হোয়াইট হাউসে তোলপাড়

নির্বাচনের আগে ভোটিং মেশিন নিয়ে গোপন প্রতিবেদন

আপডেট : ২০ জুন ২০২৬, ০২:০০ এএম

যুক্তরাষ্ট্রে আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনকে সামনে রেখে দেশটির ভোটিং মেশিন বা ভোট গ্রহণের যন্ত্রে বিদ্যমান ‘গুরুতর দুর্বলতা’ চিহ্নিত করে সরকারি একটি প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে। তবে নির্বাচনের আগমুহূর্তে এই প্রতিবেদন প্রকাশে কয়েক মাস ধরে বাধা দিচ্ছে হোয়াইট হাউস। বিষয়টি সম্পর্কে অবগত তিন ব্যক্তির বরাতে এ তথ্য জানা গেছে।

গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর পরিচালকের কার্যালয় (অফিস অব দ্য ডিরেক্টর অব ন্যাশনাল ইন্টেলিজেন্স—ওডিএনআই) এই প্রতিবেদনটি তৈরি করেছে। প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে, ভোটিং মেশিনের সফটওয়্যার আপডেট করার মতো পদক্ষেপ নিলে এর নিরাপত্তা আরও জোরদার করা সম্ভব। তবে এটি স্পষ্ট করা হয়েছে যে, এখন পর্যন্ত এই দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে ভোট জালিয়াতি বা ফলাফল পরিবর্তনের কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। মূলত মার্কিন নির্বাচনে ব্যবহৃত যন্ত্রগুলোর নিরাপত্তা সংক্রান্ত ঘাটতিগুলো নিয়েই এ প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, হোয়াইট হাউসের কর্মকর্তাদের একাংশের আশঙ্কা, এই প্রতিবেদন প্রকাশ করা হলে ভোটারদের, বিশেষ করে রিপাবলিকান সমর্থকদের মধ্যে নির্বাচন ব্যবস্থা নিয়ে অনাস্থা তৈরি হতে পারে। আবার অন্য একটি পক্ষ মনে করছে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ২০২০ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে কারচুপির যে ভিত্তিহীন দাবি করে আসছেন, এই প্রতিবেদন তাকে যথেষ্ট জোরালো সমর্থন দিচ্ছে না। অন্যদিকে, ডেমোক্র্যাটদের একটি অংশ ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন যে, প্রশাসনের এই তদন্তের সুযোগ নিয়ে বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে বাধ্যতামূলকভাবে কাগজের ব্যালট ব্যবহারের চাপ সৃষ্টি করা হতে পারে।

উল্লেখ্য, ২০২০ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ তুলে ট্রাম্পের আইনজীবীরা বিভিন্ন আদালতে যেসব মামলা করেছিলেন, তার একটিও প্রমাণ করতে ব্যর্থ হয়েছেন।

ওডিএনআই পরিচালক তুলসী গ্যাবার্ড শুক্রবার (১৯ জুন) দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন। তার ওপর দায়িত্ব ছিল ভোটিং মেশিনগুলো পরীক্ষা করে ট্রাম্পের তোলা ‘নির্বাচন জালিয়াতির’ দাবির পক্ষে কোনো প্রমাণ পাওয়া যায় কি না, তা খুঁজে বের করা। তিনি সেই তদন্ত শুরু করলেও, তা শেষ হওয়ার আগেই তিনি পদত্যাগ করলেন। তার স্থলাভিষিক্ত হচ্ছেন ফেডারেল হাউজিং রেগুলেটর বিল পাল্টে। ট্রাম্প জানিয়েছেন, তিনি চান বিল পাল্টে তার দায়িত্বকালে ‘কারচুপি হওয়া নির্বাচন’ নিয়ে তদন্ত করবেন। তবে ওডিএনআই’র নতুন এই অন্তর্বর্তী পরিচালক এই প্রতিবেদনের বিষয়ে কী করবেন, তা এখনো স্পষ্ট নয়। যদিও সূত্রের খবর, বিল পাল্টেকে এই তদন্তের অগ্রগতি এবং অপ্রকাশিত প্রতিবেদন সম্পর্কে ব্রিফ করা হয়েছে।

ডেমোক্র্যাট এবং বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, ট্রাম্প প্রশাসন মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রভাব বিস্তার করার চেষ্টা করতে পারে, যা রিপাবলিকানদের জন্য ক্ষতির কারণ হতে পারে। ওডিএনআই’র ভেতরের কর্মকর্তা এবং পরামর্শক বিশেষজ্ঞরা হোয়াইট হাউসকে পরামর্শ দিয়েছিলেন যে, গত বছরের শেষ দিকেই এই ত্রুটিগুলো সংশোধনের প্রক্রিয়া শুরু করা উচিত, কারণ এটি করতে অঙ্গরাজ্যগুলোর সঙ্গে ব্যাপক সমন্বয়ের প্রয়োজন।

হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র ডেভিস ইংল প্রতিবেদন প্রকাশের বিলম্বের বিষয়ে কোনো সরাসরি উত্তর দেননি। তবে এক বিবৃতিতে তিনি দাবি করেন, প্রশাসন এফবিআই এবং সিসা (সাইবারসিকিউরিটি অ্যান্ড ইনফ্রাস্ট্রাকচার সিকিউরিটি এজেন্সি)-এর মাধ্যমে অঙ্গরাজ্য ও স্থানীয় নির্বাচন কর্মকর্তাদের সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে, যাতে মার্কিন নির্বাচনে ব্যবহৃত সব যন্ত্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়। ওডিএনআই’র মুখপাত্র অলিভিয়া কোলম্যান বলেন, গ্যাবার্ড তার ক্ষমতার মধ্যে থেকেই নির্বাচন সুরক্ষিত রাখতে কাজ করেছেন, যার মধ্যে অবকাঠামোগত দুর্বলতা চিহ্নিত করা অন্তর্ভুক্ত।

সংশ্লিষ্টদের মতে, ওডিএনআই প্রতিবেদনে উল্লিখিত অনেক দুর্বলতা আগের প্রশাসনের আমল থেকেই পরিচিত। এর মধ্যে রয়েছে পুরনো সফটওয়্যার ব্যবহার এবং যন্ত্রগুলোর ইন্টারনেট সংযোগের সক্ষমতা, যা হ্যাকাররা কাজে লাগাতে পারে। তবে সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে, মার্কিন নির্বাচনে ভোট কারচুপির কোনো প্রমাণ কারো কাছে নেই।

২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে ট্রাম্প একটি নির্বাহী আদেশে স্বাক্ষর করেন, যার লক্ষ্য ছিল মার্কিন নির্বাচনের ওপর ফেডারেল সরকারের নিয়ন্ত্রণ বাড়ানো। এই প্রতিবেদনের কাজ সেই কার্যক্রমেরই অংশ। অথচ মার্কিন সংবিধান অনুযায়ী, নির্বাচন পরিচালনার পূর্ণ ক্ষমতা অঙ্গরাজ্যগুলোর হাতে।

এ বিষয়ে দুটি প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে। একটি ওডিএনআই’র নিজস্ব এবং অন্যটি ‘মোজাইভে রিসার্চ’ নামের একটি সরকারি ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের করা, যারা পুয়ের্তো রিকো থেকে জব্দ করা ভোটিং মেশিন পরীক্ষা করেছিল। মোজাইভে রিসার্চের প্রতিবেদনেও মেশিন হ্যাক হওয়ার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

সূত্র জানিয়েছে, ওডিএনআই গত ছয় মাসে হোয়াইট হাউসকে তাদের প্রতিবেদনের ফলাফল সম্পর্কে ব্রিফ করেছে, কিন্তু প্রকাশের কোনো অনুমতি পায়নি। একইভাবে মোজাইভে রিসার্চের প্রতিবেদনটিও প্রকাশ করা হয়নি এবং অক্টোবর মাসে প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে চুক্তি বাতিল করা হয়। সেই প্রতিবেদনে সফটওয়্যারের দুর্বলতা নিয়ে উদ্বেগ জানানো হয়েছিল এবং জরুরি ভিত্তিতে আপডেট করার সুপারিশ করা হয়েছিল, যা আজও বাস্তবায়িত হয়নি।

এদিকে সিসা স্পষ্ট করেছে, ২০২০ সালের নির্বাচনে কোনো বিদেশি শক্তি হস্তক্ষেপ করেছে এমন কোনো প্রমাণ তারা পায়নি। সংস্থাটি একে ‘আমেরিকার ইতিহাসের সবচেয়ে নিরাপদ নির্বাচন’ হিসেবে অভিহিত করেছে।

সূত্র: রয়টার্স

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত