এবার শুল্কও প্রত্যাহার হলো

আপডেট : ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ০৫:০৭ এএম

চিনির দামে লাগাম টানতে শুল্ক অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সুপারিশে গতকাল রবিবার এ সিদ্ধান্ত জানিয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) প্রজ্ঞাপন জারি করেছে। চিনি আমদানিকারকরা জানিয়েছেন, শুল্ক প্রত্যাহারের এ সুবিধা নিয়ে আমদানি করা চিনি আগামী মাসের (মার্চ) প্রথম ভাগে দেশে পৌঁছানোর সম্ভাবনা রয়েছে। এদিকে ভারত থেকে ১২ হাজার ৫০০ টন বা ১ কোটি ২৫ লাখ কেজি চিনি কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। গত ১১ জানুয়ারি সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির সভায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এ চিনিও রমজানের আগে দেশে পৌঁছানোর কথা রয়েছে। ফলে আগামী রমজানে চিনির দাম বাড়বে না বলে মনে করছেন সরকারি নীতিনির্ধারকরা।

তবে বাজারসংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেছেন, অতীতে দেখা গেছে পর্যাপ্ত মজুদ থাকার পরও কোনো না কোনো অজুহাতে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট করে বাজারে চিনির দাম বাড়িয়ে বিক্রি করে সাধারণ ক্রেতাকে কষ্টে ফেলেছে। তাই শুধু আমদানি করলেই হবে না বাজার নিয়ন্ত্রণে কঠোর নজরদারি থাকতে হবে। সরকারি চিনিকলগুলো বন্ধ থাকায় দেশের চিনির বাজার বেসরকারি খাতের মুষ্ঠিমেয় কিছু আমদানিকারকের ওপর নির্ভরশীল। বেসরকারি খাত থেকে মূলত অপরিশোধিত চিনি আমদানি করে দেশেই পরিশোধন করে বাজারে ছাড়ে। অনেকে আবার পরিশোধিত চিনিও আমদানি করে থাকে।

এনবিআর সূত্রে জানা গেছে, সম্প্রতি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিবের সভাপতিত্বে দ্রব্যমূল্য ও বাজার পরিস্থিতি পর্যালোচনা সংক্রান্ত টাস্কফোর্সের পঞ্চম সভায় আমদানি, সরবরাহ পরিস্থিতি ও বাজারমূল্যসহ বিভিন্ন বিষয়ে পর্যালোচনা করা হয়। ওই বৈঠকে আলোচনায় উঠে আসে যে গত ছয় মাসে প্রায় দুই লাখ টন চিনি কম আমদানি হয়েছে। মূলত ডলার সংকটে এলসি খুলতে না পারার কারণে এ ঘাটতি তৈরি হয়েছে বলে টাস্কফোর্সের সভায় জানানো হয়। এতে রমজানে চাহিদার তুলনায় চিনির সংকট দেখা দিতে পারে। দাম আবারও বাড়তে পারে বলেও আশঙ্কা করা হয়। এ পরিস্থিতি এড়াতে টাস্কফোর্সের সভার সিদ্ধান্ত অনুসারে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে চিনি আমদানি বাড়িয়ে চিনির দাম স্থিতিশীল রাখতে শুল্ক হার যৌক্তিকীকরণের জন্য এনবিআরকে অনুরোধ করা হয়। সভায় আশা প্রকাশ করা হয়, আমদানি বাড়লে আসছে মাসের শবেবরাত ও রমজানে চিনির চাহিদা বাড়লেও দাম স্থিতিশীল থাকবে।

দেশের অন্যতম আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান সিটি গ্রুপের পরিচালক বিশ^জিৎ সাহা দেশ রূপান্তরকে বলেন, শুল্ক প্রত্যাহারের সুবিধা নিয়ে চিনি আমদানি করা হলে তা দেশে পৌঁছতে মার্চের প্রথম ভাগ লাগবে। শুল্ক সুবিধায় আমদানি করা চিনি দেশের বাজারে ছাড়া হলে চিনির দাম স্থিতিশীল থাকবে কি না তা জানতে চাইলে তিনি বলেন, আপনারা তো শুনেছেন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের টাস্কফোর্সের সভায় বলা হয়েছে চিনি আমদানি কম হয়েছে। আশা করছি শুল্ক প্রত্যাহারের সুবিধায় আমদানি করা চিনি বাজারে ছাড়া হলে দাম স্থিতিশীল থাকবে।

কনজুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) সভাপতি গোলাম রহমান দেশ রূপান্তারকে বলেন, শুল্ক প্রত্যাহার করা হলে অবশ্যই চিনির বাজারে ইতিবাচক প্রভাব পড়ার কথা। তবে শুধু আমদানিতে সুবিধা দিলেই হবে না। কোনো অজুহাতেই যাতে সিন্ডিকেট করে বাজারে দাম বাড়ানোর সুযোগ না পায় তার নজরদারিও থাকতে হবে। এ জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকেও সচেতন থাকতে হবে।

