কক্সবাজারের উখিয়ার বালুখালী আশ্রয়শিবিরে (ক্যাম্প-১১) আগুনে পুড়েছে দুই হাজারের বেশি ঝুপড়ি ঘর। গতকাল বিকেল ৩টার দিকে লাগা এই আগুন ফায়ার সার্ভিসের ৯টি ইউনিটের চেষ্টায় নিয়ন্ত্রণে আসে সন্ধ্যা সোয়া ৬টার দিকে। আগুনে তাৎক্ষণিক হতাহতের কোনো খবর পাওয়া যায়নি। তবে গৃহহীন হয়ে কমপক্ষে ১২ হাজার রোহিঙ্গা খোলা আকাশের নিচে অবস্থান নিয়েছে। আগুনে রোহিঙ্গাদের ঝুপড়ি ঘর ছাড়াও অন্তত ২০টি বেসরকারি হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র, রোহিঙ্গা শিশুদের পাঠদানের লার্নিং সেন্টার ও ত্রাণ বিতরণ কেন্দ্র পুড়ে গেছে।
এদিকে এই অগ্নিকাণ্ডকে নাশকতামূলক বলে ধারণা করছেন সংশ্লিষ্ট অনেকেই। শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) মোহাম্মদ মিজানুর রহমান সাংবাদিকদের বলেছেন, অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় জড়িত সন্দেহে ১৪-১৫ বছর বয়সী এক রোহিঙ্গা কিশোরকে দেশলাইসহ আটক করা হয়েছে। তাকে ঘরে আগুন দিতে দেখেছেন অনেকে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জিজ্ঞাসাবাদে জানা যাবে, এটি পরিকল্পিত বা নাশকতামূলক অগ্নিকাণ্ড কি না। আটক ওই কিশোরের নামপরিচয় তাৎক্ষণিক জানায়নি স্থানীয় প্রশাসন।
জানা গেছে, বিকেল ৩টার দিকে বালুখালীর ১১ নম্বর ক্যাম্পের বি-ব্লকের একটি ঘর থেকে আগুনের সূত্রপাত। মুহূর্তেই তা ৯, ১০, ১২ নম্বর ক্যাম্পে ছড়িয়ে পড়ে। খবর পেয়ে একে একে ফায়ার সার্ভিসের ৯টি ইউনিটের সদস্যরা আগুন নেভানোর কাজে অংশ নেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সেখানে র্যাব, পুলিশ, সেনাবাহিনী ও আনসার সদস্যদের মোতায়েন করা হয়। এ ছাড়া উখিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইমরান হোসাইন, শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মিজানুর রহমান, পুলিশ সুপার মাহফুজুল ইসলামও ঘটনাস্থলে ছুটে যান।
সন্ধ্যা সোয়া ৬টার দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে বলে জানান ফায়ার সার্ভিসের কক্সবাজার স্টেশনের উপসহকারী পরিচালক অতীশ চাকমা। উখিয়া থানার ওসি শেখ মোহাম্মদ আলী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দুই হাজারের মতো ঘর পুড়ে গেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এ পর্যন্ত কোনো হতাহতের তথ্য পাওয়া যায়নি।’
উখিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইমরান হোসাইন সজীবও একই ধরনের তথ্য দেন।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, আগুন লাগার পর কক্সবাজার-টেকনাফ মহাসড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। রোহিঙ্গারা জীবন বাঁচাতে দিগবিদিক ছোটাছুটি করতে থাকে।
বালুখালী রোহিঙ্গা ক্যাম্পের জি-ব্লকের বাসিন্দা নুরজাহান বলেন, ‘আগুনে পুড়ে সব ছাই হয়ে গেছে। কোনো রকমে প্রাণে বেঁচেছি।’
ওই ক্যাম্পের আরেক বাসিন্দা গোলমেহের বলেন, ‘কীভাবে আগুন লেগেছে বলতে পারছি না। দুপুরে ক্যাম্পে গোলাগুলির শব্দ শুনেছি। এখানে শান্তি নেই। প্রতিদিন গোলাগুলি হয়। আজ আবার আগুনে সব পুড়ে গেল।’
ক্যাম্পটির আরেক বাসিন্দা মোহাম্মদ আলী বলেন, ‘আগুনে পুড়ে সব হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে গেছি। এসব ক্যাম্পে বারবার আগুন লাগার পেছনে রহস্য রয়েছে। সে রহস্য জানা কঠিন। আর ক্যাম্পে আগুন লাগাও থামে না।’
ঘটনাস্থলে থাকা শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মিজানুর রহমান বলেন, ‘আগুনে ঘরবাড়ি পুড়ে যাওয়ায় ১২ হাজার মানুষ আশ্রয়হীন হয়ে পড়েছে। তাদের আমরা বিভিন্ন সেন্টার ও মসজিদে নিয়ে যাচ্ছি। এনজিওগুলোর মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত রোহিঙ্গাদের মধ্যে শুকনো খাবার বিতরণ করা হবে। আর আগুন লাগার কারণ বের করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কাজ করছে।’
রোহিঙ্গা ক্যাম্পের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা ৮ এবিপিএনের জ্যেষ্ঠ সহকারী পুলিশ সুপার ফারুক আহমেদ বলেন, ‘বিকেল ৩টার দিকে হঠাৎ করে আগুন দেখা যায়। কীভাবে আগুনের সূত্রপাত হয়েছে তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। ক্যাম্পের ঘরগুলো পাশাপাশি হওয়ায় আগুন ১২, ১১, ১০ ও ৯ নম্বর ক্যাম্পে ছড়িয়ে পড়ে। আগুনের সূত্রপাত কীভাবে তা নিশ্চিত হওয়া না গেলেও সন্দেহজনক একজনকে আটক করা হয়েছে। তাকে জিজ্ঞাসাবাদের পর বিস্তারিত বলা যাবে।’ এর আগে ২০২১ সালের ২২ মার্চ একই ক্যাম্পে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। ওই সময় ১১ জন প্রাণ হারান, আহত হন পাঁচ শতাধিক। পুড়ে যায় ৯ হাজারের বেশি ঘর।
