পাতে কমছে মাছ মাংস ডিম

আপডেট : ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ০২:২৯ এএম

ডলার সংকট এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দার প্রভাব পড়েছে দেশের অর্থনীতিতে। প্রায় সব খাতেই খরচ বেড়েছে। নীরবে মূল্যবৃদ্ধির এ ধাক্কা সামলাতে গিয়ে বেসামাল স্বল্প আয়ের মানুষ থেকে মধ্যবিত্ত পর্যন্ত।

আর্থিক সংকটে অনেকে বাধ্য হয়েই পরিবারের নিয়মিত অনেক খরচ কাটছাঁট করেছে। ডিম, বড় মাছ, মাংস, দুধসহ অনেক কিছু নিয়মিত খাবারের তালিকা থেকে হয় বাদ দিয়ে, না হয় কমিয়ে দিয়েছে। সে তালিকায় যোগ হয়েছে কম দামি খাবার।

খরচ বেড়ে যাওয়ায় অন্য খাতে কাটছাঁট করতে গিয়ে অনেকে পাারিবারিক অনুষ্ঠান ও মেহমান দাওয়াত দেওয়া কমিয়ে দিয়েছে। অনেকে আপতত এসব আয়োজন বন্ধ রেখেছে। 

অর্থনীতি বিশ্লেষকরা বলছেন, খরচ বাড়ার সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাড়ছে না আয়। আর ব্যবসায়ীরা বলেছেন, বেশি দামে কিনে সামান্য লাভে বিক্রি করলেও দাম বেড়ে যাচ্ছে। তবে অসাধু ব্যববায়ীদের কারসাজিতে অনেক খাতে দাম যতটা বাড়ার, বেড়েছে তার চেয়ে অনেক বেশি এমন কথাও বলেছেন তারা।

সরকারের নীতি-নির্ধারকদের মতে, এ বছরের জানুয়ারি পর্যন্ত গত এক বছরে সাধারণ মূল্যস্ফীতি বেড়েছে ৪৬ শতাংশ।

বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর দেশ রূপান্তরকে বলেন, ছয় মাস ধরে কম-বেশি প্রায় সব খাতে খরচ বেড়েই চলেছে। অথচ ব্যবসায় সুবাতাস নেই। চাকরিতেও বেতন বাড়ার সুখবর তেমন শোনা যায় না। খরচের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাড়ছে না আয়। মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তের মানুষ কষ্টে পড়েছেন বেশি। প্রতি দিনের সংসার খরচ চালিয়ে যাওয়া তাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে।

দেশের ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই সভাপতি মো. জসিম উদ্দিন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ডলার সংকটে অনেক পণ্য আমদানি করা সম্ভব হচ্ছে না। যা কিনছি তা-ও বেশি দামে। ন্যূনতম লাভে বিক্রি করলেও আগের চেয়ে দাম বেশি পড়ছে। ব্যবসায়ীরা ইচ্ছে করে দাম বেশি রাখছেন না। তবে এটা সত্য অনেক সুযোগ সন্ধানী ব্যবসায়ী আন্তর্জাতিক বাজারের অজুহাত দিয়ে দাম যতটা বাড়ার, তার চেয়ে বাড়িয়ে বিক্রি করছেন।’  

রাজধানীর বিভিন্ন বাজার ঘুরে এবং খোঁজ নিয়ে জানা যায়, মোটা চালের দাম খানিকটা স্থিতিশীল। কিন্তু গত ছয় মাসে অনেকটাই বেড়েছে। অন্যদিকে শুল্ক কমিয়ে আমদানির সুযোগ বাড়ানোর পরও চালের দাম কমেনি। মিনিকেট নাম দিয়ে বিক্রি করা প্রতি কেজি ভালো মানের চাল দুই মাস আগে ৭২ টাকায় কিনতে পারলেও এখন ৭৮ টাকা। ৭০ টাকা কেজির নাজির শাইল এখন ৭৫-৮০ টাকা।

এক বছরের ব্যবধানে আটার দাম বেড়েছে ৬৬ শতাংশ। এক কেজি প্যাকেটজাত আটার দাম ৭০ টাকা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের কৃষিবিষয়ক সংস্থা ইউএসডিএর দেওয়া বাংলাদেশের দানাদার খাদ্যবিষয়ক সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, বেশি দামে আটা কিনতে না পারায় দেশের মানুষের বড় অংশ রুটি, বিস্কুট ও আটা-ময়দা থেকে তৈরি খাদ্য কম খাচ্ছে। দাম বেশি থাকায় আটার তৈরি খাবারের বদলে মানুষ ভাত খাওয়া বাড়িয়ে দিয়েছে।

ছয় মাসে প্রায় সব ধরনের বিস্কুটের দাম বেড়েছে গড়ে ২০-৩০ টাকা। চানাচুরের দাম প্রতি কেজিতে ৪০-৫০ টাকা এবং মুড়ির দাম প্রতি কেজিতে ২৫-৩০ টাকা বেড়েছে।

এক বছরে সয়াবিন তেলের দাম বেড়েছে প্রায় ১০০ ভাগ। সর্বশেষ ৭ টাকা বেড়ে বোতলজাত এক লিটারের দাম এখন ১৮৭ ১৯০ টাকা। আর খোলাটা লিটারপ্রতি বিক্রি হচ্ছে প্রায় ১৮০ টাকা।

শীতকাল শেষ। কিন্তু শীতে ভরা মৌসুমেও অনেকের সাধ্যের বাইরে ছিল শাকসবজি। ফলে স্বল্প আয়ের মানুষ খাওয়া কমিয়ে দিয়েছে।

গত বছরের অক্টোবরে প্রকাশিত বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির (ডব্লিউএফপি) প্রতিবেদন বলছে, দেশে খাবার কিনতে হিমশিম খাচ্ছে ৬৮ শতাংশ মানুষ। নিম্ন আয়ের পরিবারগুলো খাদ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় এবং আয় না বাড়ায় নানাভাবে সাশ্রয়ের চেষ্টা করছে। যেমন সবজির দাম বেড়ে যাওয়ায় বেশির ভাগ মানুষ আলু খাওয়ার পরিমাণ বাড়িয়েছে।

ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) হিসাব বলছে, এক মাস আগে ঢাকার বাজারে এক কেজি গরুর মাংসের দাম ছিল ৬৬০-৭০০ টাকা। আর খাসির মাংসের দাম ছিল ৯০০-১০০০ টাকা। এখন খাসির মাংসের দাম বেড়েছে কেজিতে ১০০-২০০ টাকা। আর এক মাসের ব্যবধানে বাজারে গরুর মাসের দাম বেড়ে হয়েছে কেজি ৭০০-৭৫০ টাকা।

ফার্মের মুরগি, ডিম, দুধ ও মাছের মতো সব ধরনের প্রোটিনজাতীয় খাবারের দাম চড়া। তেলাপিয়া, পাঙাশের মতো মাছ কিংবা অ্যাংকর ডালও সাধারণ ক্রেতার নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। বড় আকারের তেলাপিয়া মাছের দাম কেজিপ্রতি ২২০ থেকে ২৫০ টাকা। বাদামি রঙের ডিমের ডজন ১৪৫-১৫০ টাকা। এক মাস আগেও প্রতি ডজন ডিমের দাম ছিল ১১০-১১৫ টাকা। সাধারণ মানুষের প্রোটিনের বড় আরেকটি উৎস ব্রয়লার মুরগি। কেজিপ্রতি ব্রয়লার মুরগি বিক্রি হচ্ছে ২২০-২৪০ টাকা। টিসিবি বলছে, মাসখানেক আগেও প্রতি কেজি ব্রয়লার মুরগি বিক্রি হয়েছে ১৪৫ থেকে ১৬০ টাকার মধ্যে। কম নেই সোনালি মুরগির দামও। গত মাসে ২৬০ কেজি দরে বিক্রি হওয়া সোনালি মুরগির দাম এখন ৩৫০ টাকায় ঠেকেছে। দেশি মুরগি বিক্রি হচ্ছে কেজিপ্রতি ৪৫০ থেকে ৫৫০ টাকা।

তরল দুধের দাম এক বছরে লিটারে ২০ থেকে ৩০ টাকা বেড়েছে।  সরকারি সংস্থা বাংলাদেশ দুগ্ধ উৎপাদনকারী সমবায় ইউনিয়ন লিমিটেডের (মিল্ক ভিটা) এক লিটার দুধের দাম এখন ৯০ টাকা। টিসিবির হিসাবে, এক বছরে বিভিন্ন ব্র্যান্ডের প্যাকেটজাত গুঁড়ো দুধের দাম বেড়েছে ২৭-৩৫ টাকা।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) নির্দেশনা অনুযায়ী, আট ধরনের প্রাণিজ আমিষে সবচেয়ে বেশি পরিমাণে পুষ্টিকর উপাদান আছে। বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির প্রতিবেদন বলছে, বর্তমানে মাছ, মাংস, সামুদ্রিক খাবারসহ পুষ্টিকর উপাদানসমৃদ্ধ খাবার পর্যাপ্ত পরিমাণে খেতে পারছে দেশের মাত্র ১৭ শতাংশ পরিবার।

সব ধরনের প্যাকেটজাত মসলার দাম বেড়েছে। প্যাকেটজাত মসলার দাম গড়ে প্রতি কেজি বেড়েছে ১৩০ টাকা। মসুরের ডাল রকমভেদে প্রতি কেজিতে দাম বেড়েছে ২৮ টাকা। চিনির দাম দফায় দফায় বেড়ে এখন খোলা ১১০ ও প্যাকেটজাত ১২০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। পেঁয়াজের দাম কেজিতে ১০ টাকা, রসুন ও আদার দাম কেজিতে ৫০-৬০ টাকা বেড়েছে। ৩৫০ টাকার প্রতি কেজি জিরা এখন ৫৫০-৬০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। লবণের দাম বেড়েছে কেজিতে ৬ টাকা।

এক বছরে খাদ্যপণ্যের সঙ্গে খাদ্যবহির্ভূত সব ধরনের খরচও বেড়েছে। সাবান, শ্যাম্পু, দাঁতের মাজন, শাড়ি, গয়না, স্যান্ডেল, জুতাসহ প্রায় সব ধরনের পোশাকের দাম বেড়েছে।

গায়ে মাখা সাবানের দাম গড়ে বেড়েছে ২০ থেকে ৩০ টাকা। গুঁড়া সাবানের দাম বেড়েছে ৬০-৭০ টাকা। ৭০০ গ্রাম শ্যাম্পুর দাম বেড়েছে ১৫০ টাকা।

নতুন বছরের শুরুতে কমবেশি বাসাভাড়া ও বেশির ভাগ বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বেতন বাড়ানো হয়েছে। খাতা, কলম, পেনসিলসহ প্রায় সব ধরনের শিক্ষা উপকরণের দাম আগের চেয়ে বেশি। খাতার দাম বেড়েছে ১০ থেকে ১৫ টাকা। বল পয়েন্ট কলমের দাম বেড়েছে ১ থেকে ২ টাকা। গ্যাস, বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়েছে কয়েক দফা।

চিকিৎসা ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় বিপদে পড়েছে অনেকে। প্রাথমিক চিকিৎসায় বহুল ব্যবহৃত ২০টি জেনেরিকের ৫৩ ব্র্যান্ডের ওষুধ এখন বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। প্যারাসিটামলের মতো অধিক ব্যবহৃত ওষুধের দামও বেড়েছে। ৫০০ এমজির প্যারাসিটামল প্রতিটি ট্যাবলেট ৭০ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ১ টাকা ২০ পয়সা হয়েছে। মেট্রোনিডাজল ৫০০ এমজি ট্যাবলেট কোটেড-আগে ছিল ১ টাকা ৬৬ পয়সা, এখন ২ টাকা। কিছু ওষুধের দাম বেড়েছে ১০০ শতাংশেরও বেশি; অর্থাৎ আগে যে দামে ওষুধ কেনা যেত, এখন তার চেয়ে দ্বিগুণ টাকা গুনতে হয়।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার জন্য তালিকাভুক্ত ১১৭টি ওষুধের দাম বাড়ানোর ক্ষমতা থাকে সরকারের হাতে। ওষুধ উৎপাদনে ব্যবহৃত কাঁচামাল, এক্সিপিয়েন্ট, প্যাকেজিং ম্যাটেরিয়াল, পরিবহন ও ডিস্ট্রিবিউশন ব্যয়, ডলারের বিনিময়মূল্য, মুদ্রাস্ফীতিসহ নানা কারণে ওষুধের খরচ বেড়েছে। এসব কারণে ওষুধের দাম বাড়ানো হয়েছে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্যই বলছে, গত বছর মে মাসের পর থেকে উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপে দেশের নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষেরা যখন দিশাহারা, এ অবস্থায় জ¦ালানি ও বিদ্যুতের মতো কৌশলগত পণ্যের ভর্তুকি সমন্বয়ের সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। ফলে বাড়ছে জ্বালানি তেল, গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম।

একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত এক ব্যক্তি নাম প্রকাশ না করে দেশ রূপান্তরকে বলেন, তার চারজনের পরিবারের খাবার খরচ আগের চেয়ে অন্তত ৭ হাজার টাকা বেড়েছে। কিন্তু আয় তো আর এত টাকা বাড়েনি।

গত মঙ্গলবার রাজধানীর শেরেবাংলা নগর এনইসি সম্মেলন কক্ষে ডেভেলপমেন্ট জার্নালিস্ট ফোরাম অব বাংলাদেশ (ডিজেএফবি) আয়োজিত উন্নয়ন সংলাপে পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী অধ্যাপক ড. শামসুল আলম মূল্যস্ফীতি নিয়ে কথা বলেন। তিনি বলেন, চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে সাধারণ মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৫৭ শতাংশ। গত বছরের (২০২২ সালের) জানুয়ারি মাসে এই হার ছিল ৫ দশমিক ৮৬ শতাংশ। এক বছরের ব্যবধানে মূল্যস্ফীতি বেড়েছে ৪৬ শতাংশ।

পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী বলেন, উৎপাদন উপকরণের দাম বেড়েছে। পাশাপাশি বেড়েছে জ্বালানি তেলের দাম। ফলে মূল্যস্ফীতি সাড়ে ৯ শতাংশ পর্যন্ত হয়েছিল।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত