যে ভাষায় ‘না’-এর ব্যবহার নেই

আপডেট : ৩০ আগস্ট ২০২২, ১১:৩২ পিএম

নেপালের কুসুন্দা ভাষার কোনো পরিচিত উৎস নেই। এর ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’-বোধক কোনো শব্দও নেই। কিছু প্রতিশব্দ রয়েছে শুধু। আদিবাসী জনগোষ্ঠীর এই ভাষায় ভবিষ্যৎ কালের সরাসরি ব্যবহারও দেখতে পাওয়া যায় না। অনর্গল কথা বলে যাওয়ার রীতি রয়েছে শুধু। যে রীতি পরিবর্তনের জন্য উদ্যোগী হয়েছেন ভাষাবিদরা। লিখেছেন নাসরিন শওকত

বনের মানুষ কুসুন্দা

হিমালয়ের কোলে দাঁড়িয়ে আছে নেপাল। এর দক্ষিণের নিম্নাঞ্চলের পাহাড় তেরাইকে ঘিরে রেখেছে শীতের ঘন কুয়াশা। ১৮ বছরের হিমা কুসুন্দা এই অঞ্চলেরই বাসিন্দা। সবেমাত্র স্কুলের বোর্ডিং থেকে বাড়ি ফিরেছে। পরনে তার গোলাপি হুডের সোয়েটার। নেপালের ছোট্ট আদিবাসী গোষ্ঠী কুসুন্দাদের জীবিত শেষ বংশধরদের একজন হিমা। তার সঙ্গে একমাত্র নারী রয়েছেন কমলা খাত্রী। ৪৮ বছর বয়সী কমলা কুসুন্দা ভাষায় অনর্গল কথা বলতে পারেন। বর্তমানের ভাষাতাত্ত্বিক গবেষকরা বিশ^াস করে থাকেন, নেপালে তিব্বতী-ব্রাহ্ম ও ইন্দো-আর্য উপজাতিদের আগমনের আগে হিমালয়ের আশপাশের অঞ্চলজুড়ে কুসুন্দারা নামের একটি প্রাচীন আদিবাসী ভাষাভাষী জাতি বেঁচে ছিল। সবশেষ ২০১১ সালের পরিসংখ্যানের তথ্য মতে, নেপালে ২৭৩ জন কুসুন্দা রয়েছেন।

কুসুন্দারা বর্তমানে নেপালের মধ্য-পশ্চিামাঞ্চলজুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে। বনের রাজা (‘বনের মানুষ’) হিসেবে পরিচিত কুসুন্দারা। তারা নিজেদের মিহাক বা মায়াহক হিসেবে পরিচয় দিয়ে থাকে। নেপালি কুসুন্দা শব্দের মূল অর্থ ‘বর্বর’। কারণ প্রতিবেশী চেপাং ও অন্য সব গোষ্ঠী ঐতিহ্যগতভাবে ‘কুসুন্দা’দের অসভ্য বলে মনে করত। প্রাথমিক পর্যায়ের কুসুন্দারা নেপালের পশ্চিম বনাঞ্চলের যাযাবর শিকারি-সংগ্রাহকদের একটি নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠী ছিল। যারা বর্তমানে প্রতিবেশী সম্প্রদায়ের সদস্যদের সঙ্গে বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপনের মধ্য দিয়ে গ্রামে বসবাস করছে।

১৯৬৮ সালে প্রথমবারের মতো মার্কিন নৃবিজ্ঞানী জোহান রেইনহার্ড মধ্য নেপালের গোর্খার কাছে শেষ জীবিত কয়েকজন কুসুন্দার সন্ধান পান। এরপর রেইনহার্ড কুসুন্দা ভাষা উদ্ধার ও এই আদিবাসী গোষ্ঠীর ওপর নৃতাত্ত্বিক তথ্য সংগ্রহ করেন। এর পরে দুই ধাপে (১৯৬৯ ও ১৯৭৫ সালে) তিনি পশ্চিম নেপালের ডেং ও সুরক্ষেত উপত্যকায় কুসুন্দাদের আরও কয়েক সদস্যকে খুঁজে পান। যাযাবর শিকারি কুসুন্দারা সাাধারণত রাতের বেলায় গাছে বিশ্রামরত পাখি শিকার করত। এই শিকারে তারা ধনুকের সঙ্গে পাখির পালকবিহীন লম্বা এক ধরনের তীর ব্যবহার করত। সে সময় এই গোষ্ঠীর মধ্যে শুধুমাত্র বন্যপ্রাণীর মাংস খাওয়ার রীতি ছিল যা এখনো প্রচলিত। কুসুন্দারা মূলত প্রকৃতি পূজার অনুসারী। যদিও তাদের ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে হিন্দুত্বের আধিক্য দেখা যায়।

সংখ্যালঘু ও আদিবাসী সম্প্রদায়

জাতিগতভাবে নেপাল একটি জটিল ও বৈচিত্র্যময় দেশ। বর্তমানে দেশটিতে ২ কোটি ৯১ লাখ ৪শ’ মানুষের বাস। যেখানে অসংখ্য আদিবাসী ও নানা ভাষার সম্প্রদায় রয়েছে। ২০১১ সালের আদমশুমারিতে দেশটির মোট জনসংখ্যার অনুমানিক ৮৫ লাখ (৮. ৫ মিলিয়ন) জনগোষ্ঠীকে আদিবাসী জাতীয়তার বলে উল্লেখ করা হয়েছিল। যা মোট জনসংখ্যার ৩৬ শতাংশ। এর মধ্যে কুসুন্দা জনগোষ্ঠীর সংখ্যা ০ দশমিক ১ শতাংশেরও কম। ওই শুমারিতে মোট ১২৬টি নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীরও উল্লেখ করা হয়। এর মধ্যে শুধুমাত্র ৫৯টি নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠীকে আনুষ্ঠানিকভাবে আদিবাসী জনগোষ্ঠী বা আদিবাসী জাতীয়তায় অন্তর্ভুক্ত করে তালিকাভুক্ত করেছে। আর্থ-সামাজিক সূচকগুলোর ওপর ভিত্তি করে নেপালের ফেডারেশন অব ইনডিজিনাস ন্যাশনালিটিজ এই নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠীগুলোকে পাঁচটি ভাগে ভাগ করেছে। এরা হলো ‘বিপন্ন’, ‘অত্যন্ত প্রান্তিক’, ‘প্রান্তিক’, ‘সুবিধাবঞ্চিত’ ও ‘সুবিধাপ্রাপ্ত’। ২০১০ সালে আরও অতিরিক্ত ২২টি নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠীকে আদিবাসী জাতীয়তার অন্তর্ভুক্ত করার সুপারিশ করেছিল এনএফডিআইএন। যদিও নেপালের কিছু আদিবাসী সংস্থা দাবি করে থাকে, দেশটিতে আদিবাসী জনসংখ্যার প্রকৃত অংশ ৫০ শতাংশের কাছাকাছি। কিছুসংখ্যক আদিবাসী ও অন্য সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী সরকারিভাবে স্বীকৃত নয়। নেপালের প্রধান আদিবাসী গোষ্ঠীগুলো হলো মাগার, থারু, তামাং, নেওয়ার, রাই, গুরুং, লিম্বু । আর সরকারিভাবে চিহ্নিত ২৩টি আদিবাসী গোষ্ঠীর মধ্যে রয়েছে থাকালি, বোটে, রাউতে, হাইউ, জিরেল। অন্য সব সংখ্যালঘু গোষ্ঠীর মধ্যে কামি, মুসলিম ও যাদবরা রয়েছে। এদিকে সারকি, পোদে, দামাই, বাদি, লোহার, চামার, সুনার হলো দলিত গোষ্ঠীভুক্ত। এর মধ্যে হালখার হলো দলিতদের মধ্যে সবচেয়ে ছোট গোষ্ঠী।

ধর্মীয় সম্প্রদায়

২০০৮ সালে নেপালকে ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছিল। সে সময় থেকে রাষ্ট্রধর্ম হিন্দু। পরে ২০১১ সালের আদমশুমারিতে দেশটির প্রধান ধর্মীয় সম্প্রদায় হিসেবে হিন্দু সম্প্রদায়কে দেখানো হয়েছে। দেশটির মোট জনসংখ্যার ৮১ দশমিক ৩ শতাংশ (২২. ৫৫ মিলিয়ন) হিন্দু ধর্ম পালন করে থাকে। এই সম্প্রদায়ের মধ্যে পার্বত্য হিন্দুরাই সংখ্যায় বেশি। এদের আবার কয়েকটি গোত্রেও ভাগ করা যায়। যার মধ্যে রয়েছে বহু বা ব্রাহ্মণ, ঠাকুরি, ছেত্রী ও নেওয়ার। আবার দক্ষিণাঞ্চলের তেরাই হিন্দুদের মধ্যে মৈথিলি, ভোজপুরি ও আওয়াধি ভাষাভাষী সম্প্রদায় অন্তর্ভুক্ত। এ অঞ্চলে আরও অন্য ভাষাভাষী সম্প্রদায়ও রয়েছে। এছাড়াও নেপালে বৌদ্ধ, মুসলিম, কিরাত, খ্রিস্টান, প্রকৃতি, বন, জৈন এবং বাহাই ও শিখ ধর্মাবলম্বীরাও রয়েছেন। ঐতিহ্যগতভাবে ব্রাহ্মণ ও ছেত্রী ধর্মীয় সম্প্রদায় নেপালকে নিয়ন্ত্রণ করে থাাকে। পার্বত্য অঞ্চল ও রাজধানী কাঠমান্ডুর উপত্যকায় বাসরত হিন্দু জনগোষ্ঠীই কেন্দ্রীয়ভাবে নেপালি ভাষা ও সংস্কৃতিকে পরিচালিত করে থাকে। পার্বত্য অঞ্চলের এই জনগোষ্ঠী তিব্বতী-ব্রাহ্ম ভাষায় (রাই, লিম্বু, তামাং, মাগার, গুরাং ও অন্য আরও ভাষায়) কথা বলে থাকেন। তবে সরকারে তাদের প্রতিনিধিত্ব কম হওয়ায় তারা প্রান্তিক অবস্থায়ই থেকে গেছেন।

ভাষা যখন কুসুন্দা

২০১১ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, নেপালের জাতীয় ভাষা নেপালি। দেশটির ৪৪ দশমিক ৬ শতাংশ জনগোষ্ঠী তাদের মাতৃভাষা নেপালিতেই কথা বলে। মাতৃভাষা হিসেবে নেপালে আরও ১২৩টি ভাষাও চালু রয়েছে। এর মধ্যে মৈথিলি, ভোজপুরি, থারু, তামাং, নিউয়ার, বাজ্জিকা, মাগার, দোতেলি এবং উর্দু ভাষাও আছে। আদিবাসী কুসুন্দাদের ভাষার নামও কুসুন্দা। বেশ স্বতন্ত্র একটি ভাষা। ভাষাতত্ত্ববিদদের বিশ্বাস, বিশে্বর অন্য কোনো ভাষার সঙ্গে কুসুন্দা ভাষার কোনো সম্পর্ক নেই। প-িতরা এও জানেন না যে, এই ভাষার উৎপত্তি হয়েছিল কীভাবে। কুসুন্দা ভাষার মধ্যে অনেক অপরিচিত উপাদান বা বৈশিষ্ট্য রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো এই ভাষার বাক্যে কোনো কিছুকে অস্বীকার করার ক্ষেত্রে মানসম্পন্ন শব্দ ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ নেই। বা তা বোঝাতে কোনো নির্দেশও নেই। কুসুন্দা ভাষার প্রকৃত উৎস সম্পর্কে জানাতে গিয়ে পোখরেল বলেন, ‘নেপালের বাইরে  থেকে আসা জনগোষ্ঠীর কাছ থেকে আমরা নেপালের অন্য সব ভাষাকে চিহ্নিত করতে পারছি। কিন্তু কুসুন্দাই একমাত্র ভাষা যার প্রকৃত উৎস সম্পর্কে আমরা জানি না।’

ভাষাবিদদের মতে, একটি ভাষা হিসেবে কুসুন্দার শুরুটা বেশ রহস্যময়। তবে এই ভাষার অনেক বিরল উপাদানও খুঁজে পেয়েছেন তারা। ভোজরাজ গৌতম একজন ভাষাবিদ। কুসুন্দা ভাষার ওপর তার অগাধ জ্ঞান। তিনি কুসুন্দাকে সবচেয়ে অদ্ভুত ভাষার একটি বলেও উল্লেখ করেছেন। এই ভাষার একটি বাক্যে মানসম্পন্ন কোনো নেতিবাচক শব্দ নেই। তবে ভাষাটিতে বেশ কিছু শব্দ আছে যা নেতিবাচক কিছু বুঝিয়ে থাকে। আবার সঠিক অর্থ বোঝাতে প্রসঙ্গও ব্যবহার করা হয়। উদাহরণ হিসেবে আপনি যদি বলতে চান, ‘আমি চা চাই না।’ সেক্ষেত্রে আপনি নিশ্চয়ই ‘পান করার’ জন্য ক্রিয়া পদটি ব্যবহার করবেন। কিন্তু কুসুন্দা ভাষায় এই ধরনের স্থায়ী রূপের ব্যবহারের সম্ভাবনা খুব কমই নির্দেশ করে। এক্ষেত্রে ‘চা পান করার’ জন্য সমার্থক শব্দের ব্যবহার বক্তার একান্ত ইচ্ছের ওপর নির্ভর করে। এছাড়াও কুসুন্দা ভাষায় সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশক কোনো শব্দও নেই। যেমন বাম বা ডান। এর পরিবর্তে বক্তা ‘এদিকে’ বা ‘সেদিকে ’ এমন আপেক্ষিক বাক্যাংশ ব্যবহার করে থাকেন। এদিকে ভাষাবিদরা বলছেন, অন্য অনেক ভাষার মতো পুরো কুসুন্দা ভাষার মধ্যে স্থির, অনমনীয় ব্যাকরণগত কোনো রীতি বা কাঠামো খুঁজে পাওয়া যায়নি। ভাষাটি খুবই সাবলীল। এবং বাক্যাংশগুলোকে অবশ্যই বক্তার সঙ্গে সম্পর্কিত করে ব্যাখ্যা করতে হবে। যেমন বর্তমান বা অতীতের কোনো বাক্য বোঝাতে ক্রিয়াকে বিভক্ত করা হয় না। অতীতকে বোঝাতে বলা হয়, ‘আমি একটি পাখি দেখেছিলাম’ পাশাপাশি ভবিষ্যৎকে বোঝাতে ‘আমি একটি পাখি দেখব’। কিন্তু একজন কুসুন্দা ভাষার বক্তা এই দুটি বাক্যকে বলার সময় ‘অতীতের কাজ’কে বোঝানোর সময় ‘কাল’কে কোনোভাবেই নির্দেশ করেন না। বরঞ্চ বক্তার তার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত অভিজ্ঞতার আলোকে বাক্যটি বর্ণনা করে থাকেন। এদিকে ভবিষ্যতের কোনো কাজ সাধারণভাবে ব্যাখ্যা করা হবে এবং তা কোনো বিষয়ের সঙ্গে যুক্ত হবে না। অর্থাৎ কুসুন্দা ভাষায় ভবিষ্যৎ কালের ব্যবহার নেই। এর মানে এই ভাষায় ভবিষ্যতের কোনো কাজকে সাধারণভাবে তুলে ধরে এবং তা কোনো বিষয়বস্তুর সঙ্গে যুক্ত হয় না। তবে আশ্চর্যের বিষয় হলো, কুসুন্দা ভাষার এই বিরল ধরনের বৈশিষ্ট্যসমূহের মধ্যকার বড় একটি অংশ ভাষাবিদদের কাছে আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে। ভাষাটির সচল থাকার ক্ষেত্রে এটি একটি আংশিক কারণ হিসেবে কাজ করছে।

কমলা খত্রী ও হিমা

একমাত্র কমলা খত্রীই নেপালে কুসুন্দা ভাষায় অনর্গল কথা বলতে পারেন। তা সত্ত্বেও তিনি তার নিজের সন্তানদেরই কখনো কুসুন্দা ভাষা শেখাননি। কেন সন্তানদের নিজের মাতৃভাষা শেখা থেকে বঞ্চিত করেছেন সে প্রসঙ্গে কমলা বলেন, ‘আমি চিন্তা করেছি যে তাদের নেপালি ভাষা শেখা উচিত। কারণ তা খুব কাজের। কিন্তু লোকজন প্রায়ই আমাদের ভাষা নিয়ে ঠাট্টা-তামাশা করে এবং বলে এটা কোনো স্বাভাবিক ভাষা ছিল না। সমাজে কুসুন্দা ভাষাভাষীদের অনেক বেশি কলঙ্কের মুখোমুখি হতে হয়। কিন্তু নিজেকে এখন খুব বঞ্চিত মনে হয়। কারণ আমি আমার সন্তানদের সঙ্গেই নিজের মায়ের ভাষায় কথা বলতে পারি না।’ কমলা এখন নেপালে ভাষা কমিশনের সঙ্গে কাজ করছেন। ঘোরাহীতে ১০ জন কমিউনিটি সদস্যকে তিনি কুসুন্দা শেখাচ্ছেন।

এদিকে নিজের মাতৃভাষা সংরক্ষণের অবদান রেখে ক্ষমতায়নের পথে হাঁটতে চান কুসুন্দা হিমাও। নিজের ভাষা ও সংস্কৃতিকে পুনরুজ্জীবিত করার লক্ষ্য নিয়েই তেরাইয়ের নিজ গ্রাম ডেং-এ ফিরেছেন ১৮ বছরের এই তরুণী। ভবিষ্যতে কুসুন্দা ভাষার একজন শিক্ষক হওয়ার স্বপ্ন দেখা হিমা বলেন, ‘আমার মনে হয়, আমি এই ভাষাকে (কুসুন্দা) আরও সামনে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারব। যদি আমরা কুসুন্দা ভাষায় নিয়মিত কথা বলার চর্চা করতে পারি, তাহলেই আমরা এই ভাষাকে বাঁচিয়ে রাখতে পারব।’

প্রযুক্তির ব্যবহার

নেপালে বর্তমানে কুসুন্দা ভাষাকে সংরক্ষণের মাধ্যমে পুনরুজ্জীবিত করতে বেশ কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। আর এই প্রচেষ্টায় আধুনিক প্রযুক্তিকে কাজে লাগাতে গণমাধ্যমকেও ব্যবহার করা হচ্ছে। এজন্য কুসুন্দাদের সঙ্গে ‘নাওহিয়ার’ নামের বার্লিনভিত্তিক একটি স্টুডিও কাজ করছে। এই রেডিওটি কুসুন্দাদের ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে সংরক্ষণের কাজে সহায়তা করছে। এখানে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো নাওহিয়ার একটি বাস্তবধর্মী ভার্চুয়াল তথ্যচিত্র তৈরি করেছে। যেখানে থ্রিডি অ্যানিমেশন ব্যবহার করে কুসুন্দাদের যাযাবর শিকারি-সংগ্রাহক হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। তবে এই গল্পের একটিমাত্র অংশ কুসুন্দা ভাষার সংরক্ষণ। নেপাল কুসুন্দা ডেভেলপমেন্ট সোসাইটির চেয়ারম্যান ধন বাহাদুর কুসুন্দার মতে, অধিকাংশ কুসুন্দা দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করেন। তারা জমির অধিকারও ভোগ করেন না। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই শ্রমিক বা দারোয়ান হিসেবে কাজ করেন তারা। ধন বাহাদুর কুসুন্দা আরও বলেন, অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে এবং স্বাস্থ্য ও শিক্ষার দিক থেকেও কুসুন্দারা অনেক বেশি সুবিধাবঞ্চিত। এদিকে নেপালের ভাষা কমিশনের সচিব লোক বাহাদুর লোপচান বলেছেন, কুসুন্দাদের একটি অনগ্রসর গোষ্ঠী হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। তাহলেই কুসুন্দা ভাষা সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াবে । এটি কুসুন্দা গোষ্ঠীর প্রান্তিক অবস্থার দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করার একটি কার্যকর উপায়। লোপচান আরও বলেন, ‘নেপালে অন্য সব ভাষার পুনরুজ্জীবন প্রকল্পগুলো সেই সম্প্রদায়গুলোর সঙ্গেই হয়েছে সমাজে যাদের অবস্থান কুসুন্দার চেয়ে অনেকটা ভালো। যদি কুসুন্দাদের ভাষাই না থাকে তাহলে নেপালের অন্য সব প্রান্তিক গোষ্ঠী থেকে তাদের আলাদা করার কোনো মানে নেই। ভাষার পরিচয় দিয়েই তারা সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারছে।’ অন্যরাও এ বিষয়ে একমত যে, এ কুসুন্দারা খুবই প্রান্তিক। কাজেই ভাষাভাষী সম্প্রদায় হিসেবে তাদের একটি প্রোফাইল তৈরি করা আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ। অন্যরা একমত।

কুসুন্দারা এখন একীভূত বসতির জন্য সরকারের কাছে ‘একককৃত বস্তি’ হিসেবে এক টুকরো জমি দাবি করছে। যেখানে সব কুসুন্দা একসঙ্গে বাস করতে পারবে। আর এ বিষয়ে তাদের সহায়তা করছে লন্ডন বিশ^বিদ্যালয়ের পোস্ট-ডক্টরাল ফেলো টিম বডসহ অন্য গবেষকরা। কুসুন্দাদের নতুন এই আবাসের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের জন্য বড ও তার নেপালি গবেষণা সহকারী উদয় রাজ আলি বর্তমানে তহবিল অনুসন্ধান করছেন। বড জানান, এই বন্দোবস্তটি শুধুমাত্র কুসুন্দা সম্প্রদায়ের জমির অধিকারই সুরক্ষিত করবে না বরং সেখানে একটি করে স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও স্কুলের ব্যবস্থাও থাকবে। যা এই গোষ্ঠীটিকে একত্র করার সঙ্গে সঙ্গে তাদের ভাষা শেখার ও কথা বলারও সুযোগ করে দেবে।

ভাষা ও সুস্থতার পুনরুজ্জীবন

কুসুন্দা ভাষাকে পুনরুজ্জীবিত করার ক্ষেত্রে অন্য সম্ভাব্য সুবিধাও রয়েছে। নেপালে এ বিষয় নিয়ে একটি গবেষণা সংস্থা কাজও করছে। তারা আদিবাসী ভাষা খুঁজে বের করেছে তা পুনরুজ্জীবিত করার লক্ষ্যে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। এক্ষেত্রে ওই ভাষার সঙ্গে সম্পৃক্ত শারীরিক ও মানসিক সুস্থতার উচ্চতর সূচকগুলোকে ব্যবহার করছে তারা। এদিকে গবেষণায় উঠে এসেছে, উত্তর আমেরিকায় আদিবাসী ভাষাভাষী জনগোষ্ঠীর মধ্যে সিগারেট ব্যবহারের হার কম পাওয়া গেছে । উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, এই জনগোষ্ঠী শারীরিক ও মানসিক সুস্থতার সূচকে উচ্চতরে অবস্থান করলেও ডায়াবেটিসে তাদের নিম্নস্তরে অবস্থান করতে দেখা যায়। আবার কানাডার ব্রিটিশ কলাম্বিয়া বিশ^বিদ্যালয়ের একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে, আদিবাসী সম্প্রদায়গুলোর তরুণদের মধ্যে আত্মহত্যার হার ছয়গুণ বেশি। লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাষানীতি ও পুনরুজ্জীবনের অধ্যাপক জুলিয়া সাল্লাব্যাঙ্ক বলেছেন, ‘উপনিবেশ বা নিপীড়নের কারণে সৃষ্ট ঐতিহাসিক আতঙ্ক থেকে প্রায়ই ভাষার পরিবর্তন ঘটে । যা আত্মমর্যাদার হানি ঘটায়। সুতরাং আমরা এই বৃত্তটিকে ঘুরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করতে পারি। যাতে নিজের ভাষা ও সাংস্কৃতিক পরিচয় পুনরুদ্ধার করার মধ্য দিয়ে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর ক্ষমতায়ন নিশ্চিত হতে পারে।’ আর পোখরেলের কাছে মনে হয়, জীবিত কুসুন্দাদের মধ্যে কুসুন্দা ভাষার সহযোগিতামূলক শিক্ষাই এই ভাষা সংরক্ষণের চাবিকাঠি হতে পরে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত