চুক্তি নিয়ে তেহরানে রাজনৈতিক অস্থিরতা, রাজপথে আছড়ে পড়ছে ক্ষোভের ঢেউ

আপডেট : ২০ জুন ২০২৬, ০২:৩০ এএম

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে স্বাক্ষরিত সাম্প্রতিক সমঝোতা চুক্তিকে যেখানে তেহরান নিজেদের বিশাল কূটনৈতিক বিজয় হিসেবে তুলে ধরছে, সেখানে দেশটির ভেতর থেকেই সুর উঠেছে ভিন্ন। চুক্তির খুঁটিনাটি প্রকাশের পরপরই ইরানের শক্তিশালী কট্টরপন্থী গোষ্ঠীগুলো একে ‘জাতীয় অপমান’ হিসেবে আখ্যায়িত করে সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। এই অভ্যন্তরীণ বিরোধ এখন দেশটির শীর্ষ নেতৃত্বের জন্য নতুন এক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

গত সপ্তাহে যখন ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার সমঝোতার খসড়া প্রকাশ হতে শুরু করে, তখন ইরানের পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা কমিশনের ভাইস চেয়ারম্যান মাহমুদ নাবাবিয়ান তেহরানে এক জনসভায় সরাসরি চুক্তির তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি দাবি করেন, এই চুক্তির মাধ্যমে ইরান কার্যত ‘যুক্তরাষ্ট্রের উপনিবেশে’ পরিণত হবে এবং হরমুজ প্রণালী ইসরায়েলের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হবে। তার এই বক্তব্য সরাসরি সম্প্রচারের পর দেশজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি হয়। সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সামনে জড়ো হয়ে বিক্ষোভকারীরা ‘আমরা এই চুক্তি মানি না’ স্লোগান তুলে রাজপথে নেমে আসেন।

ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম এবং সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা এই চুক্তিকে ইসলামী প্রজাতন্ত্রের এক বিশাল বিজয় ও যুক্তরাষ্ট্রের পরাজয় হিসেবে প্রচার করছেন। যুদ্ধের ডামাডোলের মধ্যে এই চুক্তি সরকারকে হারানো ক্ষমতা পুনরুদ্ধারের এক সুযোগ করে দিয়েছে বলে মনে করেন ব্লুমবার্গ ইকোনমিকসের মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক বিশেষজ্ঞ দিনা এসফানদিয়ারি। তিনি বলেন, ‘যুদ্ধ পরিস্থিতি এমন একটি সরকারকে নতুন জীবন দিয়েছে, যারা আগে থেকেই অস্থিরতা ও সংকটের কারণে কোণঠাসা ছিল।’ তবে সরকারের দাবি সত্ত্বেও, সাধারণ মানুষের সমর্থন এবং কট্টরপন্থীদের বাধা চুক্তিটির সফলতাকে অনিশ্চিত করে তুলেছে।

‘ইরান’স গ্র্যান্ড স্ট্র্যাটেজি’ বইয়ের লেখক ভ্যালি নসর মনে করেন, দেশটির সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি ও বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি)-এর জন্য এখন সবচেয়ে বড় মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে জেবহে-ই পায়দারি নামক কট্টরপন্থী গোষ্ঠীটি। মাহমুদ নাবাবিয়ান এই গোষ্ঠীর ঘনিষ্ঠ। নসরের মতে, এই চুক্তি সফল করতে হলে খামেনিকে সেই শক্তির লাগাম ধরতে হবে, যাদের উত্থানে তারা নিজেরাই ভূমিকা রেখেছিলেন।

পরিস্থিতি সামাল দিতে সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি বৃহস্পতিবার এক বার্তায় জানিয়েছেন যে, প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফের দেওয়া প্রতিশ্রুতি ও দেশের স্বার্থ রক্ষার নিশ্চয়তার ভিত্তিতেই তিনি এই চুক্তিতে অনুমোদন দিয়েছেন। বিশ্লেষকদের মতে, এই বার্তার মাধ্যমে খামেনি কৌশলে চুক্তির দায়ভার আলোচনার কারিগরদের ওপর চাপিয়ে নিজেকে বিতর্ক থেকে দূরে রাখার চেষ্টা করেছেন।

পায়দারি গোষ্ঠীর মূল শক্তি তাদের জনবল। যুদ্ধের সময়ও তারা সাধারণ মানুষকে রাজপথে নামিয়ে নিজেদের শক্তির জানান দিয়েছে। দরিদ্র এবং রক্ষণশীল ধর্মপ্রাণ মানুষের মধ্যে তাদের গভীর প্রভাব রয়েছে, যারা যুদ্ধকে সবচেয়ে কাছ থেকে অনুভব করেছে। ভ্যালি নসর বলছেন, এই রক্ষণশীল অংশকে তুষ্ট করতে না পারলে চুক্তির পথে এগোতে সরকারকে হিমশিম খেতে হবে।

লন্ডনের চ্যাথাম হাউসের মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা কর্মসূচির পরিচালক সানাম ভাকিল বলেন, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান চুক্তি সামরিক উত্তেজনা কমাতে পারে, কিন্তু এটি ইরানের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক সংকটের সমাধান নয়। চুক্তিটি কতটুকু কার্যকর হবে তা নির্ভর করছে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে কতটা স্বস্তি ফিরবে তার ওপর। ইরানের অর্থনীতি এখন ধুঁকছে, তাই সাধারণ মানুষকে আশ্বস্ত করতে হলে সরকারের প্রয়োজন দ্রুততম সময়ে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার ও দৃশ্যমান আর্থিক সুবিধা প্রদান করা।

চুক্তির খবর নিয়ে তেহরানের সাধারণ মানুষের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। ৪৫ বছর বয়সী রেজা নামে এক বাসিন্দা বলেন, চুক্তি ভালো শোনাচ্ছে, কিন্তু আমার এসব শোনার শক্তিও নেই। প্রথমে গণহত্যা, তারপর যুদ্ধ, আর এখন তারা বন্ধু?

অন্যদিকে, ফাতী নামে আরেক বাসিন্দা কিছুটা আশাবাদী। তিনি বলেন, ‘যদি আমরা ব্যবসা চালিয়ে পরিবার নিয়ে ভালোভাবে বাঁচতে পারি, শুধু টিকে থাকার লড়াই করতে না হয়, তবে ঠিক আছে। আমি এটি মেনে নেব।’

সব মিলিয়ে, যুদ্ধকালীন অস্থিরতা পার করে আসা ইরান এখন চুক্তির সুফল ঘরে তোলার পরিবর্তে নিজেদের ভেতরের অস্থিরতা সামলাতেই বেশি ব্যস্ত। রাজপথের নিয়ন্ত্রণ এবং মানুষের প্রতিদিনের জীবনযাত্রার মানের ওপরই নির্ভর করছে এই সমঝোতার দীর্ঘস্থায়ী ভবিষ্যৎ।

সূত্র: সিএনএন

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত