দেশের গণতান্ত্রিক নির্বাচন প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করার জন্য দায়ী বা জড়িত থাকার অভিযোগে কিছু ব্যক্তির ওপর ভিসা নিষেধাজ্ঞা আরোপের প্রক্রিয়া শুরুর কথা জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। স্থানীয় সময় গতকাল শুক্রবার এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দিয়ে এ সিদ্ধান্তের কথা জানান যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র ম্যাথু মিলার।
সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে কারও নাম উল্লেখ করা না হলেও যাদের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে তাদের বিষয়ে বলা হয়, তারা সরকারের বর্তমান ও সাবেক কর্মকর্তা, ক্ষমতাসীন ও বিরোধী রাজনৈতিক দলের সদস্য, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য, বিচার বিভাগের সদস্য এবং নিরাপত্তা সংস্থার সদস্য।
যাদের ওপর ভিসা নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হচ্ছে, সেসব ব্যক্তি বা তাদের পরিবারের সদস্যরা হয়তো যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের যোগ্য বলে বিবেচিত হবেন না বলে বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়।
সেখানে আরও বলা হয়, ভবিষ্যতে আরও কোনো ব্যক্তিবর্গের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক নির্বাচনী প্রক্রিয়া ক্ষুন্ন করা বা এর সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ পাওয়া গেলে তারাও একই ভিসানীতির আওতায় পড়তে পারেন।
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ‘আমাদের আজকের পদক্ষেপ বাংলাদেশে শান্তিপূর্ণভাবে অবাধ ও সুষ্ঠু জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের লক্ষ্যের প্রতি সমর্থনকে প্রতিফলিত করে। একই সঙ্গে এ পদক্ষেপ যারা সারা বিশ্বে গণতন্ত্রকে এগিয়ে নিতে চান তাদের প্রতিও সমর্থন।’
সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচন সমর্থন জানিয়ে যুক্তরাষ্ট্র গত ২৪ মে বাংলাদেশের জন্য নতুন ভিসানীতি ঘোষণা করে। ওই সময় দেওয়া বিবৃতিতে সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য বাধা হওয়া ব্যক্তি ও তাদের আত্মীয়স্বজনরা এ নীতির আওতায় পড়বে বলে জানানো হয়েছিল। দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনের তিন মাস আগে মার্কিন পররাষ্ট্র বিভাগ সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দিয়ে নিষেধাজ্ঞা প্রয়োগ শুরুর কথা জানাল।
ভিসা নিষেধাজ্ঞা আরোপের পদক্ষেপ নেওয়া শুরু করার ঘোষণা দেওয়ার পর ঢাকায় মার্কিন দূতাবাসের মুখপাত্র ব্রায়ান শিলার বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র এরই মধ্যে বাংলাদেশের কিছু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য, ক্ষমতাসীন দলের সদস্য ও রাজনৈতিক বিরোধীদের ওপর ভিসা বিধিনিষেধ আরোপ করেছে।
সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমরা যখন এ ভিসানীতি ঘোষণা করেছি, তখন থেকেই যুক্তরাষ্ট্র সরকার ঘটনাবলির ওপর গভীর দৃষ্টি রাখছে। সতর্কতার সঙ্গে তথ্য-প্রমাণ পর্যালোচনার পর আমরা এসব ব্যক্তির ওপর ভিসা নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছি।’
ব্রায়ান শিলারকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, ভিসা নিষেধাজ্ঞার আওতায় আসা ব্যক্তিদের নাম যুক্তরাষ্ট্র প্রকাশ করবে কি না। জবাবে তিনি বলেন, ‘না, এসব ভিসা বিধিনিষেধের আওতায় আসা ব্যক্তিদের নাম আমরা প্রকাশ করব না।’ কারণ ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের আইনে ভিসা রেকর্ড গোপনীয়।
যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া ভিসা নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকাদের সঠিক সংখ্যা না জানালেও এটি খুব বড় নয় বলে গণমাধ্যমকে বলেছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম। গতকাল রাতে রাজধানীর গুলশানে নিজ বাসায় তার সঙ্গে কথা বলেন সাংবাদিকরা। এ সময় শাহরিয়ার আলম বলেন, ‘এটার বিষয়ে দুদিন আগেই জানিয়েছিল। এটা নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গেও তারা কথা বলেছে। আমাদের সংখ্যা সম্বন্ধে একটা ধারণা দেওয়া হয়েছে। তারা যদি না বলেন, মার্কিন দূতাবাস হয়তো বলতে পারবে। তবে সংখ্যাটি বড় নয়, ছোট এটা বলতে পারি।’
প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, ‘যে কয়েকজনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে, আমরা আশা করব সেটা সঠিক তথ্য ও উপাত্ত বিশ্লেষণ করেই নেওয়া হয়েছে। আমাদের সরকারের কেউ এটার আওতায় পড়লে আমরা এটা জানব। এতে সরকারের কাজে সমস্যা তৈরি হলে পরবর্তী সময়ে মার্কিন প্রশাসনের সঙ্গে আমরা কথা বলব। এর আগেও, অন্তত তিনজনের বিষয়ে আমাদের কাজ করতে হয়েছে। আমরা সাকসেসফুল হয়েছি। কাজেই এ নীতির ফলে কার্যক্রমে সমস্যা হলে, সেগুলো আমরা জানলে, সেটা নিয়ে মার্কিন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আমরা কথা বলব।’
আগামী জাতীয় নির্বাচনের আগে যুক্তরাষ্ট্র থেকে আর কোনো নিষেধাজ্ঞা আসবে না বলে মনে করছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী। নির্বাচনের আগে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে আরও নিষেধাজ্ঞা আসতে পারে কি না, এক সাংবাদিকের এ প্রশ্নে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা মনে করি না যে নির্বাচনের আগে আর কোনো ধরনের বিবৃতিও আপনারা দেখতে পাবেন। কারণ, আমরা পরিষ্কারভাবে বলেছি যে, এ সেনসেটিভ (স্পর্শকাতর) সময়ে এই ধরনের পদক্ষেপ বা বিবৃতি ইন্টারফারেন্স (হস্তক্ষেপ) হিসেবে মনে হবে।’
যুক্তরাষ্ট্র না চাইলেও বাংলাদেশে ভোটের আগে অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে তাদের এ ধরনের সিদ্ধান্ত প্রভাব ফেলবে সে বিষয়টি তাদের কাছে তুলে ধরা হয়েছে বলে জানান শাহরিয়ার আলম। এরপর এ বিষয়ে মার্কিন কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে আশ্বাস পেয়েছেন বলে জানান তিনি। যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগের বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করা হচ্ছে বলেও উল্লেখ করেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কিছু সদস্য নিষেধাজ্ঞার আওতায় রয়েছেন। এ বিষয়ে দেশ রূপান্তরের পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
উল্লেখ্য, গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলে ২০২১ সালের ডিসেম্বরে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র্যাব) কয়েকজন কর্মকর্তা ও র্যাবের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে যুক্তরাষ্ট্র।
নির্বাচন ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের গতকালের বিবৃতি সরকারের ওপর আরও চাপ সৃষ্টি করল। এর আগে ইউরোপীয় ইউনিয়ন চিঠি দিয়ে নির্বাচনে পূর্ণাঙ্গ পর্যবেক্ষক দল পাঠাবে না বলে জানিয়ে দিয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে সরকারি দল আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য আবদুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পৃথিবীব্যাপী যুক্তরাষ্ট্রের ভিসানীতি রয়েছে। বাংলাদেশের নির্বাচন বাধাগ্রস্তের বিষয়ে যে কথা বলেছে, এটা তাদের নিজস্ব ব্যাপার। তাদের এখতিয়ারের ব্যাপার। এটাকে খারাপ বা ভালো হিসেবে নেওয়ার সুযোগ আমাদের নেই।’
ভিসানীতি প্রয়োগের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে চায় কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘এখানে যেহেতু সরকারি দল, সরকারি কর্মকর্তা এবং বিরোধী দল রয়েছে, তাই শুধু আমরা চাপ অনুভব করব কেন? আর এখানে চাপ অনুভব করার কারণ নেই। তারা যদি অবাধ, সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য এ নীতিমালা প্রয়োগ করতে চায় বা করে, তাদের চাওয়া এবং আমাদের চাওয়ার মধ্যে তো কোনো পার্থক্য নেই। কারণ আমরা তো সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন চাই।’
আওয়ামী লীগের আন্তর্জাতিকবিষয়ক সম্পাদক শাম্মী আহমেদ বলেন, ‘আমেরিকা যেমন স্যাংশন দিতে পারে, চাইলে আমরাও তো দিতে পারি। নির্বাচনে বাধাদানকারীদের বিরুদ্ধে আমেরিকার ভিসা নিষেধাজ্ঞা আরোপের যে প্রক্রিয়া শুরু করেছে তাতে আওয়ামী লীগের বা সরকারের কোনো দুশ্চিন্তা নেই। এখানে ভয় পাওয়ার কোনো কারণ নেই। আমেরিকা চায় অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রেখে দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হোক। আমরাও তাই চাই।’
ভিসানীতি প্রয়োগের ঘোষণার মাধ্যমে আওয়ামী লীগের ওপর চাপ সৃষ্টি করা হয়েছে কি না, এ প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘আমার কাছে মনে হয় না কোনো চাপ আমাদের ওপর আছে। কারণ আমাদের একটাই কথা আমরা অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন চাই। আমরা সেটাই করব।’
শাম্মী আহমেদ বলেন, ‘আমি মনে করি এমন ভিসানীতি তারা যদি ২০১৪ ও ’১৮ সালে সংসদ নির্বাচনের আগে দিত, তাহলে বিএনপি দেশজুড়ে জ¦ালাও-পোড়াও করতে পারত না। করতে ভয় পেত।’
বিএনপি নেতারা বলেছেন, তারা সবসময় সরকারকে সতর্ক করে আসছেন। শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি পালন করছেন। কিন্তু সরকার তাতে গুরুত্ব না দিয়ে আবারও একতরফা নির্বাচনের পথে হাঁটছে। তার প্রতিক্রিয়ায় যুক্তরাষ্ট্র সরকার এ পদক্ষেপ নিয়েছে।
দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘শুধুই নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার বিষয়টি শুনেছি। কার কার বিরুদ্ধে দিয়েছে, সে বিষয়টি তারা স্পষ্ট করেনি। খোঁজখবর নিয়ে পরে এ বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানাব।’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিএনপির স্থায়ী কমিটির এক সদস্য দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞায় যাদের নাম রয়েছে, তাদের মধ্যে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা রয়েছে বলে শুনেছি। চলতি মাসে আরও নাম আসবে বলে শুনতে পাচ্ছি।’
বিএনপির মানবাধিকারবিষয়ক সম্পাদক ও পররাষ্ট্রবিষয়ক কমিটির সদস্য মো. আসাদুজ্জামান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা যতদূর জানতে পেরেছি ভিসা নিষেধাজ্ঞার মধ্যে পড়েছে সরকারি দল আওয়ামী লীগ ও জাতীয় সংসদের বিরোধী দল।’