বিষ দেন, নইলে জমি থেকে পানি সরান

আপডেট : ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ০৪:১১ এএম

‘বিষ দেন, না হলে জমি থেকে পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করে দেন’Ñহাউমাউ করে কেঁদে এমনটি বলছিলেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়ার উপজেলার মোগড়া দুর্জয়নগর গ্রামের কৃষক লিয়াকত আলী। তিনি অভিযোগ করে বলেন, একটি প্রভাবশালী মহল ফসলি জমির পাশে বেড়িবাঁধ দিচ্ছে। এতে জমির পানি নিষ্কাশন বন্ধ হয়ে শত শত বিঘা জমি চাষাবাদের হুমকির মুখে পড়বে। বর্ষা মৌসুমে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হবে। বিষয়টির প্রতিকার চেয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, স্থানীয় চেয়ারম্যানের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন

কৃষকরা। জমি বাঁচাতে প্রশাসনের দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা। কিন্তু কেউ তাদের সাহায্যে এগিয়ে আসছে না।

লিখিত অভিযোগে ভুক্তভোগী কৃষকরা জানান, উপজেলার মোগড়া ইউনিয়নের চরনারায়ণপুর মৌজায় ৫ শতাধিক বিঘা কৃষিজমি রয়েছে। উপজেলার মোগড়া ইউনিয়নের দরুইন গ্রামের মৃত শরিয়ত উল্লার ছেলে মো. তাহের মিয়া ও একই গ্রামের হাজী আবুল কাশেমের ছেলে মো. রাসেল মিয়া গত কয়েক বছর আগে চরনারায়ণপুর মৌজাতে কিছু জমি ক্রয় করে জমিগুলোর পশ্চিম পাশে উত্তর, দক্ষিণ করে একটি বেড়িবাঁধ নির্মাণ করে। এতে ওই এলাকার শত শত বিঘা

কৃষি জমিতে বর্ষা মৌসুমে জলাবদ্ধতা ও শুষ্ক মৌসুমে পানির অভাব সৃষ্টি হয়ে জমিগুলো চাষের অযোগ্য হওয়ার উপক্রম হয়েছে। এসব নিয়ে প্রতিবাদ করলেও প্রভাবশালীরা তাদের কথা শুনছে না। নিরীহ কৃষকদের জমি দখলের চেষ্টায় লিপ্ত আছে।

সম্প্রতি আবারও জমিতে পুকুর নির্মাণ শুরু করেছে তাহের মিয়া। পুকুরের পাড় বাঁধার কারণে পুকুরের পেছনের প্রায় ৫০০ বিঘা জমি থেকে পানি নিষ্কাশনের পথ বন্ধ হয়ে যাবে। আবার বর্ষাকালে পানি সরতে না পেরে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হবে। ফলে শত শত বিঘা জমির চাষাবাদ হুমকির মুখে পড়ছে। 

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, চরনারায়ণপুর ও ভবানীপুর মৌজার মাঝ দিয়ে বয়ে যাওয়া হাওড়া নদী থেকে তিতাস নদীতে মিলিত হওয়া বুড়ি বিলের খালটির এক পাশে বেড়িবাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে। এতে ওই খালটি অস্তিত্ব হারিয়েছে এবং স্বাভাবিক পানি প্রবাহ ব্যাহত হচ্ছে।

ভুক্তভোগী কৃষক লিয়াকত আলী অভিযোগ করে বলেন, আমার এখানে প্রায় ২৮ বিঘা জমি রয়েছে। চারদিক ঘুরিয়ে যে বাঁধ দেওয়া হচ্ছে এতে আমাদের জমিগুলোর পানি নিষ্কাশন পথ বন্ধ হয়ে পড়েছে। এই বাঁধের ভেতরে শত শত বিঘা জমি জলাবদ্ধ হয়ে চাষাবাদ বন্ধ হয়ে যাবে। চাষাবাদ না করতে পারলে আমরা না খেয়ে মরব। প্রভাবশালীরা আমাদের কথা শুনছে না। আমরা প্রশাসনের দ্বারে দ্বারে ঘুরছি কেউ আমাদের বিষয়টি গুরুত্ব দিচ্ছে না। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, বিষ দেন, না হলে জমি থেকে পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করে দেন।

দরখাস্তকারী কৃষক মো. রফিকুল ইসলাম ভূঁইয়া বলেন, খালের বাঁধটি কেটে জমির পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করার জন্য সরকারের কাছে দাবি জানাচ্ছি।

স্থানীয় বাসিন্দা মিলন বলেন, প্রভাবশালী মহল খালে মাটি ফেলে বেড়িবাঁধ দিয়েছে। আমরা বাধা দিয়েছি, কিন্তু তারা আমাদের বাধা মানেনি। তারা বলেছিল ব্রিজ করে দেবে কিন্তু ব্রিজ করে দেয়নি। এজন্য জমির পানি নিষ্কাশন হয় না। আমরা অনেক কষ্টের মধ্যে আছি।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে অভিযুক্ত তাহের মিয়া বলেন, এখানে কোনো খাল নেই। নিজের জায়গায় বাঁধ দিয়েছি। এতে কৃষকদের কোনো ক্ষতি হবে না।

মোগড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল মতিন বলেন, কৃষকরা আমাকে বিষয়টি জানিয়েছে। আমি সরজমিনে দেখে কৃষকদের যাতে ক্ষতি না হয় সে ব্যাপারে উভয় পক্ষের সঙ্গে কথা বলে বিষয়টি সমাধানের উদ্যোগ নেব।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শাহানা বেগম বলেন, চরনারায়ণপুরে ৫০০ বিঘা জমি রয়েছে। ২০১৯ সালে কৃষকরা ইউএনও স্যারের কাছে অভিযোগ দিয়েছিল। স্যারের নির্দেশে আমি তদন্ত করার জন্য সেখানে গিয়েছিলাম। সেখানে উঁচু বাঁধের কারণে কৃষকদের জমিতে পানি আসা-যাওয়া বাধাগ্রস্ত হয়। এখানে যদি আবারও বড় বাধা তৈরি করা হয় তাহলে কৃষিজমির ক্ষতি হবে। সেচের অভাবে জমিগুলো খালি পড়ে থাকবে। এটা কৃষির জন্য হুমকি স্বরূপ।

এ বিষয়ে আখাউড়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার অংগ্যজাই মারমা বলেন, কৃষকদের একটি দরখাস্ত পেয়েছি। স্থানীয় চেয়ারম্যানকে বিষয়টি দেখার জন্য বলেছি। তিনি দেখে সমাধান করার উদ্যোগ নেবেন বলে জানিয়েছেন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত