করোনা মহামারীর অভিঘাত কাটিয়ে ওঠার পর পর্যটন খাতকে এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা চালিয়েও সফলতা আসছে না। পর্যটকদের জন্য ভিসা জটিলতা নিরসন, সুযোগ-সুবিধা বাড়ানো, নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এর কোনো কিছুই হচ্ছে না। পর্যটন মহাপরিকল্পনা হাতে নিলেও তা চূড়ান্ত হয়নি। পর্যটনের অভিভাবক বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ড মাত্র ১০ জন কর্মকর্তা নিয়ে চলছে। যেখানে থাকার কথা কমপক্ষে ১০০ জেলা পর্যায়ে নেই কোনো অফিস। বোর্ডের প্রধান নির্বাহীর পদটি দীর্ঘদিন ধরেই শূন্য।
পাশাপাশি বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় বেশ কিছু উদ্যোগ নিলেও কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না।
এমন প্রেক্ষাপটে আজ ২৭ সেপ্টেম্বর বিশ্ব পর্যটন দিবস পালিত হবে বাংলাদেশেও। ঘটা করেই ফেস্টিভ্যালের আয়োজন করেছে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ড (বিটিবি)। ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এই ফেস্টিভ্যাল চলবে। বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে আয়োজিত এই ফেস্টিভ্যাল উদ্বোধন করবেন জাতীয় সংসদের স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী।
দিবসটি উপলক্ষে পর্যটক ও পর্যটন কেন্দ্রের নিরাপত্তা, আবাসন, অ্যাভিয়েশন পর্যটন খাতে কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা এবং পর্যটনশিল্পে নারীর অংশগ্রহণ, প্রতœ পর্যটন, খাদ্য পর্যটন, পর্যটন ও অ্যাভিয়েশন সাংবাদিকতা, প্লাস্টিকমুক্ত সেন্টমার্টিন ইত্যাদি বিষয়ে সেমিনার হবে।
সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে থাকবে গম্ভীরা, সিলেটের আঞ্চলিক গান, গাজী কালুর পট, পথনাটক, বাউলগান, পুঁথিপাঠ, কাওয়ালি এবং বিশিষ্ট শিল্পীদের গানের আয়োজন।
পর্যটন-সংশ্লিষ্টরা দেশ রূপান্তরকে বলছেন, বাংলাদেশে পর্যটন খাতের বিশাল সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে সরকার যথাযথ সহায়তা দিতে পারেনি। বিভিন্ন ধরনের সীমাবদ্ধতা ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশ এ খাতে সফলতা পাচ্ছে না। বিদেশিরা বাংলাদেশে এলে পর্যটক এলাকায় যাচ্ছেন না। কক্সবাজার, কুয়াকাটা, বান্দরবান, রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি, সুন্দরবনসহ কয়েকটি পর্যটক এলাকায় নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন আছে। বিনোদনের সুযোগ-সুবিধাও নেই।
বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিমন্ত্রী মাহবুব আলীর কাছে জানতে চাইলে তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘খুব শিগগির বাস্তবায়ন করা হবে মহাপরিকল্পনা। গত বছরের ডিসেম্বরে মহাপরিকল্পনা চূড়ান্ত করার কথা ছিল। কিন্তু করা যায়নি।
শিগগির তা চূড়ান্ত করা হবে।’
তারপরও পর্যটন খাত ঘুরে দাঁড়াবে এমন আশা প্রকাশ করে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘দেশের পর্যটনশিল্পকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করতে আমাদের মন্ত্রণালয় কাজ করছে। মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা ছাড়া উন্নয়ন সম্ভব নয়।’
বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের সচিব মোকাম্মেল হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিশে^র দরবারে বাংলাদেশের পর্যটন স্পট তুলে ধরতে কাজ চলছে। সম্ভাবনাময় এই খাতকে লাভজনক করতে নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পর্যটকরা যাতে নিরাপত্তায় থাকেন, সে জন্য আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো কাজ করছে।’
চেষ্টার কোনো কমতি নেই দাবি করে তিনি বলেন, ‘ট্যুরিজম বোর্ডের লোকবল বাড়ানো হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে শূন্য থাকা বিটিবির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার পদটি শিগগিরই পূরণ করা হবে।’
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, সৈকত নগরী কক্সবাজার পর্যটকদের আকর্ষণের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু হলেও সেখানে সুযোগ-সুবিধা তেমন নেই। যেমন বার নেই, সৈকতে পড়ে থাকে বর্জ্য। পর্যটন করপোরেশনের হোটেল-মোটেলে ছারপোকা আর তেলাপোকার উৎপাত। সমুদ্রে বখাটেদের আনাগোনা।
তারা বলছেন, এ খাতে বিনিয়োগও হতাশাজনক। আর এ কারণে প্রবৃদ্ধিও কখনোই কাক্সিক্ষত মাত্রায় অর্জিত হয়নি। প্রায় ৪৫ লাখ কর্মী থাকলেও জিডিপির মাত্র ২ শতাংশ আসছে এ খাত থেকে। ২০১৯ সালে বাংলাদেশে সর্বোচ্চসংখ্যক বিদেশি পর্যটক এসেছিল ৬ লাখ ২১ হাজার ১৩১। কিন্তু ২০২০ সালে করোনা মহামারীর কারণে তা কমে আসে ১ লাখ ৮১ হাজার ৫১৮ জনে। পরের বছর ২০২১ সালে ১ লাখ ৩৫ হাজার ১৮৬ জন বিদেশি পর্যটক আসে। ২২ সালে ১ লাখের মতো পর্যটক এসেছিল। পর্যটকদের মধ্যে ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, চীন, যুক্তরাজ্য, জাপান, মালয়েশিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, নেপাল ও সৌদি আরবের নাগরিকই বেশি। তাদের পছন্দের স্থান সুন্দরবন, কক্সবাজার ও সেন্টমার্টিন।
বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ড জানিয়েছে, তিনটি পর্যায়ে পর্যটন মহাপরিকল্পনার কাজ চলছে। প্রথম পর্যায়ে তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে দেশের পর্যটনশিল্পের বর্তমান অবস্থা, সম্ভাবনা, সংকট, দুর্বলতাসহ বিভিন্ন সমস্যা চিহ্নিত করা হবে। বেসরকারি অংশীজনদের সঙ্গে বৈঠক করে মতামত নেওয়া হয় প্রথম ধাপেই। দ্বিতীয় পর্যায়ে দেশের পর্যটনের লক্ষ্য, পদক্ষেপ, কৌশলগত লক্ষ্য, অগ্রাধিকার ও যোগাযোগের ক্ষেত্র নির্ধারণ করা হয়। পর্যটন উন্নয়ন, প্রমোশন এবং রক্ষণাবেক্ষণের জন্য ৩, ৫ ও ১৫ বছরমেয়াদি কৌশলগত পরিকল্পনাও হয় দ্বিতীয় পর্যায়ে। তৃতীয় পর্যায়ে দেশের নির্দিষ্ট অঞ্চলভিত্তিক পরিকল্পনা করা। পর্যটন পণ্যের উন্নয়ন, অর্থায়ন ও বিনিয়োগের কৌশল নিয়ে কর্মপরিকল্পনা রয়েছে। বিপণন ও প্রচারের কৌশলও উঠে এসেছে এই ধাপে। এ ছাড়া মেলা, ফেস্টিভ্যাল, কার্নিভাল, কালচারাল অনুষ্ঠান, ব্র্যান্ডিং, সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রচার, ভিডিও নির্মাণ, ডিজিটাল স্ক্রিনে প্রদর্শনী ও ওশান ট্যুরিজমকে বেসরকারি উদ্যোগে চালুর পরিকল্পনাও রয়েছে।
পর্যটন মন্ত্রণালয় বলছে, পর্যটন মহাপরিকল্পনা প্রায় চূড়ান্ত। কোনো ভুলত্রুটি আছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ঠিক কবে মহাপরিকল্পনা চূড়ান্ত করা হবে, তা কেউ বলতে পারেননি।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, মহাপরিকল্পনা তৈরিতে যুক্ত রয়েছে বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন। ৩০ বছর মেয়াদি মহাপরিকল্পনায় অবকাঠামো উন্নয়নে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কিন্তু পরিবেশ-প্রকৃতি রক্ষা, বিদেশি পর্যটকদের আকৃষ্ট করতে তেমন কোনো উদ্যোগ নেই।
এ বিষয়ে অ্যাসোসিয়েশন অব ট্রাভেল এজেন্টস অব বাংলাদেশের (আটাব) মহাসচিব আবদুস সালাম আরেফ বলেন, ‘আমাদের দেশে পর্যটনের বহু জায়গা রয়েছে। কিন্তু এখানে পর্যটন কখনোই অগ্রাধিকার পায় না। এ জন্য পর্যটনবান্ধব মহাপরিকল্পনার বিকল্প নেই। সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া বা নেপাল পর্যটনকে সবচেয়ে প্রাধান্য দেয়। কিন্তু আমাদের এখানে পর্যটন কখনোই অগ্রাধিকার পায় না।’
বিদেশি পর্যটক আসার ক্ষেত্রে বেশ কয়েকটি সমস্যার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘আমরা এখনো উদার হতে পারছি না। বেশিরভাগ দেশ এখন ই-ভিসা, অন অ্যারাইভাল ভিসা দিচ্ছে। কিন্তু আমরা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ভিসা দিতে চাই না। বিদেশি পর্যটক আকৃষ্ট করতে দেশের মানুষের আচরণের পরিবর্তন অপরিহার্য। এ কাজটি সরকারকেই করতে হবে। বিদেশি পর্যটকদের সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা দিতে হবে, যা পর্যটন মহাপরিকল্পনায় থাকতে হবে।’
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, ১ হাজার ২০০ পর্যটকের নিরাপত্তায় আছে মাত্র একজন পুলিশ। সন্ধ্যার পর এলাকায় নিরাপত্তা সংকট আছে। কিছুদিন আগে সিলেটের জাফলংয়ে টিকিট কাটাকে কেন্দ্র করে পর্যটকদের সঙ্গে হামলার ঘটনা ঘটেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে এ দৃশ্য। আতঙ্কিত হয়ে পড়েন পর্যটকরা।
জানা গেছে, ২০১৯ সালের ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের ট্র্যাভেল অ্যান্ড ট্যুরিজম কমপিটিটিভনেস রিপোর্টে বাংলাদেশের অবস্থান ১২০তম দেখানো হয়েছে। আর ২০১৭ সালে ছিল ১২৫তম। জিডিপিতে ২০১৯ সালে ৪ দশমিক ৪ শতাংশ, অর্থাৎ ৭৭ হাজার ৩০০ কোটি টাকার অবদান রেখেছে, পর্যটন রপ্তানির মাধ্যমে একই বছর ২ হাজার ৮০০ কোটি টাকার সমমানের বৈদেশিক মুদ্রা আয় করেছে।
পর্যটন বিশেষজ্ঞ বাংলাদেশ ইন্টারন্যাশনাল হোটেল অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি এইচ এম হাকিম আলী জানান, বিপুল সম্ভাবনা থাকলেও সেটা কাজে লাগানো যাচ্ছে না। বিদেশি পর্যটকদের আকৃষ্ট করার মতো প্রচার নেই। ফলে পর্যটন খাতে প্রবৃদ্ধি কম। রয়েছে প্রচারণার ঘাটতি। দেশের পর্যটন স্পট সম্পর্কে ধারণা কম পর্যটকদের। পর্যটকের নিরাপত্তার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই। পর্যটকের স্বার্থে ট্যুরিস্ট পুলিশ গঠন হলেও সব পর্যটন স্পটে তাদের উপস্থিতি এখনো নিশ্চিত করা যায়নি। রয়েছে যাতায়াতব্যবস্থার বড় সমস্যা এবং অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতাও।
আরেক পর্যটন বিশেষজ্ঞ কাজী ওয়াহিদুল হক বলেন, পর্যটন বিকাশের জন্য পূর্বশর্ত হচ্ছে নিরাপত্তা। পৃথিবীর প্রায় সব দেশে পর্যটন এখন অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার খাত। নিরাপত্তা ও অবকাঠামোগত সুযোগ-সুবিধা পর্যটন বিকাশের পূর্বশর্ত। পর্যটকবান্ধব পরিবেশ পর্যটকদের আস্থা ও বিশ্বাস বৃদ্ধি করে। অথচ পর্যটনশিল্প বিকাশে অবারিত সুযোগ রয়েছে বাংলাদেশে।
