সক্কাল সক্কাল ঘুম ভেঙে মোবাইলে চোখ রাখতেই স্ক্রিনে ভেসে এলো, আমার এক বিশিষ্ট বন্ধুর পোস্ট। সোশ্যাল মিডিয়ায় আজকাল যা-সব লেখালেখি হয়, বলা বাহুল্য, অধিকাংশই তা নিম্নমানের। ফলে মনে মনে বন্ধুর পোস্টের তারিফ না করে পারলাম না। পোস্টটি হুবহু তুলে দিলাম ‘সত্তর দশকের কলকাতা। একটি সংস্থার চাকরিপ্রার্থী যুবককে জিজ্ঞাসাবাদ করছেন কোম্পানির উচ্চপদস্থ প্রতিনিধিরা।
হোয়াট ইজ দ্য মোস্ট আউটস্ট্যান্ডিং অ্যান্ড সিগনিফিকেন্ট ইভেন্ট অব দ্য লাস্ট ডিকেড?
আই থিংক ওয়ার ইন ভিয়েতনাম স্যার।
মোর সিগনিফিকেন্ট দ্যান দ্য ল্যান্ডিং অন মুন?
আই থিংক সো স্যার।
কুড ইউ টেল আস, হোয়াই ইউ থিংক সো?
নট দ্য ওয়ার ইটসেল্ফ বাট ইট ইজ রিভিল্ট অ্যাবাউট দ্য ভিয়েতনামিজ পিপল, অ্যাবাউট দেয়ার এক্সট্রা অর্ডিনারি পাওয়ার অব রেজিস্টেন্স, দেয়ার পিপল, পিজান্টস... ইটস নট ম্যাটার অব টেকনোলজি, ইটস জাস্ট প্লেন হিউম্যান কারেজ।
অবধারিতভাবে পরের প্রশ্ন ছিল তুমি কি কমিউনিস্ট!
ছেলেটি উত্তর দিলেও তাকে এরপরে বিদায় করা হলো।
আর একটি ইন্টারভিউয়ে আর এক তরুণকে জিজ্ঞাসা করা হলো, হোয়াট ইজ দ্য ওয়েট অব মুন? চাঁদের ওজন কত? ছেলেটি ঈষৎ বিস্মিত গলায় জানতে চাইল, চাঁদের ওজন! এর সঙ্গে চাকরির কী সম্পর্ক?
তোমাকে যা জিজ্ঞেস করা হচ্ছে, যদি জানো, উত্তর দাও।’
দুটিই সত্যজিৎ রায়ের প্রতিদ্বন্দ্বী ও জন অরণ্য সিনেমার। অনেকেই দেখেছেন। জানেন। তবুও আমার বন্ধু মনে করিয়ে দিল বলে মনে পড়ে গেল। ছোট্ট একটা ডিসক্লেমার অবশ্যই বন্ধু দিতে ভোলেননি এই পোস্টের সঙ্গে চন্দ্রযান অভিযানের কোনো সম্পর্ক নেই।
ভারতের চন্দ্রযান অভিযানের সাফল্য নিয়ে এমন একজন ভারতীয় নাগরিক নেই যে আনন্দে উদ্বেল হয়নি। ইসরোর বিজ্ঞানীরা যেভাবে দিনের পর দিন, রাতের পর রাত পরিশ্রম করে সারা বিশ্বের কোটি কোটি লোককে গর্বিত করলেন, তাতে কোনো প্রশংসাই তাদের জন্য যথেষ্ট নয়। তারা দুনিয়ার ইতিহাসে নতুন এক অধ্যায়ের জন্ম দিলেন। আসলে এটা খুব জোর গলায় বলার দরকার যে ভারতের বিজ্ঞানী, সমাজবিজ্ঞানী, অর্থনীতিবিদ, লেখক, সমাজকর্মী, বিজ্ঞাপন জগতের রথী-মহারথীদের প্রতিভা, যোগ্যতা নিঃসন্দেহে দুনিয়ার সেরা। শিল্প, সাহিত্য, খেলা সব ক্ষেত্রেই আপনি, যত সমালোচক হোন না কেন, তাদের যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারবেন না। এবারের চন্দ্রযান অভিযানের কথাই ধরুন। চন্দ্রযান অভিযান-২ ব্যর্থ হওয়ার পরও একজনও ভেঙে না পড়ে অসাধ্যসাধন করলেন যে বিজ্ঞানীরা তাদের নামগুলো দেখলেই বুঝবেন, অধিকাংশই উঠে এসেছেন নিতান্তই সাধারণ ঘর থেকে। কেউ কেউ অতি দরিদ্র পরিবারের। এমন বিশাল কর্মযজ্ঞ সফল হলো মাত্র ৬১৫ কোটি টাকা বাজেটে। যেখানে ‘আদিপুরুষ’ সিনেমার বাজেটই ছিল সাতশ কোটি টাকা।
এমন একসময়ে বিজ্ঞানীরা সাফল্য পেলেন, যখন দেশে জ্যোতির্বিজ্ঞান নয়, প্রাধান্য পাচ্ছে জ্যোতিষ শাস্ত্র। যখন চারপাশে নব্য হিন্দুত্ববাদী রাজনীতিক দেশকে ঠেলে দিচ্ছেন প্রাচীন অন্ধকার সময়ে। ডিরোজিও, রামমোহন, বিদ্যাসাগর, রবীন্দ্রনাথের যুক্তি ও প্রজ্ঞা নয়, গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে অলৌকিক ক্ষমতা ও বিশ্বাসের ওপর। এমন একসময়, যখন সাম্প্রদায়িক হানাহানি ক্রমবর্ধমান। যখন মণিপুর, হরিয়ানা জ্বলছে। যখন গরু নিয়ে যাওয়ার অপরাধে নির্দিষ্ট একটি সম্প্রদায়ের ওপর হামলা হচ্ছে। এমন একসময়, যখন দেশের মাননীয় নেতারা ক্ষুধা, অভাব, চাকরি না পাওয়া, অর্থনৈতিক সংকট থেকে কীভাবে বের হতে পারা সম্ভব সে আলোচনায় না গিয়ে কাল্পনিক গালগল্প জনমনে চারিয়ে দিতে ব্যস্ত। সে কাহিনি নির্মাণে কখনো পাঠ্য সিলেবাস থেকে পুরো মুঘল যুগ বাদ পড়ে যাচ্ছে। কখনো শোনা যাচ্ছে আধুনিক প্লাস্টিক সার্জারি সনাতন ভারতে ছিল বলেই গণেশের কাটা মাথায় হাতির মাথা জুড়ে দেওয়া সম্ভব হয়েছিল। যে দেশের নীতিনির্ধারকরা বিজ্ঞানচর্চার ধারে-কাছে যান না। সেখানে এই চন্দ্রযাত্রা নিশ্চিত কৃতিত্বের। বিক্রম সফলভাবে ল্যান্ড করার পর থেকে অবশ্য ঠিক বুঝতে পারছি না, ইসরোর বিজ্ঞানীরা না আমাদের মাননীয় সর্বজ্ঞানী শ্রীল শ্রীযুক্ত প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র দামোদর দাস মোদিজি ঠিক কার কৃতিত্ব এই যুগান্তকারী সাফল্য!
টিভির পর্দায় কোটি কোটি লোক অধীর উৎকণ্ঠা নিয়ে তাকিয়ে আছেন, সবার বুকের ধড়ফড়ানির শব্দ ক্রমেই বাড়ছে। শেষ মুহূর্তে সব ঠিকঠাক কাজ করাই আসল। হাততালি সবে দিতে যাবেন আপামর ভারতবাসী, সেই প্রতীক্ষিত মুহূর্তেই বিদেশ থেকে মোদিজির সহাস্য মুখ আর বাণী বিতরণে ক্যামেরা ফোকাস করায় ল্যান্ডিং দেখা থেকে বঞ্চিত হলেন কোটি কোটি মানুষ। তারপর থেকে দৃষ্টিকটুভাবে মিডিয়ার বড় অংশ ও সংঘ পরিবারের কেষ্ট-বিষ্টুরা উঠেপড়ে লেগেছেন যাবতীয় কৃতিত্ব একজনকে দিয়ে নতুন এক জাতীয়তাবাদী জোয়ার তুলে আগামী নির্বাচনে সফল হতে। বিপুল এই মোদি হাইপে চাপা পড়ে যাচ্ছে বিজ্ঞানীদের কৃতিত্ব। বিজ্ঞানগাথা গৌণ হয়ে তুলে আনা হচ্ছে সংখ্যাগরিষ্ঠ সম্প্রদায়ের ধর্মীয় আবেগকে। যে জায়গায় বিক্রম চাঁদের মাটি ছুঁয়েছে, তার নাম রাখা হয়েছে শিবশক্তি। হঠাৎ শিবশক্তি কেন? মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তার ব্যাখ্যা দিয়েছেন যে, শিব মানবতার কল্যাণে সদাই তৎপর। সংকল্প সম্পূর্ণ করার শক্তি দেয় মহাশক্তি। দুইয়ে মিলে শিবশক্তি। ফলে এটাও পরিষ্কার, প্রযুক্তি, বিজ্ঞান যত লম্ফঝম্প করুক, মহাশক্তি বা শিবশক্তি সহায় না হলে কোথাও কোনো অভিযান করে লাভ নেই। প্রধানমন্ত্রীজি আরও বলেছেন এই সাফল্যের পেছনে আছে নারী শক্তি। আসলে তিনি নারী বিজ্ঞানীদের প্রশংসা করেছেন। উচিত কাজ। যথার্থ দেশ নেতাসম কাজ। আমার কেন জানি না আচমকাই কয়েক মাস আগে ভারতের পদক জেতা মহিলা কুস্তিগিরদের ওপর পুলিশি অত্যাচার ও মণিপুরের কুকি দুই তরুণীকে নগ্ন করে প্রকাশ্যে ধর্ষণ করার ভাইরাল ছবি মনে পড়ে যাচ্ছিল। হাথরাস ও অন্যান্য ঘটনা তো ভুলেই গেছি। বড় ভালো বলেন আমাদের প্রধানমন্ত্রী। অসাধারণ বাগ্মী। তিনি সব সময় বলেন, ‘বেটি বাঁচাও, বলেন, সবকা সাথ সবকা বিকাশ...।’ আবার তিনিই কোনো জাদুমন্ত্রে শুধু পোশাক দেখে সন্ত্রাসবাদী চিহ্নিত করতে পারেন!
এক-এক লোকসভা নির্বাচনে এক-এক ইস্যু। কখনো কালো টাকা বন্ধের প্রতিশ্রুতি, কখনো দেশের সব নাগরিকের পনেরো লাখ টাকা দেওয়ার আশ্বাস, কখনো দুই কোটি চাকরির স্বপ্ন দেখানো। পাশাপাশি রামমন্দির নির্মাণের মহতী উদ্যোগ, নতুন পার্লামেন্ট ভবনের গায়ে অখণ্ড ভারতের ম্যাপের ম্যুরাল, সাধুদের পায়ে উপুড় হয়ে লুটিয়ে থাকা, একের পর এক কোলাজ। সবকা সাথ বাণী চাপা পড়ে যায়, নির্দিষ্ট একটি গোষ্ঠীর দিকে আঙুল তুলে, গোলি মারো শালাকো আওয়াজে। এ ছাড়া রয়েছে উত্তর প্রদেশের কুখ্যাত ফেক এনকাউন্টার ও বুলডোজার রাজ। এসব ধামাচাপা দিতেও তো এখন দরকার চন্দ্র অভিযানের বিজ্ঞানীদের সাফল্যকে নিজের বলে ঢাক পেটানো।
কাকে আর কি বলব! খোদ ইসরোর ডিরেক্টর বলে দিয়েছেন, চন্দ্রযান অভিযানের গূঢ় রহস্য। তা হচ্ছে যাবতীয় বিজ্ঞান নিহিত রয়েছে বেদের পাতায়। পাশ্চাত্য পরে সেসব অনুসরণ করেছে। ভারতের প্রথম দিকের মহাকাশ গবেষণা কেন্দ্রের বিজ্ঞানী হোমি জাহাঙ্গীর ভাবা, বিক্রম সারাভাই ও অন্যদের কথা খুব মনে পড়ছে। আর মনে পড়ছে দেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুকে। মূলত যার উৎসাহেই ১৯৬২ সালে জন্ম নিয়েছিল, ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল কমিটি ফর স্পেস রিসার্চ। স্পেস সায়েন্সের সাফল্য কোনো অলৌকিক ঘটনা নয়। দীর্ঘ অনুশীলনের ফল, সবই বেদে আছে বলে তাকে অগ্রাহ্য করা যায় না।
লেখক : ভারতীয় প্রামাণ্যচিত্র নির্মাতা ও লেখক
