ট্রেন পেরুলো পদ্মা

আপডেট : ১১ অক্টোবর ২০২৩, ০৬:০২ এএম

দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান হলো। দেশের দক্ষিণের পথে যাতায়াত আরও দ্রুত, আরামদায়ক ও নিরাপদ করতে ঢাকা থেকে পদ্মা সেতু হয়ে ফরিদপুরের ভাঙ্গা পর্যন্ত রেলপথের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এ সময় তিনি বলেন, ‘আবারও প্রমাণ করেছি, বাঙালি ঐক্যবদ্ধ থাকলে কেউ তাকে দাবিয়ে রাখতে পারবে না। বাঙালি জাতিকে আমি আহ্বান জানাই, জাতির ভাগ্য নিয়ে কেউ যেন ছিনিমিনি খেলতে না পারে।’

প্রথম ধাপে ঢাকা থেকে ভাঙ্গা অংশ সমাপ্তির মধ্য দিয়ে নতুন তিন জেলা মুন্সীগঞ্জ, শরীয়তপুর ও মাদারীপুর রেলওয়ে নেটওয়ার্কের আওতায় এলো। শিগগির এ পথে যাত্রী নিয়ে বাণিজ্যিক রেল চলাচল শুরু হবে। আগামী বছর এ রেলপথের বাকি অংশ ভাঙ্গা থেকে যশোর পর্যন্ত চালুর লক্ষ্য রয়েছে বলে জানিয়েছে রেলপথ মন্ত্রণালয়।

গতকাল দুপুর ১২টা ২৪ মিনিটে মুন্সীগঞ্জের মাওয়া রেলস্টেশনে সুইচ টিপে একটি ফলক উন্মোচনের মধ্য দিয়ে ঢাকা থেকে ভাঙ্গা পর্যন্ত রেলপথ উদ্বোধন করেন শেখ হাসিনা। স্টেশনের দুই নারী টিকিট বিক্রেতার কাছ থেকে প্রধানমন্ত্রী ও তার বোন শেখ রেহানা দুপুর ১২টা ৫২ মিনিটের দিকে তাদের এবং পরিবারের শিশু সদস্যদের জন্য টিকিট সংগ্রহ করেন। প্রধানমন্ত্রী সবুজ পতাকা নেড়ে ও বাঁশি বাজিয়ে তার পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে দুপুর ১২টা ৫৫ মিনিটে ট্রেনে উঠে পদ্মা রেল সেতু দিয়ে পদ্মা নদী পার হয়ে ভাঙ্গার উদ্দেশে রওনা দেন।

দুপুর ২টার পর তিনি ভাঙ্গায় পৌঁছান। মাওয়া থেকে ভাঙ্গাগামী বিশেষ ট্রেনে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে পরিবারের সদস্য, মন্ত্রিপরিষদ সদস্য, সংসদ সদস্য ও বিশিষ্ট ব্যক্তিরা ছিলেন। এ ছাড়া বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার আরও ৫০ জন ট্রেনে ভ্রমণ করেন। যাত্রাপথে শেখ হাসিনাকে তার সহযাত্রীদের খোঁজ-খবর নিতে দেখা গেছে।

এর আগে মাওয়া রেলস্টেশনে এক নাগরিক সমাবেশে যোগ দেন প্রধানমন্ত্রী। রেলমন্ত্রী মো. নূরুল ইসলামের সভাপতিত্বে উদ্বোধন অনুষ্ঠানে অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন বঙ্গবন্ধুর ছোট মেয়ে শেখ রেহানা।

সেনাপ্রধান জেনারেল এসএম শফিউদ্দিন আহমেদ, বাংলাদেশে নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন এবং স্থানীয় সংসদ সদস্য (মুন্সীগঞ্জ-২) সাগুফতা ইয়াসমিন, রেলওয়ে সচিব মো. হুমায়ুন কবির অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন।

অনুষ্ঠানে ঢাকা ও যশোরের মধ্যে রেল যোগাযোগের ওপর একটি প্রামাণ্যচিত্র দেখানো হয়। এ সময় রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি এবিএম ফজলে করিম চৌধুরী, বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক মো. কামরুল আহসান, প্রকল্প পরিচালক আফজাল হোসেন প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

বাসস-এর খবরে বলা হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মাওয়া স্টেশনে আয়োজিত অনুষ্ঠানে বলেন, ‘আজকের এই প্রকল্প, যেটা ভাঙ্গা পর্যন্ত এখন করেছি, সেটা ভাঙ্গা থেকে যশোরে সংযোগ হবে। আর যশোর থেকে মোংলা পোর্ট পর্যন্ত সংযুক্ত হবে। এমনকি বরিশাল, পটুয়াখালী থেকে পায়রা পর্যন্ত এ রেললাইনকে যুক্ত করার পরিকল্পনা সরকারের রয়েছে। যদিও সেখানে মাটি নরম থাকায় কিছু প্রতিবন্ধকতা রয়েছে; তবে এ ব্যাপারে সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের সমীক্ষা চলছে।’

জাতির পিতার ৭ মার্চের ভাষণের সেই অমোঘ উচ্চারণ ‘বাঙালিকে কেউ দাবায়ে রাখতে পারবা না’ স্মরণ করিয়ে দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বিদেশি অর্থায়ন বন্ধের পর আমরা নিজেদের টাকায় পদ্মা সেতু নির্মাণের যে ঘোষণা দিয়েছিলাম, আজকে তা করে দেখিয়েছি। আবারও প্রমাণ করেছি, বাঙালি ঐক্যবদ্ধ থাকলে কেউ তাকে দাবিয়ে রাখতে পারবে না।’

পদ্মা সেতু নির্মাণ নিয়ে দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রের প্রসঙ্গ টেনে শেখ হাসিনা বলেন, ‘সামান্য একটি ব্যাংকের এমডি পদে থাকতে পারবে না বয়সের কারণে, সেটা বলার জন্য বিশ্বব্যাংক তার পক্ষে পদ্মা সেতুর অর্থায়ন বন্ধ করে দিয়েছিল। এরপরই আমরা ঘোষণা দিয়েছিলাম, নিজের টাকায় পদ্মা সেতু নির্মাণ করব।’ তিনি বলেন, পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্পটি দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নয়টি জেলা ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ, শরীয়তপুর, মাদারীপুর, ফরিদপুর, গোপালগঞ্জ, নড়াইল ও যশোরকে সংযুক্ত করবে।

রেলওয়ে সূত্র জানায়, ঢাকা থেকে খুলনাগামী আন্তঃনগর ট্রেন সুন্দরবন এক্সপ্রেস বর্তমানে বঙ্গবন্ধু (যমুনা) সেতু, ঈশ্বরদী, চুয়াডাঙ্গা হয়ে চলাচল করে। পদ্মা রেল সেতু চালু হলে ট্রেনটি রাজবাড়ী, পাটুরিয়া, কুষ্টিয়ার পোড়াদহ ও যশোর হয়ে খুলনায় যাবে। পাশাপাশি একই পথে ঢাকা থেকে যশোরের বেনাপোল পর্যন্ত চলাচলকারী বেনাপোল এক্সপ্রেস ট্রেনটি পদ্মা সেতু হয়ে চালানোর পরিকল্পনা রয়েছে।

অন্যদিকে রাজশাহী থেকে ঢাকা পর্যন্ত একটি ট্রেন চালানোর প্রস্তাব রয়েছে। বর্তমানে রাজশাহী থেকে মধুমতী এক্সপ্রেস ট্রেনটি ভাঙ্গা পর্যন্ত চলাচল করে। পদ্মা সেতুর ওপর দিয়ে ট্রেনটি ঢাকা পর্যন্ত সম্প্রসারণের পরিকল্পনা আছে। এ ছাড়া ঢাকা-পদ্মা সেতু-রাজবাড়ী রুটে একটি কমিউটার ট্রেন চালানোর কথাও ভাবছে রেলওয়ে।

২০২২ সালের ২৫ জুন পদ্মা সেতু চালু হয়। দ্বিতল এ সেতুর ওপর দিয়ে যানবাহন চলাচল করছে। এর নিচে সেতুর ভেতরে রয়েছে ট্রেন চলাচলের পথ। ২০১৬ সালের ৩ মে ৩৪ হাজার ৯৮৮ কোটি টাকা ব্যয়ে একনেকে পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্পটি অনুমোদিত হয়। বর্তমানে এ প্রকল্পের ব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৯ হাজার ২৪৬ কোটি টাকা। প্রকল্পটি সরকারের অগ্রাধিকার তালিকাভুক্ত। চীনের অর্থায়নে ওই দেশেরই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান রেলপথ নির্মাণের কাজটি করছে।

ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান চায়না রেলওয়ে গ্রুপের (সিআরইসি) স্বল্পমেয়াদি এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ২০৩০ সাল নাগাদ রেলপথটির ঢাকা-ভাঙ্গা অংশে প্রতিদিন ১৩ জোড়া ট্রেন চলবে। একইভাবে ভাঙ্গা-কাশিয়ানী অংশে প্রতিদিন সাত জোড়া ও কাশিয়ানী-যশোর অংশে প্রতিদিন চলবে পাঁচ জোড়া ট্রেন। এ সময়ের মধ্যে ঢাকা-ভাঙ্গা অংশে বছরে ৪০ লাখ, ভাঙ্গা-কাশিয়ানী অংশে বছরে ১৭ লাখ ও কাশিয়ানী-যশোর অংশে বছরে সাড়ে ১৩ লাখ যাত্রী পরিবহন করা হবে। একমুখী চলাচলের ওপর ভিত্তি করে এই প্রাক্কলন তৈরি করেছে সিআরইসি।

দেশ রূপান্তরের লৌহজং (মুন্সীগঞ্জ) প্রতিনিধি জানান, পূর্বনির্ধারিত সময় অনুযায়ী সড়কপথে গাড়িবহরে ঢাকার গণভবন থেকে রওনা হয়ে বেলা ১১টায় মুন্সীগঞ্জের মাওয়া স্টেশনে পৌঁছান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এ সময় আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী ও স্থানীয় মানুষ রাস্তার দুই ধারে দাঁড়িয়ে প্রধানমন্ত্রীকে হাত নেড়ে অভ্যর্থনা জানান। তাদের হাতে ছিল বিভিন্ন লেখা সংবলিত ফেস্টুন, প্ল্যাকার্ড, কণ্ঠে ছিল জয় বাংলাসহ বিভিন্ন স্লোগান।

স্থানীয় বাসিন্দা নয়ন আক্তার বলেন, ‘আগে মাওয়া থেকে ঢাকা যেতে দুই-তিন ঘণ্টা লাগত। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এক্সপ্রেস করে দিয়েছেন, পদ্মা সেতু করে দিয়েছেন, এতে আমাদের যাতায়াত খুব সুবিধা হয়েছে। এখন রেলপথ চালুর মাধ্যমে আমাদের আর কোনো দুর্ভোগ থাকবে না, সহজেই আমরা ঢাকা যাতায়াত করব।’

মুন্সীগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট সোহানা তাহমিনা বলেন, ‘আজকে ঈদের আমেজ অনুভব হচ্ছে। অনুষ্ঠানে যোগ দিতে পেরে এবং এই প্রথম ট্রেনে অংশগ্রহণ করে নিজেকে ধন্য মনে করছি।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত