মেট্রোরেলের শহরে গরিবি বাস

আপডেট : ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ০২:২৯ এএম

সড়ক যোগাযোগব্যবস্থার নতুন দুয়ার নগর পরিবহনে মেট্রোরেল উন্মোচন করেছে। বৈদ্যুতিক ট্রেনের যুগে প্রবেশ করেছে বাংলাদেশ। কিন্তু এত কিছুর পরও রাজধানীরজুড়ে সড়কে এখনো দাপিয়ে বেড়ায় ফিটনেসবিহীন বাস। এই নিম্নমানের বাসগুলোর দিকে তাকালে দেশের এবং দেশের বাইরে থেকে আসা অনেকেই ভাবতে পারেন বাংলাদেশে যোগাযোগব্যবস্থা উন্নত হলেও সেকালের গরিবি বাসে সয়লাব শহরজুড়ে। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্র্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) থেকে নানা সময় বাসগুলো বন্ধের নির্দেশনা দিলেও সেভাবে মনিটরিং না করায় বছরের পর বছর বাসগুলো সড়কে চলছে। তবে বাস মালিক সমিতি থেকে এই মাসে বাসগুলো বন্ধের বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়ার কথা বলছেন সমিতির নেতারা।

সরেজমিনে গত বৃহস্পতিবার রাজধানীর সদরঘাট, গুলিস্তান, যাত্রাবাড়ী, ফার্মগেইট, মোহাম্মদপুর, গাবতলী, মিরপুরসহ বেশ কয়েকটি এলাকায় ঘুরে দেখা যায়, সড়কে এখনো ফিটনেসবিহীন বাস প্রকাশ্যে চলছে। মাঝপথে অনেক বাস বন্ধ হতে দেখা যায়। বেশিরভাগ বাসের সিট ভাঙা, নেই ভালো বসার স্থান। আর বাসগুলো থেকে কালো ধোঁয়া বের হয়ে পরিবেশের মারাত্মক হুমকির দিকে নিয়ে যাচ্ছে। তবে সবচেয়ে খারাপ বাস চলতে দেখা যায় পুরান ঢাকার বাবুবাজার বেড়িবাঁধ এলাকা থেকে গাবতলী পর্যন্ত রোডে। এই রোডে শতভাগ বাসের ফিটনেস নেই বললেই চলে।

ভোলার বাসিন্দা মো. যুবায়ের দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমার জেলা-উপজেলায় ঢাকার চেয়ে উন্নত মানের বাসগুলো চলে। সিটিতে চলা বেশিরভাগ বাসে ভালোভাবে বসা যায় না। সিটগুলোর অবস্থা খুব খারাপ। আর কিছু বাস দেখতে সুন্দর হলেও ভেতরে দেখা যায় নানা সমস্যা। এই রকম অবস্থা দেখে আসছি বছরের পর বছর। কোনো উন্নতি নেই এই বাসগুলোর।

ঢাকায় নিয়মিত বাসে চলাচল করা মো. ইমন নামের এক যাত্রী জানান, বাসগুলোর দিকে তাকালে বুঝা যায় সড়কে এত দুর্ঘটনা কেন ঘটে। এই ফিটনেসবিহীন বাসগুলো দিনের পর দিন সড়কে চলছে কিন্তু কেউ কিছু বলছে না। তবে কিছু হলে তেলের অজুহাতে ভাড়া বাড়ান বাস মালিকরা।    

সদরঘাট থেকে মিরপুর রোডে চলাচল করা তানজীল পরিবহনের এক বাসচালক মো. তানভির বলেন, ‘মালিক যে বাস দেন সেটি চালাই। এখন পুরনো হোক বা নতুন হোক আমাদের তো আর কিছু বলার নেই। আমি না চালালে অন্য কেউ তো আর বসে থাকবে না।’

পুরান ঢাকার বাবুবাজার থেকে বেড়িবাঁধ দিয়ে গাবতলী পর্যন্ত চলা একটি ফিটনেসবিহীন লক্কড়-ঝক্কড় ‘প্রত্যয় পরিবহন’র একটি বাসের চালক মো. সিফাত দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘যাত্রীরা যখন বাসে ওঠেন আমাদের সঙ্গে বাগ্বিত-া লেগেই থাকে বাসের এই অবস্থার জন্য। শুনলাম সামনে নতুন বাস নামাবেন মালিক। এর থেকে বেশি আর বলতে পারছি না।’

বাবুবাজার রোডে চলাচল করা একটি পরিবহনের মালিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সবচেয়ে খারাপ গাড়ি চলে এই রোডে। এই এলাকায় বাস নিয়ে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট আছে। তাদের জন্য নতুন বাস নামানো যায় না। আর এই ফিটনেসবিহীন বাসগুলোর জন্য মোটা অঙ্কের টাকা দিতে হয় প্রতিটি জায়গায়।’   

বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘২০১২ সাল থেকে শুনে আসছি এসব ফিটনেসবিহীন বাসের বিরুদ্ধে অভিযানের কথা। কিন্তু এই বাসগুলো বন্ধে সেভাবে পদক্ষেপ আজও নিতে দেখিনি। ফলে এই বাসগুলো রাস্তায় চলাচল করায় সড়কে দিনের পর দিন মৃত্যুর মিছিল বেড়েই যাচ্ছে।’

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ^বিদ্যালয়ের (বুয়েট) দুর্ঘটনা গবেষণা কেন্দ্রের সহকারী পরিচালক ও যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ সাইফুন নেওয়াজ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মেট্রোরেলের মতো এত অত্যাধুনিক পরিবহন শহরের যোগাযোগে যুক্ত হয়েছে। কিন্তু এখনো সড়কে দেখা যায় সেই পুরনো ফিটনেসবিহীন বাস। এসব বাস বন্ধের জন্য বাস মালিক সমিতি ও বিআরটিএ একসঙ্গে বসে ফিটনেসবিহীন বাসের মালিকদের সঙ্গে বৈঠক করা উচিত। খুব দ্রুত এই বাসগুলোর বিষয়ে মনিটরিং বাড়িয়ে যেগুলো চলাচলের অনুপযোগী, সেগুলোকে অপসারণ করা দরকার।’ 

চলতি মাসেই ফিটনেসবিহীন বাসের বিরুদ্ধে মনিটরিংয়ের কাজ শুরু হয়েছে বলে জানিয়ে ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সাংগঠনিক সম্পাদক মাহবুবুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, এই মাস থেকেই আমরা কাজ শুরু করে দিয়েছি। ফিটনেসবিহীন বাস কোনোভাবেই সড়কে চলাচল করতে দেওয়া যাবে না। আর বাবুবাজার রোডে যেসব ফিটনেসবিহীন বাস চলাচল করে সেগুলো আমাদের সমিতির আওতায় নেই বলে জানান তিনি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত