চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান প্রকৌশলীকে মারধর এবং প্রধান নিরাপত্তা কর্মকর্তাকে লাঞ্ছিত করার অভিযোগে এক ছাত্রলীগ নেতার বিরুদ্ধে মামলা করেছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্র্তৃপক্ষ। গতকাল সোমবার সকালে ওই হামলার ঘটনার পর ক্যাম্পাসে তিন ঘণ্টা গ্যাস-বিদ্যুৎ-পানি সরবরাহসহ সব কার্যক্রম বন্ধ রেখে প্রতিবাদ জানিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। এ ছাড়া উপাচার্যের সঙ্গে বৈঠক করে হামলাকারী বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের যুব সম্পাদক রাজু মুন্সীকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় অফিসার্স সমিতি। তবে অভিযুক্ত ছাত্রলীগ নেতা এরপরও দিয়েছেন ঔদ্ধত্যপূর্ণ বক্তব্য। বলেছেন, পুলিশে ধরলে শেখ হাসিনাই কল দিয়ে তাকে ছাড়ানোর ব্যবস্থা করবেন! হাটহাজারী থানা সূত্র জানিয়েছে, প্রধান নিরাপত্তা কর্মকর্তা শেখ মোহাম্মদ আবদুর রাজ্জাক বাদী হয়ে রাজু মুন্সী ও অজ্ঞাতনামা তিন-চারজনের নামে মামলা করেছেন।
জানা যায়, ঘটনার সূত্রপাত গত রবিবার ক্যাম্পাসের কাটা পাহাড় রাস্তায়। প্রধান প্রকৌশলী ছৈয়দ জাহাঙ্গীর ফজল সেখানে রাজু মুন্সীর হাতে মারধরের শিকার ও লাঞ্ছিত হন। গতকাল প্রধান প্রকৌশলী ছৈয়দ জাহাঙ্গীর ফজল বলেন, ‘কাটা পাহাড় এলাকায় নির্মাণকাজ পরিদর্শনকালে রাজু মুন্সী আমাকে মারধর করেন। পরে রেজিস্ট্রার অফিসের সামনেও আমাকে মারতে আসেন।’
ছৈয়দ জাহাঙ্গীর ফজল বলেন, ‘রাজু মুন্সী বিশ্ববিদ্যালয়ের চলমান উন্নয়ন প্রকল্পের প্রত্যেক কনট্রাকটরের কাছ থেকে চাঁদাবাজি করছেন। রড-সিমেন্টসহ নির্মাণসামগ্রী চুরি করেছেন। এসব বিষয়ে আমি উপাচার্য, প্রক্টর ও রেজিস্ট্রারের কাছে অভিযোগ জানানোয় তিনি ক্ষিপ্ত হয়ে এ কাজ করেছেন।’
জানা গেছে, রাজু মুন্সী শাখা ছাত্রলীগ সাধারণ সম্পাদক ইকবাল হোসেন টিপুর অনুসারী হিসেবে ক্যাম্পাসে পরিচিত। বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতিতে এই পক্ষটি নগর আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক আ জ ম নাছির উদ্দীনের অনুসারী হিসেবে পরিচিত।
প্রধান প্রকৌশলীর সঙ্গে ওই ঘটনার কাছাকাছি সময়ে রাজু মুন্সী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান নিরাপত্তা কর্মকর্তার কার্যালয়ে গিয়ে ১০ হাজার টাকা চাঁদা দাবি করেন বলেও অভিযোগ ওঠে।
প্রধান নিরাপত্তা কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) শেখ মোহাম্মদ আবদুর রাজ্জাক বলেন, ‘আমি তখন ওপরে নিজের অফিসে ছিলাম। নিচে আমাদের এক গার্ডের কাছে এসে রাজু মুন্সী বলেন, তোর স্যারকে গিয়ে বলবি ১০ হাজার টাকা রেডি রাখতে। নিচ থেকে ওই গার্ড উঠে এসে আমাকে বিষয়টি জানায়। এর ২০-২৫ মিনিট পর আমি নিচে নেমে কর্মচারীদের হাজিরা খাতা দেখছিলাম। তখন রাজু মুন্সী এসে উচ্ছৃঙ্খল আচরণ করতে থাকে। তুই-তুকারি করে এবং আমাকে ধাক্কা মারে। তখন লোকজন এসে তাকে ধরে সরিয়ে নেয়।’
আবদুর রাজ্জাক বলেন, ‘এরপর আমি প্রশাসনিক ভবনে জানাই। বিষয়টি প্রক্টরকে জানালে তিনি আমাকে আশ্বস্ত করে আমার অফিসে যেতে বলেন। তখন আমি নিজের অফিসে যাই। এর কিছুক্ষণ পর পুলিশ এসে ঘটনার বিষয়ে জানতে চায়। তাদের সঙ্গে কথা বলার পর তারা চলে যান। এরপর আমি আবার প্রশাসনিক ভবনে যাই। সেখানে নিচে অনেক লোকজন জড়ো দেখে দাঁড়াই। তখনই প্রক্টর অফিসের দিক থেকে রাজু মুন্সী এসে আমাকে ধাক্কা দেয়। এ সময় উপস্থিত ডেপুটি রেজিস্ট্রার আমাকে রক্ষা করেন। এরপর রাজু মুন্সী দৌড়ে গিয়ে প্রধান প্রকৌশলীকে মারতে যায়।’
এসব ঘটনার কথা জানাজানি হলে শুরুতে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৌশল দপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এবং পরে সব বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা কাজ বন্ধ করে দেন। এ সময় পুরো ক্যাম্পাসে গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানি সরবরাহ বন্ধ রাখা হয়। প্রায় তিন ঘণ্টা পর বিশ্ববিদ্যালয় কর্র্তৃপক্ষের আশ্বাসে তারা কাজে ফেরেন।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় অফিসার্স সমিতির সাধারণ সম্পাদক মুহাম্মদ হামিদ হাসান নোমানী বলেন, ‘উপাচার্যের সঙ্গে আমরা দেখা করেছি। তিনি আশ্বাস দিয়েছেন ব্যবস্থা নেবেন।’
বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার কেএম নুর আহমদ বলেন, এই ঘটনায় মামলা হয়েছে। রাজু মুন্সীকে আসামি করে মারধর ও চাঁদাবাজির অভিযোগে মামলাটি করা হয়েছে।
এ বিষয়ে অভিযুক্ত রাজু মুন্সী বলেন, ‘তারা দুজন (প্রকৌশলী ও নিরাপত্তা কর্মকর্তা) বিভিন্ন অনিয়মের সঙ্গে জড়িত। আমি প্রতিবাদ জানিয়েছি। প্রতিবাদের কারণে আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ দিয়েছেন।’ নিজেকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার রিজার্ভ ফোর্স দাবি করে রাজু বলেন, ‘আমাকে পুলিশে নিয়ে গেলে শেখ হাসিনা কল দিয়ে আমাকে ছাড়াবেন। আমি শেখ হাসিনার রিজার্ভ ফোর্স। নির্বাচনে আমাকে কাজে লাগবে।’
