দানের ব্যাপকতা ও নানা ধরন

আপডেট : ২২ আগস্ট ২০২৩, ১২:১০ এএম

ইসলামি শরিয়তের মহৎ গুণাবলি ও সৌন্দর্যের অন্যতম হলো এতে রয়েছে কল্যাণের বহু উপায় ও সৎকর্মের নানা মাধ্যম। যা দ্বারা প্রত্যেক মুমিন তার মাওলার সান্নিধ্য অর্জন করতে পারে, সে ধনী হোক বা গরিব; শক্তিশালী বা দুর্বল। বান্দাদের ওপর আল্লাহর অন্যতম দয়া ও অনুগ্রহ যে, তিনি তাদের সবাইকেই রিজিক দান করেছেন। অতঃপর তিনি তাদের কাউকে ধনাঢ্যতা দান করেছেন তারা শোকরিয়া (কৃতজ্ঞতা) আদায় করে কিনা তা পরীক্ষার জন্য এবং যাতে তারা জাকাত আদায় ও দান-সদকার মাধ্যমে তার নৈকট্য লাভ করতে পারে। তিনি বান্দাদের জন্য এমন কিছু ইবাদতের বিধান দিয়েছেন যেগুলোতে দরিদ্র ব্যক্তি তার ধনী ভাইয়ের সঙ্গে অংশগ্রহণ করতে পারে। ফলে সে উত্তম প্রতিদান লাভে তার সমপর্যায়ের হতে পারে।

এ প্রসঙ্গে হাদিসে আছে, হজরত আবু যর গিফারি (রা.) থেকে বর্ণিত, হজরত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাহাবিদের কয়েকজন নবী কারিম (সা.) কে বললেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল! বিত্তবানরা সওয়াব নিয়ে যাচ্ছে, তারা আমাদের মতো নামাজ আদায় করেন, আমাদের মতো রোজা পালন করেন এবং তারা নিজেদের অতিরিক্ত ধন-সম্পদ থেকে কিছু দান করে থাকেন। তখন তিনি বললেন, তোমাদের জন্য কি আল্লাহতায়ালা দান-সদকা করার ব্যবস্থা করেননি? প্রতিটি তাসবিহ সদকা, প্রতিটি তাকবির সদকা, প্রতিটি তাহমিদ সদকা, প্রতিটি তাহলিল সদকা, সৎকাজের আদেশ দেওয়া ও অসৎকাজ হতে বিরত রাখা সদকা এবং স্ত্রীর সঙ্গে মিলনও সদকা। তারা বললেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ! কেউ যদি স্ত্রী সংগম করে এতেও কি সে সওয়াব পাবে? তিনি বললেন, তোমরা কী মনে করো যদি সে কামাচার করে হারাম পথে তাতে কি তার পাপ হবে না? অনুরূপভাবে যদি সে কামাচার করে হালাল পথে তবে সে সওয়াব পাবে।’ সহিহ মুসলিম

পবিত্র কোরআন-হাদিসের দালিলসমূহ প্রমাণ করে যে, সদকা ব্যাপক অর্থবোধক এবং আর্থিক সদকা কেবলমাত্র ফকির-মিসকিনদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। যদিও তাদের ওপর সদকার অনেক ফজিলত রয়েছে এবং বহু উপায় ও মাধ্যম রয়েছে যার মাধ্যমে খরচকারী বান্দা তার দান যতই ছোট হোক না কেন দানবীরদের খাতায় নিজেকে যোগ করতে পারে ও ডানপন্থি বদান্যদের কাতারে শামিল করতে পারে। এগুলোর অন্যতম হলো নিজ পরিবার-পরিজনের ওপর খরচ করা, এমনকি নিজের ওপর খরচ করাও।

হাদিসে এসেছে, হজরত আবু মাসউদ বদরি (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী কারিম (সা.) বলেছেন, ‘সওয়াবের আশায় কোনো মুসলিম যখন তার পরিবার-পরিজনের জন্য খরচ করে, তা তার জন্য সদকায় পরিগণিত হয়।’ সহিহ বোখারি

নিজের চাহিদা পূরণের জন্য নিজের ওপর খরচ করা পরিবারের ওপর খরচ করার চেয়েও অগ্রাধিকারযোগ্য। হজরত জাবির (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, বনি ওজরার এক ব্যক্তি তার মৃত্যু পরবর্তীকালের জন্য তার এক গোলামকে আজাদ (মুক্ত) করল। হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) এ খবর শোনার পর (মালিককে) বললেন, তোমার কাছে এটা ব্যতিরেকে অন্যকোনো সম্পদ আছে কি? সে বলল, নেই। তখন তিনি বললেন, আমার কাছ থেকে এ গোলামকে খরিদ করবে কে? তখন হজরত নুয়াইম ইবনু আবদুল্লাহ আবদি (রা.) ৮০০ দিরহামের বিনিময়ে তাকে খরিদ করলেন। এরপর হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) মুদ্রাগুলো নিয়ে এসে তাকে দিয়ে বললেন, প্রথমে নিজের জন্য ব্যয় কর। এরপর অবশিষ্ট থাকলে পরিজনের জন্য ব্যয় কর। নিজ পরিজনের জন্য ব্যয় করার পরও যদি কিছু অবশিষ্ট থাকে তবে নিকটাত্নীয়দের জন্য ব্যয় কর। আত্মীয়-স্বজনদের দান করার পরও যদি কিছু অবশিষ্ট থাকে তাহলে এদিক সেদিক অর্থাৎ সম্মুখে-ডানে-বামে ব্যয় করবে।’ সহিহ মুসলিম

নবী কারিম (সা.) আরও বলেছেন, ‘প্রয়োজনের অতিরিক্ত সম্পদ থেকে সদকা করা উত্তম। যাদের ভরণ-পোষণ তোমার দায়িত্বে, প্রথমে তাদের দেবে।’ সহিহ বোখারি

শুরুতে উল্লিখিত হজর আবু যর (রা.)-এর হাদিস ও অন্যান্য হাদিসগুলো সদকার ব্যাপক অর্থের মধ্য থেকে দ্বিতীয় প্রকার অর্থের ওপর প্রমাণ বহন করে। তা হলো প্রতিটি সৎকাজ ও কল্যাণ যার দ্বারা একজন মুসলিম তার নিজের উপকার করে বা অন্যের উপকার করে তাই সদকা। সুতরাং আল্লাহর জন্য প্রতিটি জিকির সদকা, স্বামী-স্ত্রীর বৈধ চাহিদা পূরণ করাও সদকা। যেমন হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘প্রত্যেক ন্যায়সংগত কাজ সদকাতুল্য।’

অসুস্থতা বা অন্য কোনো কারণে অক্ষম ব্যক্তির সাহায্যে এগিয়ে আসা সদকাতুল্য। যার এরূপ করার সাধ্য নেই সে যদি অন্যকে কষ্ট দেওয়া থেকে বিরত থাকে তাহলে এটাও তার জন্য সদকাতুল্য হবে। নবী কারিম (সা.) বলেন, ‘প্রত্যেক মুসলিমের সদকা করা উচিত। সাহাবিরা আরজ করলেন, ইয়া নবীয়াল্লাহ! কেউ যদি সদকা দেওয়ার মতো কিছু না পায়? তিনি বললেন, সে ব্যক্তি নিজ হাতে কাজ করবে; এতে নিজেও লাভবান হবে, সদকাও করতে পারবে। তারা বললেন, যদি এরও সামর্থ্য না থাকে? তিনি বললেন, কোনো বিপদগ্রস্তকে সাহায্য করবে। তারা বললেন, যদি এতটুকুরও সামর্থ্য না থাকে? তিনি বললেন, এ অবস্থায় সে যেন নেক আমল করে এবং অন্যায় কাজ থেকে বিরত থাকে। এটা তার জন্য সদকা বলে গণ্য হবে।’ সহিহ বোখারি

দান-সদকার একটি ধরণ হলো মুসলিম ব্যক্তি কর্র্তৃক বৃক্ষরোপণ করা বা চাষাবাদ করা, আর তা থেকে মানুষ বা পশু-পাখির ফায়দা নেওয়া। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী কারিম (সা.) বলেছেন, ‘যেকোনো মুসলিম ফলবান গাছরোপণ করে কিংবা কোনো ফসল ফলায় আর তা থেকে পাখি কিংবা মানুষ বা চতুষ্পদ জন্তু খায় তবে তা তার পক্ষ থেকে সদকা বলে গণ্য হবে।’ সহিহ বোখারি

একজন মুসলিম ব্যক্তি তার ভাইয়ের উপকার সাধনে বা ক্ষতি থেকে রক্ষা করতে বা অপছন্দনীয় কিছু দূর করতে অথবা তাকে খুশি করতে যা কিছু সাহায্য করে তার সবই সদকাতুল্য। তাইতো হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘তোমার বালতি থেকে তোমার ভাইয়ের বালতিতে পানি ভর্তি করে দেওয়া একটি সদকা। সৎকাজের জন্য তোমার আদেশ এবং অসৎকাজ থেকে বিরত থাকার জন্য তোমার নির্দেশ একটি সদকা। তোমার ভাইয়ের সঙ্গে তোমার হাস্যোজ্জ্বল মুখে সাক্ষাত করা একটি সদকা। জনপথ থেকে পাথর, কাঁটা ও হাড় অপসারণ করা তোমার পক্ষ থেকে একটি সদকা। পথহারা পথিককে তোমার রাস্তা বাতলে দেওয়াও একটি সদকা।’

ভালো কথা যা দ্বারা অজ্ঞ ব্যক্তি শিক্ষা পায় বা উদাসীন ব্যক্তি সতর্ক হয়, সুন্দর ধারণা যা মুসলিম ব্যক্তি তার ভাই থেকে শ্রবণ করে অথবা নেক দোয়া যা দ্বারা সে কাউকে বিদায় দেয় বা স্বাগত জানায়-এগুলো সবই তার জন্য সদকাতুল্য। নবী কারিম (সা.) বলেছেন, ‘ভালো কথা সদকাতুল্য।’ সহিহ বোখারি

হজরত আবু দারদা (রা.) বলেন, ‘সৎ উপদেশের চেয়ে অধিক উত্তম কোনো সদকা কেউ করেনি যে উপদেশ সে একদল মানুষ প্রদান করেছে, অতঃপর তারা চলে গিয়েছে এমন অবস্থায় যে, আল্লাহ তাদেরকে এর দ্বারা উপকৃত করেছেন।’

১৮ আগস্ট শুক্রবার, মসজিদে নববিতে প্রদত্ত জুমার খুতবা।

অনুবাদ মুহাম্মদ আতিকুর রহমান

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত