ঢাকা জেলার সাতটি থানায় গত সাড়ে ১৩ মাসে ৪৬টি ডাকাতির মামলা হয়েছে। এসব মামলায় গ্রেপ্তার হয়েছে ২৩২ ডাকাত। গ্রেপ্তারদের মধ্যে ৯২ জন আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। এরপরও দমছে না ডাকাতরা। ডাকাতির ঘটনা বেশি ঘটছে ঢাকার কেরানীগঞ্জ এলাকায়। ঢাকা জেলা পুলিশ সুপারের (এসপি) কার্যালয় সূত্র এসব তথ্য জানা গেছে।
তবে একাধিক সূত্র বলছে, বেশিরভাগ ডাকাতির ঘটনা ঘটছে মহাসড়কে। কখনো আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরিচয়ে আবার কখনো সরাসরি ডাকাতির ঘটনা ঘটছে। এসব ঘটনায় ভুক্তভোগীদের অধিকাংশই থানায় মামলা করছে না। মোটা অঙ্কের টাকা বা স্বর্ণালংকার ডাকাতির ঘটনায় শুধু মামলা হচ্ছে। আর ডাকাতির শিকার বেশিরভাগই তাদের থেকে ছিনিয়ে নেওয়া মোবাইল ফোন ও মানিব্যাগ হারানোর সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করে। ফলে ডাকাতির প্রকৃত সংখ্যা জানা যায় না। যার সর্বশেষ দৃষ্টান্ত গত রবিবার রাতে গাজীপুর-খুলনা রুটে চলা রিসাত পরিবহন (প্রা.) লিমিটেডের একটি বাসে নৃশংস ডাকাতির ঘটনা। এ ঘটনার পর আশুলিয়া থানাধীন নবীনগর পুলিশ ফাঁড়িতে জিডি করে পরিবহন কর্তৃপক্ষ। আর ভুক্তভোগীদের কয়েকজন মোবাইল ফোন হারানোর সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছেন।
নাম প্রকাশ না করে ঢাকা জেলার এক অতিরিক্ত পুলিশ সুপার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ডাকাতির ঘটনা বেশি ঘটছে কেরানীগঞ্জ মডেল ও দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানা এলাকায়। এ ছাড়াও আশুলিয়া, সাভার, ধামরাই, নবাবগঞ্জ ও দোহার থানা এলাকায় তুলনামূলক কম ডাকাতির ঘটনা ঘটে। ডাকাতির ঘটনায় তারাও উদ্বিগ্ন বলে জানান এ কর্মকর্তা।
ঢাকা জেলা পুলিশ সুপার (এসপি) আসাদুজ্জামান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে ইতিমধ্যে সড়কের নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করেছি। টহল পুলিশের সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে। আমাদের সিনিয়র কর্মকর্তারাও টহল বাড়িয়েছেন। একই সঙ্গে যেন নিñিদ্র নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত করা যার সে লক্ষ্যে সিসি (ক্লোজ সার্কিট) টিভি ক্যামেরা স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছি।’ আগের চেয়ে ডাকাতি অনেকটাই কমে এসেছে বলেও দাবি করেন পুলিশের এ কর্মকর্তা।
ঢাকা জেলা এসপির কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ঢাকা জেলা পুলিশের অধীনে রয়েছে সাভার, আশুলিয়া, ধামরাই, কেরানীগঞ্জ মডেল, দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ, নবাবগঞ্জ ও দোহার থানা। ২০২২ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ডাকাতির মামলা হয়েছে ৪২টি। এসব মামালায় গ্রেপ্তার হয়েছে ২১৩ ডাকাত যাদের ৯২ জন অপরাধ স্বীকার করে আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছে। আর চলতি বছরের দেড় মাসে চারটি ডাকাতির মামলা হয়েছে, গ্রেপ্তার হয়েছে ১৯ ডাকাত, যাদের ৯ জন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে।
ঢাকা জেলা পুলিশের দায়িত্বশীলরা বলছেন, মহাসড়কের একটা বড় এলাকা ফাঁকা স্থানে। আশপাশে কোনো বাড়িঘর থাকে না। আর সড়কের সব এলাকা পুলিশ দিয়ে পাহারা দেওয়া সম্ভব হয় না। এ সুযোগই কাজে লাগাচ্ছে ডাকাতরা। তবে যেসব স্থানে ডাকাতির ঘটনা বেশি ঘটছে সেসব স্থানে টহল পুলিশ বাড়ানোর চেষ্টা চলছে।
সর্বশেষ গত মঙ্গলবার গ্রেপ্তার হয়েছে আট ডাকাত। এ ডাকাতচক্রটি গত ৩১ জানুয়ারি সন্ধ্যায় ঢাকা-নবাবগঞ্জ রোডের কোনাখোলায় নবকলি নামক একটি বাস থামিয়ে র্যাব পরিচয়ে আনোয়ার হোসেন খোকন ও নাহিদ নামে দুই স্বর্ণ ব্যবসায়ীকে মাইক্রোবাসে তুলে নেয়। পরে তাদের মারধর করে কাছে থাকা স্বর্ণ বিক্রির ৭১ লাখ টাকা ছিনিয়ে নিয়ে রাস্তার পাশে ফেলে দেয়।
ভুক্তভোগী দুই স্বর্ণ ব্যবসায়ী দেশ রূপান্তরকে জানান, তাঁতীবাজারে স্বর্ণ বিক্রি করে নাহিদ ৪০ লাখ ও খোকন ৩১ লাখ টাকা নিয়ে দোহারে যাওয়ার উদ্দেশে নবকলি বাসে ওঠেন। কেরানীগঞ্জ মডেল থানাধীন কোনাখোলা এলাকায় পৌঁছলে একটি সাদা হাইয়েস মাইক্রোবাস জোর করে বাসটি থামায়। র্যাবের পোশাক পরে বাসে উঠেই তারা যাত্রীদের বলে, ‘আপনারা কেউ ঘাবড়াবেন না। দুজন আসামি আছে বাসে। তাদের গ্রেপ্তার করতে এসেছি’। এরপরই নাহিদ ও খোকনকে নিয়ে টাকার ব্যাগসহ বাস থেকে নামিয়ে মাইক্রোতে তোলে তারা। দুজনকে বেঁধে ইলেকট্রিক শক দেয় ও মারধর করে এবং অস্ত্র ঠেকিয়ে ৭১ লাখ টাকা নিয়ে মুন্সীগঞ্জের শ্রীনগরের নিমতলা এলাকায় মহাসড়কের পাশে ফেলে দেয়।
এ চক্রই গত ১৭ জানুয়ারি গোবিন্দ চন্দ্র দাস, লিটন চন্দ্র দাস ও বাপন চন্দ্র দাস নামের তিন ব্যক্তির কাছ থেকে ৯ লাখ টাকা দামের রুপার অলংকার তৈরির কাঁচামাল ডাকাতি করে। ওই তিনজন তাঁতীবাজার থেকে অটোরিকশায় করে কেরানীগঞ্জে যাওয়ার পথে শাক্তা জামিয়া আরাবিয়া ইসলামিয়া মাদ্রাসার সামনে র্যাব পরিচয় দেওয়া ওই ডাকাতচক্রের কবলে পড়েন।
সংশ্লিষ্ট থানা পুলিশ বলছে, চক্রগুলো ডাকাতির মাধ্যমে অঢেল সম্পদ গড়ে তুলেছে। তাদের রয়েছে বড় সিন্ডিকেটও। ফলে গ্রেপ্তার করলেও জামিনে মুক্ত হতে বেশি বেগ পেতে হয় না তাদের। আর জামিনে ছাড়া পেয়ে ফের ডাকাতি শুরু করে।
কেরানীগঞ্জ মডেল থানার ওসি মামুন-অর-রশিদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার হলেও এদের নিজস্ব চক্র জামিন করিয়ে ফেলে। এরপর আবার ডাকাতিতে ফিরে আসে।’ তিনি বলেন, ‘এরা ডাকাতিকে সহজ পেশা মনে করে। কেননা পুলিশ বা র্যাবের পোশাক পরে তারা সহজেই সাধারণ মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করতে পারে।’