলতি অক্টোবরে আগের মতো স্বাভাবিক হবে বিদ্যুৎ সরবরাহ। যদিও বাস্তবতা ভিন্ন। এখনো স্বাভাবিক হয়নি বিদ্যুৎ সরবরাহ পরিস্থিতি। দফায় দফায় বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে। এক ঘণ্টার বদলে তিন ঘণ্টা এমনকি দেশের কোথাও কোথাও পাঁচ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎহীন থাকতে হচ্ছে গ্রাহককে। এমন পরিস্থিতিতে আবাসিক গ্রাহকদের চরম দুর্ভোগের পাশাপাশি দেশজুড়ে শিল্পকারখানার উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
শিল্প-কারখানার মালিক ও ব্যবসায়ীরা জানান, ঘন ঘন লোডিশেডিংয়ের কারণে বিকল্প উপায় হিসেবে জেনারেটরের মাধ্যমে কারখানা সচল রাখতে গিয়ে মাত্রাতিরিক্ত খরচ হচ্ছে তাদের। কিন্তু তাতেও শতভাগ উৎপাদন করতে পারছেন না, উৎপাদন কমে অর্ধেকে নেমেছে। এছাড়া ঘন ঘন বিদ্যুতের আসা-যাওয়ায় কারখানার মূল্যবান যন্ত্রপাতিরও ক্ষতি হচ্ছে। ব্যবসায়ীরা উৎপাদন ধসের জন্য বিদ্যুতের পাশাপাশি গ্যাস সংকটকেও দায়ী করেছেন
রাজধানী ঢাকার পাশের শিল্প অধ্যুষিত জেলা গাজীপুরে প্রতিদিন ঘনঘন লোডশেডিংয়ের কারণে বিভিন্ন কলকারখানায় উৎপাদনে ধস নেমে এসেছে। শিল্প মালিকরা লোকসান দিয়ে কোনোমতে শিল্প টিকিয়ে রেখেছেন বলে জানিয়েছেন। উৎপাদন স্বাভাবিক রাখতে জেলার শিল্পকারখানা অধ্যুষিত এলাকায় লোডশেডিং কম করার কথা থাকলেও তা মানা হচ্ছে না বলে অভিযোগ করেছেন কয়েকজন শিল্প মালিক। এছাড়া লোডশেডিংয়ের আগাম তথ্য জানানোর কথা থাকলেও তা মানা হচ্ছে না।
পোশাক কারখানার কয়েকজন মালিক জানান, বিদ্যুৎ সংকটের কারণে দেশি-বিদেশি ক্রেতাদের দেওয়া অর্ডার ঠিক মতো সরবরাহ করা যাচ্ছে না। আর ঠিকমতো পোশাক সরবরাহ করতে না পারলে শ্রমিকদেরও বেতন দেওয়া সম্ভব হবে না।
গাজীপুর পল্লীবিদ্যুৎ কর্র্তৃপক্ষ জানায়, জেলায় প্রায় দুই হাজারের মতো শিল্পকলকারখানা থাকলেও এসব কারখানায় নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। জেলায় বিদ্যুতের চাহিদা রয়েছে ৬৫০ মেগাওয়াট। পাওয়া যাচ্ছে এর অর্ধেক।
গাজীপুর পল্লীবিদ্যুৎ সমিতি-২ এর সিনিয়র জিএম যুবরাজ চন্দ্র পাল বলেন, ‘১৫৫টি ফিডারের মাধ্যমে বিদ্যুৎ গ্রাহকের কাছে পৌঁছানো হয়। এর মধ্যে ১০০টি ফিডারে শিল্পকারখানা রয়েছে। বাকিগুলো আবাসিক। শিল্পকারখানায় লোডশেডিং না করতে সরকারের নির্দেশনা থাকলেও বিদ্যুতের ঘাটতির কারণে তা পুরোপুরি মানা সম্ভব হচ্ছে না।’
গাজীপুর মহানগরীর মিম ডিজাইনের ব্যবস্থাপক আবু তাহের বলেন, ‘ঘনঘন লোডশেডিংয়ের কারণে বিকল্প ব্যবস্থায় জেনারেটর চালিয়ে কারখানা সচল রাখতে গিয়ে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। বেশি সময় ধরে জেনারেটর চালু রাখতে গিয়ে জেনারেটরও নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। তা মেরামত করতে সময় ও অর্থ দুটিই অপচয় হচ্ছে।’
ভালুকায় বিদ্যুৎ-গ্যাস সংকটে বহু কারখানা বন্ধের উপক্রম : শিল্পকারখানা অধ্যুষিত ময়মনসিংহের ভালুকায় লোডশেডিং এবং গ্যাসের অপ্রতুল সরবরাহ ও সরবরাহ লাইনে চাপ কম থাকায় কারখানাগুলোতে উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। এমন পরিস্থিতি চলতে থাকলে অনেক কারখানা মালিক তাদের কারখানা বন্ধ করে দেওয়ার চিন্তাভাবনা করছেন। আর তা হলে হাজার হাজার শ্রমিক কর্মহীন হয়ে পড়বেন। উৎপাদনে ধস নামায় এরই মধ্যে অনেক কারখানা কর্র্তৃপক্ষ শ্রমিক ছাঁটাই করছে বলে তথ্য মিলেছে।
হাজীর বাজার এলাকার একটি বাড়ির মালিক ও ব্যবসায়ী শাহাব উদ্দিন বলেন, ‘মিল বন্ধ হয়ে গেলে হাজার হাজার শ্রমিক কর্মহীন হয়ে পড়বে। ফলে চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই বেড়ে যেতে পারে।’
ভালুকা উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে ছোট-বড় দুইশ’র বেশি শিল্পকারখানা রয়েছে। যার মধ্যে প্রায় ৩০টি ডাইং ফ্যাক্টরি। একদিকে ঘনঘন লোডশেডিং, অন্যদিকে অপ্রতুল গ্যাস সরবরাহের কারণে এসব কারখানার উৎপাদন প্রায় ৭০ শতাংশ কমে গেছে। উপজেলায় পিডিবি প্রতিদিন গড়ে ১২/১৪ ঘণ্টা এবং আরইবি ১৬/১৭ ঘণ্টা লোডশেডিং দিচ্ছে। এছাড়া প্রতিদিন সন্ধ্যা ৬টা থেকে সকাল ৬টা পর্যন্ত গ্যাস সরবরাহ বন্ধ থাকে।
মল্লিকবাড়ি ইউনিয়নের গাদুমিয়া গ্রামের তাইপে বাংলা ফেব্রিক্স-এর ডিজিএম আশিকুর রহমান বলেন, ‘বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকট থাকায় আমাদের ২৭টি মেশিনের মধ্যে ২/১টি করে মেশিন চালু রেখেছি। লোডশেডিং ও গ্যাসের প্রেশার কম থাকায় কাপড়ের রং ঠিকমতো আসছে না ফলে সঠিক সময়ে মাল উৎপাদন করতে পারছি না। তাই বায়ারদের সঙ্গে চুক্তি ভঙ্গ হচ্ছে। আমাদের কোম্পানি শতভাগ রপ্তানিমুখী। এটি বন্ধ হলে প্রায় ৮শ শ্রমিক কর্মহীন হয়ে পড়বে। গত মাসে শ্রমিকদের বেতন ভর্তুকি দিয়ে কষ্ট করে দেওয়া হয়েছে।’
শেফার্ড গ্রুপের জিএম মোকলেছুর রহমান বলেন, ‘আমাদের মিল শতভাগ রপ্তানিমুখী। বিদ্যুৎ-গ্যাস সংকটের জন্য মিলের উৎপাদন ৭০ শতাংশ কমে গেছে। এমন পরিস্থিতি চলতে থাকলে ছোট অনেক মিল বন্ধ হয়ে যাবে।’
নারায়ণগঞ্জে কমছে কারখানার অর্ডার, চাকরি হারাচ্ছে শ্রমিক : নারায়ণগঞ্জে লোডশেডিংয়ের কারণে গার্মেন্টস, টেক্সটাইল ও হোসিয়ারি শিল্পকারখানায় উৎপাদন চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে। আগে থেকেই নারায়ণগঞ্জের কারখানাগুলোতে ছিল গ্যাস সংকট। গ্যাসের চাপ না থাকায় উৎপাদন ব্যাহত হতো। বিকল্প পন্থায় বিদ্যুৎ ব্যবহার করে চলত উৎপাদন কাজ। কিন্তু লোডশেডিংয়ের কারণে এ পদ্ধতিতেও উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। এতে কমে যাচ্ছে কারখানার অর্ডার। চাকরি হারাচ্ছে বহু শ্রমিক।
শিল্পসংশ্লিষ্টরা বলছেন, গ্যাস-বিদ্যুতের সংকট দীর্ঘায়িত হলে রপ্তানি খাতে চাপ বাড়বে। বাড়বে উৎপাদন ব্যয়। এছাড়া ক্রেতাদের কাছে সময়মতো পণ্য পৌঁছাতে না পারলে প্রতিযোগিতা থেকে ছিটকে পড়তে হবে। এরই মধ্যে রপ্তানি আদেশ কমতে শুরু করেছে।
ফতুল্লার বিসিক শিল্প নগরীর একটি নিটিং কারখানার ম্যানেজার রনি আহমেদ বলেন, ‘কারখানায় অর্ডার কমেছে। কারখানায় তেমন কাজ নেই। মালিক ভর্তুকি দিয়ে কারখানা চালাচ্ছেন। এখন যে অবস্থা চলছে করোনার সময়ও এমন ছিল না। এভাবে চলতে থাকলে ভবিষ্যতে কী হবে জানি না।’
আল আমিন হোসিয়ারির মালিক আসাদুল ইসলাম কবির বলেন, ‘বিভিন্ন ধরনের সমস্যা মোকাবিলা করতে হচ্ছে। লোডশেডিংয়ের কারণে উৎপাদন কম হলে লেবার খরচ ঠিকই হচ্ছে। উৎপাদন কম হওয়ায় ঘাটতি থাকছে। অনেক জায়গায় জেনারেটর না থাকায় প্রোডাকশনে ক্ষতি হচ্ছে। ফলে অনেকেই রাগ করে কাজ ছাড়ছে।’
আড়াইহাজারের মিথিলা টেক্সটাইলের পরিচালক মাহবুব খান বলেন, ‘গ্যাস সমস্যার কারণে এমনিতেই উৎপাদন অর্ধেকেরও কম। তার ওপর অনির্ধারিত লোডশেডিংয়ে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হচ্ছে।’
বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) নির্বাহী সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, ‘এভাবে চলতে থাকলে উৎপাদন ব্যয় বাড়বে। ব্র্যান্ড ক্রেতারা পোশাকের দরে এক সেন্টকেও খুব গুরুত্ব দেন। অন্য কোথাও কম দাম পেলে রপ্তানি আদেশ সরিয়ে নিতে বিন্দুমাত্র ভাববে না।’
সিরাজগঞ্জে দিশেহারা তাঁত মালিক-শ্রমিক : সিরাজগঞ্জ জেলার ৯ উপজেলায় ৫ লাখ তাঁত রয়েছে। এর মধ্যে সাড়ে ৩ লাখ তাঁতই বিদ্যুৎচালিত পাওয়ারলুম। তাঁত মালিক ও শ্রমিকরা জানান, লোডশেডিংয়ের কারণে উৎপাদন কমে তাঁত মালিকদের লোকসান গুনতে হচ্ছে। অন্যদিকে মজুরি কমে সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে শ্রমিকদের।
সদর উপজেলার পাইকোষা গ্রামের গামছা তৈরির তাঁত মালিক নূর হোসেন বলেন, ‘দিনে ৩/৪ বারে দুই থেকে আড়াই ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকে না। উৎপাদন আগের চেয়ে অনেক কমে গেছে। আমরা চরম লোকসানে পড়েছি। সুতার মহাজনের পাওনাও দিতে পারছি না। এনজিও বা ব্যাংকের কিস্তি দিতেও হিমশিম খাচ্ছি। লোকসানে পড়ে অনেকেই তাঁত বিক্রি করে দিচ্ছে।’
আমডাঙ্গা গ্রামের শাহিন আলী পুরাতন তাঁতের ক্রেতা। তিনি বলেন, ‘লোডশেডিংয়ের কারণে লোকসানে পড়ে অনেক তাঁতি তাদের তাঁত বিক্রি করে দিচ্ছেন। এক সপ্তাহে অন্তত ১০০ পুরান তাঁত কিনেছি। এগুলোর যন্ত্রাংশ খুলে আলাদা আলাদা করে বিক্রি করব।’
লাহিড়ীবাড়ি গ্রামের শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘লোকসান হওয়ায় তাঁত বিক্রি করে দিয়ে এখন গরু লালন পালনের পাশাপাশি বেগুন চাষ করে সংসার চালাচ্ছি।’
এ বিষয়ে পাইকোষা বাজারের সুতা ব্যবসায়ী সাজেদুল ইসলাম বলেন, আগের চেয়ে সুতা বিক্রি অর্ধেকে নেমে এসেছে। রং-সুতার দাম বৃদ্ধির পাশাপাশি চরম লোডশেডিংয়ের কারণে তাঁতিরা লোকসানে পড়ে তাঁত চালানো বন্ধ করে দিচ্ছেন। এ কারণে আমাদের সুতা বিক্রিও অনেক কমে গেছে। এতে আমরাও চরম লোকসানের মধ্যে পড়েছি।
প্রতিবেদনটি তৈরিতে তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছেন সংশ্লিষ্ট জেলা-উপজেলার প্রতিনিধি ও সংবাদদাতারা
