প্রথম ম্যাচে সৌদি আরবের কাছে হেরেও বিশ্বকাপ জিতেছিল লিওনেল মেসির আর্জেন্টিনা। সাকিব আল হাসানের বাংলাদেশও ঘুরে দাঁড়াবে এশিয়া কাপে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই তত্ত্বে বিশ্বাসীর সংখ্যা কম নয়।
শ্রীলঙ্কার কাছে ৫ উইকেটে হার দিয়ে বাংলাদেশের এশিয়া কাপ শুরু হলেও লাহোরে ঠিকই ঘুরে দাঁড়াবে সাকিবের দল, সব সমীকরণকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে পৌঁছে যাবে সুপার ফোরে এবং এরপর ফাইনালে; ক্রিকেটসংক্রান্ত নানান ফেসবুক গ্রুপে আর মন্তব্যের ঘরে এই মতবাদে বিশ্বাসীদের দেখা মেলে।
প্রশ্ন হচ্ছে, দলের ক্রিকেটাররা কতটা বিশ্বাস করেন, আফগানিস্তানকে তারা আজ হারিয়ে দেবেন হেসেখেলে?
শ্রীলঙ্কার দ্বিতীয় সারির বোলিং আক্রমণের সামনেই যাদের মুখ থুবড়ে পড়েছে, আফগানিস্তানের ধারালো বোলিং আক্রমণের সামনে তাদের পরিণতি কী হতে পারে তার প্রমাণ কিছুদিন আগেই দেখা গেছে চট্টগ্রামে। সিরিজের প্রথম দুটো ওয়ানডেতেই বাংলাদেশ করেছিল যথাক্রমে ১৬৯-৯ ও ১৮৯।
কাল বাংলাদেশ দলের প্রতিনিধি হয়ে সংবাদ সম্মেলনে আসা কোচ চন্ডিকা হাথুরুসিংহে যেন সেটাই মনে করিয়ে দিলেন, ‘বিশ্বের অন্যতম সেরা বোলিং আক্রমণ আফগানিস্তানের, বিশেষ করে সীমিত ওভারের খেলায়। তাদের বিশ্বমানের স্পিনাররা আছে, ভালো সব সিম বোলারও আছে। আমরা তাদের ব্যাপারে ভালো করেই জানি। কারণ সম্প্রতি তাদের বিপক্ষে ওয়ানডে এবং টি-টোয়েন্টি সিরিজ খেলেছি।’
চট্টগ্রামের ব্যাটিংবান্ধব উইকেটে তামিম ইকবাল ও লিটন দাসের মতো নিয়মিত ও অভিজ্ঞ দুই উদ্বোধনী ব্যাটসম্যানকে নিয়েও ফজল হক ফারুকির তোপ সামাল দেওয়া যায়নি। তার ওপর রশিদ খানের লেগস্পিন, মুজিব-উর-রহমানের অফস্পিন তো আছেই। পাল্লেকেলেতে মাহেশ থিকশানার অফস্পিনের বিষেই তো নীল হলো বাংলাদেশ।
আর্জেন্টিনা-তত্ত্বের বাইরে গিয়ে বাংলাদেশকে সত্যিকারের ভরসা জোগাতে পারে আফগানদের দুর্বল মিডল অর্ডার। ইব্রাহিম জাদরান আর রহমানউল্লাহ গুরবাজের উদ্বোধনী জুটিটা দারুণ।
গত কয়েকটা ম্যাচে দুইবার তাদের উদ্বোধনী জুটি ২০০ ছাড়িয়েছে, বাংলাদেশের বিপক্ষে ২৫৬ রানের পর পাকিস্তানের বিপক্ষে ২২৭ রানের জুটি গড়েছেন এই দুজন। তবে এই দুজনের পর যারা ব্যাট করতে নামছেন, তারা ঠিক পারছেন না ছন্দটা ধরে রাখতে। পাকিস্তানের বিপক্ষে উদ্বোধনী জুটিতে ৪০ ওভারে ২২৭ রান এলেও ৫০ ওভার শেষে সংগ্রহটা ৩০০ রানের বেশি হয়নি, তার আগের ম্যাচে জাদরান আর গুরবাজ অল্পতে আউট হওয়ার পর আফগানদের ইনিংসও গুটিয়ে যায় মাত্র ৫৯ রানে।
চট্টগ্রামে সিরিজের শেষ ওয়ানডেতেও আফগানদের টপ ও মিডল অর্ডার গুঁড়িয়ে দিয়েছিলেন তাসকিন-শরিফুলরা। কাল লাহোরে সেটাই করতে পারলে সুযোগ আছে বাংলাদেশের, তবে প্রতিপক্ষের রানটা বড় হয়ে গেলে রান রেট বাড়িয়ে নেওয়া এবং জেতা দুইয়ের সুযোগই কমে যাবে, যা আসরে টিকে থাকার জন্য বাংলাদেশের খুবই দরকার।
লিটনের জ্বরে দলে সুযোগ পাওয়া এনামুল হক কি একাদশে সুযোগ পাবেন? তাকে জায়গা করে দিতে কে বাদ পড়বেন, আগের দিন ক্যারিয়ার সেরা ১৬ রানের ইনিংস খেলা নাঈম শেখ নাকি অভিষেকেই শূন্য রানে আউট হওয়া তানজিদ তামিম?
হাথুরুসিংহে বললেন, উইকেট দেখে আজ সকালে নেবেন সিদ্ধান্ত, ‘আসলে ওদের মতো (লিটন ও তামিম) অভিজ্ঞ দুজন যখন একসঙ্গে দলের বাইরে চলে যায়, তখন কিছুই করার থাকে না। একজনের চোট আর আরেক জন অসুস্থ, তাই আমাদের কিছুই করার নেই। যারা দলের সঙ্গে আছে, তাদের নিয়েই এগিয়ে যেতে হবে। ওরা প্রতিভাবান বলেই দলে জায়গা পেয়েছে। আমরা মাত্রই এখানে এলাম, এখনো উইকেটই দেখা হয়নি। নিশ্চয়ই উইকেটের চরিত্রে বদল আসবে (আগের ম্যাচ থেকে), তখন আমরা দলে পরিবর্তনের কথা ভাবব।’
আফগানদের সঙ্গে ঘরের মাঠে ওয়ানডে সিরিজে হারের পর দুটো টি-টোয়েন্টিই জিতেছে বাংলাদেশ। ব্যাটে-বলে দারুণ পারফর্ম করেছিলেন অধিনায়ক সাকিব। তখনো তিনি হয়তো জানতেন না, এশিয়া কাপে ওয়ানডে অধিনায়ক হিসেবে তাকেই আসতে হবে। আর্জেন্টিনা-ভক্ত সাকিব আল হাসানকে তাই নিতে হবে মেসির ভূমিকা। কাতার বিশ্বকাপে সৌদি আরবের কাছে হারের পর মেসির জাদুতে আর্জেন্টিনা যেভাবে একের পর এক বাধা পেরিয়ে সব সমীকরণ মিলিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে, বাংলাদেশকেও এশিয়া কাপে এগিয়ে যেতে হলে লাগবে সাকিবের জাদুকরি ভূমিকা। তাহলেই আর্জেন্টিনা-তত্ত্ব প্রমাণ করে জিততে পারবে বাংলাদেশ।
অধিনায়ক হিসেবে এশিয়া কাপের ওয়ানডে সংস্করণে এখনো কোনো ম্যাচ জেতেননি সাকিব। ২০১০ সালে শ্রীলঙ্কার দাম্বুলায় হয়ে যাওয়া এশিয়া কাপের ৩ ম্যাচে ভারত, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কার কাছে হেরেছিল বাংলাদেশ। ১৩ বছর পর পাল্লেকেলেতেও ৫ উইকেটে হার। সাকিব কি পারবেন বাংলাদেশকে জিতিয়ে, আসরে টিকিয়ে রেখে মেসি হতে? ভক্তের শক্তি কতটা লাহোরের গাদ্দাফি স্টেডিয়ামে তারই প্রমাণ মিলবে আজ।
