গ্রাহক ছাড়াই হিসাব খুলে জালিয়াতি

আপডেট : ১৯ জুলাই ২০২৩, ০৩:৫১ এএম

ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের ময়মনসিংহ জেলার ভালুকায় অবস্থিত সিডস্টোর বাজার শাখায় বগুড়ার একজন মাদ্রাসার শিক্ষকের নামে ভুয়া ব্যাংক হিসাব খোলা হয়। মো. তোফায়েল আহমেদ নামে ওই শিক্ষকের এই ব্যাংক হিসাব খোলেন আনারুল নামে এক ব্যক্তি। পরে এই ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে দীর্ঘদিন লেনদেনও করেন। স্থানীয় ব্যবসায়ী মফিজুল ইসলামের বিশ্বস্ততা অর্জনের পর আনারুল তার পাওনা টাকার বিপরীতে দুটি ব্যাংক চেক দেন। এই চেক ভাঙাতে গেলেই ঘটে বিপত্তি। কারণ ওই ব্যাংক হিসাবে ছিল না কোনো টাকা। এতে নিজের টাকা তুলতে ভালুকা থানায় চেক জালিয়াতির মামলা করেন। আর ওই মামলার আসামি হিসেবে মাদ্রাসা শিক্ষক তোফায়েলের কাছে নোটিস যাওয়ার পর তিনি এই ব্যাংক হিসাব সম্পর্কে জানতে পারেন। ব্যাংক হিসাবের সঙ্গে তার কোনো সংশ্লিষ্টতা না থাকলেও এখন প্রতিনিয়তই মামলার হাজিরা দিতে হচ্ছে অল্প বেতনে চাকরি করা এই শিক্ষককে।

ব্যাংকাররা বলছেন, বর্তমানে ব্যাংক হিসাব খোলার ক্ষেত্রে অনেক ধাপ রয়েছে। চাইলেই কেউ জালিয়াতি করতে পারে না। ঘটনা বিশ্লেষণ করলে এটি স্পষ্ট যে, সংশ্লিষ্ট ব্যাংক কর্মকর্তার যোগসাজশ ছাড়া অন্যজনের এনআইডি ব্যবহার করে ব্যাংক হিসাব খোলা সম্ভব নয়।

বাংলাদেশ ব্যাংক ও আদালত থেকে প্রাপ্ত তথ্য বলছে, মাদ্রাসা শিক্ষক তোফায়েল আহমেদের বাড়ি বগুড়া জেলার সোনাতলা উপজেলার শালিখা গ্রামে। স্থানীয় একটি কওমি মাদ্রাসায় ৫ হাজার টাকা বেতনে চাকরি করেন। পাশাপাশি মসজিদের ইমামতিতে পান আরও ৩ হাজার টাকা। তা দিয়েই টেনেটুনে চলে সংসার। হঠাৎ একদিন তারই প্রতিবেশী আনারুল ইসলাম বেশি বেতনে ইমামতির চাকরির অফার নিয়ে আসেন, নিয়ে যান জাতীয় পরিচয়পত্রসহ কিছু কাগজপত্র। ওইসব কাগজপত্র দিয়েই ভুয়া ব্যাংক হিসাব খোলেন প্রতিবেশী আনারুল। আর ওই অ্যাকাউন্টের চেক জালিয়াতির মামলায় ফেঁসে গেছেন মাদ্রাসা শিক্ষক তোফায়েল।

তোফায়েল আহমেদ জানান, চাকরি তো হয়ইনি বরং কিছুদিন পর জানতে পারেন তার বিরুদ্ধে ময়মনসিংহের ভালুকায় চেক জালিয়াতির মামলা হয়েছে। মামলা থেকে রেহাই পেতে দিতে হবে ৮ লাখ টাকা। কিংকর্তব্যবিমূঢ় তোফায়েল প্রতিকার চেয়ে অভিযোগ দিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকে। একই সঙ্গে প্রতারক চক্রের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা করেছেন। দুটি মামলার খরচ জোগাতে তার এখন বেহাল অবস্থা।

দেশ রূপান্তরের হাতে আসা মামলার নথিপত্র ও বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ময়মনসিংহ জেলার ত্রিশাল থানার গুজিয়াম এলাকার বাসিন্দা মফিজুল ইসলামের নামে ইস্যুকৃত ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের দুটি চেক ডিজঅনার হয়েছে। মফিজুল ব্যাংকটির একটি এজেন্ট আউটলেটের প্রোপ্রাইটর। টাকার পরিমাণ ১৭ লাখ ৪৬ হাজার। ২৮১১৫২০০০১৯৯২ নম্বর হিসাবের যথাক্রমে চেক নম্বর ৬৭৮৯১৬২-এ আট লাখ ও ৬৭৮৯১৬৪ নম্বর চেকে ৯ লাখ ৪৬ হাজার টাকা। হিসাবধারী ব্যক্তির নাম তোফায়েল আহমেদ। তিনি বগুড়ার সোনাতলা এলাকার বাসিন্দা। এ ঘটনায় ময়মনসিংহের ৮ নম্বর আমলি আদালতে নেগোশিয়েবল ইনস্ট্রুমেন্ট আইনের ১৩৮ ধারায় একটি মামলা হয়েছে। আদালতের ওয়ারেন্ট আদেশ পেয়ে আসামি তোফায়েল আহমেদ আত্মসমর্পণ করে জামিন নেন। এরপর ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট শাখা ব্যবস্থাপককে একটি আইনি নোটিস পাঠান। একই সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকে একটি অভিযোগও দেন। এতে তিনি দাবি করেন, তার অগোচরে প্রতারণার উদ্দেশ্যে ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের ভালুকা সিডস্টোর শাখায় হিসাবটি খোলা হয়েছে। তিনি কখনই ময়মনসিংহে যাননি। তার বিরুদ্ধে করা মামলার বাদী মফিজুল ইসলামের সঙ্গে কখনই কোনো মাধ্যমে যোগাযোগ হয়নি।

ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের এজেন্ট ও তোফায়েলের বিরুদ্ধে করা চেক ডিজঅনারের মামলার বাদী মফিজুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘অ্যাকাউন্টের তথ্য ব্যবহার করে আমি মামলা করেছি। তোফায়েল নামে ব্যক্তির সঙ্গেই আমি নিয়মিত লেনদেন করতাম। তিনি স্থানীয় প্রাণ কোম্পানির পণ্যে ডিলার ছিলেন। তিনিই আনারুল কি না, তা আমি জানি না। স্থানীয় সব মানুষ তাকে তোফায়েল নামেই চিনত। আমার কাছ থেকে টাকা নেওয়ার পর হঠাৎ সে গা-ঢাকা দেয়। মাদ্রাসাশিক্ষক তোফায়েল সম্পর্কে আমার কোনো ধারণা নেই।’ তিনি বলেন, ‘জালিয়াতির মাধ্যমে যদি হিসাব খোলাও হয়ে থাকে তাও আমি কিছু জানি না। কারণ এ হিসাবটি আমার এজেন্ট আউটলেটে খোলা হয়নি। ব্যাংক হিসাবটি সিডস্টোর শাখায় খোলা হয়েছে।’

ভুক্তভোগী তোফায়েল দাবি করেন, নিজস্ব সোর্স ব্যবহার করে তিনি হিসাবের নথিপত্র ব্যাংকের সার্ভার থেকে দেখেছেন। তাতে এনআইডির সঙ্গে ব্যাংক হিসাবের স্বাক্ষরে গরমিল রয়েছে। ব্যাংক হিসাবে ব্যবহৃত মোবাইল নম্বরটিও তার নয়। ব্যাংক হিসাবে যে ছবি ব্যবহার করা হয়েছে, তাও তোফায়েলের নয়। শুধু নাম-ঠিকানা তার। এতে তোফায়েল নিশ্চিত হয়েছেন, প্রতিবেশী আনারুল ইমামতির চাকরির কথা বলে তার কাছ থেকে নেওয়া এনআইডি ব্যবহার করে ব্যাংক কর্মকর্তার যোগসাজশে হিসাবটি খোলেন। বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পর তিনি মফিজুল (তোফায়েলের বিরুদ্ধে করা মামলার বাদী) ও প্রতিবেশী আনারুলের বিরুদ্ধে ময়মনসিংহের ৮ নম্বর আমলি আদালতে একটি মামলা করেছেন।

অভিযুক্ত আনারুলের মোবাইল ফোনে কল দিয়ে বন্ধ পাওয়া যায়। স্থানীয়রা জানিয়েছেন, ঘটনার পর থেকে আনারুল পলাতক। তার বাবা ফজলু শেখের মোবাইল ফোনটিও বন্ধ রাখা হয়েছে।

গ্রাহকের অনুপস্থিতিতে এনআইডি ছবি ও স্বাক্ষর ছাড়াই কীভাবে ব্যাংক হিসাব খোলা হয়েছে জানতে চাইলে ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের ভালুকা সিডস্টোর বাজার শাখা ম্যানেজার কামরুজ্জামান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘গ্রাহক উপস্থিত না থাকলে তো তার অ্যাকাউন্ট খোলা সম্ভব নয়। সুতরাং বিষয়টি সঠিক নয়। তবে যেহেতু চেক ডিজঅনারের মামলা হয়েছে, এজন্য আমরা সব তথ্য আমাদের প্রধান কার্যালয়ে জমা দিয়েছি। পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংক যেহেতু তদন্ত করছে, আমরা তাদেরও তথ্য দিয়েছি।’ লিগ্যাল নোটিসের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘নোটিস পাওয়ার পর নোটিসদাতার কাছে কিছু কাগজপত্র চাওয়া হয়েছে। ওইসব কাগজপত্রসহ সংশ্লিষ্ট তথ্য আমাদের আইন বিভাগকে দেওয়া হয়েছে। এজন্য বিষয়টি নিয়ে প্রধান কার্যালয়ের তদন্তের অধীন থাকায় মন্তব্য করা সম্ভব নয়।’

পরে এ বিষয়ে জানতে ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবুল কাশেম শিরিনের ব্যক্তিগত মোবাইলে একাধিকবার কল দিলেও তিনি রিসিভ করেননি। পরবর্তী সময়ে তার হোয়াটসঅ্যাপে প্রশ্ন লেখে পাঠালেও তিনি তার উত্তর দেননি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এক কর্মকর্তা বলছেন, বর্তমানে গ্রাহকের এনআইডি, ছবি ও স্বাক্ষর ছাড়া হিসাব খোলা খুবই কঠিন। একজনের তথ্য দিয়ে অন্য কেউ হিসাব খোলা প্রায় অসম্ভব। সাধারণভাবে বোঝা যাচ্ছে ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার যোগসাজশেই এমন ঘটনা ঘটেছে। তদন্ত হলে বিষয়টি বেরিয়ে আসবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত