ঢাকার নবাবগঞ্জের দড়িকান্দা গ্রামের তোতা মিয়ার ছেলে মোসলেম মোল্লা পরিবারের সচ্ছলতার আশায় ২০১৬ সালে ইরাকে যান। ইরাকের সাইদিয়া শহরে থাকতেন তিনি। ২০২১ সালের শুরুতে হঠাৎ চাকরি হারান। বেকার অবস্থায় তিনি যখন চাকরি খুঁজছিলেন, তখন এক বিকেলে পরিচয় হয় সেলিম নামে এক বাংলাদেশির সঙ্গে। সেলিমের কাছে চাকরির জন্য অনুরোধ করেন মোসলেম। এই সুযোগে মাসিক ৫০০ ডলারে অফিস সহকারীর চাকরির লোভ দেখান সেলিম। চাকরির সাক্ষাৎকারের কথা বলে ২০২১ সালের ২৩ জানুয়ারি মোসলেমকে তিনি সাইদিয়া শহর থেকে ৫০ কিলোমিটার দূরে আল মনসুর বা কাবাদ শহরে পাঠান। একটি প্রাইভেট কারে করে মোসলেমকে নেওয়া হয় আল মনসুর শহরের একটি বাড়িতে। সেখানে যাওয়ার দুই ঘণ্টা পরই মোসলেম বুঝতে পারেন তিনি অপহরণের শিকার হয়েছেন। সেখানে একটি ফ্ল্যাটে চার মাস বন্দি ছিলেন মোসলেম। মোসলেম দেশ রূপান্তরকে জানান, এই চার মাসে তিনি ছাড়াও ৯ বাংলাদেশিকে একইভাবে অপহরণ করে নির্যাতন করে অন্তত কোটি টাকা আদায় করেছে ওই চক্র। তারাও অধিকাংশই বেকার ছিল। কেউ আবার ভালো বেতনের আশায় সেখানে এসেছিলেন।
ভুক্তভোগী ও পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) সূত্রে জানা গেছে, ইরাকের আল মনসুর শহরে আবাসিক ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়ে প্রবাসী বাংলাদেশিদেরই অসাধু এক চক্র রমরমা অপহরণ-মুক্তিপণ বাণিজ্য চালাচ্ছেন। বেকার বা ভালো বেতনে চাকরি খুঁজছেন এমন বাংলাদেশিদের টার্গেট করছে চক্রটি। অপহরণকৃতদের নির্মম নির্যাতন করে সে দৃশ্য ভিডিও করে দেশে স্বজনদের পাঠিয়ে মুক্তিপণ আদায় করছে। অনেক ক্ষেত্রে আবার মুক্তিপণের টাকা দিলেও মিলছে না মুক্তি। ২০২১ সালের শুরুর দিকে মাত্র চার মসে ১০ বাংলাদেশিকে তারা অপহরণ করে কোটি টাকা মুক্তিপণ আদায় করেছে। চক্রটি মুক্তিপণের টাকা নিচ্ছে তাদের দেশে থাকা স্বজনদের মাধ্যমে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে লেনদেন হচ্ছে অপহরণের টাকা।
ভুক্তভোগীর মায়ের কাছ থেকে ছয় লাখ টাকা নিলেও মুক্তি দেয়নি তাকে। মুক্তি না দিয়ে আরও টাকা দাবি করে চক্রটি। চার মাস আটকা থাকার পর সুযোগ পেয়ে সেই বন্দিদশা থেকে পালান মোসলেম। তিনি বর্তমানে বাংলাদেশে রয়েছেন।
মোসলেম গতকাল সোমবার মোবাইল ফোনে দেশ রূপান্তরকে ভয়াবহ সেই ঘটনার কথা জানান। তিনি বলেন, আমাকে যে ফ্ল্যাটে আটকে রেখেছিল সেটি ছিল দুই রুমের। ভবনটি ছিল দোতলার। অপহরণকারীদের মধ্যে ছয়জন ছিল পুরুষ ও একজন নারী। চক্রের ওই নারী সদস্য অসামাজিক কাজে লিপ্ত হতো। তারা সবাই বাংলাদেশি। আমি গিয়ে প্রথমপর্যায়ে আরও তিনজনকে দেখেছি, যাদের একইভাবে চাকরির কথা বলে অপহরণ করেছে। এর মাস-দুই পর তাদের স্বজনদের কাছ থেকে টাকা নিয়ে ছেড়ে দেয়। এরপর আরও ছয়জনকে এনে আটকে রেখে মুক্তিপণের জন্য নির্যাতন করতে থাকে। যেদিন সেখান থেকে পালিয়েছিলাম সেদিন আরও কয়েকজনকে আনতে গিয়েছিল তারা। এ সময় অপহরণকারী চক্রের মাত্র দুজন ফ্ল্যাটে ছিল। আমরা তাদের হাত-পা বেঁধে রেখে ভবনের ছাদ টপকে পালাতে সক্ষম হই।
মোসলেমের মা খতেজা বেগমের করা মামলার তদন্তে নেমে বাংলাদেশ থেকে আটজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। গ্রেপ্তারকৃতরা হলে আলী হোসেন, মো. শামীম, শিরিন সুলতানা, মোহাম্মদ ঘরামী, রবিউল ঘরামী, শাহিদা বেগম, সাহনাজ আক্তার লিপি ও মো. আকবর সরদার। তারা সবাই অপহরণকারী চক্রের স্বজন, যারা বাংলাদেশ থেকে অপহরণের টাকা গ্রহণ করেছে। ২০২১ সালের ২০ সেপ্টেম্বর থেকে চলতি বছরের ২৩ আগস্ট পর্যন্ত বাংলাদেশের বরিশাল, গাজীপুর, মুন্সীগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ, মাগুরা এবং খুলনায় পৃথক অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়।
তবে মূল অপহরণকারীরা এখনো গ্রেপ্তার হয়নি। এ বিষয়ে জানতে চাইলে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআই ঢাকা জেলার এসআই একেএম সামসুল আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, মূল অপহরণকারীরা ইরাকে রয়েছে। যাদের মাধ্যমে বাংলাদেশ থেকে মুক্তিপণের টাকা আদায় করেছে তাদের আমরা গ্রেপ্তার করেছি। তারা টাকা নেওয়ার কথা স্বীকারও করেছে।
পিবিআই ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার মো. কুদরত-ই-খুদা বলেন, ২০২১ সালের ২৩ জানুয়ারি মোসলেম মোল্লা ইরাকে অবস্থানকালে সেলিম মিয়া ও শামীমসহ অজ্ঞাতপরিচয়ের আরও কয়েকজনের হাতে অপহরণের শিকার হন। মোসলেমকে কাজের কথা বলে ইরাকে তার বর্তমান কর্মস্থল থেকে অন্যত্র অপহরণ করে তার মা খতেজা বেগমের কাছ মুক্তিপণ দাবি করে। ছেলেকে বাঁচানোর জন্য আসামিদের দেওয়া ১২টি বিকাশ নম্বরে ২৬ বার ছয় লাখ টাকা দেন তিনি। পরে তারা মোসলেমকে মুক্তি না দিয়ে পুনরায় তার মায়ের কাছে টাকা দাবি করে। এ ঘটনায় মা খতেজা বেগম বাদী হয়ে নবাবগঞ্জ থানায় মামলা করেন। পরে পুলিশ সদর দপ্তরের নির্দেশে পিবিআই ঢাকা জেলা মামলাটির তদন্তভার গ্রহণ করে।
মো. কুদরত-ই-খুদা বলেন, তদন্তে জানা গেছে ইরাকে অবস্থানকালে সেলিম মিয়া নামে একজনের সঙ্গে ভুক্তভোগী মোসলেমের পরিচয় হয়। ভালো বেতনের কাজের প্রলোভন দেখিয়ে মোসলেমকে তিনি অপহরণকারী চক্রের সদস্য আনোয়ার, শাহনেওয়াজ, রুহুল আমিন, মনির, হাসিবুর, সাব্বিরদের হাতে তুলে দেয়। মোসলেমকে নিয়ে তারা একটি আবদ্ধ রুমে আটকে রেখে তার কাছে থাকা প্রায় দুই লাখ টাকা ও দেড় লাখ টাকা মূল্যের একটি আইফোন ছিনিয়ে নেয়। এর থেকে তাকে নির্যাতন করতে থাকে। তিন দিন ধরে নির্মম, বর্বর নির্যাতনের পর সেই নির্যাতনের দৃশ্য ভিডিও করে ইমো অ্যাপের মাধ্যমে মোসলেমের মা খতেজা বেগমকে দেখিয়ে ১১ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করে। খতেজা বেগম ছেলের নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে আসামিদের পাঠানো ১২টি বিকাশ নম্বরে ২৬টি ট্রানজেকশনের মাধ্যমে ছয় লাখ টাকা পাঠান।
তিনি আরও বলেন, আসামি আনোয়ার, শাহনেওয়াজ, রুহুল আমিন, মনির, হাসিবুর, সাব্বিররা ইরাকে অবস্থান করলেও বাংলাদেশ তাদের পরিবারের সদস্যরা এই মুক্তিপণের টাকা বিভিন্ন বিকাশ এজেন্টের দোকান ও নিজেদের পারসোনাল বিকাশ নম্বর থেকে ক্যাশআউট করে নেয়। শাহনেওয়াজ অপহরণ চক্রের দলনেতা বলে গ্রেপ্তারকৃতরা জানায়। গ্রেপ্তারকৃত আটজন আসামিকে আদালতে সোপর্দ করা হলে ছয়জন ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার বিষয়ে আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়। জবানবন্দি অনুযায়ী ইরাকে অবস্থানকারী মামলার আসামি আনোয়ার, মনির, রুহুল আমিন, সাব্বির, শাহনেওয়াজ, হাসিবুর ও সোহাগকে শনাক্ত করা হয়।