সম্প্রতি এক সভায় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব তপন কান্তি ঘোষ বলেছেন, সরকার রমজানে সব ধরনের পণ্যের বাজার স্থিতিশীল রাখতে চেষ্টা করছে। বাজার নিয়ন্ত্রণেও নজরদারি করা হবে। সাধারণ ক্রেতা যাতে ভোগান্তিতে না পড়ে সে জন্য সব ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। আশা করছি চিনি আমদানিতে রাজস্ব সুবিধা দেওয়া হলে বাজানে এর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।

শুল্ক প্রত্যাহারের প্রজ্ঞাপন জারি করায় আগামী ৩০ মে পর্যন্ত আমদানিকারকরা বিনা শুল্কে পরিশোধিত ও অপরিশোধিত চিনি খালাস করতে পারবেন। আগে প্রতি টন পরিশোধিত চিনি আমদানিতে ৬ হাজার টাকা ও অপরিশোধিত চিনি আমদানিতে ৩ হাজার টাকা শুল্ক কর নির্ধারিত ছিল। এ ছাড়া অপরিশোধিত চিনি আমদানিতে ৩০ শতাংশ সংরক্ষণমূলক শুল্ক আরোপিত ছিল। দামের ঊর্ধ্বগতির কারণে এটি কমিয়ে ২৫ শতাংশ নির্ধারণ করে প্রজ্ঞাপন জারি করে এনবিআর। এ সুবিধা চলতি বছরের ৩০ মে পর্যন্ত বলবৎ থাকবে।

সূত্র আরও জানায়, বর্তমানে প্রতি টন চিনি আমদানিতে কাস্টম ডিউটি ৩ হাজার টাকা, সংরক্ষণমূলক শুল্ক ৩০ শতাংশ, ভ্যাট ১৫ শতাংশ, অগ্রিম কর ৪ শতাংশ। সব মিলিয়ে চিনি আমদানি ডিউটি পড়ে প্রায় ৬১ শতাংশ।

কয়েক মাস থেকে দেশে চিনির সংকট চলছে। ক্ষেত্রবিশেষে ১২০ টাকা দিয়েও এক কেজি চিনি কিনতে পারেননি ভোক্তা এমন ঘটনাও আছে। এখনো সেই সংকট পুরোপুরি কাটেনি। উচ্চ দামেই বিক্রি হচ্ছে চিনি। এদিকে আসছে মাসেই রমজান। সারা বছর ১২-১৩ লাখ টন চিনির চাহিদা রয়েছে। তবে রমজান মাসে অন্য সময়ের তুলনায় চিনির চাহিদা বেড়ে যায়। এ মাসে চিনির চাহিদা দুই লাখ টন ছাড়িয়ে যায়।

অন্যদিকে এনবিআরসংশ্লিষ্টরা বলেছেন, মূলত রোজায় নিরবচ্ছিন্ন চিনির সরবরাহ এবং দাম স্থিতিশীল রাখার জন্য এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

সরকার চিনি কিনছে : ভারত থেকে ১২ হাজার ৫০০ টন বা ১ কোটি ২৫ লাখ কেজি চিনি কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এ চিনির জন্য কেজিপ্রতি খরচ হবে ৫৬ টাকা। অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামালের সভাপতিত্বে গত ১১ জানুয়ারি সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির সভায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ভারতের কলকাতার শ্রীনোভা ইস্পাত প্রাইভেট লিমিটেড থেকে ১২ হাজার ৫০০ টন চিনি কেনার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) জন্য এ চিনি কেনা হচ্ছে। আন্তর্জাতিকভাবে সরাসরি ক্রয়পদ্ধতিতে (ডিপিএম) এ চিনি কিনতে খরচ হবে ৭০ কোটি ২ লাখ ৪৫ হাজার টাকা। অর্থাৎ প্রতি কেজি চিনি কিনতে খরচ হবে ৫৬ টাকা ২ পয়সা। এর আগে গত বছর ১০ নভেম্বর অনুষ্ঠিত সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির সভায় উন্মুক্ত দরপত্র পদ্ধতিতে ব্রাজিল থেকে ১২ হাজার ৫০০ টন চিনি কেনার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। টিসিবির জন্য কেনা ওই চিনির জন্য খরচ ধরা হয়েছে ৬৫ লাখ ৫২ হাজার ৬২৫ ডলার। যা বাংলাদেশি টাকায় ৬৫ কোটি ৯৮ লাখ ৪৯ হাজার ৩৩৭ টাকা। প্রতি টন চিনির দাম ধরা হয় ৫২৪ ডলার। সরকারের কেনা এসব চিনিও রমজানের আগে দেশে পৌঁছানোর কথা রয়েছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত