সৌদির ঐতিহাসিক অঞ্চল মদিনার প্রাচীন শহর আলউলা। ইউনেস্কোর বিশ্বঐতিহ্যে স্থান পাওয়া হেগরার অবস্থান এই শহরেই। জীবন্ত এই জাদুঘরে নাবাতিয়ান সভ্যতার রহস্য লুকিয়ে রয়েছে। কেমন ছিল দুইশো বছরের প্রাচীন এই সভ্যতা। লিখেছেন নাসরিন শওকত
প্রাচীন শহর আলউলা
সৌদি আরবের উত্তর-পশ্চিমের শহর আলউলা। মদিনা শহর থেকে ৪শ’ কিলোমিটার দূরের আরব উপদ্বীপের প্রাচীন শহর এটি। উর্বর মাটি ও প্রচুর পানি সরবরাহ থাকা এক মরূদ্যানের পাদদেশে আলউলার অবস্থান। ২৯ হাজার ২৬১ বর্গ কিলোমিটার আয়তনের শহরটি খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।
আলউলা শহরের চারপাশ ঘিরে রয়েছে অসংখ্য পাহাড়। প্রাচীন গ্রিস ও রোমের মতোই অনেক প্রাচীন সভ্যতাও আছে শহরটিতে। চারপাশের আকাশছোঁয়া পাহাড়গুলো যেন দেয়াল হয়ে আলউলা শহরকে ঘিরে রেখেছে। শহরটির যেদিকে তাকানো যায় কেবলই ঘন সবুজ উপত্যকা। এই উপত্যকাই সম্ভবত এক সময় বেদুইনপল্লী ছিল। প্রকৃতি যেন পরম মমতায় আলউলাকে নির্মাণ করেছে। এর শান্ত মরূদ্যানের বুকে সার বেঁধে দাঁড়িয়ে থাকা খেজুর গাছের পান্না সবুজ সৌন্দর্য যে কাউকে বাকরুদ্ধ করে দেবে। আলউলা শহরের এক একটি স্তর যেন মানব ইতিহাস ও ঐতিহ্যের নিদর্শনে গড়া। গুহার গোলকধাঁধা আর বিশাল সব পাথরে খোদাই করা ঘরবাড়ি ও ইটের ভবন দুপাশে গাদাগাদি করে দাঁড়িয়ে আছে। শিলালিপি আঁকা লাল পাথরের পুরনো এই শহর প্রাচীন রহস্যময় ঐতিহ্যের সাক্ষী।
চার সভ্যতা
সৌদির প্রতœতাত্ত্বিক বিভাগ আলউলা শহরের চারপাশে চারটি সভ্যতাকে খুঁজে পেয়েছে। যার মধ্যে রয়েছে দাদান, লিহিয়ান, নাবাতিয়ান ও আদি আরবি। প্রাচীন লিহিয়ান সাম্রাজ্যের রাজধানী শহর ছিল আলউলা (যাকে দেদান বা দাদানও বলা হয়)। পবিত্র বাইবেলের বর্ণনা থেকে দাদান শহরে আলউলার অবস্থানের কথা জানা যায়। কিন্তু উত্তর আরবের প্রাচীন সাম্রাজ্য লিহিয়ানেই শহরটি গড়ে উঠেছিল। মরূদ্যানের এই প্রাচীন ইতিহাসকে কয়েক ধাপে ভাগ করা হয়েছে। খ্রিস্টপূর্ব ৭ম ও ৬ষ্ঠ শতাব্দীতে দাদান (দেদানাইট) সাম্রাজ্য হিসেবে বিস্তৃতি লাভ করে। ‘হারান শিলালিপি’তেও দাদানের উল্লেখ রয়েছে। সেখানে বলা আছে, খ্রিস্টপূর্ব ৫৫২ শতাব্দী বা তারও কিছু সময় পরে কীভাবে ব্যাবিলনের রাজা নবোনিদাস উত্তর আরবের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান চালিয়ে তাইমা দেদান ও ইয়াথ্রিব (মদিনা) জয় করেছিলেন। ধারণা করা হয়ে থাকে, খ্রিস্টপূর্ব ৫ম শতাব্দী থেকে এই সাম্রাজ্য বংশানুক্রমিভাবে শাসন করা হয়। পরবর্তী ৪শ’ বছরে অর্থাৎ প্রায় খ্রিস্টপূর্ব ১শ’ শতাব্দী পর্যন্ত এটি লিহিয়ান (লিহিয়ানাইট) সাম্রাজ্য হিসেবে শাসিত হয়েছিল। খ্রিস্টের জন্মের বছর ১০৬ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত এই সাম্রাজ্যের সম্রাট ছিল নাবাতিয়ানরা। সে সময় রোমানরা লিহিয়ান সাম্রাজ্যের রাজধানী পেত্রা জয় করেছিল। নিজেদের শাসনকালে নাবাতিয়ানরা হেগরা নির্মাণ করেছিল। এবং আধুনিক মাদায়েনে সালেহকে সে সময় তারা লিহিয়ান সাম্রাজ্যের দ্বিতীয় রাজধানী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে। আলউলা থেকে প্রায় ২২ কিলোমিটার উত্তরের হেগরা সে সময় এভাবেই ওই অঞ্চলের ক্ষমতার কেন্দ্র হয়ে ওঠে।
মুঘাইরার কাছ থেকে প্রায় ২০ কিমি দূরে আল-মাবিয়াত এই অঞ্চলের পরবর্তী বাণিজ্যিক কেন্দ্র হয়েছিল। যা প্রায় ৬৫০ খ্রিস্টাব্দ থেকে উন্নতি লাভ করলেও ১২৩০ সালের কিছু সময় আগে এর অবনতি হয়। ১৩ শতকে পুরনো আলউলা শহরটি নির্মিত হয়েছিল। সে সময় পুরনো দাদান ও লিহিয়ান ধ্বংসাবশেষের অনেক পাথর পুনরায় ব্যবহার করার নমুনা পাওয়া যায়। আধুনিক এই সময়ে আলউলা আবার এই অঞ্চলের প্রধান বসতি হয়ে উঠেছে। ১৯০১ থেকে ১৯০৮ সালের মধ্যে অটোমানরা দামেস্ককে মদিনার সঙ্গে যুক্ত করার জন্য হেজাজ রেলপথ নির্মাণ করেছিল।
আলউলার সমতল মরুর রাস্তা ধরে সামনে এগিয়ে যেতে থাকলে আকাশছোঁয়া সব ফলের গাছ দেখতে পাওয়া যায়। আরো রয়েছে বিশালাকারের অসংখ্য পাথরখ-। এই পাথরগুলোর গায়ে প্রাচীন শিলালিপির কারুকাজ ও এর খোদাই করার অনন্য বৈশিষ্ট্য এক বিস্ময়ের যুগকে উন্মোচিত করে। এর একটু এগোলেই ভবন আকারের এক বিশাল পাথরের তৈরি গুহার দেখা মেলে। প্রাচীন রীতির খোদাই করা স্তম্ভ ও খাঁজকাটা মুকুট আকৃতির এই স্থাপনাটিই হেগরা নামে পরিচিত।
প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান হেগরা
হেগরা মদিনা শহরের হিজাজ পর্বতের পাদদেশে অবস্থিত। এই শহরেই প্রাচীন নাবাতিয়ান সভ্যতা গড়ে উঠেছিল।
হেগরার সামনের অংশজুড়ে সুসজ্জিত ও সুরক্ষিত স্মৃতিসৌধ ও সমাধির সম্ভার রয়েছে। যা খ্রিস্টপূর্ব প্রথম শতাব্দী থেকে খ্রিস্টের জন্মের বছর পর্যন্ত একই শতকে নির্মিত হয়েছিল। এই সম্ভারগুলোর মধ্যে প্রাক-নাবাতিয়ান যুগের প্রায় ৫০টি শিলালিপি ও পাথরের পাহাড় খোদাই করা বেশ কিছু গুহাও রয়েছে। এছাড়াও বিশাল এই এলাকায় ১১১টি স্মারক সমাধিও আছে। যার মধ্যে ৯৪টি সমাধি বিভিন্ন শিলালিপি ও সূক্ষ্ম খোদাইয়ে সজ্জিত। জানা যায়, এই সমাধিগুলোতে নাবাতিয়ান অভিজাতরা সমাহিত আছেন। এই সমাধির অনেকগুলোই কে ও কখন নির্মাণ করার নির্দেশ দিয়েছিল তা কারিগরের নামসহ শিলালিপিতে খোদাই করা আছে। যার আকার, নকশা ও স্থাপত্যশৈলীর মাধ্যমে ওই ব্যক্তির মর্যাদাকেও ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। এমনকি সংরক্ষিত এই স্থানের সমাধিগুলোতে সে সময়কার চিকিৎসক, সামরিক ব্যক্তিত্ব ও স্থানীয় নেতাদের নামে উৎসর্গ করার নমুনা পাওয়া গেছে।
প্রত্নতাত্ত্বিকরা এই স্থানটিকে নাবাতিয়ানদের অনন্য স্থাপত্যশৈলী ও জলসেচ দক্ষতার অসাধারণ উদাহরণ হয়ে আছে। ২০০৮ সালে ইউনেস্কার বিশ্বঐতিহ্যের তালিকায় স্থান পায় হেগরা। খোলা আকাশের নিচে প্রাচীন রহস্যময় হেগরা এক জীবন্ত জাদুঘর।
আল-হিজর বা মাদায়েনে সালেহ
হেগরা স্থানীয়ভাবে আল-হিজর বা মাদায়েনে সালেহ (মাদাই’ন সালেহ) নামে পরিচিত। মাদায়েনে সালেহ আলউলা শহর থেকে ২০ কিলোমিটার দূরে ও মদিনা থেকে ৪শ’ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে এবং জর্ডানের পেত্রা নগরী থেকে ৫শ’ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্ব দিকে অবস্থিত। প্রতœতাত্ত্বিক এই স্থানটি মরুভূমির সৌন্দর্য ও বিভিন্ন আকারের খোদাই করা পাথরের পাহাড়ের জন্য বিখ্যাত। এর প্রতœতাত্ত্বিক ভা-ারকে সৌদির লুকানো রতœ বলা হয়।
খ্রিস্টপূর্ব ২য় থেকে ৩য় শতাব্দী ও প্রাক-মুসলিম যুগে অনন্য নিদর্শনসমৃদ্ধ নাবাতিয়ান সভ্যতাকে ঘিরে আল-হিজর শহর নির্মিত হয়েছিল। তবে খ্রিস্ট্রের জন্মের পরে প্রথম শতাব্দীতে নাবাতিয়ান সভ্যতা বিশেষভাবে সমৃদ্ধ হয়ে ওঠে। অসাধারণ নির্মাণশৈলীর স্থাপত্য সম্ভারে পূর্ণ এই শহরটি যথাযথভাবে সংরক্ষিত আছে। আল-হিজরের স্থাপত্য সম্ভারের মধ্যে প্রধান ও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক সমাধি ও স্মৃতিস্তম্ভ রয়েছে। পাথরের পাহাড়ের গায়ে সরাসরি খোদাই করে এর স্থাপত্য ও নকশা তৈরি করা হয়েছে। এই স্থাপত্যগুলোর নকশা ও শৈলীতে বেশ কয়েকটি প্রাচীন জাতি ও সভ্যতার সংমিশ্রণ ঘটেছে। সভ্যতাগুলো হলো অ্যাসিরীয়, মিসরীয়, ফিনিশীয় ও হেলেনিক। এছাড়াও স্থাপত্যগুলোর গায়ে খোদাই করা শিলালিপিতে প্রাচীন বেশ কয়েকটি ভাষার উপস্থিতি দেখতে পাওয়া যায়। ওই ভাষাগুলোতে লিহিয়ানাইট, থামুডিক, নাবাতিয়ান, গ্রিক ও লাতিন এপিগ্রাফির সাক্ষ্য বহন করছে। আল-হিজরের পাথুরে মাটিতে সে সময় কৃত্রিমভাবে অসংখ্য কুয়াও সৃষ্টি করা হয়েছিল। যা নাবাতিয়ান সভ্যতার কৃষির কৌশলগত বিকাশের সাক্ষ্য বহন করে। সময়ের ধারায় ওই কুয়াগুলো এখনো সচল রয়েছে।
কাসর আল ফরিদ
হেগরার প্রত্যন্ত মরুবালির মাঝখানে সগর্বে দাঁড়িয়ে আছে পাথর কেটে তৈরি করা রহস্যময় এক স্থাপত্য। এটিই কাসর আল ফরিদ সৌধ। যা লিহিয়ানের কুজার পুত্র নামেও পরিচিত। অন্যসব সৌধ থেকে একেবারেই বিচ্ছিন্ন কাসর আল ফরিদকে ‘একাকী দুর্গ’ নামেও ডাকা হয়। তবে একে দুর্গ বলা হলেও এটি মূলত একটি সমাধি সৌধ। সবচেয়ে বিস্ময়ের হলো, প্রায় ২ হাজার বছর আগে একটি মাত্র পাথর খন্ড খোদাই করে ৭২ ফুট উচ্চতার এই সমাধি সৌধটি নির্মাণ করা হয়েছিল। এর নির্মাণের ইতিহাসের সঙ্গে মিশে আছে প্রাচীন আরবের গৌরবময় স্থাপত্যশৈলী ও এক অমীমাংসিত রহস্য।
এই সমাধিটির সম্মুখভাগ নিখুঁতভাবে খোদাই করে খিলান ও মুকুট দিয়ে সজ্জিত। পেছনের অংশের পাথর খোদাই ছাড়াই রয়েছে। সমাধিটির ভেতরে এখনো পর্যন্ত কোনো সমাধির অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়নি। এই সৌধটি সম্পর্কে পর্যটকদের গাইড ও আরব গল্পকার আলহানুফ বলেন, ‘এই সমাধি সৌধটি প্রায় প্রথম শতকের দিকে নির্মিত হয়েছিল। তবে অজ্ঞাত কারণে অসম্পূর্ণ অবস্থায় থেকে যায়। এর মানে হলো যার জন্য এই সমাধিটি তৈরি করা হয়েছিল তাকে এখানে কখনোই সমাহিত করা হয়নি। এর জমিনের নির্মাণশৈলী ও সূক্ষ্মতা ধীরে ধীরে নষ্ট হওয়া প্রমাণ করে এই সৌধটি ওপর থেকে নিচ পর্যন্ত খোদাই করে নির্মাণ করা হয়েছিল।’ তবে নির্মাণকাজের অসম্পূর্ণতা ও জনবিচ্ছিন্ন স্থানে এর অবস্থান হওয়ায় কাসর আল ফরিদকে ঘিরে নানা রহস্যময় গল্প এখনও প্রচলিত।
জাবাল আল বানাত
কাসর আল ফরিদ-এর পরই হেগরার অন্যতম বৃহত্তম সমাধিক্ষেত্র হলো জাবাল আল বানাত। এই স্মৃতিসৌধটিতে ২৯টি সমাধি আছে। পাথরের গায়ে অট্টালিকার আকার দেওয়া সমাধিগুলোর চারপাশ দক্ষ হাতে খোদাই করে নির্মাণ করা হয়েছিল। এর বেশির ভাগই নারীদের নামে নির্মিত হওয়ায় এর নামকরণ করা হয়েছে জাবাল আল বানাত। সবচেয়ে বিস্ময়ের বিষয় হলো, বেশির ভাগ সমাধিগুলোর গায়েই খোদাই করা আছে। ওই নির্দেশের মধ্যে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, ওই সমাধিগুলোতে কেউ যদি অনুপ্রবেশ করে বা গোপনে তা দখল বা এর বিষয়বস্তু পরিবর্তনের চেষ্টা করে, তবে তাকে কঠোর শাস্তি দেওয়া হবে।
সাংস্কৃতিক কেন্দ্র জাবাল ইথলিব
আলউলা শহর থেকে পূর্ব দিকে ও হেগরার মাঝ বরাবর সরু রাস্তা ধরে হেঁটে গেলেই পাওয়া যাবে জাবাল ইথলিব। ধারণা করা হয়, এটি সে সময়ের হেগরার নাবাতিয়ান সভ্যতার গৌরবময় ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র ছিল। পাথরের পাহাড়ের সামনের অংশে খোদাই করা একটি বিশাল কক্ষ। এর তিনটি দেয়ালের চারপাশে পাথরে খোদাই করা বেঞ্চ ও সামনের পুরোটা অংশ খোলা রাখা। ‘দিওয়ান’ নামের এই উন্মুক্ত অংশটি খাবারের ঘর ছিল। রাজকীয় ভোজ বা রাজনৈতিক সভা অনুষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে এটি ব্যবহার হতো। সে সময়ে নাবাতিয়ানরা দলবেঁধে খাবার তৈরি করত। এবং অবসরে সেখানেই তারা খাবারের সঙ্গে সংগীত উপভোগ করত।
গিরিপথ সিক
এর পরই পাহাড়ের মধ্য দিয়ে সরু হয়ে চলে যাওয়া বিশাল প্রাকৃতিক গিরিপথ ‘সিক’-এর দেখা মেলে। পাহাড়ের মাঝ দিয়ে একটি প্রাকৃতিক পানির ধারা বয়ে চলেছে। এই স্রোতধারা প্রমাণ করে, সে যুগে নাবাতিয়ানরা কেবল প্রাকৃতিক পানি সম্পদ হিসেবে ব্যবহারেই বিশেষজ্ঞ ছিল না বরং বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ ও ব্যবহারে দক্ষ ছিল । এই ব্যবস্থা থেকে সম্ভবত নাবাতিয়ান শব্দটির ব্যাখা করা যায়। নাবাতিয়ান শব্দটি আরবি ‘নাবাতু’ থেকে এসেছে। যার অর্থ ‘কুয়া থেকে আসা ঝরনাধারা’।
নাবাতিয়ান সভ্যতা
নাবাতিয়ানরা হলো প্রাচীন আরব জনগোষ্ঠী। কয়েকটি যাযাবর বেদুইন গোত্রের সমন্বয়ে এই জাতি গঠিত হয়েছিল। যারা উত্তর আরব ও ভূমধ্যসাগর তীরবর্তী পূর্ব দ্বীপাঞ্চল লেভেন্তে বাস করত। বিস্তৃত এই মরুঅঞ্চলে তারা পশুপালনের জন্য চারণভূমি ও পানির সন্ধানে ঘুরে বেড়াত। আরবের সীমান্তবর্তী ভূমি থেকে শুরু করে ইউফ্রেতিসের লোহিত সাগর পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল তাদের সাম্রাজ্য।
ধারণা করা হয়, নাবাতিয়ান শাসকরা জর্ডানের শহর পেত্রা (প্রাচীন রাকমু) থেকে তাদের সাম্রাজ্য শাসন করতেন। তারা তাদের দ্বিতীয় রাজধানী হেগ্রা (আধুনিক নাম মাদায়ানে সালেহ) আলউলায় স্থাপন করেছিল।
খ্রিস্টপূর্ব ৪র্থ শতাব্দী ও ২য় শতাব্দীতে নাবাতিয়ানরা এই অঞ্চলজুড়ে একটি স্বতন্ত্র সভ্যতা গড়ে তুলেছিল। যা তাদের রাজনৈতিক সত্তা হিসেবেও পরিচিতি এনে দেয়। সে সময়ের একটি দুর্বল বাণিজ্যিক নেটওয়ার্ককে কেন্দ্র করে তাদের সাম্রাজ্য পরিচালিত হতো। যার প্রভাব ও প্রতিপত্তি প্রাচীন বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল।
১০৬ খ্রিস্ট-পূর্বাব্দের দিকে রোমান সম্রাট ট্র্যাজান নাবাতিয়ান সাম্রাজ্য জয় করেন। সে সময় তারা গ্রিক-রোমান সংস্কৃতি থেকে সিরামিকের ওপর হাতে আঁকা চিত্রের মাধ্যমে প্রাচীন আরবীয় বৈশিষ্ট্য অর্জন করেছিল। পরে রোমান যুগের শেষ দিকে এসে তারা খ্রিষ্টীয় ধর্মে ধর্মান্তরিত হয়। ঐতিহাসিক জেন টেইলর ‘নাবাতিয়ানদের প্রাচীন বিশে^র প্রতিভাধর জাতি হিসেবে উল্লেখ করেছেন।’
অনেক গ্রাফিতি ও শিলালিপিতে নাবাতিয়ানদের প্রমাণ মিললেও কোনো লেখা বা সাহিত্যে তাদের বাস্তব সন্ধান মেলেনি। প্রতœতাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিকরা নাবাতিয়ান সভ্যতার স্থাপত্যশৈলীর বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা খুঁজে পাননি। তাই ২ হাজার বছর আগের সেই রহস্যময় নগর পরিকল্পনা কারা করেছে এবং পাহাড় কেটে কেমন করে এসব বিশাল পাথুরে স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছিল তা রহস্যময় বিস্ময় হয়েই রয়ে গেছে। তবে প্রাচীন এই সভ্যতার কোনো লিখিত ইতিহাস না থাকার বিষয়টি এই বিস্ময়কেও ছাপিয়ে গেছে।