ব্যাপক হারে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়ার শঙ্কায় রয়েছে বরিশাল সিটি করপোরেশনবাসী। এডিস মশার লার্ভা শনাক্তকরণ মেশিন এবং মশার লার্ভা ধ্বংস করার সরঞ্জাম না থাকায় এখন হিমশিম খাচ্ছে সিটি করপোরেশনসহ সংশ্লিষ্টরা।
সচেতন মহল বলছেন, বরিশাল বিভাগীয় শহর হওয়ায় নগরীতে সব ধরনের মানুষের চলাচল আছে। চিকিৎসা, স্কুল, কলেজ, দাপ্তরিক কাজে বিভিন্ন স্থানের মানুষ এখন নগরীতে প্রবেশ করছেন। এ ছাড়া দক্ষিণাঞ্চলের একমাত্র বড় চিকিৎসাকেন্দ্র শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালটি নগরীতে। তাই আশপাশের মানুষ এবং নগরীর মধ্যে ডেঙ্গু ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থেকেই যায়। তাই দ্রুত যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন।
বরিশাল বিভাগীয় স্বাস্থ্য কার্যালয়ের সূত্রে জানা গেছে, জানুয়ারি থেকে এখন পর্যন্ত চিকিৎসা নিয়েছে ২ হাজার ৮৯৩ জন রোগী। আর জেলার অন্যান্য হাসপাতালে ভর্তি আছে ১৩৯ জন। এখন পর্যন্ত বরিশাল সিটি করপোরেশনের দুজন রোগী ডেঙ্গুতে মারা গেছে। আর বরিশাল জেলায় গত জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত ১০ জনের মৃত্যু হয়েছে।
এদিকে বরিশাল নগরীর ৩০টি ওয়ার্ডে নিম্ন অঞ্চল, বিভিন্ন খাল, ড্রেনে নর্দমা জমে আছে। তাই নিম্ন অঞ্চলের জলাবদ্ধতা এবং খালগুলো অপরিষ্কার হওয়ায় সেগুলো পরিণত হয়েছে মশার বাসস্থানে। এরই মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে গেছে নগরীর মধ্যে। তাই খাল, ড্রেনগুলো খুব দ্রুত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করার দাবি জানিয়েছেন নগরবাসীরা।
নগরীর ২৪ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা মোসাম্মৎ ফাতেমা বলেন, ‘মাত্র ১০ থেকে ২০ মিনিট বৃষ্টি হলে আমাদের রাস্তাঘাটে পানি জমে থাকে। নেই ড্রেনের ব্যবস্থা। তাই জমাট বাঁধা পানি কোথাও সরে না। ইদানীং মশার উপদ্রবে থাকা যাচ্ছে না। রাত-দিন এখন মশার আতঙ্কে আছি।’
নগরীর ৩ নম্বর ওয়ার্ড ময়লাখোলা নামে পরিচিত। নগরীর ৩০টি ওয়ার্ডের সব ময়লা স্তূপ করে ফেলা হয় এই ওয়ার্ডের নির্দিষ্ট একটি স্থানে। আর নিম্নাঞ্চল হওয়ায় অল্প বৃষ্টিতে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয় ওয়ার্ডটিতে। এ ছাড়া এখানে ময়লার ভাগাড় হওয়ায় মশার উপদ্রবে দিন কাটাতে হয় নগরবাসীর।
এই ওয়ার্ডের স্থানীয় বাসিন্দা মে. জয়নাল বলেন, ‘অল্প বৃষ্টিতে ঘর পর্যন্ত পানি উঠে যায়। ময়লার ভাগাড়ের আশপাশে দুই কিলোমিটারের মধ্যে মানুষ বসবাসের যোগ্য নয়। নানান রকমের পোকামাকড়, মশায় আমাদের দিন কাটে। এখন আছি ডেঙ্গু আতঙ্কে।’ বরিশাল সিটি করপোরেশনের পরিচ্ছন্নতা কর্মকর্তা মো. রেজাউল করিম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘প্রতিটি ওয়ার্ডে ডেঙ্গু নিধনের জন্য একজন করে মশক নিধনকর্মী নিয়োজিত আছে। পাশাপাশি ঝোপঝাড়, খাল ও ড্রেন পরিষ্কারের কাজ অব্যাহত আছে। এডিস মশার লার্ভা নির্দিষ্টভাবে শনাক্তকরণের কিট এখনো বরিশালে নেই। তবে শুনেছি বাংলাদেশেই নেই। আমরা কেন্দ্রীয় টিম গঠনের মাধ্যমে প্রতিটি ওয়ার্ডে এডিস মশার লার্ভা ধ্বংস করার জন্য ডেল্টা মিক্স ও ফগার মেশিন ব্যবহার করছি। এ ছাড়া জনসচেতনতা বাড়াতে লিফলেট বিতরণ করেছি।’
বরিশাল সিটি করপোরেশনের দায়িত্বপ্রাপ্ত স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. খন্দকার মঞ্জুরুল ইমাম (শুভ্র) দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘যেসব রোগী হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে, তার বেশিরভাগই বরিশাল সিটির বাইরের উপজেলাগুলো থেকে আসছে। আনুমানিক ৩০০ রোগী বর্তমানে চিকিৎসাধীন রয়েছে। বেশিরভাগ সময় আক্রান্ত ব্যক্তির পরিবারের সদস্যদেরও আক্রান্ত হতে দেখা গেছে। বরিশাল সিটি করপোরেশনের লোকজন আপাতত ডেঙ্গু-আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কায় নেই। কিন্তু আমাদের বরিশাল-ঢাকার সঙ্গে যোগাযোগব্যবস্থার উন্নতি হয়েছে। এ ছাড়া লঞ্চ রয়েছে। এতে করে এডিস মশা ছড়ানোর শঙ্কা থাকে। তবে সাবধানতা অবলম্বনের জন্য অবশ্যই মশারি ব্যবহার এবং আবদ্ধ ও স্থির পানি জমে থাকলে তা পরিষ্কার করতে হবে। এ ছাড়া স্থানীয় পর্যায়ে মনিটরিং টিম কাজ করছে এবং বেসরকারি ক্লিনিকগুলোতে ডেঙ্গু পরীক্ষার ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ফি নেওয়ার অভিযোগ পেলে তৎক্ষণাৎ ৫০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা জরিমানা করা হচ্ছে।’
বরিশাল বিভাগীয় স্বাস্থ্য কার্যালয়ের উপপরিচালক ডা. শ্যামল কৃষ্ণ মন্ডল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ঢাকা থেকেই মূলত এডিস মশা আসছে বলে প্রাথমিকভাবে আমরা আশঙ্কা করেছিলাম। তবে ৪২টি উপজেলা ম্যাপিংয়ের পর ডিভিশনাল অফিস টিম পিরোজপুরের নেছারাবাদ ও পটুয়াখালীর দুমকী উপজেলায় এডিস মশার লার্ভা শনাক্ত করে; যা এই অঞ্চলের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়তে পারে। তাই রোগী শনাক্ত ও চিকিৎসার প্রতি গুরুত্ব দিই। ইতিমধ্যে ১১ হাজার রোগী শনাক্ত হয়েছে। তাদের বেশির ভাগই সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে। যারা মারা গেছে তাদের মধ্যে শিশু এবং বৃদ্ধের সংখ্যাই বেশি। তবে রোগ শনাক্তকরণে বিলম্ব হলে তা মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।’
